এনপিআরের ঘুরপথে দেশজুড়ে এনআরসি আনতে চলেছে কেন্দ্রীয় সরকার।


  • December 25, 2019
  • (1 Comments)
  • 949 Views

এনপিআরে যে তথ্য সংগৃহীত হবে তা থেকেই ঝাড়াই বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে প্রথমে স্থানীয় তারপর দেশজোড়া নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি তৈরি হবে। লিখছেন ধীমান বসাক

 

কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় এনপিআর বা জাতীয় জনসংখ্যা পঞ্জি এবং জনগণনার অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। ২০২১-এর জনগণনার জন্য ৮,৭৫৪.২৩ কোটি টাকা এবং ২০২০-র ১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এনপিআর-এর তথ্য সংগ্রহের জন্য ৩,৯৪১.৩৫ কোটি টাকা। মোদীর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ্ রাখঢাক না-করেই সংসদে বলেছিলেন যে, নাগরিক সংশোধনী আইন বা সিএএ-র পরে ২০২৪-এর আগেই জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি হবে। নরেন্দ্র মোদী সম্প্রতি দিল্লিতে এক জনসভায় বলেছেন, এনআরসি নিয়ে কোনও আলোচনাই নাকি হয়নি। অথচ আজ নিজেই কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় এনপিআরের জন্য টাকা বরাদ্দ করলেন।

 

এনপিআর নিশ্চিতভাবেই দেশজোড়া এনআরসি-র প্রথম ধাপ। এখানে ‘এনআরসি’ এনআরআইসি নামে পরিচিত। অসম বাদে সারা ভারতের  ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। এখানে ‘আই’ অর্থ ‘ইন্ডিয়া’। অসমে যে এনআরসি হয়েছে, তা হয়েছে নাগরিকত্ব আইনের অধীনেই, ৬এ ধারায়। সেখানে ভিত্তিবর্ষ ও তারিখ বা ‘কাট অফ ডেট’ ছিল ২৪ মার্চ মধ্যরাত্রি বা ২৫ মার্চ, ১৯৭১, যেদিন পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী নামায় পাকিস্তানের শাসকরা। ভারতজোড়া এনআরসি বা এনআরআইসি-র ‘কাট অফ ডেট’ ঘোষিত হয়নি। এই তারিখ ও বছর যদি আলাদা করে ঘোষিত না-হয়, তাহলে অভিবাসনের ক্ষেত্রে সংবিধান অনু্যায়ী তা হবে ২৬ জানুয়ারি, ১৯৫০। সে অসমের এনআরসি-র থেকেও ভয়ঙ্কর।

 

এখানে একটা কথা বলার দরকার। যে সিএএ বা নাগরিকত্ব সংশোধন আইন পাশ হল, সাধ করে আগ বাড়িয়ে তার ফাঁস কেউ পরতে যাবে বলে মনে হয় না। যাঁরা ইতিমধ্যেই নাগরিকের সুযোগসুবিধা ভোগ করছেন, তাঁরা কেন নিজেকে শরণার্থী বানাতে যাবেন? কিন্তু মোদী সরকার তাঁদেরকে তিষ্ঠোতে দেবে না। দেশজোড়া এনআরসি আনা হবে। তাতে ধরা পড়বেন কারা? ১৯৫০-র পর যাঁরা এদেশে এসেছেন তাঁরা। তাঁদেরকে তখন বাধ্য হয়ে সিএএ-র আশ্রয় নিয়ে নাগরিকত্ব চাইতে হবে। এই আইনের ফাঁস গলায় পড়তে হবে। তাই মোদী সরকার দেশজোড়া এনআরসি করবেই। তারই প্রথম ধাপ হল এনপিআর। কীভাবে প্রথম ধাপ?

