বিএসএনএল: সরকারি অন্তর্ঘাত অথবা পুনরুজ্জীবনের মায়াবী বিভ্রম 


  • November 12, 2019
  • (0 Comments)
  • 389 Views

সত্যি কি বিএসএনএল একটি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান নাকি সরকারি পলিসি জনিত অন্তর্ঘাত একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেল? টেলিকম শিল্পে রিলায়েন্স জিও-কে একচেটিয়া হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা কি বিএসএনএল সহ বাকি সমস্ত টেলিকম সংস্থাকে অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলে দিল? এই পুনরুজ্জীবন প্রকল্প কি আদৌ বিএসএনএল-কে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করবে? প্রশ্নগুলি আজ ভীষণ রকম জীবন্ত, আমরা বর্তমান নিবন্ধে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। লিখেছেন সুমন কল্যাণ মৌলিক

 

প্রাক কথন

অবশেষে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বিএসএনএল(ভারত সঞ্চার নিগম লিমিটেড) -কে নিয়ে চলমান অলীক কুনাট্যরঙ্গের আপাত পরিসমাপ্তি ঘটল। কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভা এক পুনরুজ্জীবন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে যাতে বেশ কিছু নির্দিষ্ট প্রস্তাবের কথা বলা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বিএসএনএল ও এমটিএনএল (মহানগর টেলিফোন নিগম লিমিটেড)-এর সংযুক্তি, একটি ‘আকর্ষণীয়’ (যদিও তার রূপরেখা এখনও আমরা পাইনি) স্বেচ্ছাবসর প্রকল্প, সংস্থাকে ফোর জি লাইসেন্স প্রদান, বন্ডের মাধ্যমে ১৫,০০০ কোটি টাকা বাজার থেকে তোলা, ৩৮,০০০ কোটি টাকার অ্যাসেট মানিটাইজেশন (সাদা বাংলায় যার অর্থ কোম্পানির সম্পত্তি বেচে খাওয়া) ইত্যাদি। তবে এই পুনরুজ্জীবন প্রকল্পটিকে আমরা বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখছি না। বরং এর সঙ্গে যুক্ত করতে হবে সংস্থার সিএমডি প্রবীণ কুমার পুরওয়ারের শুভেচ্ছাবার্তা যেখানে তিনি কোনও রাখঢাক না রেখেই বলেছেন কেন ৫০ বছরের বেশি কর্মীদের স্বেচ্ছাবসর প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত, কাজ করলেই বেতন মিলবে এমন নিশ্চয়তা কেন নেই, অর্ধেক কর্মী নিয়ে আগামিদিনে ৫ গুণ বেশি কাজ করতে হবে ইত্যাদি।

 

লেখার শুরুতে ‘অলীক কুনাট্য’ শব্দ চয়নটির কারণ গত ছয় মাস ধরে বিএসএনএল-কে নিয়ে যেভাবে মিথ্যা ও অর্ধসত্য সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। বিলগ্নিকরণ – পুরোপুরি বন্ধ – আর্থিক পুনরুজ্জীবন – কর্মী ছাঁটাই – কোনটা বেশি দরকার তা নিয়ে কূট তর্কে মেতেছে কর্পোরেট কলমচিরা, যেভাবে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পের স্থায়ী ও ঠিকা শ্রমিকদের সময় মতো মাইনে দেওয়া হয়নি, যেভাবে কর্মীদের গোটা দেশের সামনে অযোগ্য ও অপদার্থ প্রতিপন্ন করা হয়েছে তার তুলনা বিরল।

 

কিন্তু সত্যি কি বিএসএনএল একটি ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান নাকি সরকারি পলিসি জনিত অন্তর্ঘাত একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে গেল? টেলিকম শিল্পে রিলায়েন্স জিও-কে একচেটিয়া হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা কি বিএসএনএল সহ বাকি সমস্ত টেলিকম সংস্থাকে অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলে দিল? এই পুনরুজ্জীবন প্রকল্প কি আদৌ বিএসএনএল-কে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করবে নাকি আরেকটা এয়ার ইন্ডিয়া আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে? প্রশ্নগুলি আজ ভীষণ রকম জীবন্ত, আমরা বর্তমান নিবন্ধে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি।

 

