১০ মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে কলকাতার টেলিফোন ভবনে ঠিকা শ্রমিকদের বিক্ষোভ। 


  • January 22, 2020
  • (0 Comments)
  • 162 Views

১০ মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে বুধবার কলকাতার টেলিফোন ভবনে প্রায় পাঁচশো ঠিকা শ্রমিক বিক্ষোভ দেখালেন।  গ্রাউন্ডজীরো রিপোর্ট।

 

গোটা দেশ এখন এনআরসি, সিএএ নিয়ে উত্তাল, শহর কলকাতাও দেখেছে একাধিক মিছিল, বিক্ষোভ। কিন্তু বার বার অবহেলিত হচ্ছে শ্রমিকদের দাবিদাওয়াগুলো। সরকার চেপে রাখছে শ্রমিকদের কন্ঠস্বরগুলোকে। অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে শ্রমজীবী মানুষদের। মিডিয়া হিন্দু-মুসলিম আর পাকিস্তান তরজায় ব্যস্ত। সেই পরিস্থিতিতে ১০ মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে বুধবার কলকাতার টেলিফোন ভবনে প্রায় পাঁচশো ঠিকা শ্রমিক বিক্ষোভ দেখালেন।

 

বিক্ষোভকারী শ্রমিকদের সাথে কথা বলতে গিয়ে উঠে এল একাধিক অভিযোগ। বিএসএনএল (ক্যালকাটা টেলিফোনস্)-এ কর্মরত প্রায় সাড়ে চার হাজার ঠিকা শ্রমিকের জীবন আজ গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে।

 

একটু পিছনে গিয়ে দেখা যাক। ২০১৯ -এ আমরা দেখেছিলাম ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিএসএনএল (ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড) -কে নিয়ে যে নাটক চলছিল তার পরিসমাপ্তি ঘটানো হল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা এক পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছিল যাতে বেশ কিছু নির্দিষ্ট প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বিএসএনএল ও এমটিএনএল (মহানগর টেলিফোন নিগম লিমিটেড)-এর সংযুক্তি, একটি ‘আকর্ষণীয়’ (যদিও তার রূপরেখা এখনও আমরা পাইনি) স্বেচ্ছাবসর প্রকল্প, সংস্থাকে ফোর জি লাইসেন্স প্রদান, বন্ডের মাধ্যমে ১৫,০০০ কোটি টাকা বাজার থেকে তোলা, ৩৮,০০০ কোটি টাকার অ্যাসেট মানিটাইজেশন (সাদা বাংলায় যার অর্থ কোম্পানির সম্পত্তি বেচে খাওয়া) ইত্যাদি। তবে এই পুনরুজ্জীবন প্রকল্পটিকে আমরা বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখলে হয়তো ভুল হবে। সংস্থার সিএমডি প্রবীণ কুমার পুরওয়ারের শুভেচ্ছাবার্তা স্মরণ করতে হবে এক্ষেত্রে। যেখানে তিনি কোনও রাখঢাক না রেখেই বলেছিলেন কেন ৫০ বছরের বেশি বয়সের কর্মীদের স্বেচ্ছাবসর প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত, কাজ করলেই বেতন মিলবে এমন নিশ্চয়তা কেন নেই, অর্ধেক কর্মী নিয়ে আগামিদিনে ৫ গুণ বেশি কাজ করতে হবে।

 

সেই সূত্র ধরেই স্থায়ী শ্রমিক-কর্মচারীদের অবসর নেওয়ানো বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে ঠিকা শ্রমিকদের ছাঁটাই করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেই মতো ছাঁটাই চলছে নিয়ম মাফিক।

 

গত ৮-১০ মাস ধরে বিএসএনএল-কে নিয়ে একাধিক মিথ্যা ও অর্ধসত্য সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। বিলগ্নিকরণ – পুরোপুরি বন্ধ – আর্থিক পুনরুজ্জীবন – কর্মী ছাঁটাই – কোনটা বেশি দরকার তা নিয়ে কূট তর্কে মেতেছে কর্পোরেট কলমচিরা, যেভাবে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিকদের সময় মতো মাইনে দেওয়া হয়নি, যেভাবে কর্মীদের গোটা দেশের সামনে অযোগ্য ও অপদার্থ প্রতিপন্ন করা হয়েছে তার তুলনা বিরল।

