সুনাগরিকের দিন গিয়াছে, উহার কবর রচিত হোক।


  • February 11, 2020
  • (0 Comments)
  • 394 Views

শিক্ষাস্বাস্থ্যবিদ্যুৎপানীয় জলের সুশাসন কেবল নহে, শাহিনবাগজামিয়াজেএনইউ দু:খের বল, ত্যাগের বল, মানুষের জন্য মানুষের প্রেমের বলও যুক্ত হইয়াছিল বলিয়া, অঙ্গন হইতে রাজপথ অধিকৃত হইয়াছিল বলিয়াও দিল্লির মসনদ সঙ্ঘী দ্বেষপ্রেমীদের অধরা রহিয়া গেল। লিখেছেন দেবাশিস আইচ

 

দেশের সমস্ত বালক ও যুবককে আজ পুলিশের গুপ্তদলনের হাতে নির্বিচারে ছাড়িয়া দেওয়া — এ কেমনতরো রাষ্ট্রনীতি। এ-যে পাপকে হীনতাকে রাজপেয়াদার তকমা পরাইয়া দেওয়া। এ যেন রাতদুপুরে কাঁচা ফসলের খেতে মহিষের পাল ছাড়িয়া দেওয়া। যার খেত সে কপাল চাপড়াইয়া হায় হায় করিয়া মরে, আর যার মহিষ সে বুক ফুলাইয়া বলে — বেশ হইয়াছে, একটা আগাছা আর বাকি নাই।

— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

 

নাগরিকত্বই যখন কাড়িয়া লওয়া হইবে তখন সুনাগরিক হইয়া উঠিবার প্রচেষ্টা আজ অর্থহীন। নাগরিকত্ব হারাইয়া বন্দিশালার অপরাধী বনিয়া যাওয়াই যখন ভবিতব্য, তখন কিই-বা সু কিই-বা কু! ভূমিহীন, জীবিকাহীন, দেশহীন ঊনমানব করিয়া  তোলাই যখন নীতি ও আইন, যখন সংসদ হইতে শীর্ষ আদালত, সংবাদমাধ্যম হইতে সুরক্ষাবাহিনী ইতরের অভিযানে মত্ত — তখন মুক্ত আকাশ, ফসলবিহীন ক্ষেত্র, বিকাইয়া যাওয়া জল-জমিন-জঙ্গল, কর্মহীন কল-কারখানা, শিক্ষাহীন বিদ্যালয়, লাশভরা শ্মশান-গোরস্থানে ভরিয়া উঠুক আজাদির কুচকাওয়াজ। প্রতিটি বাগ, প্রতিটি অঙ্গন, প্রতিটি চত্বর, প্রতিটি রাজপথ অবরুদ্ধ হোক।

 

যখন বইমেলা চত্বরে মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে কচিকাঁচা ছাত্রীদের শরীর ধামসায় শিক্ষাবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী কলিকাতার পুলিশ, ধর্ষণের হুমকি দেয়, কিয়স্কের মেঝেতে ফেলিয়া যথেচ্ছ কিল-চড়-লাথি কষায় নাট্যকর্মীকে, ‘দেশপ্রেমী’ নয় বলিয়া প্রতিবাদী মানবাধিকার কর্মী-লেখক-প্রকাশকদের কর্ণকুহর অশ্লীল বাক্যরাজিতে ভরিয়া তোলে পুলিশ কর্তা — অপবিত্র করিয়া তোলে সাংস্কৃতিক মহামেলার চত্বর — যখন মানহারা মানবীর দ্বারে বলিষ্ঠ চিত্তে দাঁড়াইবার কেহ নাই — তখন সেই সুবিবেচক নাগরিকপনার পোশাকি ছদ্মবেশ ছিঁড়িয়া উড়াইয়া দেওয়াই মঙ্গল। যে পুলিশ কর্ত্রী এক ছাত্রীকে ‘ক্যারিয়ার ধ্বংস’ করিয়া দিবার, ‘কেস’ দিয়া জীবন বিপর্যস্ত করিয়া দিবার হুমকি দেয়, তাহার ‘পুলিশ ম্যানুয়াল’-এ যাহা লিখা নাই তাহা হইল, এই ছাত্রদল ‘ক্ষুদ্র বিষয়বুদ্ধিকে জলাঞ্জলি দিয়া প্রবল নিষ্ঠার সঙ্গে দেশের সেবার জন্য সমস্ত জীবন উৎসর্গ করিতে প্রস্তুত হইয়াছে। এই পথের প্রান্তে কেবল যে গবর্মেন্টের চাকরি কিংবা রাজসম্মানের আশা নাই তাহা নহে, ঘরে বিজ্ঞ অভিভাবকদের সঙ্গেও বিরোধে এ রাস্তা কণ্টকিত।” হুমকিতে তাহারা ভীত নহে। তর্জনী তুলিয়া, স্বর চিরিয়া সেই সদ্য তরুণী জনতার সম্মুখে ওই উর্দি পরিহিতা গুন্ডাকে অপরাধী বলিয়া সাব্যস্ত করিয়াছিল। জবাবে, তাহাকে সমদলের আড়ালে মুখ লুকাইতে দেখিবার সৌভাগ্য হইয়াছে।