বিএসএনএল: জন্মের ইতিহাস

বিএসএনএল-এর ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ২০০০ সালের ১ সেপ্টেম্বরে যখন অটলবিহারী বাজপেয়ীর নেতৃত্বে তৎকালীন এনডিএ সরকার টেলিকম মন্ত্রক (DOT) থেকে বাইরে এনে এই রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা গঠন করে। সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করে ১৯৯৯ সালের টেলিকম পলিসি যাতে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করা হয়েছিল আগামিদিনে অনিবার্য টেলিকম বিপ্লবকে বাস্তবায়িত করার জন্য এবং বেসরকারি প্রতিযোগী সংস্থাগুলির জন্য সমমানের প্রতিযোগিতা (level playing field) তৈরির জন্য এই ধরনের কর্পোরেশন গঠন জরুরি। তার আগে সেনাবাহিনী, রেল বা পোস্ট অ্যান্ড টেলিগ্রাফের মতো টেলিকমও পুরোপুরি ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এই সময় টেলিকম মন্ত্রক থেকে ৩ লক্ষ কর্মী বিএসএনএল-এ চলে আসে।

 

বিএসএনএল গঠনের সিদ্ধান্ত ছিল পঞ্চাশের দশক থেকে চলে আসা ভারতের আর্থিক নীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ভারত রাষ্ট্রের জন্মের সময় থেকে সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল দেশের শিল্পের অগ্রগতির জন্য ভারতীয় শিল্পপতিদের সস্তায় পরিকাঠামো দেওয়ার ব্যবস্থা করা। কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছিল সেই সময় টাটা, বিড়লা, গোয়েঙ্কার মতো ভারতের শিল্পপতিদের হাতে পরিকাঠামো তৈরির জন্য যথেষ্ট পুঁজি ছিল না। তাই শিল্পের অগ্রগতির প্রয়োজন দেখিয়ে বেসরকারি শিল্পপতিদের সাহায্য করার জন্য আমাদের দেশের জনগণের পয়সায় তৈরি হল খনি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও ইস্পাত শিল্প, একইভাবে পরিষেবা ক্ষেত্র যেমন রেল, ডাক ও তার, টেলিকম ক্ষেত্রও থাকল সরকারের হাতে। জনগণের টাকায় তৈরি পরিকাঠামো ব্যবহার করে মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলল বেসরকারি তথা কর্পোরেট পুঁজি।

 

ছবিটা পাল্টাতে লাগল নব্বইয়ের দশকের সূচনালগ্নে যখন ‘ব্যালেন্স অব পেমেন্ট’এর সঙ্কটকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে আইএমএফ, বিশ্বব্যাঙ্ক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাঙ্ক প্রভৃতি আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নি সংস্থাগুলির চাপে ভারত সরকার (নরসিমারাও-মনমোহন সিং নেতৃত্বাধীন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস) ‘উদারীকরণ-বেসরকারিকরণ-বিশ্বায়ন’-এর নীতির কাছে আত্মসমর্পণ করল। নেহেরু পরিকল্পিত স্বনির্ভর অর্থনীতি (যদিও এর সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির কোনও সম্পর্ক ছিল না) আরব সাগরের জলে বিসর্জিত হল। সেই জনবিরোধী আর্থিক নীতির প্রথম দিককার সবচেয়ে সফল প্রয়োগ হল বিএসএনএল গঠন। যা কিছু ব্যক্তিগত তাই পবিত্র — এই আবহাওয়ায় দু-একটি বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ ছাড়া প্রায় বিনা লড়াইয়ে বিএসএনএল গঠিত হল। তাই আজকে যখন সেই আর্থিক নীতির ধারাবাহিকতায় রেলের প্রোডাকশন ইউনিট বা অর্ডিন্যান্স কারখানাগুলিকে কর্পোরেশন করার পরিকল্পনা সরকার পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হচ্ছে তখন স্বাভাবিকভাবেই আতঙ্কিত শ্রমিকরা বিএসএনএল-এর করুণ পরিণতির উদাহরণ সামনে আনছেন।

 

বিএসএনএল: সরকারি অন্তর্ঘাতের ইতিকথা

২০০০ সালে তদানীন্তন যোগাযোগমন্ত্রী রামবিলাস পাসোয়ানের সভাপতিত্বে একটা মন্ত্রিগোষ্ঠী গঠন করা হয়েছিল। মাননীয় মন্ত্রী বিএসএনএল গঠন করাটাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। সে সময় মন্ত্রিগোষ্ঠী সমস্ত ইউনিয়নগুলিকে জানিয়ে দিয়েছিল যে বিএসএনএল-এর আর্থিক স্থায়িত্ব সুনিশ্চিত করা হবে। ১৯৯৯ সালের টেলিকম পলিসির নির্দেশিকা অনুযায়ী গ্রামীণ অঞ্চলে টেলিফোন পরিষেবা অর্থনৈতিক ভাবে লাভজনক না হলেও বিএসএনএল সেই সমস্ত অঞ্চলে পরিষেবা প্রদানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে। এই কাজে ভারত সরকার নিগমকে ক্ষতিপূরণ দেবে।

 

কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক তার উল্টো। শুরু হল সরকারি পরিকল্পনায় বিএসএনএল-কে রুগ্ন করার চক্রান্ত। কর্পোরেশন গঠনের সময় বলা হয়েছিল টেলিকম মন্ত্রকের যে সমস্ত জমি, বাড়ি অর্থাৎ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিএসএনএল ব্যবহার করছে তা যথাবিহিত সরকারি নিয়মে বিএসএনএল-কে হস্তান্তর করা হবে। সেজন্য Land Management Policy (যার মধ্যে থাকবে মিউটেশন) তৈরি করা হবে। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহল জানে যে আজ পর্যন্ত সেই সমস্ত সম্পত্তি হস্তান্তর করা হয়নি।

 

এর পরের ঘটনাগুলোও সেই অন্তর্ঘাতের তত্ত্বকে আরও জোরালো ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৯৫ সালে বেসরকারি কোম্পানিগুলিকে মোবাইল পরিষেবা দেওয়ার লাইসেন্স দেওয়া হল। কিন্তু সরকারি পরিষেবা প্রদান করে যে সংস্থা সেই ডিপার্টমেন্ট অব টেলিকমকে মোবাইল চালু করার লাইসেন্স দেয়নি। ২০০০ সালে বিএসএনএল তৈরি হওয়ার পরে ২০০২ সালের অক্টোবর মাসে সরকারি মোবাইল পরিষেবা বাজারে এল। সোজা কথায় সরকারি সংস্থার থেকে ৭ বছর আগে বেসরকারি অপারেটররা মোবাইল চালু করার লাইসেন্স পেয়ে গেল। একথা বুঝতে টেলিকম বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না যে এই সিদ্ধান্তের কারণ বেসরকারি অপারেটররা যাতে সহজেই দেশের মোবাইল বাজার করায়ত্ত করতে পারে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না সেই সময় প্রতি মিনিটে কল চার্জ ছিল ৫-১৫ টাকা এবং ইনকামিং কলের জন্যও গ্রাহকদের চার্জ দিতে হত। সে সময় এই সরকারি নীতিকে কাজে লাগিয়ে অনিল আম্বানির রিলায়েন্স কম্যুনিকেশন কয়েক হাজার কোটি টাকার মুনাফা কামায়। টেলিকম পলিসিতে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড-এর কথা বলা হলেও যেভাবে বিএসএনএল-কে পিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হল তাতে পরিষ্কার সরকার পক্ষ কর্পোরেট স্বার্থের পক্ষে দালালি করেছিল।

 

কিন্তু মোবাইল পরিষেবার ক্ষেত্রে দেরিতে প্রতিযোগিতায় নামলেও, অতি অল্প সময়ের মধ্যে মোবাইল ক্ষেত্রে বিএসএনএল এগিয়ে গেল অতি দ্রুত গতিতে। ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে বিএসএনএল-এর গ্রাহক সংখ্যা এবং এয়ারটেলের গ্রাহক সংখ্যা হয়ে গেল প্রায় সমান সমান। ২০০০ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মোটের উপর বিএসএনএল ছিল লাভজনক সংস্থা ও গড় লাভের পরিমাণ ছিল বার্ষিক ১০,০০০ কোটি টাকা। এ সময় কিন্তু সংস্থার কর্মী সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু পতনের গল্পটা তার পর থেকে শুরু হল। এক্ষেত্রে প্রধান দায়ী এনডিএ ও ইউপিএ সরকারের বিএসএনএল-এর প্রতি বিমাতৃসুলভ ব্যবহার ও কর্পোরেশন চালানোর ক্ষেত্রে নীতিগত ব্যর্থতা। ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিএসএনএল-কে যন্ত্রপাতি সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হয়নি। যন্ত্রাংশ সরবরাহের যে টেন্ডারগুলি আহ্বান করা হয় তা সরকারি দাক্ষিণ্যে বাতিল হয়ে যায়। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে বিএসএনএল-এর ৪.৫ কোটি মোবাইলের লাইনের টেন্ডার বাতিল করা হয়। অর্থাৎ সরকারি বিরুদ্ধতাই যে বিএসএনএল-কে এগিয়ে যেতে দেয়নি তা আজ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। ২০০৬ থেকে ২০১২ সাল, ভারতে মোবাইল পরিষেবার চূড়ান্ত বিস্তার ঘটে কিন্তু বিএসএনএল তার সুযোগ নিতে পারেনি। যারা কথায় কথায় বিএসএনএল-এর অদক্ষতাকে সঙ্কটের কারণ হিসেবে দায়ী করেন তাদের জানা দরকার যে একটা পেশাদার সংস্থা হিসেবে কখনও বিএসএনএল-কে বেড়ে উঠতে দেওয়া হয়নি। এখনও এই কর্পোরেশনের আধিকারিকদের একটা বড়ো অংশ আসে সরকারের অন্যান্য মন্ত্রক থেকে ডেপুটেশন ভ্যাকেন্সিতে, এরা নির্দিষ্ট সময়ের পর তাদের পুরনো সংস্থায় ফিরে যান। কোম্পানির ভালোমন্দের ব্যপারে তাদের যেমন কোন দায় থাকে না, তেমনি থাকে না টেলিকম ব্যবসার কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা। ২০১৩ সালের পর বিএসএনএল যন্ত্রাংশ আমদানির অনুমতি পায় এবং কিছুটা হলেও ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করে। ২০১৫ সালের জুলাই মাসে নতুন সংযোগ হয় ১৬ লক্ষ। ২০১২-১৩ সালে যেখানে রেভিনিউ আয় হয়েছিল ২৭,১২৭,৮৯ কোটি টাকা, সেটা ২০১৫-১৬ সালে বেড়ে হয় ৩২,৯১৮,৭০ কোটি টাকা। সংস্থার ক্ষতির পরিমাণও কমতে শুরু করে। ২০১১-১২ সালে বিএসএনএল-এর আর্থিক ক্ষতি হয়েছিল ৮৮৫১ কোটি টাকা, কিন্তু ২০১৫-১৬ সালে আর্থিক ক্ষতি কমে গিয়ে দাঁড়াল ৩৮৮০ কোটি টাকা। এর অর্থ ক্ষতির দিকে চলে যাওয়া একটা সংস্থা অপারেটিং প্রফিট করতে শুরু করেছিল।

