ডায়ালগস্‌: ক্যুয়ার চলচ্চিত্র উৎসবে রাষ্ট্রের নজরদারির বিরোধিতা 


  • November 29, 2019
  • (0 Comments)
  • 207 Views

১৩তম ডায়ালগস্‌ – আর্ন্তজাতিক এলজিবিটিকিউ ফিল্ম অ্যান্ড ভিডিও ফেস্টিভ্যাল, নভেম্বরের ২৮ থেকে শুরু হয়ে পয়লা ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে কলকাতার প্রেক্ষাগৃহ বসুশ্রীতে। কলকাতার  দর্শক এই উৎসবে এসে যৌন ও লিঙ্গ পরিচিতির রাজনীতির বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় শোসনের বিরূদ্ধেও আওয়াজ তুলুক, তাহলেই তো সিনেমার হাত ধরে আবারও সংলাপ-কথাবার্তা-ডায়ালগস্ আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে। লিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তীর । 

 

ডায়ালগস্‌ – আর্ন্তজাতিক এলজিবিটিকিউ ফিল্ম অ্যান্ড ভিডিও ফেস্টিভ্যাল-এর এটি ১৩তম বছর। প্রত্যয় জেন্ডার ট্রাস্ট, স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি ও গ্যেটে ইন্সটিটিউট-এর যৌথ উদ্যোগে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী সিঙ্গল স্ক্রিন প্রেক্ষাগৃহ বসুশ্রীতে নভেম্বরের ২৮ থেকে শুরু হয়ে পয়লা ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে এই চলচ্চিত্র উৎসব। চারদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন ভাষার সিনেমায় লিঙ্গ ও যৌনতার রাজনীতি নিয়ে চর্চা করবেন এই শহরের সিনেমাপ্রেমী সচেতন মানুষেরা। প্রান্তিক লিঙ্গ ও যৌনতাই শুধু নয়, বৃহত্তর সামাজিক পরিসরে যেকোনও লিঙ্গ পরিচিতিই কীভাবে জীবনে ছাপ রেখে যায়, সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থান নাড়িয়ে দেয় তাই দেখা যাবে নতুন, পুরনো বিভিন্ন সিনেমায়। বিশেষত নারীকেন্দ্রীক সিনেমাও  বিশেষ ভাবে জায়গা করে নেয় এই উৎসবে।

 

ডায়ালগস্‌, মানে করলে দাঁড়ায় সংলাপ, কথোপকথন। এই চলচ্চিত্র উৎসবকে শুধুই একটি ক্যুয়ার চলচ্চিত্র উৎসব মনে করলে একটু ভুল হবে। কারণ নিজেদের লিঙ্গ ও যৌনতার যে সমাজকথিত প্রান্তিকতা ও তার জন্য যে অধিকারের লড়াই – কেবলমাত্র সেই জায়গা থেকেই এই উৎসবের ভাবনা ও উপস্থাপনা নয়। সমাজ আসলেই রাষ্ট্রের আয়না। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের যে ক্রমশ ছোট থেকে বড় রূপ পেয়ে যাওয়া, সেইখানে দাঁড়িয়ে কোনও ব্যক্তির যৌন ও লিঙ্গ পরিচয় যখন বৃহত্তর রাজনীতির অংশ হয়ে যায়, তখনই প্রয়োজন পড়ে নিজের অবস্থান বেছে নেওয়ার। আর সেখানে অধিকারের কথা বললে রাষ্ট্রবিরোধী তকমাও জুটে যেতে পারে। সমাজের উল্টো স্রোতে হাঁটছে – এমন কথাও শোনা যেতে পারে। তবে, কোনও সৎ সাহসী শিল্প কবেই বা সে সবের তোয়াক্কা করেছে! বিশেষত সিনেমা। সিনেমাকে কেন্দ্র করে এই সংলাপের আদান-প্রদান, কথোপকথন চালিয়ে যাওয়ার জন্যই এই চলচ্চিত্র উৎসবের সার্থকতা।

 