 

যে সকল গিল্ডকর্তা, লেখক, কবি, সাহিত্যিক, নাট্যকার, বুদ্ধিজীবীরা এখনও এই শ্বাপদ-কাণ্ডে নীরব, একটি নিন্দাবাক্য উচ্চারণ করেন নাই, মনে রাখিতে হইবে তাঁহারা এই রাষ্ট্রের পোষ্য সুচতুর সুনাগরিক। বুদ্ধি বিবেক বন্ধক রাখিয়া, ইহারা শাসকের দরবারে ‘দরখাস্তপত্র বিছাইয়া আপন পথ সুগম’ করিতে ব্যস্ত। ছাত্ররা যাহা অস্বীকার করিয়াছে।

 

যখন বিষবাস্প সমাকীর্ণ  প্রকাশ্য রাজপথে চতুর্দিক হইতে ঘিরিয়া ছাত্রীদের যৌনাঙ্গে লাথি-লাঠি মারে দিল্লিস্থ পুলিশ, নিরস্ত্র তরুণ-তরুণীদের বিজাতীয় আক্রোশে প্রবল পীড়ন করিয়া অবদমিত বিকৃত বাসনা চরিতার্থ করে — সেই মনুষ্যেতর বাহিনীর জন্য কোনও ঘৃণাই যথেষ্ট নহে। এই শাসক বাহিনীর বিষদন্ত উপড়াইয়া তুলিবার জন্য সুনাগরিক হইয়া ওঠাও বাঞ্ছনীয় নহে। কুকুরের মতো গুলি করিয়া  মারিতেছে যখন, আরও মারিবে বলিয়া ভয় দেখাইয়া চলিতেছে — কোনও ন্যায়ালয়ে যখন তাহার বিচার নাই, স্বাভাবিক প্রতিকার নাই, তখন এই দানবীয় নিদানের বিরুদ্ধতায় ক্ষমাহীন প্রত্যাঘাত করিতে হইবে। তাহাদের জয়স্তম্ভ গুঁড়াইয়া দিতে হইবে। উহা সুনাগরিকের কর্ম নহে।

 

মনে রাখিতে হইবে, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বিদ্যুৎ-পানীয় জলের সুশাসন কেবল নহে, শাহিনবাগ-জামিয়া- জেএনইউ-র দু:খের বল, ত্যাগের বল, মানুষের জন্য মানুষের প্রেমের বলও যুক্ত হইয়াছিল বলিয়া, অঙ্গন হইতে রাজপথ অধিকৃত হইয়াছিল বলিয়াও দিল্লির মসনদ সঙ্ঘী দ্বেষপ্রেমীদের অধরা রহিয়া গেল। একইসঙ্গে একথাও মনে রাখিতে হইবে দিল্লি সঙ্ঘীদূষণ হইতে মুক্ত হয় নাই। এই দূষণ মুক্তি, এই প্রবল পীড়নকারীদের পঙ্গু করিয়া দেওয়া, এই পেশীশক্তির কবর রচনা করা এখন এক ও একমাত্র রাজনৈতিক ও নাগরিক কর্তব্য। যমুনা অবিরল নির্মল হোক।

 

ঋণ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ছোটো ও বড়ো, অগ্রহায়ণ ১৩২৪।

 

লেখক সাংবাদিক এবং সামাজিক কর্মী।

 

Share this
Leave a Comment