 


ফোর জি স্পেকট্রাম জিও এফেক্ট

ভারতের টেলিকম জগতের ছবিটা একদম পাল্টে গেল মুকেশ আম্বানির রিলায়েন্স জিও-এর আগমনের পর। জিও ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কিন্তু ব্যবসা শুরু করে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। ওই বছর অক্টোবর মাসে ফোর জি স্পেকট্রামের নিলাম শুরু হয়। এয়ারটেল ১৪,২৪৪ কোটি টাকা, জিও ১৩,৬৭২ কোটি টাকা, আইডিয়া ১২,৭৯৮ কোটি টাকা দিয়ে ফোর জি লাইসেন্স পায়। কিন্তু পুরোপুরি পরিকল্পনা মাফিক বিএসএনএল-কে এই নিলামে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। গ্রাহক সবসময় উন্নত প্রযুক্তি খোঁজে অথচ টেলিকমের মতো সদা পরিবর্তনশীল ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাকে প্রযুক্তি দেওয়া হল না – বিশ্বাসঘাতকতার এত বড় ঘটনা ভারতবর্ষের আর্থিক ইতিহাসে প্রায় বিরল বলা চলে। যেদিন রিলায়েন্স জিও ভারতবর্ষের টেলিকম জগতে ব্যবসা শুরু করল সেদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ছবি ভারতবর্ষের সমস্ত সংবাদপত্রে জিও-এর বিজ্ঞাপনে দেখা গেল। একটি বেসরকারি সংস্থার পরিষেবা বিক্রির বিজ্ঞাপনে দেশের প্রধানমন্ত্রী – এটাও এদেশে এক নতুন অভিজ্ঞতা। পরিষেবা শুরু করার দিন থেকে জিও এক আগ্রাসী বিপণন পদ্ধতি (প্রিডেটরি প্রাইসিং) শুরু করল যার উদ্দেশ্য অন্য টেলি-কোম্পানিগুলিকে বাজার থেকে সরিয়ে দিয়ে টেলিকম ক্ষেত্রে নিজেদের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। প্রিডেটরি প্রাইসিং বলতে বোঝায় যখন কোনও দ্রব্য বা পরিষেবা কোনও কোম্পানি তার খরচের থেকে কমে গ্রাহকদের দেয়, বাজার থেকে প্রতিযোগীদের সরিয়ে দিতে। প্রথমে জিও প্রায় বিনামূল্যে ভয়েস, মেসেজ ও ডাটা গ্রাহকদের দিতে শুরু করল ওয়েলকাম অফারের নাম দিয়ে। নিয়ম হচ্ছে এই  প্রোমোশনাল অফার দেওয়া যাবে মাত্র ৯০ দিনের জন্য। কিন্তু অফারের নাম পরিবর্তন করে জিও এই অনৈতিক ব্যবসা দীর্ঘদিন চালু রাখে, অথচ এক্ষেত্রে যাদের হস্তক্ষেপ করার কথা অর্থাৎ নিয়ামক সংস্থা ট্রাই নীরব থাকে। সেসময় টেলিকম সেক্রেটারি জেএস দীপক সরকারের রেভিনিউ কম হওয়ার উদাহরণ পেশ করে এই অনৈতিক ব্যবসা বন্ধের জন্য সরব হন। ফলে কিছুদিনের মধ্যে তাকে কম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বদলি করা হয়। কিন্তু ক্রমাগত সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে ট্রাই ২০১৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি প্রিডেটরি প্রাইসিং এর নতুন সংজ্ঞা নির্দেশ করে। এখানে বলা হল যে একটি কোম্পানির যদি ৩০ শতাংশ গ্রাহক বা রেভিনিউ থাকে তবে তাকে এসএমপি (সিগনিফিকেন্ট মার্কেট পাওয়ার) বলা হবে। ট্রাই জানাল যে কেবলমাত্র এই এসএমপি প্রিডেটরি প্রাইসিং নিয়ে ব্যবসা করতে পারবে না। অর্থ হচ্ছে একটি কোম্পানি যদি এসএমপি-এর আওতায় না পড়ে তাহলে সেই কোম্পানি প্রকৃত খরচের থেকে কম দামে গ্রাহকদের পরিষেবা দিতে পারে। গোটা বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে অগস্ট ২০১৮ সালে জিও-র মার্কেট শেয়ার পৌঁছেছিল মাত্র ২০ শতাংশে, তাই ট্রাইয়ের জারি করা নির্দেশ রিলায়েন্স জিও-এর প্রতি নির্লজ্জ সমর্থন ছাড়া আর কিছু নয়। জিও-কে অনৈতিক সুবিধা দিতে ট্রাই অপর একটি কৌশল গ্রহণ করেছিল। সেটা হল ইন্টারকানেক্ট ইউসেজ চার্জ (আইইউসি) কমিয়ে দেওয়া। একটি কোম্পানির কল অন্য কোম্পানির নেটওয়ার্কে আসলে যে ফি দিতে হয় পূর্বের কোম্পানিকে সেটাই আইইউসি। এই চার্জ ধার্য করা হয় প্রতি মিনিট হিসেবে। ২০১৭, ডিসেম্বরে রিলায়েন্স জিও-এর গ্রাহক সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৬০ লক্ষ। স্বভাবতই ওদের নেটওয়ার্ক থেকে প্রতিযোগীদের নেটওয়ার্কে কলের সংখ্যাও প্রচুর। তাই তাদের প্রতিযোগী কোম্পানিগুলিকে আইইউসি বাবদ টাকাটা বেশিই দিতে হত। রিলায়েন্স জিও-কে সাহায্য করার জন্য ট্রাই এই আইইউসি চার্জ ২০১৭ সালের ১ অক্টোবর ৫৭ শতাংশ কমিয়ে দিল ফলে জিও প্রভূত পরিমাণে লাভবান হলো। যে রিলায়েন্স জিও নিজের ব্যবসা শুরু করার ১৫ মাস পরেও আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে ব্যবসা চালিয়েছে ট্রাইয়ের নয়া নির্দেশে সে হয়ে গেল একটা লাভজনক কোম্পানি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় রিলায়েন্স জিও ২০১৭ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, এই ত্রৈমাসিক আইইউসি দিয়েছিল অন্য টেলি কোম্পানিগুলিকে ২,১৪০ কোটি টাকা। অথচ ওই ২০১৭ সালের পরবর্তী ত্রৈমাসিক মানে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর আইইউসি দিয়েছিল মাত্র ১,০৮২ কোটি টাকা। স্বভাবতই আইইউসি বাবদ ব্যয় ৫০ শতাংশ কমে যাবার ফলে রিলায়েন্স জিও-এর নেট প্রফিট হয়ে গেল ৫০৪ কোটি টাকা। ভারত সরকার যেভাবে গোটা পর্বে রিলায়েন্স জিও-কে অনৈতিক ভাবে মদত করেছে তা বিশ্বায়নের অর্থনীতির জমানার অনিবার্য বৈশিষ্ট। বিকৃত পুঁজিবাদের উদাহরণ, যাকে আধুনিক তত্ত্বায়নে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম বলে জানি। এর অর্থ কোনও গোষ্ঠী বা সংস্থার স্বার্থে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিদ্যমান নিয়মাবলীকে সরকারি মদতে লঙ্ঘন করা।

 

সঙ্কটের চালচিত্র

একথা অস্বীকার করার কোন কারণ নেই যে সরকারের ধারাবাহিক অন্তর্ঘাত, নতুন প্রযুক্তির অভাব সর্বোপরি রিলায়েন্স জিও-এর আগ্রাসী ও অনৈতিক বাণিজ্য নীতির কারণে বিএসএনএল অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে। কেন সরকারি অন্তর্ঘাত বলছি তা বোঝানোর জন্য ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ সিএনবিসি-টিভি ১৮ -কে দেওয়া যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদের এক বক্তব্য তুলে ধরছি:  “Both BSNL and MTNL were in profit by thousands and thousands of core in the 2005-06.  What happened in the subsequent years that they have come under such a critical state? Something which I can openly tell you today that every attempt was made that they are not attended to and expand.”

