তথ্যানুসন্ধানী দলের রিপোর্টে এন আর সি-র বাস্তব চিত্র


  • December 9, 2019
  • (0 Comments)
  • 1044 Views

আসাম থেকে ফিরে এসে উওমেন এগেইনস্ট সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স অ্যান্ড স্টেট রিপ্রেশন একটি দাবির তালিকাও প্রকাশ করেছে এন আর সি প্রক্রিয়া আসাম সহ দেশের অন্য রাজ্যে যাতে চালু না হয় তার জন্য। কারণ তাদের কানে বাজছে আসামের বয়স্ক মানুষদের প্রশ্নটা – “আচ্ছা আমরা কীভাবে মরে যাব বলতে পারেন আপনারা?” সুদর্শনা চক্রবর্তীর রিপোর্ট। 

 

৯৪ বছরের আসরাফ আলি আত্মহত্যা করেছেন। তাঁর ৭৯ বছরের বিধবা স্ত্রী সজ্জন বেগম জীবনের উপান্তে পৌঁছে আগামী দিনগুলো কোথায় কাটাবেন – গ্রামের বাড়িতে না ডিটেনশন ক্যাম্পে, সে প্রশ্নের উত্তর নেই। তৃতীয়বার এন আর সি হিয়ারিং-এর পর আতঙ্কিত আসরাফ আলি আত্মহত্যা করেন তাঁর আজীবনের গ্রামের বাড়িতে। তাঁর ভয় ছিল নাগরিক পঞ্জির তালিকায় আর নাম উঠবে না।

 

মরিয়ম বেগম যেদিন নিজের পরিচিতির কাগজপত্র নিতে তাঁর বাবার বাড়িতে গেছেন ও কাগজপত্র নিয়ে হিয়ারিং সেন্টারে যাওয়ার পর বাড়ি ফিরছেন, সেদিনই তাঁর দুই মেয়েও তাদের বাবার সঙ্গে অন্য এক সেন্টারে যাচ্ছেন, যা তাদের বাড়ি থেকে অনেক দূর। সাধারণত প্রতিটি সেন্টারের ক্ষেত্রেই একইরকম ঘটছে। ফলে খুবই কম সময়ের মধ্যে পৌঁছাতে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট যেগুলি সেগুলি অত্যন্ত দ্রুত চলাচল, রেষারেষি ইত্যাদি করতে বাধ্য হচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মরিয়ম খবর পান বাস দুর্ঘটনায় তাঁর দুই মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। মা ও মেয়েরা শেষবারের মতো একে অপরকে দেখতেও পাননি। কারণ – এন আর সি।

 

এন আর সি-র জন্যই নিজের আজন্মলালিত পরিচয়, বসতি সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। পাশের জেলা থেকে হয়তো কোনও সময়ে সরে এসে কেউ নতুন করে ঘর বেঁধেছিলেন পার্শ্ববর্তী জেলায়। আজ জেলা-দেশ সবকিছুর পরিচিতি হারিয়ে যাচ্ছে। কেউ কেউ হতাশ হয়ে বলে ফেলছেন – “আমরা এই দেশে এসে ভুল করেছি,” – দেশ মানে পাশের জেলাটাই! এন আর সি একটা গোটা জীবন ভুলিয়ে দিচ্ছে।

 

এইরকমই নানা তথ্য যা সাধারণত মূলস্রোতের সংবাদমাধ্যমের চোখের আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে তা খুঁজে দেখতেই গত ৫ থেকে ১০ নভেম্বর নয় সদস্যের এক তথ্যানুসন্ধানী দল আসামে গিয়েছিলেন। এই দলের সব সদস্যরা ছিলেন মহিলা এবং উওমেন এগেইনস্ট সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স অ্যান্ড স্টেট রিপ্রেশন-এর সদস্য। এন আর সি কীভাবে আসামের প্রান্তিকতম মানুষদের উপরে আঘাত হানছে তা দেখাই ছিল উদ্দেশ্য। বাঙালি হিন্দু ও বাঙালি মুসলমান মানুষদের বাসস্থান বরাক উপত্যকা; চর ও চাপরির বাসিন্দা, যা হল নদী তীরবর্তী দ্বীপ ও ব্রহ্মপুত্র নদের তীরের গ্রাম যেখানে ভূমিহীন মুসলমান মিয়া চাষিদের বাস; জোরহাট-শিবসাগর-হোজাই জেলার বিভিন্ন গ্রাম যেখানে ১৯৬৪ সালে পূর্ব পাকিস্তান থেকে মানুষেরা পালিয়ে এসে বসতি গড়ে তোলেন এবং চা বাগানগুলি যেখানে ঝাড়খণ্ড ও ছোট নাগপুর থেকে পরিযায়ী শ্রমিকেরা যান কাজের জন্য – এই জায়গাগুলিতে এই তথ্যানুসন্ধানী দল স্থানীয় মানুষ, শ্রমিক, কৃষক, আন্দোলনকর্মী, শিক্ষাক্ষেত্রের মানুষ, নাগরিক সমাজের সদস্য সকলের সঙ্গেই দেখা করে কথা বলেন।

