ছিঃ! 


  • November 9, 2019
  • (0 Comments)
  • 351 Views

লজ্জায় মুখ ঢেকে এখন শুধু এটুকুই বলতে ইচ্ছে করছে, ছিঃ

 

— লিখেছেন দেবাশিস আইচ

 

 

এবার তবে সংবিধানের প্রস্তাবনা থেকে লোপাট করে দেওয়া যাক ‘সমাজতন্ত্র’, ‘গণতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দগুলি। ঘোষিত হোক ভারতের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ‘হিন্দু’। একটি অনৈতিহাসিক, অলীক, কল্পকথাকে ইতিহাসে ঠাঁই করে দিল সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ভারতের শীর্ষ আদালত। শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের সাংবিধানিক বেঞ্চ।

 

শীর্ষ আদালতকে কি কেউ পরামর্শ দিয়েছিল, হিন্দু প্রধান দেশে হিন্দুত্ববাদীদের দিকে ঝুঁকে থাকার? কোথাও কি কোনও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ খুবই জরুরি ছিল? নিন্দুকে বলবে এতো শুধু ঝুঁকে পড়া নয়, পরম নিষ্ঠায় হামাগুড়ি দেওয়া। পরামর্শদাতা যদি স্বয়ং ‘প্রজানুরঞ্জক’ রাম হন। তবে আদালতে বোধহয় ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি ওঠাটাই বাকি ছিল। শিলমোহর পড়ল সেই অমোঘ শ্লোগানে ‘মন্দির ওহি বনায়েঙ্গে।’

 

১৯৪৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর অত্যন্ত হীন উদ্দেশ্যে বাবরি মসজিদে রাম-সীতার মূর্তি নিয়ে ঢুকে পড়েছিল অল্প কিছু হিন্দু ধর্মাবলম্বী। মসজিদ পাহারারত ১৫ জনের পুলিশ পিকেট তাদের কোনো বাধাই দেয়নি। ১৯৪৬ সাল থেকেই অখিল ভারতীয় রামায়ণ মহাসভা বাবরি মসজিদকে ঘিরে বিতর্ক শুরু করেছিল। মূর্তি স্থাপনের সঙ্গে সঙ্গে উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দবল্লভ পন্থকে পাঠানো জেলাশাসকের রেডিও মেসেজ, অযোধ্যা থানার রিপোর্ট, মুখ্যমন্ত্রীকে পাঠানো প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর চিঠি এবং অনান্য সংশ্লিষ্ট ঘটনা, মামলার নথি, রায়, জেলাশাসক কে কে নায়ারের পদত্যাগ এবং রাতারাতি জনসঙ্ঘে যোগদান সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করে গোপনে, এক রকম গা-জোয়ারি করে একটি মসজিদকে মন্দিরে পরিণত করা হয়েছিল।

 

ধর্মনিরপেক্ষতা, সংখ্যালঘুর প্রাথমিক অধিকার, আইনের শাসন হাস্যাস্পদ হয়ে উঠেছিল সেদিন, অবমানিত হয়েছিল। তার কোনও বিচার হল না। উল্টে ক্রমে বিতর্কিত এবং ধর্মোন্মাদদের হাতিয়ার হয়ে উঠল একটি ধর্মস্থান। তালা বন্ধ হয়ে পড়ে রইল ততদিন বিতর্কিত মসজিদ । ১৯৮৬ সালে ফের আরও একবার খুলে দেওয়া হল তালা। দূরদর্শনে সারা দেশ দেখল রাম-সীতার পুজো হচ্ছে। সৌজন্যে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী, সৌজন্যে উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী বীরভদ্র সিং। যদিও ১৯৮৪ সালের সাতই অক্টোবর গঠিত হয়েছিল রাম জন্মভূমি আ্যকশন কমিটি। আর সেদিন থেকেই শুরু হয় ‘তালা খোল’ আন্দোলন। ১৯৮৯ সাল থেকে শিলাপুজো, মিছিলের জেরে একের পর এক দাঙ্গা, গণহত্যায় মৃত্যু হল, সরকারি হিসেবে ১১৭৪ জনের। ১৯৯০ লালকৃষ্ণ আদবানির রথযাত্রার মাশুল গুণলেন ৬৯৩ জন। ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর, করসেবকদের হাতে ধবংস হল বাবরি মসজিদ। আবারও দেশজুড়ে ২২৬টি দাঙ্গা, গণহত্যায় ১৮০১ জনের মৃত্যু হল। এত মৃত্যু, এত রক্তপাত, এক ঐতিহাসিক ধর্মসৌধ গুঁড়িয়ে দেওয়ার পরও কোথাও যার যথাযথ বিচার হল না। ৯ নভেম্বর ২০১৯, ৭০ বছর পর আরও একবার কি হাস্যাস্পদ হল না, অবমানিত হল না গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, আইনের শাসন, সংখ্যালঘুর মৌলিক অধিকার?

 

সেই সময়, ৮ ডিসেম্বর ১৯৯২, আনন্দবাজার পত্রিকায় উত্তর সম্পাদকীয়র শিরোনাম ছিল, ‘ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ দরজায় ঘা দিয়েছে, রুখতে ঐক্যবদ্ধ হোন।’ প্রবন্ধকার ছিলেন প্রয়াত গৌরকিশোর ঘোষ। প্রবন্ধটি শুরু হয়েছিল এই ভাবে, “হিন্দুত্ববাদ আসলে ফ্যাসিবাদ, গরিবের এ কথা এতদিন কারও কানে ঢোকেনি।” আজ তিনি বেঁচে থাকলে শীর্ষ আদালতের বাবরি-রায়কে কী চোখে দেখতেন বলা কঠিন। তবে অনুমান করা যেতে পারে শিরোনামটি এমনও হতে পারত, “ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ শীর্ষ আদালতের দরজায় ঘা দিয়েছে…।” এই তো কিছুকাল আগেই নিউইয়র্কারে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক অমর্ত্য সেন ‘হিন্দুত্ববাদী আন্দোলন’ এবং ভারতীয় সংবিধানকে হিন্দুত্ববাদীদের দ্বারা ‘সংকীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার’ করার প্রশ্নে বলেছিলেন, “আমার মনে হচ্ছে, ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এই ব্যাপারে ভীষণ মন্থর ও বিভক্ত। তা ছাড়া সুপ্রিম কোর্ট ভালো কাজ যা-ই করে থাকুন না কেন, বহুত্ববাদের দেখভাল যেভাবে করতে পারতেন, সেভাবে পারেননি।”

 

লজ্জায় মুখ ঢেকে এখন শুধু এটুকুই বলতে ইচ্ছে করছে, ছিঃ!

 

 

Share this
Leave a Comment