কলকাতার নিউ মার্কেট চত্বরে বিদ্যুৎদ্যুতি জমায়েতে রব উঠল ‘রাষ্ট্রই ধর্ষক’।


  • January 5, 2020
  • (0 Comments)
  • 764 Views

এই জমায়েতে মেয়েদের চলমান, ছন্দবদ্ধ শরীর হয়ে ওঠে স্লোগানের ক্ষেত্র। সে শ্লোগানে উঠে আসে সাম্প্রতিকতম ফ্যাসিস্ট সরকারের আইনি বেআইনি হিংসার ইতিহাস। অন্যদিকে, চিৎকার করে, নিজেদের নৃত্যরত শরীরের ছন্দের তালে তালে শতাধিক মেয়ে বলে ওঠেন, ‘তুমিই ধর্ষক’। লিখছেন নন্দিনী ধর

 

“ফ্ল্যাশ মব” শব্দটি আমাদের বাংলার রাজনৈতিক শব্দতালিকায় বড় একটা নেই। ঝটিতি জমায়েত হওয়া একদল মানুষ ঝটিতি কিছু অঙ্গভঙ্গি করে আবার ঝট করে উধাও হয়ে যান — একেই বলে ফ্ল্যাশ মব। ফ্ল্যাশ মব পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন সময়ে জড়ো হয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে, মানুষকে চমকে দিয়েছে। তেমনি একটি ফ্ল্যাশ মব, একটি হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখা গেল, ৫ জানুয়ারি শনিবার, কলকাতার নিউ মার্কেট চত্বরে। প্রায় ১২০ জন বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন ধরনের পোশাক পরিহিতা মেয়েরা জড়ো হয়ে, সার বেঁধে নাচলেন, ছন্দের সাথে সাথে কতগুলো কথা সশব্দে ছুঁড়ে দিলেন —“তুমিই ধর্ষক !” এক অর্থে দেখতে গেলে এই পারফরম্যান্স-এর মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই।

 

২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে লাতিন আমেরিকার দেশ চিলিতে ‘লাস্টেসিস’ নামে একটি নারীবাদী সংগঠনের আহ্বানে সে দেশের রাষ্ট্রপতির বাসগৃহের সামনে করা হয় এমনি একটি ফ্ল্যাশ মব পারফরমেন্স। সেই অনুষ্ঠানে উচ্চারিত স্লোগানগুলির ইংরেজি করলে দাঁড়াবে অনেকটা এইরকম:

 

“And it wasn’t my fault or where I was or how I dressed.”
“The oppressive state is a male rapist.”
“The Rapist is You. The judges, The State, The President.”

 

লাস্টিসিসের পক্ষ থেকে সারা পৃথিবীর নারীবাদী কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যে তাদের নিজ নিজ শহরে এই ফ্ল্যাশ মব পারফরম্যান্সটি সংগঠিত করার। সেই ডাকে সারা দিয়েই প্যারিস, বার্সিলোনা, সান্তো ডোমিঙ্গ, মেক্সিকো সিটি, বোগোটা এবং নিউ ইয়র্কে এই জাতীয় একটি একটি পারফরম্যান্স সংগঠিত করা হয়। আজকের কলকাতার অনুষ্ঠানটিও সেই আন্তর্জাতিক ডাকে সাড়া দেওয়ার ধারাবাহিকতাতেই।

 

প্রথমত, অনুষ্ঠানটির জন্য কোনো পুলিশ-অনুমতি নেওয়া হয়নি, তবে পুলিশকে জানানো হয়েছিল। মানে, আজ বহুদিন ধরে রাষ্ট্রের প্রহরায় যে ধরনের প্রতিবাদ-সভা করাতে আমরা অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি, তার থেকে এই জমায়েতটি কোথায় যেন আলাদা। হ্যাঁ, জমায়েতটির ফলে বিঘ্নিত হয়েছে যান-চলাচল। কিন্তু, এই বিঘ্ন ঘটানোর রাজনীতি আমাদের সামনে বৃহত্তর একটি প্রশ্নকে তুলে ধরে। বিঘ্নিত কি হয়নি উন্নাওয়ের সেই মেয়েটির জীবন? কিংবা কাশ্মীরের গোটা একটি গ্রামের, যার নাম কুনান-পোশপোরা? কিংবা সোনি সোরির? কিংবা মণিপুরের থ্যাঙজাম মনোরমার? মানে, ধর্ষণ বা যৌন হিংসা মানে তো আসলে ধর্ষিতার জীবনে বিঘ্ন। সেই বিঘ্নতার বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে কোন অধিকারে আমরা চাই যে সমস্তভাবে অবিঘ্নিত থাকবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবন? বিশেষ করে প্রতিবাদের ভাষা এবং বিষয় যখন সেই ধর্ষণের বিঘ্নের বাস্তবতাকে মনে রেখেই?

