কলকাতায় এনআরসি-সিএএ বিরোধী জমায়েতে হিন্দুত্ববাদীদের হামলা


  • December 23, 2019
  • (0 Comments)
  • 494 Views

সারা দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে, কলকাতায় যেভাবে মানুষ পথে নামছেন, লাগাতার প্রতিবাদ চালাচ্ছেন, তাতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি-আরএসএস কোণঠাসা হয়ে হিংসার আশ্রয় নিচ্ছেন। সম্ভবত ভেবেছিলেন ‘মেয়েদের’ জমায়েতে হামলা চালিয়ে প্রবল পৌরুষ দেখিয়ে শিক্ষা দেবেন। প্রতিরোধ এতটা জোরদার হবে ভাবেননি। তাদের হামলা এখন এভাবেই রুখে দেবে জনতার প্রতিরোধ। রক্ত ঝরিয়ে, ক্যামেরা ভেঙেও ভয় দেখানো যাবে না। ফ্যাসিজম-এর বিরূদ্ধে এ লড়াই থামবে না। লিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী 

 

 

‘জয় শ্রীরাম’ বলতে বলতে এনআরসি-সিএএ বিরোধী একটি শান্তিপূর্ণ মিছিলের উপরে খাস কলকাতায় লাঠি হাতে মারাত্মক আক্রমণ চালাল বিজেপি-র হিন্দুত্ববাদী সমর্থকেরা। মিছিলটির আয়োজক ছিল ফেমিনিস্ট ইন রেজিস্টান্স। তারা সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে এনআরসি-সিএএ বিরোধী জমায়েত, সচেতনতা ক্যাম্পেন আয়োজন করছে। বিভিন্ন মানুষের বক্তব্য, কবিতা, গান নিয়েই চলে তাদের এধরনের প্রচার ও পথসভা। ঠিক এরকমই একটি জমায়েত ছিল গত ২২শে ডিসেম্বর রবিবার দক্ষিণ কলকাতার যাদবপুর সংলগ্ন বাঘা যতীন এলাকার আই ব্লক-এ। একটি ছোট মিছিলের পর চলছিল জমায়েতে প্রতিবাদী গান, কবিতা, বক্তব্য। রাত মোটামুটি দশটা নাগাদ যখন অনেকেই চলে গেছেন ও বাকি ১০, ১২ জন সদস্য স্থানীয় চায়ের দোকানে ছিলেন তখনই আচমকা সাত আট জন মুখ ঢাকা মানুষ হাতে লাঠি নিয়ে তাদের উপর বেপরোয়া আক্রমণ চালায় ‘জয় শ্রীরাম’, ‘ভারতমাতার জয়’ ইত্যাদি বলতে বলতে।

 

শুধু লাঠি দিয়ে মারাত্মকভাবে আঘাত করাই নয়, লাগামছাড়া লাথি, ঘুষি আছড়ে পড়ে ফেমিনিস্ট ইন রেজিস্টান্স-এর সদস্য ও তাদের সঙ্গে থাকা বন্ধুদের উপরে। কৌস্তভ দাশগুপ্ত নামের এক প্রতিবাদকারীকে মাথায় লাঠির আঘাত করা হয়, তাঁর অবস্থা এখনও স্থিতিশীল নয়। আরেক সদস্যর পায়ে রয়েছে গুরুতর আঘাত। একজনকে মারতে মারতে চলন্ত অটো-র সামনে ফেলে দেওয়া হয়। অটো’টি মুহূর্তের মধ্যে ব্রেক সামলানোয় তিনি সামান্যের জন্য প্রাণে বেঁচে গিয়েছেন। মিছিলের সঙ্গে থাকা গার্গী ব্যানার্জী বললেন, “ওরা যখন মারছিল, তখন বলছিল ‘জনগন তোদের মারছে’।” এই আচমকা আক্রমণের জন্য জমায়েতকারীরা কেউই প্রস্তুত ছিলেন না, ফলে এই মারধোর সামলাতে তাদের প্রাথমিক কিছুটা সময় লাগে। এরমধ্যেই ভেঙে যায় চলচ্চিত্র নির্মাতা দেবলীনা-র ক্যামেরা। দেবলীনা শুধু চলচ্চিত্র নির্মাতাই নয়, অধিকার আন্দোলনেরও পরিচিত মুখ। কলকাতার সাম্প্রতিক সময়ে চলা এনআরসি-সিএএ বিরোধী প্রতিবাদগুলিতে তিনি নিয়মিত ডকুমেন্টেশন করে চলেছেন। তাঁর ক্যামেরাতেই এদিনের লাঠি নিয়ে আক্রমণের ফুটেজ রয়েছে। সোমবার তাঁর সঙ্গে যখন যোগাযোগ করা হয় তখন তিনি আদালতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, সংক্ষেপে বললেন, “আজকের পরেই ক্যামেরা ঠিক করব। আপাতত আদালতে যাচ্ছি। শুধু সোশ্যাল মিডিয়ায় একটা আপডেট দিতে হবে যে ঠিক আছি। প্রচুর মানুষ খোঁজ নিচ্ছেন।”

 

