মানুষের বিক্ষোভের রঙে শহর জুড়ে ‘গো ব্যাক মোদি’


  • January 11, 2020
  • (0 Comments)
  • 352 Views

কলকাতায় আসার পর জনরোষের ভয়েই বারবার সফরসূচী বদলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধীতার সামনে পড়তে চাননি। ধর্মতলা চত্ত্বর দখল করে রাত জাগছেন ছাত্রযুবরা। প্রধানমন্ত্রী শহর না ছাড়া পর্যন্ত অবস্থান চলবে। ১২ই জানুয়ারি নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম-এ বক্তব্য রাখার কথা তাঁর। তবে সেই বক্তব্যের থেকেও বহু গুণ জোরে আওয়াজ উঠছে প্রীতিলতার এই মাটিতে দাঙ্গাবাজের ঠাঁই নেই/ঠাঁই নেই, তোমার বুকে নাথুরাম/আমার বুকে ক্ষুদিরাম! লিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

বেচু দলুই বসেছিলেন এসপ্ল্যানেড ওয়াই চত্ত্বরে। ভোর চারটের সময় ডায়মন্ড হারবারের আমোদপুর গ্রাম থেকে রওনা দিয়েছিলেন। কলকাতা এসে পৌঁছেছেন দুপুরের মধ্যে। তাকে যখন দেখতে পেলাম তখন বিকেল গড়িয়ে যাচ্ছে। বললেন, আরও কিছুক্ষণ থেকে তারপর যাবেন। কী করেন আপনি? “আমি চাষি। চাষ করে খাই। সারা দেশ জুড়ে চাষিরা মরছে, তাই আর ঘরে বসে থাকতে পারলাম না,” স্থির গলায় বললেন বেচু। এই সরকার কেন্দ্রে আসার পর থেকে কোনও উন্নয়ন চোখে পড়েছে? মুচকি হাসি নিয়ে বললেন, “আপনারা শহরের লোক ভালো বলতে পারবেন। চাষিরা মরেছে, উন্নয়ন না? মেয়েদের উপর ধর্ষণ-অত্যাচার বেড়ে গেছে, উন্নয়ন না? চাকরিবাকরি নাই, উন্নয়ন না? জিনিসপত্রের দাম শুধু বাড়ছে, উন্নয়ন না?” কি পেলেন আজকের এই জমায়েতে এসে? “সাহস পেলাম জানেন, সবাই মিলে এই অন্যায়ের বিরূদ্ধে দাঁড়াতে পারব মনে হচ্ছে। গ্রামে ফিরে গিয়ে বলব, সবাই দলমত ভুলে একসঙ্গে জোট বাঁধছে। বিজেপি-র সঙ্গে আমাদের এভাবেই লড়তে হবে,” প্রৌঢ় ‘চাষি’ বেচু দলুই এভাবেই প্রত্যয় জুগিয়ে দিলেন।

 

১১ই জানুয়ারি যখন দুপুরে বাড়ি থেকে বেরোচ্ছি তখনও পর্যন্ত জানি না প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কলকাতায় আসার পর কোথায় কখন যাচ্ছেন। তবে শহরের নানা প্রান্তে সাধারণ মানুষ, বামদলগুলি জমায়েত করে রাস্তা অবরোধ করছেন এমন খবর তো ছিলই। যত বেলা গড়িয়েছে ততই খবর আসতে শুরু করেছে যে বিভিন্ন জমায়েতে ক্রমশই মানুষের যোগদান বাড়ছে। কৈখালি মোড় থেকে একটি এমনই জমায়েতের যাওয়ার কথা ছিল দমদম এয়ারপোর্ট, যদিও সেই মিছিল মাঝরাস্তাতেই পুলিস আটকে দেয়।

 

এসে পৌঁছলাম নন্দন চত্ত্বরে। সেখানে তখন মূলত ছাত্রছাত্রদের ভিড়। চলছে পোস্টার লেখা আর স্লোগান তোলা। ম্যাটাডোর-এর মাথায় উড়ছে ভগৎ সিং আর রোহিত ভেমুলার ছবি আঁকা বিরাট পতাকা। পুলিসের সতর্ক চোখের সামনেই জোর গলায় স্লোগান উঠছে – ‘সরফরোশি কি তমান্না অব হমারে দিল মে হ্যায়/দেখনা হ্যায় জোর কিতনা বাজুয়ে কাতিল মে হ্যায়’।

 

নন্দন থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছচ্ছিলাম ধর্মতলা চত্ত্বরে। সারা শহরের ব্যস্ততায় কোথাও কোনও ছন্দপতন হয়নি। পথঘাট স্বাভাবিক, মানুষ শনিবার দিন সপ্তাহান্তের শীতের দুপুর-বিকেল-সন্ধ্যার আমেজ নিতে চান। তবে যতই এসপ্ল্যানেড ওয়াই চত্ত্বরের কাছে পৌঁছানো গেল, ততই মোদি-বিরোধী প্রতিবাদের স্বর স্পষ্টতর হয়ে উঠছিল। রাজভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ করা সম্ভব হয়নি। তবে কার্যত এসপ্ল্যানেড চত্ত্বর দুপুর থেকেই চলে গিয়েছিল মানুষের দখলে। বিভিন্ন বাম দল, ছাত্র সংগঠন ও অসংখ্য সাধারণ মানুষের সমবেত কন্ঠে নানাভাবে একটিই কথা উঠে আসছিল – ‘নরেন্দ্র মোদি গো ব্যাক’। সেখানে লাল পতাকার পাশে নিশ্চিন্তে উড়ছিল রামধনু পতাকা। নীল পতাকা নিয়ে জয় ভীম শ্লোগান তোলা মানুষও হাজির ছিলেন।