 

এই তথ্যানুসন্ধানী দলের কয়েক জন সদস্য সম্প্রতি কলকাতায় একটি সাংবাদিক বৈঠকে তাঁদের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। যে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি আলোচনায় উঠে আসে তা হল – এনআরসি প্রক্রিয়ায় জরুরি হল জমি, উত্তারাধিকার, শিক্ষা ও এগুলি প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করতে পারা। এক্ষেত্রে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়ছেন মহিলারা। আমাদের দেশে এখনও মহিলাদের নিজেদের নামে জমি থাকার ঘটনা বিরল। বিশেষত প্রান্তিক মহিলাদের ক্ষেত্রে তা আরও সত্যি। এছাড়া পড়াশোনার ক্ষেত্রেও তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। নিজেদের নাগরিক হিসেবে প্রমাণ করার কাগজপত্র অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের থাকে না। বিয়ে হয়ে গেলে মা-বাবার বাড়ি থেকে তিনি কোথায় স্বামীর বাড়িতে চলে যাবেন তার কোনও স্থিরতা নেই এবং সেই সংক্রান্ত কোনও কাগজও থাকে না। অথচ এনআরসি-র ক্ষেত্রে স্বামী নয় বাবার বাড়ির উত্তরাধিকার জনিত কাগজপত্র তাকে পেশ করতে হবে। একে তো কাগজ না থাকা এবং থাকলেও বাবার পরিবার থেকে বিবাহিত মেয়েদের তা না দিতে চাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে, কারণ এত সমস্যার মধ্যেও পিতৃতান্ত্রিক পরিবার ব্যবস্থার প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে – এর ফলে বিবাহিত মেয়ে আবার বাবার সম্পত্তির ভাগ চাইবেন না তো! বিয়ের পর মেয়েদের পদবি বদলে যায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা নিয়েও অসুবিধা তৈরি হচ্ছে। হিয়ারিং সেন্টারগুলিতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে অনেক মহিলাই বলেছেন সেখানে সঙ্গে পুরুষ না থাকলে মহিলাদের কোনও কথাই গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে না। বিশেষ সমস্যায় পড়ছেন একা নারী, বিধবা মহিলারা।

 

তথ্যানুসন্ধানী দলের সদস্যদের বক্তব্য চোখে দেখা-কানে শোনা অভিজ্ঞতায় তাঁদের বদ্ধমূল ধারণা এই এনআরসি আসলে একটি সর্বতোভাবে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া। তাছাড়া বর্ণ ও শ্রেণি বৈষম্যের সমাজে প্রান্তিক মানুষেরা যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজগৎ থেকেই বাদ পড়ে যায়, সেখানে তাদের কাছে নাগরিকত্ব প্রমাণের কাগজ চাওয়া হাস্যকর। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদের শ্রমের উপরেই দাঁড়িয়ে রয়েছে সামাজিক কাঠামো। ধরা যাক পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যদি তারা দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক দল, তাদের সমর্থকদের কথায় সায় না দিচ্ছেন, তাহলে তাদের সন্দেহজনক বাসিন্দা, বিদেশি ইত্যাদি বলে জেলে পোরা হচ্ছে, তাদের অনুপস্থিতিতেই চলছে হিয়ারিং। অথচ এই মানুষগুলো যে অবস্থায় কাজের জায়গায় থাকেন সেখানে কোথা থেকে আসবে এসব কাগজপত্র? এমনকি অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী রাষ্ট্রের হয়ে পরিষেবা দিচ্ছেন যিনি, যার শ্রম নিচ্ছে সরকার, তার নামও বাদ পড়েছে তার বাবার নামে সমস্যা থাকায়। চর এলাকায় যে মানুষেরা থাকেন আর ফি বছর চূড়ান্ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে পড়েন তারাও প্রাণ বাঁচানোর চেয়ে পরিচিতিপত্র বাঁচাতেই মরিয়া হয়ে উঠছেন। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে মানবিকতাহীন, নৃশংস। এইসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরূদ্ধে লড়ছেন যে মানবাধিকার কর্মীরা তাদের সমানে হেনস্থা করা, ভয় দেখানো চলছে।

 

যারা অনাথ, যারা রূপান্তরকামী তারা ঠিক কোন্‌ অবস্থার মধ্যে রয়েছেন? এই মানুষগুলির নামের ক্ষেত্রে অনেক সময়েই কিছু পার্থক্য থাকে। সেগুলির সমাধানের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যারা এমনিতেই দেওয়ালে পিঠ ঠেকা অবস্থায় রয়েছেন তারা আবার নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য কোন্‌ পরিস্থিতির মধ্যে পড়বেন সে বিষয়ে নাগরিক সমাজের ভাবার অবকাশ রয়েছে। পরিবার, উত্তরাধিকার অস্বীকৃত যে মানুষগুলি তাদের সম্পত্তি, জমি না থাকায় এতদিন কোনও প্রশ্ন ওঠেনি, তাদের রোজকার জীবনের বিপন্নতা নিয়েও সরকারের, রাষ্ট্রের কোনও হেলদোল নেই, অথচ নাগরিকত্ব প্রমাণ না হলে ঠিকানা হয়ে যাবে ডিটেনশন ক্যাম্প। রাষ্ট্র যেন একটা পরিচিত সামাজিক কাঠামোকে ভেঙে ফেলতে চাইছে, যেখানে বৈচিত্র্যের কোনও স্থান নেই।

