প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনে এন পি আর ডি-এর এক দশক


  • February 20, 2020
  • (0 Comments)
  • 811 Views

ভারতে রয়েছে প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার আইন, ২০১৬। এখনও এ দেশে প্রতিবন্ধী মানুষদের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে, প্রাপ্য মৌলিক অধিকার নিয়ে লড়াই বিগত কয়েক দশকের মতোই চলছে। সেই লড়াইতে অন্যতম উজ্জ্বল নাম ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর দ্য রাইটস্ অফ দ্য ডিসেবেল্ড (এন পি আর ডি)। ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ সম্পূর্ণ হল প্রতিবন্ধীদের অধিকার আন্দোলনের এই জাতীয় মঞ্চটির পথ চলার এক দশক। দীর্ঘ দিনের প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলন কর্মী শম্পা সেনগুপ্ত ফিরে দেখলেন এই দশ বছরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ও বললেন ভবিষ্যতের ভাবনা।

 

সে ছিল এমনই এক ফাল্গুন মাস। কলকাতার আকাশে ছিল উজ্জ্বল রোদ। হয়তো বা বাইপাসের ধারের গাছগুলোতে লাল পলাশও ফুটেছিল অনেক। তারিখটা ছিল বিশে ফেব্রুয়ারি, ২০১০ সাল। সল্টলেক স্টেডিয়ামে এক সম্মেলনে সেদিন দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা প্রতিবন্ধী মানুষরা সমবেত হয়েছিলেন, শপথ নিয়েছিলেন জাতীয় প্রতিবন্ধী মঞ্চ গড়ে তোলার, নিজেদের সংগঠন এর নাম স্থির করেছিলেন ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর রাইটস অফ ডিসেবেল্ড (এন পি আর ডি)। ভারতের প্রতিবন্ধী আন্দোলনের ইতিহাসে শুরু হয়েছিল নতুন অধ্যায়।

 

সমবেত প্রতিবন্ধী মানুষ এবং প্রতিবন্ধী আন্দোলনের কর্মীদের সবার জন্যই এটি নতুন কাজ ছিল না, কারণ দীর্ঘদিন ধরে তারা প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার আদায়ের কাজ করে যাচ্ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য প্রতিবন্ধী সম্মিলনী এমনই এক সংগঠন। কিন্তু তাদের সংগঠকদেরও নতুন দায়িত্ব হলো এই দিন থেকে – জাতীয় স্তরে আন্দোলন গড়ে তোলা। আবার, অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা অনেক কর্মীদের কাছে এই ছিল পথ চলা শুরুর দিন। মাত্র দশ বছরেই এন পি আর ডি হয়ে উঠেছে ভারতবর্ষের প্রতিবন্ধী আন্দোলনের এক অন্যতম মুখ। তাদের কাজের ধারা ভারতের অন্যান্য প্রতিবন্ধী সংগঠনের থেকে একেবারেই আলাদা।

 

কাশ্মীরে পেলেট গান-এর দ্বারা মানুষ দৃষ্টিহীন হলে অথবা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জে.এন. সাইবাবা জেলে প্রতিবন্ধী-বান্ধব পরিবেশ না পেলে তার প্রতিবাদ একমাত্র এন পি আর ডি করে, যেখানে দেশের অন্য প্রতিবন্ধী সংগঠনেরা একেবারে চুপ থাকে।

 

ভারতের বেশি ভাগ প্রতিবন্ধী সংগঠনই এনজিও হিসাবে কাজ করে, তাদের মধ্যে অধিকাংশই সরকারি অনুদানের সাহায্য নেয়, কাজেই সরকার বিরোধী কথা বলা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। আবার বেশ কিছু বিদেশি অনুদানদাতাদের থেকে সাহায্য নেন। কিন্তু এন পি আর ডি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে এইরকম কোনো অনুদান তারা নেবে না। এন পি আর ডি-এর কর্মী ও নেতৃত্ব বেশীর ভাগই রাজনৈতিক কাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত, যা অন্য কোনো প্রতিবন্ধী সংগঠনেই দেখা যায় না। এই রাজনৈতিক সচেতনতা তাদের কাজে অন্য মাত্রা যোগ করতে সাহায্য করে। কাশ্মীরে পেলেট গান-এর দ্বারা মানুষ দৃষ্টিহীন হলে অথবা দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জে.এন. সাইবাবা জেলে প্রতিবন্ধী-বান্ধব পরিবেশ না পেলে তার প্রতিবাদ একমাত্র এন পি আর ডি করে, যেখানে দেশের অন্য প্রতিবন্ধী সংগঠনেরা একেবারে চুপ  থাকে।