 

অনুষ্ঠানের অন্যতম উদ্যোক্তা দ্যুতি মুখোপাধ্যায় জানালেন যে, তাঁরা বিশেষভাবে এম্পায়ার সিনেমার সামনে এই জায়গাটি বেছে নেন কারণ এটি কলকাতার অন্যতম কেন্দ্রীয় স্থল। আসা-যাওয়া আছে বহুধরনের মানুষের। বিশেষ করে, এই অঞ্চলের গা-ঘেঁষেই কলকাতার অন্যতম মুসলিম সম্প্রদায়গুলির বাস। “আমরা ইচ্ছে করেই কোনো এলিট জায়গা বেছে নিইনি”, জানালেন দ্যুতি। পাশাপাশি, এও জানালেন যে, যদিও তাঁরা রিহার্সাল দিয়েছেন আজকের অনুষ্ঠানটির আগে, তৎসত্ত্বেও, বহু পথচলতি মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশগ্রহণ করতে চাইলে তাঁরা বাধা দেননি। এমনকী একটি বড় সংখ্যক অংশগ্রহণকারীদের পক্ষে রিহার্সালে রোজ আসা সম্ভব না হওয়ায়, তারা অনলাইন পাঠিয়ে দিয়েছেন স্লোগান/গানটির কথা, সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করেছেন নাচের মূলগত স্টেপগুলি। দ্যুতি “পারফরম্যান্স” শব্দটি ব্যবহার করতে চান না। কারণ, শব্দটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে একধরণের ভীতি, দক্ষতার আধিপত্য। কাজেই, “পারফরম্যান্স” শব্দটি অনেককেই ত্রস্ত করে তোলে, ভয় পাইয়ে দেয়, দূরে সরিয়ে রাখে। “পারফরমেন্স এর সাথে সাথেই যে আসে পারফরম্যান্স অ্যাঙজাইটি”, বললেন দ্যুতি। অর্থাৎ, শিক্ষা ও দক্ষতার যে স্বৈরতন্ত্রকে আমরা চিনতে শিখেছি “পারফরম্যান্স” বিষয়টির অঙ্গ হিসেবে, তাকেও এখানে একধরনের গণতন্ত্রীকরণের প্রক্রিয়ার মধ্যে ফেলা হল।

 

ধর্ষণ বা যৌন হিংসা বিষয়টি জটিল। সেখানে একদিকে যেমন আছে একটি চূড়ান্ত ব্যক্তিগত দিক এবং অবশ্যম্ভাবীভাবে ব্যক্তিগত ধর্ষণের বাস্তবতা, তেমনি আবার ধর্ষণ ও যৌন হিংসা একইসাথে তো ভীষণভাবে ব্যবস্থাভিত্তিকও। বিশেষ করে ধর্ষণ যখন হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণের হাতিয়ার। যৌন হিংসার এই গোটা ধারাবাহিকতাই উঠে আসে এই পারফরম্যান্সে। অংশগ্রহণকারীদের অনেকেরই বুকে বা পিঠে ঝোলে প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা, “Rapist UP Police, Go Back”, অথবা “শাড়িকাপড় খুলবো না/documents দেবো না — NOCAA/NPR/NRC /NOTGBILL.”

কেউ বা পরে আছেন সাদা শাড়ি, তাতে ছোট ছোট জাতীয় পতাকা আটকে লেখা “ভারতমাতা। ” CAA-র বাস্তবতার সাথে এইভাবেই মিলেমিশে এক হয়ে যায় ট্রান্সজেন্ডার বিলের বাস্তবতা। যে বাস্তবতা দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্রের সনাক্তকরণ পদ্ধতির ওপর। যে সনাক্তকরণের যুক্তির ওপর দাঁড়িয়েই রাষ্ট্র তৈরি করে তার বৈষম্য ও নিপীড়ণের নীলছক। বিশেষত ফ্যাসিবাদী যেকোনো রাষ্ট্রের কাছেই, ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, সনাক্তকরণ হয়ে উঠেছে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ধাপ। তাই, জার্মানিতে ইহুদিদের পরতে হতো হলুদ তারা, সমকামীদের জন্য সেই তারার রং নির্ধারিত হয়েছিল গোলাপি। দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের সর্বত্র বয়ে বেড়াতে হতো পাস। আর, আমাদের এই ভারতবর্ষের চৌহদ্দিতে, কাশ্মীর, যেখানে গেলে সবচাইতে গভীরভাবে ধরা পরে ভারতরাষ্ট্রের ঐতিহাসিক স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্র, সেখানকার মানুষকে বয়ে বেড়াতে হয় আইডি কার্ড। তো, যাই হোক, এইভাবেই, এই জমায়েতে মেয়েদের চলমান, ছন্দবদ্ধ শরীর হয়ে ওঠে স্লোগানের ক্ষেত্র। সে শ্লোগানে উঠে আসে সাম্প্রতিকতম ফ্যাসিস্ট সরকারের আইনি ও বে-আইনি হিংসার ইতিহাস। অন্যদিকে, চিৎকার করে, নিজেদের নৃত্যরত শরীরের ছন্দের তালে তালে শতাধিক মেয়ে বলেন, “তুমিই ধর্ষক। … আর ধর্ষক, ওই পুলিশ। আর আদালত। এই দেশ। ব্রাহ্মণ্যবাদী। ধর্মান্ধ। মৌলবাদী। হোমোফোবিক। ট্রান্সফোবিক। ফ্যাসিবাদী। হিন্দুরাষ্ট্র। মোদী সরকার।” এইভাবেই এই নাচে ধর্ষণ আর শুধুই একটি ব্যক্তিগত মেয়েদের যন্ত্রণা বা “ইজ্জত হারানোর” প্রশ্ন থাকে না, বরং হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার একটি অবস্থা। যার নাম সামাজিক-রাষ্ট্রীয় স্থিতাবস্থা। বৃহত্তর বাস্তবতা। যে বাস্তবতার হাত থেকে কারুর নিস্তার নেই। প্রতিরোধের রাজনীতি বিনা।