 

কিন্তু আজ কর্পোরেট মিডিয়াতে এমনভাবে বিষয়টা প্রচার করা হচ্ছে যে বিএসএনএল-এর আয়ের ৭৫ শতাংশ কর্মচারী খাতে বেতন দিতে বেরিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে কোম্পানির আয় কমে গেছে। ২০১৬-১৭ সালের রেভিনিউয়ের পরিমাণ ছিল ৩১,৫৩৩ কোটি টাকা-), যা ২০১৮-১৯ সালে হয়ে দাঁড়িয়েছে ১৮,৮৬৫ কোটি টাকা। ঠিক এই কারণেই কোম্পানির আয়ের সঙ্গে কর্মচারীদের বেতন বাবদ ব্যয়ের শতাংশ বেড়ে গেছে তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না।

 

বিএসএনএল-এর সঙ্কট মুক্তির জন্য আরেকটি বড়ো প্রয়োজন হলো দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তিতে লগ্নি। এক্ষেত্রে কর্পোরেশনের মালিক হিসাবে ভারত সরকারের দায়িত্ব ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৭ জুলাই (২০১৯) টাইমস অব ইন্ডিয়াতে প্রকাশিত একটি সংবাদে জানা গেছে যে ভারত সরকার ২০১৮-১৯, ২০১৯-২০-এই দুই অর্থবর্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিকে বাঁচাতে ২.৬৯ লক্ষ কোটি টাকা ঢেলেছে। ব্যাংকগুলি যাতে অনাদায়ী ঋণের ভারে নুইয়ে না পড়ে সেজন্যই সরকারের এই সাহায্য। আবার ১ জুলাই (২০১৯) টাইমস অব ইন্ডিয়া জানিয়েছে যে ভারত সরকার পার্শ্ববর্তী ৬৩টি দেশকে ২৮ বিলিয়ন ইউএস ডলার (যার ভারতীয় মূল্য ১,৯৬,০০০ কোটি টাকা) সফট লোন দিয়েছে ভারতের সঙ্গে এইসব দেশগুলির পারস্পরিক সৌহার্দের সম্পর্ককে মজবুত করার জন্য। অথচ ভারত সরকার কখনও বিএসএনএল-কে কোনও আর্থিক সাহায্য দেয়নি।

 

টেলি-কোম্পানিগুলির হিসাবের খাতা থেকে জানা যাচ্ছে যে বাজারে আইডিয়া-ভোডাফোনের ঋণের পরিমাণ ১.২ লক্ষ কোটি টাকা, এয়ারটেলের ১.১৩ লক্ষ কোটি টাকা, জিওর ২ লক্ষ কোটি টাকা অথচ বিএসএনএল-এর ১৩,৯০০ কোটি টাকা। প্রাইভেট কোম্পানিগুলি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে যথেচ্ছ ঋণ পাচ্ছে কিন্তু সরাসরি বিএসএনএল-কে ব্যাংক ঋণ নেওয়ার অনুমতি সরকার দিচ্ছে না।

 

যে কোন টেলিকম কোম্পানির তুলনায় বিএসএনএল-এর আর্থিক বনিয়াদ অনেক বেশি মজবুত। কোম্পানির আছে ৩ লক্ষ কোটি টাকা মূল্যের জমি, ৩৬,০০০ মোবাইল টাওয়ার, ৮ লক্ষ কিমি অপটিক্যাল ফাইবার। কিন্তু সেই সম্পত্তিকেও বিক্রি করে দেবার পরিকল্পনা চলছে। মোবাইল টাওয়ারগুলিকে বিএসএনএল থেকে বাইরে বার করে এনে আলাদা সাবসিডিয়ারি টাওয়ার কর্পোরেশন তৈরি করা হচ্ছে যাতে বেসরকারি টেলিকম কোম্পানিগুলি সেগুলোকে খুব কম দামে ব্যবহার করতে পারে। একটা ঋণমুক্ত কোম্পানি তৈরির নামে কোম্পানির মূল্যবান জমি বিক্রির নীল নকশা তৈরি হচ্ছে। মজার কথা হল বিএসএনএল জমি বিক্রি করবে না, তার জন্য একটা স্পেশাল পারপাস ভেহিকল (কমিশন এজেন্ট) তৈরি করা হচ্ছে। সেখানেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। চেন্নাই-এ যে জমির বাজার দর ৩৮৬৭.৮৯ কোটি টাকা, তার বিক্রয়মূল্য স্থির হয়েছে ২৭৫৩.৬৭ কোটি টাকা। তিরুবন্তপুরমে ১ সেট (৪০.৪৭ বর্গ মিটার) জমির বাজার দর ৩০ লাখ টাকা কিন্তু সেখানে বিএসএনএল-এর জমির দাম ঠিক হয়েছে সেট প্রতি ১০ লাখ টাকা।

