টালা সেতু বিপর্যয়ে উদ্বাস্তু শত পরিবার। সুষ্ঠু পুনর্বাসন নিয়ে ক্ষোভ।


  • November 10, 2019
  • (0 Comments)
  • 360 Views

জীর্ণ, ভগ্নপ্রায় টালা সেতুর সংস্কারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে সেতু সংলগ্ন বাসিন্দাদের ভবিষ্যৎ। উচ্ছেদ হতে চলেছেন শতাধিক পরিবার। তাঁদের প্রকৃত পুনর্বাসন নিয়ে কোনও পরিকল্পনা নেই নগরকর্তা কিংবা সরকারের। শ্রেয়া আচার্য্য -এর প্রতিবেদন।

 

দক্ষিণের পর উত্তর। মাঝেরহাটের পর টালা সেতু বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত শহরের জনজীবন, যোগাযোগ ব্যবস্থা। নাগরিকদের সময় ও অর্থের যে বিপুল অপচয়, শারীরিক ও মানসিক ক্লেশ, পরিবহন ব্যবসার যে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সেতু বিপর্যয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেল তার কোনও হিসেব অদূর ভবিষ্যতে কখনো হবে বলে ইঙ্গিত নেই। আর একদিকে, ৫৭ বছরের পুরনো, জীর্ণ, বিটি রোডের সঙ্গে সংযোগকারী অতি গুরুত্বপূর্ণ টালা সেতু ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে আরও বহু মানুষের উদ্বাস্তু হওয়ার আশঙ্কা। সেতুর ভগ্নদশা, নবনির্মাণ, ট্রাফিক পরিচালনা নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে, যত পরিকল্পনা হয়েছে, কথা হয়েছে প্রশাসনিক ও মিডিয়া মহলে, তার ক্ষুদ্র অংশ ব্যয় হয়নি, সেতুর নীচে, পাশে বসবাসকারী খেটে-খাওয়া সেই মানুষদের জন্য।

 

টালা সেতুকে কেন্দ্র করে এখানে প্রায় শতাধিক পরিবারের বসবাস। ওই অঞ্চলে দীর্ঘ ৬০-৭০ বছর ধরে তারা রয়েছেন। নির্দেশ জারি হতে না হতেই রাতারাতি তাদের বাড়িঘর ছেড়ে দিতে বলা হয়। এতজন মানুষ কোথায় থাকবেন? কী হবে তাদের রুজি-রোজগারের, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার — তার উত্তর অবশ্য কর্তৃপক্ষ দেয়নি।

 

সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২৪ সেপ্টেম্বর রাত ন’টা নাগাদ স্থানীয় কাউন্সিলর ও বোরো চেয়ারম্যান তরুণ সাহা এলাকায় এসে বলেছিলেন, শুধুমাত্র টালা ব্রিজ সারানোর দিনগুলোতে এই মানুষেরা যেন অন্যত্র চলে যান। আরও বলেন, তাদের  জিনিসপত্র সব বাড়িতেই থাকুক এবং ব্রিজ সারানো হয়ে গেলে তারা আবার বাড়িতে ফিরতে পারবেন। এমনকি এলাকার সকল মানুষের জন্য (ব্রিজ সারানোর দিনগুলোতে) অস্থায়ী থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ায় প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন!

 

অভিযোগ, ঠিক তার পরের দিনই অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে তরুণ সাহা আবার এসে তক্ষুনি ঘরের সমস্ত জিনিসপত্র বের করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।থাকার ব্যবস্থা হিসেবে মানিকতলা সাহিত্য পরিষদের কাছে অনির্দিষ্ট একটি জায়গার কথা বলে তিনি তখনকার মতো চলে যান। খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই অবস্থায় এলাকার মানুষজন মানসিক ভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়েন এবং সুরক্ষার অভাব বোধ করেন। পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে দিশাহারা হয়ে পড়েন।ইতিমধ্যেই কাউন্সিলর পুনরায় ফিরে এসে জানান যে কিছু আইনি গোলযোগের কারণে তিনি মানিকতলায় থাকার ব্যবস্থা করতে পারছেন না।  তার বদলে ক্যানাল সংলগ্ন পাড়ে এবং চিৎপুর রেলওয়ে ইয়ার্ডে থাকার ব্যবস্থা করবেন।

 

এই পরিস্থিতিতে ওই এলাকার মানুষজন এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়েন। কাউন্সিলরের প্রতি তারা প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন যে একবার সমস্ত জিনিসপত্র সমেত বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার পরে তারা যে আবার তাদের পুরনো বাসস্থানে ফিরে যেতে পারবেন, সেই নিশ্চয়তা কোথায়? লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে বলা হয় তাঁকে।

 

অভিযোগ, এর পরেই শুরু হয় লাগাতার হুমকি দেওয়া। কাউন্সিলর জানতে চান, এলাকাটা তাদের সম্পত্তি কিনা ! কার অনুমতি নিয়ে তারা এখানে রয়েছেন! কোনোরকম লিখিত প্রতিশ্রুতি দিতে সরাসরি অস্বীকার করেন।

 