রবিবার রাতে যখন আক্রমনকারীরা আক্রমণ চালায় তখন সেখানে কিছুক্ষণ পরে এসে উপস্থিত হন একজন মাত্র পুলিস। ফেমিনিস্ট ইন রেজিস্টান্স-এর সদস্যরা বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও ফোর্স এসে উপস্থিত হয়নি। ইতিমধ্যে তারাই একজন আক্রমণকারীকে ধরে ফেলেন ও ছুটে গিয়ে আরও দু’জনকেও আটক করে পুলিসের হাতে তুলে দেন। তাদের আজ সোমবার আলিপুর আদালতে তোলার কথা। তবে সকলেই আশঙ্কা করছেন যে রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে সম্ভবত তারা জামিন পেয়ে যেতে পারেন। ফেমিনিস্ট ইন রেজিস্টান্স-এর সদস্য পৌষালি বসাক জানালেন, “কালকের জমায়েতে যে সদস্য বা বন্ধুরা অংশ নিয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই স্থানীয়। এই আক্রমণকারীরা জামিন পেয়ে গেলে তাদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। কারণ সকলেই ঐ অঞ্চলের পরিচিত মুখ। যদিও আমাদের কাছে খুবই ভালো প্রমাণ আছে, দু’টি ভিডিও আর আমরা অনেকে গিয়ে জামিন আটকানোর চেষ্টাও করব, কিন্তু তবু কিছুটা আশঙ্কা হচ্ছে। আমাদের আইনজীবি বন্ধুরাও সাহায্য করছেন।” পৌষালি জানালেন সেদিন ভিড়ের মধ্যেও অনেক হিন্দুত্ববাদী আক্রমণকারী উপস্থিত ছিলেন, যারা তাদের মারার জন্য উসকানিমূলক কথাবার্তা বলছিলেন। দলের আরেক সদস্য ঝিলাম রায় জানান, সেদিন শুরু থেকেই সম্ভবত উপস্থিত মানুষদের ভিড়ে বিজেপি-আরএসএস সমর্থকেরা হাজির থেকে নজর রাখছিলেন। ভিড় কমতেই তারা আক্রমণ করেন, “কারণ যে লাঠিগুলো ওরা এনেছিল সেগুলো আগে থেকে মজুত করা। আর ওরা খুব পরিকল্পনা করে আমাদের মাথা আর পা লক্ষ্য করে মারছিল। এলোপাথাড়ি নয়। তাছাড়া ধ্বস্তাধ্বস্তিতে মেয়েদের শারীরিক হেনস্থা হয়েছে, হাতে-পায়ে কালশিটে পড়ে গেছে।” কিন্তু কেন এই হঠাৎ আক্রমণ? ঝিলাম বললেন, “আমরা আসলে এখন ঠিক যেখানে হিন্দু মহল্লা বা হিন্দু মানুষদের বসবাস বেশি সেখানে গিয়েই প্রচার চালাচ্ছি। ফলে এই হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সমর্থকদের মৌচাকে ঢিল পড়েছে। ওরা যেখানে গত ১৫ই অগাস্ট ভারতমাতার পুজো করেছিল সেখানেই কাল আমরা জমায়েত করেছিলাম। সেইজন্যই ওরা পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়।”

একজন আক্রমণকারী

তবে এই হামলা কোনওভাবেই তাদের প্রতিবাদের আন্দোলনে প্রভাব ফেলছে না। বরং আরও বেশি করেই জোটবদ্ধ হয়ে শক্তিশালী আন্দোলনের ডাক দিচ্ছেন তারা। আজ সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ছ’টায় আক্রমণস্থলেই একটি প্রতিবাদসভার ডাক দিয়েছেন তারা। লাগাতার সচেতনতা-প্রচারের কাজও চালিয়ে যাবেন। মিছিলের সঙ্গে থাকা গার্গী ব্যানার্জী যেমন বললেন, “মিছিলে স্লোগান, গান, কবিতা চলছিল। ওরা নিশ্চয়ই আগের থেকেই নজর রাখছিল। সেইজন্যই জমায়েতের শেষে হামলা চালায়। তাছাড়া পুলিসও কিছুটা টালবাহানা করেছে। জামিন পেয়ে যাওয়ার ভয় তো আছেই।”

 

ফেমিনিস্ট ইন রেজিস্টান্স-এর শেষ অনুষ্ঠানে দেবর্ষি বন্দোপাধ্যায় গান গেয়েছিলেন, সময় পেলেই তাদের সঙ্গে থাকেন। দেবর্ষি জানালেন – “ওরা হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিরূদ্ধে, এনআরসি-সিএএ-এর বিরূদ্ধে সচেতনতা চালাচ্ছেন, সংস্কৃতিমনস্ক অনুষ্ঠান করছেন। কালকের এই আক্রমণ আসলে হিন্দুত্ববাদীদের ভয়ের প্রকাশ। যেভাবে কালকে সবাই এই হামলার বিরূদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন তা খুবই আশাব্যঞ্জক। আমি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি। তবে পাশাপাশি এটাও বলছি যে এরা আসলে বোকা শত্রু। ওদের আইটি সেল-ও এখন ফেইল করছে। বারবার এভাবেই ওদের রুখে দিতে হবে।”

 

সারা দেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের নানা প্রান্তে, কলকাতায় যেভাবে মানুষ পথে নামছেন, লাগাতার প্রতিবাদ চালাচ্ছেন, তাতে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি-আরএসএস কোণঠাসা হয়ে হিংসার আশ্রয় নিচ্ছেন। সম্ভবত ভেবেছিলেন ‘মেয়েদের’ জমায়েতে হামলা চালিয়ে প্রবল পৌরুষ দেখিয়ে শিক্ষা দেবেন। আক্রমণ সয়েও যে প্রতিরোধ এতটা জোরদার হবে ভাবেননি। তাদের হামলা এখন এভাবেই রুখে দেবে জনতার প্রতিরোধ। রক্ত ঝরিয়ে, ক্যামেরা ভেঙেও ভয় দেখানো যাবে না। ফ্যাসিজম-এর বিরূদ্ধে এ লড়াই থামবে না।

 

 

Cover Image : Debolina Mow, whose camera was broken by the attackers, speaking to media.

 

 

Share this
Leave a Comment