 

সঙ্কট শুধু বিএসএনএলের নয়

যারা শুধু বিএসএনএলের সঙ্কট বলে তারস্বরে চিৎকার করছেন, তাদের জ্ঞাতার্থে জানানো যেতে পারে টেলিকম শিল্পের সঙ্কট সর্বব্যাপ্ত। উদাহরণ হিসেবে ভোডাফোন ও আইডিয়ার সংযুক্তির পর ভারতের বৃহত্তম টেলিকম কোম্পানিকে দেখা যেতে পারে। সংযুক্তির পর তাদের গ্রাহক সংখ্যা ছিল ৪০ কোটি। কিন্তু গত একবছরে কোম্পানি ১১ কোটি ৫০ লক্ষ গ্রাহক হারিয়েছে। কে কত কম খরচে গ্রাহক কে পরিষেবা দিতে পারে সেই প্রতিযোগিতায় অনেক কোম্পানিরই আজ দেউলিয়া হবার যোগাড়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ১জিবি ডেটার মূল্য ১২.৩৭ মার্কিন ডলার। গ্রেট ব্রিটেনে ৬.৬৬ মার্কিন ডলার অথচ ভারতে ০.২৬ মার্কিন ডলার। এর সাথে যুক্ত করতে হবে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিকতম নির্দেশ, যেখানে বলা হয়েছে টেলিকম দপ্তরের (ডট) হিসেব মেনে লাইসেন্স ও স্পেকট্রামের ফি বাবদ বকেয়া ৯২ হাজার কোটি টাকা মেটাতে হবে। এরমধ্যে এয়ারটেলের বাকি ৪২ হাজার কোটি টাকা ও ভোডাফোন- আইডিয়া বাকি ৪০ হাজার কোটি টাকা। স্বাভাবিকভাবে ত্রাণ না পেলে ভোডাফোন-আইডিয়া, এয়ারটেলের যারা সম্মিলিতভাবে ৬৩% গ্রাহককে পরিষেবা দেয়, অভূতপূর্বভাবে সঙ্কটের মুখে পড়বে।বহু লোকের চাকরি যাবে। পাঠকদের স্মরণে থাকতে পারে টাটা গ্রূপের মালিকানাধীন টাটা টেলিকম সার্ভিস, অনিল আম্বানির রিলায়েন্স ইনফোকম, মালেশিয়ার সংস্থা এয়ারসেল, ইউনিনর ইতিমধ্যে টেলিকম মানচিত্র থেকে সরে গেছে। আগামিদিনে টেলিকম শিল্পে একচেটিয়াকরণ-এর সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে টেলকম শিল্পে ব্যাপক ব্যাঙ্ক বিনিয়োগ হয়েছে। যারা ইতিমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে তারা ব্যাঙ্ককে টাকা ফেরত দেবে তো? নাকি বিজয় মাল্য, নীরব মোদির উত্তরসূরীদের আমরা দেখতে পাব?


সংযুক্তি প্রকল্পআমাদের কথা

সরকার যে রিভাইভাল প্যাকেজ তৈরি করেছে তা দিয়ে কি বিএসএনএল-কে পুনরায় লাভজনক কোম্পানি করে তোলা সম্ভব হবে? এটা ঘটনা যে এই প্যাকেজ কিছুদিনের জন্য কোম্পানি তথা কর্মচারীদের অক্সিজেন যোগাবে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি ভিত্তিতে পরিত্রাণের কোনো আশা দেখা যাচ্ছে না। বিএসএনএল ও এমটিএনএল এর মোট কর্মী সংখ্যা ১,৬৩,০০০+২২,০০০= ১,৮৫,০০০। কর্মীদের গড় বয়স ৫২। তাই এটা মনে করা যেতে পারে এর অর্ধেক কর্মী গতিক সুবিধের নয় দেখে স্বেচ্ছা অবসর গ্রহণ করবে। রাতারাতি একটা সংস্থার কর্মী অর্ধেক হয়ে গেলে পরিষেবাতে ও ঘাটতি পড়বে। ইতিমধ্যে ঠিকে কর্মীরা দীর্ঘদিন মাইনে পাচ্ছে না। ফলে পরিষেবা তে ঘাটতি হচ্ছে, গ্রাহক অসন্তোষ বাড়বে। ফোর জি  এত দেরি করে দেওয়া হচ্ছে যখন বাজারে ফাইভ জি পরিষেবা আসার সময় হয়ে গেছে।