 

দশ বছরের পথ চলায় সাফল্যের ঝুলি তাদের খুব ছোট নয়। সল্টলেক স্টেডিয়ামে দশ বছর আগের সেই সম্মেলনে তারা দাবি তুলেছিলেন ভারতবর্ষে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য অভিন্ন পরিচয়পত্র দেওয়া উচিত বলে। সেই দাবি এখন নতুন প্রতিবন্ধী অধিকার আইনের অংশ বিশেষ। এই প্রতিবন্ধী অধিকার আইনের লড়াইয়ে তারা অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে এবং ছিনিয়ে এনেছে অনেক নতুন অধিকারের ধারা। দিল্লির নির্ভয়া কান্ডের পর ভার্মা কমিটি গঠিত হয়। সেই কমিটির সদস্যদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলার তিনবার সুযোগ পান এন পি আর ডি-এর সদস্যরা এবং দেশের ধর্ষণ আইনে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য বিশেষ ধারার অন্তর্ভুক্ত করতে সমর্থ হন।

 

গত বছর মানে ২০১৯-এর পঁচিশে নভেম্বর এই সংগঠন দিল্লিতে এক ধর্নার পরিকল্পনা করে প্রতিবন্ধী অধিকার আইনের সঠিক প্রয়োগের দাবি নিয়ে। ২২শে নভেম্বর ভারত সরকার এক সরকারি বিঞ্জপ্তি জারি করে জানান যে তারা মেনে নিচ্ছেন প্রতিবন্ধী আইন ঠিক মতো রূপায়ণ হচ্ছে না এবং এন পি আর ডি-এর ধর্নার কথা উল্লেখ করে সব রাজ্যকে এই আইন মেনে চলতে নির্দেশ পাঠায়। ভারতের প্রতিবন্ধী আন্দোলনের ইতিহাসে এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা – ধর্না শুরুর আগেই কেন্দ্রীয় সরকার সব দাবি মেনে নেওয়া এবং জি.ও.-তে সেই কথা উল্লেখ করা।

 

দিল্লির এক কামরার ছোট্ট অফিস দেখে এন পি আর ডি-এর কাজের মূল্যায়ন করা অসম্ভব । কারণ এই সংগঠনের কাজ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে। এদের না আছে নিজস্ব ওয়েবসাইট, না আছে উইকিপিডিয়া পাতা। বেশির ভাগ গণসংগঠনের মতো এদের কাজের লিখিত হিসাব পাওয়া মুশকিল। প্রতি তিন বছর অন্তর সম্মেলনে নির্বাচনের মাধ্যমে এরা নিজেদের নেতৃত্ব ঠিক করে। এদের তৃতীয় সম্মেলনের নথিপত্র অনুযায়ী এই সম্মেলনে যোগদান করা সদস্যদের মধ্যে ৮৬% তপশীলী জাতি, উপজাতি (এসসি, এসটি, ওবিসি)-এর মধ্যে পড়েন। যদিও সচেতনভাবে চেষ্টা করেও নেতৃত্ব বা কর্মীদের মধ্যে নারী প্রতিনিধি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে আবার দেশে প্রতিবন্ধী নারীদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করায় তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

 

এন পি আর ডি গত এক দশকে নানাবিধ কাজ করেই চলেছে – আদালতে আইনী লড়াই থেকে পথে নেমে আন্দোলন। আজ, দশ বছর পূর্তিতে এন পি আর ডি-এর সকল সদস্যদের নতুন করে শপথ নেওয়ার দিন : ভারতবর্ষকে সকল বাধামুক্ত, প্রতিবন্ধী-বান্ধব দেশ বানানোর।

 

শম্পা সেনগুপ্ত এন পি আর ডি-এর যুগ্ম সম্পাদক।

 

Share this
Leave a Comment