 

এই জমায়েতে বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। বৃদ্ধ বা মাঝবয়সীরা যেমন ছিলেন আগামীর কাছে নিজের অস্তিত্ব প্রমাণের তাগিদে, তেমনি এনআরসি, সিএএ বিরোধী আন্দোলনের চেনা-অচেনা তরুণ প্রজন্ম গান, স্লোগান আর রাস্তায় রং-তুলিতে মোদি-বিরোধী বক্তব্য অক্লান্তভাবে লিখে রাখতে রাখতে প্রমাণ করছিলেন – ‘হাম দেখেঙ্গে/লাজিম হ্যায় কে হাম ভি দেখেঙ্গে’। ছোট বড় নানা দলে ভাগ হয়ে বসে, দাঁড়িয়ে লাগাতার বক্তব্য ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন নানা বয়সী মানুষ। সবচেয়ে বেশি ভেসে আসছিল ‘আজাদি’-র স্লোগান।

Image Courtsey: Madhurima Bakshi

সারা চত্ত্বর ঘুরে ঘুরে সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে আজাদির স্লোগান দিচ্ছিলেন সদরুন্নিসা। পার্ক সার্কাস ময়দানে এনআরসি, সিএএ বিরোধী দিনরাতের লাগাতার যে অবস্থান বিক্ষোভ করছেন মহিলারা, সেখানে প্রথম দিন থেকে রয়েছেন তিনি। চোখে-মুখে রাগ আর আত্মবিশ্বাসের এক আশ্চর্য মিশ্রণ। এই জমায়েত থেকে ফিরে যাবেন ময়দানের অবস্থান বিক্ষোভে, “মোদি সরকার কালা দিন লেকর আয়া হ্যায়। উও নেহি চলনে দেঙ্গে হম। ইসকো হঠা কর রহেঙ্গে।” ডকুমেন্টস দেখাবেন কি না জানতে চাওয়ায় উত্তর দিলেন, “কিঁউ দিখায়েঙ্গে? হমারা ডকুমেন্টস হ্যায় কুতুব মিনার, হমারা ডকুমেন্টস হ্যায় লাল কিলা, ইয়ে দেশ হমারা ডকুমেন্টস হ্যায়।”

 

যত রাত বেড়েছে ততই যেন জমায়েতে উপস্থিত মানুষের ক্ষোভ এক জায়গায় হতে শুরু করেছে। আকাশে কালো বেলুন উড়িয়ে কালো পতাকার মতোই বার্তা গেছে মোদি সরকারের বিরূদ্ধে। মনে রাখা জরুরি, রাজ্য সরকারের নির্দেশে এসপ্ল্যানেড ওয়াই চত্ত্বরে কোনওরকম প্রতিবাদী সভা-সমাবেশ-জমায়েত নিষিদ্ধ হয়েছিল। এদিন নরেন্দ্র মোদির শহরে আসার ঘটনার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েত তা নিমেষেই উঠিয়েই দিয়েছিল। যদিও প্রচুর সংখ্যায়  পুলিস মোতায়েন ছিল, দেওয়া হয়েছিল ব্যারিকেড-ও। উপস্থিত মানুষেরা অবশ্য গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে অবস্থান বিক্ষোভই চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

 

এদিনের ঘটনা অবশ্য একটি বিষয় সুস্পষ্ট করে দেয় – এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যতই মুখে সিএএ, এনআরসি-র বিরোধীতা করুন না কেন, তিনি সুকৌশলে প্রধানমন্ত্রীর শহরে আসা ও তার সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় ভিন্ন বার্তাই দিলেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে যে ক্ষোভ ক্রমশ পুঞ্জীভূত হচ্ছে তাকে কিছুটা বিভ্রান্ত করতেই যেন তৃণমূলেরও একটি ধর্ণা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে রাজভবনের কাছে। সেখানে সন্ধ্যাবেলা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মোলাকাতের পর মুখ্যমন্ত্রী পৌঁছান ও সিএএ, এনপিআর রাজ্যে কার্যকরী করা হবে না – এমনটাই দাবি তোলেন। কাছাকাছি সময়েই ধর্মতলায় অবস্থানকারীরা পুলিসের ব্যরিকেড ভাঙার চেষ্টা করলে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়, যদিও তা বেশি দূর এগোয়নি। অন্যদিকে বাগবাজার ঘাটে কিছু ছাত্র নরেন্দ্র মোদি জলপথে বেলুড় মঠ যাওয়ার সময়ে কালো পতাকা দেখাতে গেলে পুলিস তাদের ব্যাপক মারধরের পর তুলে নিয়ে যায়।

 

কলকাতায় আসার পর জনরোষের ভয়েই বারবার সফরসূচী বদলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিরোধীতার সামনে পড়তে চাননি। ধর্মতলা চত্ত্বর দখল করে রাত জাগছেন ছাত্রযুবরা। ১২ই জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শহর না ছাড়া পর্যন্ত অবস্থান চলবে। ১২ই জানুয়ারি নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়াম-এ বক্তব্য রাখার কথা তাঁর। তবে সেই বক্তব্যের থেকেও বহু গুণ জোরে আওয়াজ উঠছে – ‘প্রীতিলতার এই মাটিতে দাঙ্গাবাজের ঠাঁই নেই/ঠাঁই নেই’, ‘তোমার বুকে নাথুরাম/আমার বুকে ক্ষুদিরাম’!

 

লেখক ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং স্বতন্ত্র সাংবাদিক 

 

Share this
Leave a Comment