 

একথা বলার অর্থ ফোর জি বিএসএনএল পেলে রাতারাতি তার গ্রাহক সংখ্যা বেড়ে যাবে, এটা আকাশ কুসুম কল্পনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল বিএসএনএল এর সম্পদ বিক্রি করে ৩৮,০০০ কোটি টাকার সংস্থান করা। যে কাজ টাওয়ার ও জমি বিক্রির পরিকল্পনার মাধ্যমে আগেই শুরু হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়াটিকে নিয়েও যথেষ্ট সংশয়ের অবকাশ রয়েছে। প্রথমত বিএসএনএল-এর সমস্ত সম্পত্তি এখনও টেলিকম মন্ত্রক থেকে হস্তান্তরিত হয়নি। দ্বিতীয়ত দেখা গেছে সরকার সম্পত্তির যে মূল্য নির্ধারণ করে সেই দামে সম্পত্তি বিক্রি হয় না, পরে আর্থিক সঙ্কটের দোহাই দিয়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলির কাছে তা জলের দরে বিক্রি হয়। এবারও তাই হবে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।

 

কেউ পাল্টা প্রশ্ন তুলতে পারেন যে সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও সরকার এই প্যাকেজ ঘোষণা করল কেন? এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় টেলিকম মন্ত্রক-এর ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী রবিশংকর প্রসাদ এর একটি বক্তব্য স্মরণ করাতে চাই যেখানে তিনি বলেছিলেন বিএস এনএল থাকবে, তবে এই আকারে নয়। গত তিন মাস ধরে বাণিজ্যিক মিডিয়া, বাজার অর্থনীতির মুক্তকচ্ছ সমর্থকেরা, এমনকী জাতীয়তাবাদের ঠিকেদার রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মুখ্যপত্র অরগানাইজার ধারাবাহিক ভাবে বিএসএনএল- এর কর্মীদের অযোগ্যতা, রাষ্ট্রায়ত্ত্ব শিল্পের অপদার্থতা কে দায়ী করে এমন এক বাতাবরণ তৈরি করল যাতে কর্মীদের মধ্যে ভয়ের আবহ তৈরি হয়। পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় দাঁড়াল যে হতমান কর্মীরা আরও নৈরাশ্যে ডুবল। ফলে সরকার পক্ষের আরও সহজ হল এই ধরনের প্যাকেজ গেলানো। যেটা মাথায় রাখতে হবে তা হল নিরাপত্তাজনিত কারণে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় বা সীমান্তে পরিষেবায় গোপনীয়তা রাখার জন্য একটি সম্পূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত্ব টেলিকম সংস্থা রাষ্ট্রের প্রয়োজন।

 

সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় কাশ্মীরে আমরা দেখেছি যে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর সেখানে যখন টেলি পরিষেবা চালু হয় তখন একমাত্র বিএসএনএলকেই পরিষেবা চালানোর অনুমতি দেওয়া হয়। ঘটনার গতি প্রকৃতি দেখে মনে হচ্ছে যে সামান্য সংখ্যক কর্মী নিয়ে বিএসএনএল এর রাষ্ট্রীয় সম্পদ কর্পোরেট সংস্থাগুলি কে বেচে দিয়ে সমস্ত নতুন কর্ম সংস্থান বন্ধ করে একটা ছোট সংস্থা হিসেবে বিএসএনএলকে চালানো হবে। তবে চলবেই এমনটা গ্যারান্টি দিয়ে বলা যাচ্ছে না। কারণ আমাদের চোখের সামনে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্স ও এয়ার ইন্ডিয়ার অসফল সংযুক্তির উদাহরণ মজুত আছে। আর টেলিকম শিল্পের বর্তমান অবস্থায় বিএসএনএল ও এমটিএমএল এর বিলগ্নীকরনের জন্য প্রচুর ক্রেতা অপেক্ষা করে আছে – ছবিটা এমন নয়।

 

এই প্যাকেজের কোথাও টেলিকম শিল্পের মূল সঙ্কটটিকে বোঝার চেষ্টা নেই। সরকারি মদতে একটি বিশেষ টেলিকম কোম্পানির ব্যবসা একচেটিয়াকরণের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেই। বরং সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থাকে তুলে দেওয়ার নীতিতে অবিচল। বিএসএনএল-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার এই পরিণতি আটকানো যেতে পারত যে রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তা আজ অনুপস্থিত। আজ ঘটনার স্রোতকে উল্টো দিকে চালিত করতে হলে আমাদের যাবতীয় সক্রিয়তা সেই সংগ্রামের লক্ষ্যে সমাবেশিত করা উচিত।

 

লেখক স্কুল শিক্ষক  গনতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী 

 

Share this
Leave a Comment