 

একথা অস্বীকার করার কোন কারণ নেই যে সরকারের ধারাবাহিক অন্তর্ঘাত, নতুন প্রযুক্তির অভাব সর্বোপরি রিলায়েন্স জিও-কে একচেটিয়া টেলিকম মার্কেটে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ করে দেওয়ার ফলে বিএসএনএল অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে।

 

আজ কর্পোরেট মিডিয়াতে এমনভাবে বিষয়টা প্রচার করা হচ্ছে যে বিএসএনএল-এর আয়ের ৭৫ শতাংশ কর্মচারী খাতে বেতন দিতে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে কোম্পানির আয় কমে গেছে। ২০১৬-১৭ সালের রেভিনিউয়ের পরিমাণ ছিল ৩১,৫৩৩ কোটি টাকা-), যা ২০১৮-১৯ সালে হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৮,৮৬৫ কোটি টাকা। ঠিক এই কারণেই কোম্পানির আয়ের সঙ্গে কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয়ের শতাংশ বেড়ে গেছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।

 

প্রত্যক্ষ সরকারি মদতে একটি বিশেষ টেলিকম কোম্পানি জিও-র ব্যবসা একচেটিয়াকরণের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেই। বরং সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থাকে তুলে দেওয়ার নীতিতে অবিচল। বিএসএনএল-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার এই পরিণতি আটকাতে মাঝে মধ্যেই দেখেছি আমরা গোটা দেশেই বিএসএনএল -এর শ্রমিক-কর্মচারীরা বার বার বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন।

 

ক্যালকাটা টেলিফোনস-এ ঠিকা শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঠিকা শ্রমিকরা এর বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে গড়ে তুলেছে এক সংগ্রামী ইউনিয়ন।কন্ট্রাক্টরস ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের পক্ষ থেকে এ দিন টেলিফোন ভবন অভিযান সংগঠিত করা হয়। ঠিকা শ্রমিকদের দাবি:

 

১) বকেয়া ১০ মাসের বেতন মেটাতে হবে

২) মাসে ২৬ দিনের কাজ দিতে হবে

৩) ঠিকা প্রথা নয়, স্থায়ীকরণ করতে হবে

৪) মাসে ১৩ দিন কাজ, ৫৫ বছর হলেই বাধ্যতামূলক অবসর, দিনে ৩ ঘন্টা কাজের ফরমান বাতিল করতে হবে

 

 

দাবিগুলি থেকেই স্পষ্ট যে সরকারের শ্রমিক-বিরোধী আগ্রাসী নীতি এবং সরকারি রাষ্ট্রায়ত্ব শিল্পের বেসরকারীকরণ শ্রমিকরা কোনমতেই সফল করতে দিতে চান না।

 

কন্ট্রাক্টরস্ ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিএসএনএল নিয়ে যে অন্তর্ঘাত সরকার চালিয়েছে দীর্ঘদিন, তার পরিণতিতে ৯ জন শ্রমিক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। আজকের কর্মসূচিতে তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়।

 

ইউনিয়নের উপদেষ্টা অমিতাভ ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে একটি চারজনের প্রতিনিধি দল সিজিএমের প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা করে দাবিপত্র পেশ করেন। দাবিগুলো নিয়ে কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে। সেই আশ্বাসের উপর দাঁড়িয়েই শ্রমিকরা এ দিনের মতো তাঁদের বিক্ষোভ কর্মসূচি শেষ করেন। কিন্তু শ্রমিকদের উপর সর্বস্তরের আক্রমণ, তাদের মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া এসব প্রত্যেকদিন নতুন নতুন ভাবে চালাচ্ছে সরকার। এনেছে শ্রম কোড। স্থায়ী কাজ তুলে দিয়ে সমস্ত সেক্টরে ঠিকা প্রথা চালু করছে। সেই সমস্ত আক্রমণের কথা মাথায় রেখেই নতুন ইউনিয়নের পক্ষ থেকে আগামী দিনে আইনি লড়াই ও ময়দানি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা হয়।

 

তথ্যঋণ: সুমন কল্যান মৌলিক, খবর অনলাইন।

 

Share this
Leave a Comment