এ বছর ডায়ালগস্‌ বিশেষ হয়ে উঠেছে তার ভাবনার জন্য। এ দেশের মানুষকে নতুন করে দেশের সংজ্ঞা ভাবতে হচ্ছে। জন্মের ভিটেমাটি, আত্মপরিচয় প্রমাণ করে নাগরিক হয়ে উঠতে হচ্ছে – না হলে ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক। সর্বক্ষণ রাষ্ট্রের নজরদারির অধীন আমরা, কী খাচ্ছি, কী পরছি, কী পড়ছি, কী দেখছি সবকিছু এই রাষ্ট্র আর নাহলে বিশ্বের ‘বড়দা’ ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলে দেখে যাচ্ছে। গত ছ’ বছরে নিজের দেশটাই ক্রমশ অচেনা হয়ে যাচ্ছে। একটি অংশের মানুষের বিশেষ অধিকার কেড়ে নিয়ে রাষ্ট্রের খবরদারিতে নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে তাদের জীবন-জীবিকা আর সারা দেশ তথা পৃথিবীর থেকে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন করে রেখে দেওয়া হচ্ছে। যখন এই চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হচ্ছে তার মাত্র দিন দুয়েক আগে রাজ্যসভায় পাশ হয়েছে অবমাননাকর ট্রান্সজেন্ডার বিল – দেশজুড়ে রূপান্তরকামী মানুষদের জোটবদ্ধ প্রতিবাদ সত্ত্বেও। সম্ভবত এভাবেই তৈরি করা চেষ্টা হচ্ছে ‘স্বাভাবিক’-এর নতুন সংজ্ঞা। পরিস্থিতি যখন এরকম তখন প্রান্তিক যৌন ও লিঙ্গ পরিচিতির মানুষদের পরিচিতির রাজনীতিও বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে না।

 

এই চলচ্চিত্র উৎসব তাই প্রতিবাদের, প্রতিরোধের। প্রত্যয় জেন্ডার ট্রাস্ট-এর অনিন্দ্য হাজরা যেমন বলেন, “এই চলচ্চিত্র উৎসব আসলে একটা ক্রুদ্ধ উৎসব, দেশজুড়ে রাষ্ট্রের যে শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ তার বিরূদ্ধে আমাদের সমবেত চিৎকার।” স্যাফো ফর ইক্যুয়ালিটি-র মালবিকা সান্যাল চলচ্চিত্র উৎসব বিষয়ে কোনও কথা না বলে বলেন, “সময় এসে গেছে যখন আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করে রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে সরাসরি তাকাতে হবে।”

 

এ বছরের ডায়ালগস্‌ বাস্তবিকই রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তুলছে। সুমন্ত্র ও তাঁর দলের করা আর্ট ইনস্টলেশন বসুশ্রী সিনেমা হলের প্রতিটি ছত্রে সেই বাস্তবকে তুলে ধরেছে। প্রেক্ষাগৃহে ঢোকার মুখ থেকে দু’টি তলা জুড়ে করা এই ইনস্টলেশন বহুদিন মনে রাখার মতো। কলকাতার কোনও চলচ্চিত্র উৎসব সাম্প্রতিক অতীতে একইসঙ্গে এরকম সাহসী ও শৈল্পিক ইনস্টলেশন দেখেনি। নজরদারি আমাদের প্রতিদিনের জীবনে ঠিক কতটা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে আর কতটা জোর গলায় আমাদের এই দাঁত-নখ বের করা রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরূদ্ধে একজোট হয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে তা সিনেমা দেখতে ঢুকে এই আর্ট ইনস্টলেশন-এর মধ্যে বসে আরও একবার অনুভব করে নেওয়া যায়। শ্রেয়তমা দত্তর তৈরি করা উৎসবের সিগনেচার ফিল্ম-এও এনআরসি, রাজনৈতিক পরিচিতির নিরিখে তকমা এঁটে দেওয়া, ক্রমশ বিভিন্ন পরিচিতির নৌকাগুলির ভেসে যাওয়া মধ্যে দিয়ে এক অসম্ভব দোলাচলের মধ্যে আটকে যাওয়া এই সময়ের ছবিই ভেসে ওঠে।

 

কলকাতার সিনেমা ভালবাসা দর্শক সিনেমা দেখতে এই উৎসবে এসে যৌন ও লিঙ্গ পরিচিতির রাজনীতির বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় শোসনের বিরূদ্ধেও আওয়াজ তুলুক, তাহলেই তো সিনেমার হাত ধরে বিগত কয়েক দশকের সব কঠিন সময়ের মতো এখন আবারও সংলাপ-কথাবার্তা-ডায়ালগস্ আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।

 

 

লেখক ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং স্বতন্ত্র সাংবাদিক 

 

Share this
Leave a Comment