এনপিআর-এর তথ্যেই তৈরি হবে সর্বভারতীয় এনআরসি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের ২০১৮-‘১৯-এর বার্ষিক রিপোর্টের ২৬২ নং পৃষ্ঠায় এর উল্লেখ রয়েছে।

 

এনপিআর-এর বিজ্ঞপ্তি জারি হয়েছে নাগরিকত্ব বিধি ২০০৩-এর অধীনে। [The Citizenship (Registration of Citizens and Issue of National Identity Cards) Rules, 2003] নীচে সেই বিজ্ঞপ্তিটি দেখুন।

 

এবার আইনটি জেনে নেওয়া যাক। এই আইনের ২(কে) উপধারায় এনআরআইসি-র সংজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। ঠিক তার পরের ২(এল) উপধারায় পপুলেশন রেজিস্টারের সংজ্ঞা দেওয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে যে এই রেজিস্টার তৈরি করবেন ‘রেজিস্ট্রার জেনারেল অফ সিটিজেন রেজিস্ট্রেশন’। যিনি এনআরআইসি-র দায়িত্বপ্রাপ্ত, তিনিই পপুলেশন রেজিস্টারেরও দায়িত্বপ্রাপ্ত। সেন্সাস তৈরির দায়িত্ব কিন্তু আলাদা ব্যক্তির ওপর। সে পদের নাম ‘রেজিস্ট্রার জেনারেল অ্যান্ড সেন্সাস কমিশনার অফ ইন্ডিয়া’।

 

এরপর আইনটির তিন নম্বর ধারা, যার শিরোনাম হল ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেন, তাতে কীভাবে এই এনআরআইসি তৈরি হবে, কে করবে এবং সেখানে কী কী থাকবে তা বলা হয়েছে।

৩(৩) উপধারায় এই এনআরআইসি-তে যেগুলো আবশ্যিকভাবে থাকবে তাতে শেষ দু’টো লক্ষ্য করার বিষয়। ১১ নং সিরিয়ালে বলা হল — রেজিস্ট্রেশনের সিরিয়াল নম্বর, ১২নং-এ বলা হল — ন্যাশনাল আইডেনটিটি নম্বর। এটা আধার বা অমিত শাহের সাম্প্রতিক সময়ে বলা সবকিছু মেশানো কার্ডের কথা মনে করিয়ে দেয়।

 

ঠিক তার পরের উপধারা ৩(৪)-এ বলা হচ্ছে পপুলেশন রেজিস্টারের কথা – (4) The Central Government may, by an order issued in this regard, decide a date by which the Population Register shall be prepared by collecting information relating to all persons who are usually residing within the jurisdiction of Local Registrar, অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় সরকার, এই মর্মে এক আদেশ ঘোষণা করে, স্থির করতে পারে লোকাল রেজিস্ট্রারের এলাকার মধ্যে সাধারণভাবে বসবাসকারী সমস্ত ব্যক্তির তথ্য সংগ্রহ করে, কোন্ তারিখের মধ্যে পপুলেশন রেজিস্টার তৈরি করা হবে।

 

এর পরেই আসছে ৩(৫) উপধারা। বলা হচ্ছে – (5) The Local Register of Indian citizens shall contain details of persons after due verification made from the Population Register, অর্থাৎ, লোকাল রেজিস্টার অফ ইন্ডিয়ান সিটিজেন-এ পপুলেশন রেজিস্টারে নাম থাকা ব্যক্তিদের তথ্য যাচাই-এর পর তোলা হবে।

 

পরের ৪ নং ধারার হেডিং হচ্ছে — 4. Preparation of the National Register of Indian Citizens.

 

৪(১) নং উপধারায় বলা হচ্ছে — The Central Government shall, for the purpose of National Register of Indian Citizens, cause to carry throughout the country a house-to-house enumeration for collection of specified particulars relating to each family and individual, residing in a local area including the Citizenship status, অর্থাৎ এনআরআইসি তৈরির উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় সরকার স্থানীয় এলাকায় বসবাস করা প্রতিটি পরিবার ও প্রতিটি ব্যক্তির নির্দিষ্ট তথ্যগুলো, নাগরিকত্ব পরিচয় সহ, সংগ্রহ করার জন্য বাড়ি-বাড়ি নাম তোলার প্রক্রিয়া চালাবে।