যে সকল মানুষেরা দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকায় রয়েছেন, যাঁদের জীবন-জীবিকা সবকিছুই এই এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে তাঁদের বিনা আইনি নোটিশে প্রায় হুমকি দিয়ে এবং যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ করা নীতিগত ভাবে এবং আইনত অপরাধ বলে মনে করেন অনেকেই। এলাকার প্রত্যেকটি মানুষের কাছে ওই ঠিকানায় তাদের পরিচয় পত্র, ইলেকট্রিক বিল,গ্যাসের বিল ইত্যাদি যাবতীয় তথ্য প্রমাণ রয়েছে।অর্থাৎ, কোনো না-কোনোভাবে সরকার, পুরসভা, স্থানীয় পুরপিতার আইনসম্মত অনুমতি রয়েছে। অথচ, তাঁদের থাকার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা না করেই সেতু ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।

 

পরবর্তীতে পুরপিতার কথায় ভরসা করে চিৎপুর রেলওয়ে ইয়ার্ডে আসার পরে সেখানকার মানুষেরা স্পষ্টতই বুঝতে পারেন যে তাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। কোনো রকমে বাঁশের বেড়া আর প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে বানানো পরপর কয়েকটি ঘর; উদ্বাস্তু শিবিরের মতো দেখায়। সেখানে একজন মানুষের বেঁচে থাকার নূন্যতম উপকরণগুলিও নেই যেমন-বিদ্যুৎ,পানীয় জল,শৌচালয় ইত্যাদি। বেশ কিছুটা দূরে একটি শৌচালয় থাকলেও সেটি রাত আটটার পরে বন্ধ হয়ে যায়।খোলা রাখার অনুরোধ করেও কোনও লাভ হয়নি। সেখানেও প্রতিবার যাওয়ার জন্য দু’টাকা করে দিতে হয়,ফলত অনেকের পক্ষেই সেই বাড়তি খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

একদিকে দীপাবলিতে কলকাতা শহর যখন আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে তখনই এই মানুষদের ঘরে গাঢ় অন্ধকার। কেননা বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। এমনকী সেখানে রান্না করার কোনও ব্যবস্থাও নেই। শব্দবাজির বিকট আওয়াজ যেন বার বার বিদ্রুপ করছিল তাঁদের। তাঁরা ভয় পাচ্ছিলেন শেষ সম্বল প্লাস্টিকের ছাউনিগুলিতে যেন আগুন ধরে না যায়!

 

এরা সকলেই এই শহরের খেটে খাওয়া মানুষ। দিন আনি দিন খাইয়ের সংসারে এইভাবে মাথার ওপর থেকে ছাদ চলে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারেননি কেউ। এদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ৬০-৭০ জন শিশু ও কিশোর, প্রায় ৫০ জন বয়স্ক মানুষ। বৃষ্টি হলেই প্লাস্টিকের ছাউনি দিয়ে ঘরে জল ঢোকে।ঘরের থেকে কয়েক হাত দূরত্বেই নর্দমা। সেখানকার জমা জল থেকে মশাবাহিত রোগের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতিমধ্যেই তিনজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছন। রয়েছেন তিন জন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগী। এই পরিস্থিতিতে তাদের শারীরিক এবং মানসিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অনেকেই সামনের বছর মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। জীবনের প্রথম বড়ো পরীক্ষার আগের দিনগুলোতে এইরকম টালমাটাল পরিস্থিতিতে পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হবার জোগাড়।

 

এর মধ্যে মরার উপর খাঁড়ার ঘা-এর মতো গত ৬ অক্টোবর টালা সেতু সংলগ্ন এলাকায় পূর্তবিভাগের পক্ষ থেকে একটি লিখিত নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে বলা হয়েছে, ওই এলাকার মানুষেরা বেআইনি ভাবে জায়গা দখল করে আছেন! তাদেরকে অবিলম্বে  সেখান থেকে সরে যেতে হবে নয়তো ‘উপযুক্ত’ ব্যবস্থা নেওয়া হবে!

 

উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলির মধ্যে ৫৬টি পরিবার কোনোরকমে ওই ইয়ার্ড সংলগ্ন ঘরগুলিতে থাকার জায়গা পেয়েছ। ঘোষবাগান ও পাইকপাড়ার প্রায় ৪০টি পরিবার এখনও কোনো রকম থাকার জায়গা পায়নি।এদিকে তাদের এতদিনকার স্থায়ী ঘর ভাঙার প্রস্তুতি পর্ব প্রায় শুরু হয়ে গেছে। নোটিশ জারি করে বেআইনি ঘোষণার পর তাদের পুনর্বাসন জুটবে কি না তা নিয়ে আশঙ্কায় আছে ওই পরিবারগুলো।

 

এলাকার মহিলারা মূলত গৃহ পরিচারিকার কাজ করেন।পুরুষেরা কেউ ছোটখাটো দোকানে কাজ করেন, কেউ ছাতু বিক্রি করেন,কেউ অ্যাম্বুলেন্স চালিয়ে রোজগার করেন। যেটুকু সঞ্চয় ছিল, তাই দিয়েই অনেকেই পাকা বাড়ি করেছিলেন। সেই বাড়ি ভাঙার কাজ শুরু হল বলে!

 

সুষ্ঠু পুনর্বাসন ও অধিকার রক্ষার তাগিদে, ভুক্তভোগী  মানুষের উদ্যোগে, দলমত নির্বিশেষে একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছে। কমিটির নাম — বস্তিবাসী শ্রমজীবী অধিকার রক্ষা কমিটি (টালা)। কমিটি আগামী ১৮ তারিখ, বাগবাজার রীডিং লাইব্রেরি-এ, একটা কনভেনশন ডেকেছে ভবিষ্যতে এই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

 

প্রতিবেদক ছাত্রছাত্রী আন্দোলনের কর্মী।

 

 

Share this
Leave a Comment