লক্ষ্ণৌ ঘণ্টাঘরে মহিলাদের অবস্থান-মঞ্চে যোগীর পুলিশের হামলা


  • March 19, 2020
  • (0 Comments)
  • 468 Views

১৯ মার্চ দুপুরে লক্ষ্ণৌর ঘণ্টাঘরে মহিলাদের অবস্থানে আচমকা পুলিশি হামলা। মুখোশধারী আক্রমণকারীরা কি আদৌ পুলিশ? যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসন মহিলা অবস্থানকারীদের উপর নির্মম আক্রমণ বুঝিয়ে দিল প্রশাসন ভয় পাচ্ছে। একটি গ্রাউন্ডজিরো রিপোর্ট

 

লক্ষ্ণৌ শহরের ঘণ্টাঘর এলাকায় নাগরিকত্ব আইনের কার্যকরী হওয়ার প্রতিবাদে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান বিক্ষোভে শামিল শতাধিক মহিলা। বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ তাঁদের উপরে অমানবিক আক্রমণ চালাল মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের পুলিশ বাহিনী। এই আক্রমণ ছিল সম্পূর্ণ অকস্মাৎ, ফলে কোনও রকম প্রতিরোধ তৈরির সুযোগই পাননি শান্তিপূর্ণ অবস্থানরত মহিলা আন্দোলনকারীরা। করোনার আতঙ্কককে বেমালুম উড়িয়ে দিয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীনের মতো যে প্রশাসন অযোধ্যায় রামনবমী উৎসব পালনের আয়োজন করে হিন্দুত্ববাদী জিগির বজায় রাখতে, তাঁরা ঠিক এই স্পর্শকাতর সময়কেই বেছে নিল দীর্ঘদিন আন্দোলনে বসে থাকা ও সারা দেশের মানুষের কাছে প্রতিবাদের আরও একটি উদাহরণ হয়ে ওঠা সিএএ-বিরোধী মহিলাদের উপর বর্বরোচিত হামলা করার জন্য। ভেবে দেখার মতো বিষয় এদিনই সন্ধ্যাবেলা প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন।

এদিন দুপুরবেলা আচমকাই বহু সংখ্যক পুলিশের পোষাক পরিহিত মানুষ ঘণ্টাঘরের অবস্থান বিক্ষোভের এলাকাটি ঘিরে ফেলে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় তাদের পরনে খাকি উর্দি থাকলেও তাঁদের পোশাকে কোনও নেমপ্লেট ছিল না এবং রুমালে তাদের মুখ ঢাকা ছিল। মহিলা পুলিশেরা যদিও উপস্থিত ছিলেন। এই বাহিনী এসেই উপস্থিত মহিলাদের উপর শারীরিক আক্রমণ শুরু করে। নির্বিচারে চুল ধরে মারা, তাদের পেট লক্ষ্য করে লাথি, ঘুষি মারতে থাকে। এমনকি প্রৌঢ়া ও বৃদ্ধারাও এই নির্দয় মারের হাত থেকে রেহাই পাননি। ঘটনাস্থলেই তিন মহিলা জ্ঞান হারান। শরীরে আঘাত নিয়ে বহু মহিলাকে স্থানীয় হাসপাতেলে ভর্তি করা হয়। আচমকা পুলিশি হামলায় মহিলারা সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ ও হতচকিত হয়ে পড়েন।

 

 

বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে তাঁরা যে ত্রিপল টাঙিয়েছিলেন তা ছিঁড়ে ফেলে পুলিশ ও উর্দিধারীরা। বসার যে কিঞ্চিৎ ব্যবস্থা রয়েছে তাও মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দেওয়া হয়। অবস্থানকারী মহিলারা জানান, যে মুখ ঢাকা উর্দিধারীরা ছিলেন তারা আদৌ পুলিশ কি না তা নিয়ে যথেষ্ঠ সন্দেহ রয়েছে। কারণ তাদের ব্যবহার ও শরীরী ভাষা ছিল পুরোপুরি গুন্ডাদের মতো। অনবরত মহিলাদের প্রতি কুৎসিত ও অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করে গেছেন তারা। পুলিসদের সঙ্গে মিশে প্রশাসনের সহায়তায় এই গুন্ডাস্থানীয় ব্যক্তিরাই অবস্থানরত মহিলাদের উপর মারাত্মক হামলা চালায় বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কিছু সময় পরে এই বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয় প্রায় ৩০০/৪০০ র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স-এর সদস্য।

 

ঘণ্টাঘরের এই ধরনায় নিয়মিত যোগ দেন এক প্রতিবন্ধী দম্পতি। তাঁদের প্রতিবন্ধকতার সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত অপমানজনক ব্যবহার করা হয় এবং স্বামী ভদ্রলোককে ধর্নার এলাকা থেকে জোর করে বের করে দেওয়া হয়। প্রশাসনের সাহায্যে শান্তিপূর্ণ অবস্থানে এই হামলার ভিডিও ও ছবি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। দিল্লির শাহিনবাগে মহিলাদের যে অবস্থান বিক্ষোভ দেশের লাখো মহিলাকে প্রতিবাদের পথ দেখিয়েছে ঘণ্টাঘর সেখানে বিশেষ উল্লেখযোগ্য। কারণ যোগী আদিত্যনাথের রাজ্যে বসে নিরবচ্ছিন্ন এই ধর্না মোটেই ছোট কথা নয় এবং সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। কোনওরকম ভয় না পেয়ে ও হুমকিতে পিছু না হঠে তাঁরা এই অবস্থান চালিয়ে যাচ্ছেন। এদিনের হামলার পরেও তাঁরা ধর্না চালিয়ে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

 

আক্রমণের পরেই বিকেলবেলা সেখানে পৌঁছে যান অবস্থান বিক্ষোভের সাথী ও সমর্থকেরা। তাঁরাই আহত মহিলাদের পাশে দাঁড়ান ও হামলার বিরোধিতায় সরব হন। ঘণ্টাঘর থেকে কিছু দূরেই গোমতীনগরে চলতে থাকা আরও একটি ধর্নামঞ্চ, সেখানকার মহিলারাও ঘন্টাঘরের সাহসী মহিলাদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন। ঘণ্টাঘরে এই আক্রমণ আসলে ধর্না তুলে দেওয়ার জন্য যোগী আদিত্যনাথের প্রশাসনের কৌশল। যদিও ভয় পাইয়ে, এমনকি এরকম মারাত্মক শারীরিক হেনস্থা ও হামলা চালিয়েও এই নারীদের মনোবল ভেঙে দেওয়া সহজ হবে না। ঘণ্টাঘর আরও একবার দেখিয়ে দিল প্রশাসন এই ধর্নামঞ্চগুলিকে রীতিমত ভয় পাচ্ছে, সেইকারণেই  মহিলাদের উপর আক্রমণ শানাচ্ছে। তবে এই মহিলাদের পুরুষতান্ত্রিক ভাবনার চেনা ছাঁচে ফেলতে চাওয়াটা নিছকই ভুল হচ্ছে, তা ভেঙে যাবে এভাবেই সাহসী রুখে দাঁড়ানোয় আর অবস্থান না ভাঙার শপথে।

 

গ্রাউন্ডজিরো-র তরফ থেকে ঘণ্টাঘরের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের উপর নিয়মিত নজর রাখা হবে ও পাঠকদের জানানো হবে।

 

ছবি: সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রাপ্ত   

 

Share this
Leave a Comment