 

এ-ধরনের আতঙ্কের সময়ে যা হয়, এখানেও সেভাবেই এক সম্পূর্ণ দুর্নীতিগ্রস্ত বিকল্প অর্থনীতি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। হিয়ারিং সেন্টারে পৌঁছে দেওয়ার গাড়ি থেকে শুরু করে কাগজপত্র ঠিক করে বানিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি – দুর্নীতি সব স্তরে। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষগুলো এ দেশের মানুষ প্রমাণ করার তাগিদে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। এমনও হয়েছে যে গড়ে সব মিলিয়ে কারওর হয়তো ১৯,০০০ থেকে ২০,০০০ টাকা খরচ হয়ে গেছে এই প্রক্রিয়ায়। সব বাড়িতে এক বা একাধিক জনের নাম এনআরসি-র তালিকায়। অথচ বাস্তব হল এনআরসি সেবাকেন্দ্রে অধিকাংশ কর্মী অত্যন্ত অদক্ষ। নামের বানান ইত্যাদিতে তারা যারপরনাই ভুল করছেন। এদিকে এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করছে, শুধুমাত্র অগণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে দেশের মানুষের বৈধ নাগরিকত্ব খারিজ করতে।

 

এমন ঘটনাও আছে যেখানে একটা গ্রাম পঞ্চায়েতের ১০,০০০ মানুষের মধ্যে ৬০০০ জন বাদ পড়েছেন। কোথাও পরিবারের সবার নাম আছে নাবালক সন্তান ছাড়া, কোথাও তিন ভাই-বোনের নাম আছে একজন বাদে, কোথাও স্বামীর নাম আছে অথচ বাদ পড়েছেন তার ত্রিশ বছরের বিবাহিত স্ত্রী। তথ্যানুসন্ধানী দল দেখা পেয়েছে দু’বছর ও ন’বছরের শিশুদের যাদের বিরূদ্ধে ‘অবজেকশন’ করা হয়েছে। দু’জনের মা-বাবার নাম তালিকায় আছে। অবজেকশন জমা দেওয়ার শেষ দিন আড়াই লাখ মানুষ অবজেকশন জমা দেন মূলত মুসলমান ও প্রান্তিক সম্প্রদায়ের মানুষদের বিরুদ্ধে, যাদের অধিকাংশকেই যাদের নামে অবজেকশন তারা চেনেন না। একদিকে এমন সব কাগজপত্র জমা দিতে বলা হচ্ছে যা জোগাড় করা প্রায় অসম্ভব, অন্যদিকে নথিপত্রে সামান্য ভুল হলেও তা সংশোধনের সম্ভাবনা প্রায় নেই।

 

শিশু সুরক্ষা ও অধিকার আইন লঙ্ঘন, নামের সামান্য ভুলে তালিকা থেকে বাদ পড়া, জমা পড়া তথ্যের সুরক্ষা, মহিলাদের নথি জোগাড়ে প্রভূত সমস্যা, অসম্ভব মানসিক ট্রমা, ফরেন ট্রাইবুনালস্‌ ও ডিটেনশন সেন্টার-এর সমস্যা, মানবাধিকার কর্মীদের লাঞ্ছনা – এনআরসি, আসামে এখন এই সব’কটি স্তরেই চূড়ান্তভাবে অমানবিকভাবে বর্তমান।

 

আসাম থেকে ফিরে এসে উওমেন এগেইনস্ট সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স অ্যান্ড স্টেট রিপ্রেশন একটি দাবির তালিকাও প্রকাশ করেছে এন আর সি প্রক্রিয়া আসাম সহ দেশের অন্য রাজ্যে যাতে চালু না হয় তার জন্য। কারণ তাদের কানে বাজছে আসামের বয়স্ক মানুষদের প্রশ্নটা – “আচ্ছা আমরা কীভাবে মরে যাব বলতে পারেন আপনারা?” বা সজ্জন বেগমের কথা –“যব জঙ্গল মে আগ লগতি হ্যায় তো সব দেখতে হ্যায়। মেরে আন্দর কে আগ কো কোয়ি নেই দেখ পাতা। ম্যায় জানওয়ার জ্যায়সি বন গয়ি হু। ইয়া পাগল, ম্যায় কহি কুছ রাখতি ভি হু তো ইয়াদ হি নহি আতা।”

 

 

Share this
Leave a Comment