 

এরপর ৪(৩) উপধারায় বলা হল — (3) For the purposes of preparation and inclusion in the Local Register of Indian Citizens, the particulars collected of every family and individual in the Population Register shall be verified and scrutinized by the Local Registrar, who may be assisted by one or more persons as specified by the Registrar General of Citizen Registration, অর্থাৎ, ভারতীয় নাগরিকদের স্থানীয় রেজিস্টার তৈরি এবং সেখানে নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য, পপুলেশন রেজিস্টারে প্রতিটি পরিবার এবং প্রতিটি ব্যক্তির সংগৃহীত তথ্যগুলো স্থানীয় রেজিস্ট্রার যাচাই এবং স্ক্রুটিনি করবেন, এবং এ কাজে তাকে সহযোগিতা করার জন্য রেজিস্ট্রার জেনারেল অফ সিটিজেন রেজিস্ট্রেশন লোক নিয়োগ করবেন।

 

এরপর ৪(৪) উপধারায় বলা হল — (4) During the verification process, particulars of such individuals, whose Citizenship is doubtful, shall be entered by the Local Registrar with appropriate remark in the Population Register for further enquiry and in case of doubtful Citizenship, the individual or the family shall be informed in a specified proforma immediately after the verification process is over, অর্থাৎ যাচাই করার সময়, যে সমস্ত ব্যক্তির নাগরিকত্ব সন্দেহপূর্ণ, তাদের তথ্য পপুলেশন রেজিস্টারে যথোচিত মন্তব্য-সহ স্থানীয় রেজিস্ট্রার অন্তর্ভুক্ত করবেন আরও অনুসন্ধানের জন্য, এবং সন্দেহপূর্ণ নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা পরিবারটিকে যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার ঠিক পরে পরেই নির্দিষ্ট প্রোফর্মায় জানাবেন।

 

এরপর ৫ নং ধারা, ৬(এ), (বি)-তে পরবর্তী শুনানি, যাচাই, আবেদন, নাম অন্তর্ভুক্তকরণ কীভাবে হবে তার বিবরণ রয়েছে।

 

এরপর ৬(সি)-তে বলা হচ্ছে — (c) Subject to the provisions contained in clause (a) of sub-rule (5), the Sub-district or Taluk Registrar shall consider such objections and summarily dispose off the same within a period of ninety days, and thereafter submit the Local Register of Indian Citizens so prepared to the District Registrar of Citizen Registration who shall cause the entries in the Local Register of Indian Citizens, to be transferred to the National Register of Indian Citizens, অর্থাৎ  ৫(এ) উপধারার (এ) অংশধারায় উল্লেখিত শর্তসাপেক্ষে, উপজেলা বা তালুক রেজিস্ট্রাররা কোনও ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের তোলা আপত্তিগুলো বিচার করবেন এবং নব্বইদিনের মধ্যে দ্রুত নিষ্পত্তি করবেন এবং তারপর এইভাবে তৈরি হওয়া ভারতীয় নাগরিকের স্থানীয় রেজিস্টার জেলা রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠাবেন, যিনি এনআরআইসি-তে অন্তর্ভুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবেন।

 

কী দাঁড়াল? এনপিআরে যে তথ্য সংগৃহীত হবে তা থেকেই ঝাড়াই বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে প্রথমে স্থানীয় তারপর দেশজোড়া নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি তৈরি হবে। নিশ্চিতভাবেই এনপিআর এনআরআইসি-র প্রথম ধাপ।

 

লক্ষণীয়, কেন্দ্রীয় সরকার এগুলোকে আড়াল করবার জন্য জনগণনার কর্মীদের দিয়ে বা জনগণনার অংশ হিসাবে এটাকে চালাতে চাইছে।

 

নীচে পুরো রুলটির স্ক্রিনশট রইল আর শেষে রইল সরকারেরই প্রকাশিত প্রশ্নোত্তরের একটি অংশ।

 

 

লেখক একজন সমাজকর্মী।

 

Share this
Recent Comments
1
Leave a Comment