 

এই জমায়েতের পেছনে ছিল না কোনো ‘পার্টি’ জাতীয় রাজনৈতিক সংগঠন। উদ্যোক্তারা জানালেন, একে অন্যের সাথে তাঁদের অনেকাংশেই পরিচয় ঘটেছে সাম্প্রতিক এনআরসি-বিরোধী মিছিল-মিটিঙে। খুব অবশ্যম্ভাবীভাবেই তাই উঠে আসে একটি রাজনৈতিক-সাংগঠনিক বাস্তবতা — মৌলবাদ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন একভাবে দৃঢ় করে লিঙ্গ-আন্দোলনকে, নারী আন্দোলনকে, পিতৃতন্ত্র-বিরোধী আন্দোলনকে। অন্যদিকে পিতৃতন্ত্র বিরোধী আন্দোলন ব্যতীত কোনো ফ্যাসিবাদী আন্দোলনও সম্ভব নয়। কাজেই, কালকের জমায়েতের একজন অংশগ্রহণকারীর গলায় ঝোলা প্লাকার্ডের কথা মনে পরে যায় — “Women will Destroy Hindu Rashtra.” যে স্লোগানটি আমরা প্রথম দেখেছিলাম সপ্তাহ দুয়েক আগে, দিল্লিতে, ‘পিঞ্জরা তোড়’ নামে এক মূলত ছাত্রী-সংগঠনের কর্মীদের হাতে। এইভাবেই, আমাদের আজকের টালমাটাল পৃথিবীতে তৈরি হয় রাজনৈতিক অনুবাদের অনুষঙ্গ, তৈরি হয় নতুন এক আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের ভাষা, নতুন এক রাজনীতির ভাষা।

 

উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে জানালো হল যে, আগামী দু-এক সপ্তাহ জুড়ে, শহরের আরও কয়েকটি জায়গায় এই অনুষ্ঠানটি করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। “আসলে আমাদের কাছে অন্যতম একটি চ্যালেঞ্জ ছিল যে যাঁরা পুরুষ নন, তাঁদের নিজেদের মতো করে রাজনৈতিক হয়ে ওঠার একটা জায়গা দেওয়ার। আমাদের সমাজে সেটাও একটা রাজনৈতিক কাজ ,” জানালেন দ্যুতি। “কারণ, যাঁরা আজ জমায়েতে অংশগ্রহণ করেছেন, তাঁদের জীবনে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্যের মুখোমুখি হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। দ্যুতির মতে, এই যে একসাথে জড়ো হওয়া, শরীরে ছন্দ তোলা, চিৎকার করে ওঠা গলা মিলিয়ে একসাথে — গোটা প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়ে তাঁরা একভাবে নিজেদের রাজনৈতিক বৈষয়িকতার হদিশ পেয়েছেন।

 

এইভাবেই বোধহয় ছোট ছোট তথাকথিত তুচ্ছ ঘটনার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে একটি সময়ের রাজনীতি, তার ভাষা। আমরা যারা এই দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলটিকে চিনছি বেশ কিছুদিন ধরে, বয়সে আর ঠিক তরুণ নেই, তাদের কাছে এইটাই এক ধরনের পাওনা। রাষ্ট্রীয় হিংসার সাথে পাল্লা দিয়ে গড়ে উঠছে নতুন ধরনের প্রতিরোধ। আমরা আজ সবাই রাস্তায়। কী হবে জানা নেই। কিন্তু রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছি সবাই। চলছে নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক নিরীক্ষার প্রচেষ্টাও।

 

লেখক কবি ও সাহিত্যের অধ্যাপক।

 

All Image Courtesy : Facebook page of Dhorshok Tumi-i/The Rapist is You: Kolkata Chapter. Video: https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10156858348441705&id=727771704 

 

Share this
Leave a Comment