মুচলেকা-রত্ন সাভারকার ভারতের নয়, সঙ্ঘের রত্ন


  • November 6, 2019
  • (0 Comments)
  • 316 Views

ভারতরত্ন আমাদের দেশের সর্বোচ্চ অ-সামরিক সম্মান। যেকোনও সরকার তাঁর রাজনীতি-কূটনীতি অনুযায়ী যে-কারোকেই এই সম্মান দিতে পারেন। দেনও। কিন্তু প্রাপক সাভারকরের মতো ‘মুচলেকা-রত্ন’ হলে, আমাদের মতো পাঁচ-পাব্লিকের ছানবিন করে দেখে নেওয়ার অধিকার আছে সে রত্ন কতটা সঙ্ঘের, কতটাই বা ভারতবর্ষ নামক সূর্যের। লিখেছেন দেবতোষ দাশ

 

 

কে এই বি ডি সাভারকর, যাঁকে ভারতরত্ন দেওয়ার জন্য শাহ-মোদী-সঙ্ঘ উঠেপড়ে লেগেছে? সাফ-সাফ বললে, বহুত্বের দেশ ভারতে এই যে আজ সঙ্ঘী চিন্তাধারার বোলবোলা ও দাপট, তার পেছনের প্রধান পুরোহিত ছিলেন যিনি, তাঁর নামই সাভারকর। এক মন্ত্র এক তন্ত্রের উদগাতা সেই বীর সাভারকরের জীবনের দুটি পর্ব। গৌরবময় বিপ্লবীপর্ব এবং পরে ধিক্কৃত প্রতি-বিপ্লবীপর্ব।

 

১৮৫৭-এর মহাবিদ্রোহের আদর্শেই, শুরুতে তিনি, সশস্ত্র আন্দোলনে বিশ্বাস করতেন। লন্ডনে বসে ১৯০৫-এর রুশ-বিপ্লবের আগুন তাকে উদ্দীপ্ত করে। তাঁর শিষ্য মদনলাল ধিংড়া ১৯০৯-এ খোদ ইংল্যান্ডে বসেই কার্জন ওয়াইলিকে খুন করেন। পর পর আরও নানাবিধ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের জন্য ১৯১০-এ ব্রিটিশ সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে। তারপর কালাপানি পার করে পরের বছর আন্দামানের কুখ্যাত সেলুলার জেলে পাঠিয়ে দেয়। এর পরেই শুরু হল বীর সাভারকরের জীবনের দ্বিতীয় এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্ব। কুখ্যাত মুচলেকাপর্ব।

 

১৯১১ সালে জেলে ঢুকে, কয়েক মাসের মধ্যেই, ব্রিটিশ-শাসকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে লেখেন তাঁকে যেন নির্দিষ্ট সময়ের আগেই মুক্তি দেওয়া হয়। আন্দামানে সেলুলার জেলে থাকাকালীন এইভাবে একাধিক বার ব্রিটিশরাজের কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। সরকার কান দেননি যথারীতি। এগারোর পর ১৯১৩ সালে আবার লেখেন। ১৯২১-এ তাঁকে দ্বীপভূমি থেকে ভারতীয় মূল ভূখণ্ডের জেলে স্থানান্তরিত করার আগে পর্যন্ত বারবার ব্রিটিশ-প্রভুর কাছে ক্ষমা চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন একদা-বিপ্লবী। শেষমেশ ‘রবার্ট ব্রুস’ সফল হলেন। ব্রিটিশ তাঁর মুচলেকা গ্রহণ করে ১৯২৪-এ মুক্তি দেন। মুচলেকায় পরিষ্কার জানিয়ে দেন, তিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে সরে দাঁড়াবেন এবং চিরকাল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভুর জো-হুজুর হয়ে থাকবেন।

 

এর ঠিক বিপরীতে যদি আমরা ভগৎ সিং-এর দিকে তাকাই, কী দেখব? আত্মীয়পরিজন-সহ বহুজনের চাপ তখন ফাঁসির আদেশ-প্রাপ্ত ভগৎ সিং-এর ওপর। প্রত্যেকে বলছেন ব্রিটিশ-প্রভুর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিতে। মাত্র ২৩ বছরের যুবক ভগৎ সিং ব্রিটিশ-রাজকে চিঠি লিখলেন। কিন্তু কী লিখলেন? লিখছেন, তাঁদের যেন ফাঁসির পরিবর্তে ফায়ারিং স্কোয়াডে দাঁড় করিয়ে গুলি করে মারা হয়! বিপ্লবী যতীন দাসের অসামান্য আত্মত্যাগ, কমরেড ভগবতী চরণ ও বীরযোদ্ধা চন্দ্রশেখর আজাদের গৌরবময় আত্মবলিদানের ধারাবাহিকতায়, তাঁদের আত্মত্যাগ, সামান্য এক সংযোজন মাত্র। চিঠিতে পরিষ্কার করে তিনি জানিয়ে দেন, এই লড়াই চলবেই। এমনকী স্বপ্নের কথাও বলে যান সেই চিঠিতে, ভারতের শ্রমজীবী মানুষ ভবিষ্যতে একদিন ব্রিটিশ বা ভারতীয় ‘পরজীবী’দের হাত থেকে মুক্তি পাবেন।

 

সাভারকর তথা সঙ্ঘের ভক্ত-সকল বীরবাহাদুরের এহেন বারংবার ‘বীরত্বসূচক’ ক্ষমা-প্রার্থনার নমুনায় স্বভাবিকভাবেই ব্যাকফুটে, কিন্তু ভক্তকে দাবায়া রাখব কেডা! তাঁরা তাঁদের ‘বীর’কে বাঁচাতে এগিয়ে আসেন যথারীতি এবং হাস্যকর যুক্তি খাড়া করে বলেন, মুচলেকা ছিল সাভারকরের স্ট্র্যাটেজি যাতে নিজ-কর্তব্যে তিনি অবিচল থাকতে পারেন। সত্য এটাই যে কার্যত উনি তাই ছিলেন অর্থাৎ নিজ-কর্তব্যে অবিচল। ব্রিটিশ প্রভুকে মুচলেকা দিয়ে তিনি যা-যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন অক্ষরে অক্ষরে তা-ই পালন করেছিলেন। বিপরীতে ভগৎ সিং-এর উদাহরণ এলে ভক্তদের বিপন্নতা আরও কিছুটা বাড়ে।

 

হৃদয়ে মুসোলিনি চেতনায় জঙ্গি হিন্দুত্ব

১৯২৪-এ মুক্তি পাওয়ার পর থেকে সাভারকর আর কক্ষনো ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেননি। আর ব্রিটিশ প্রভুর বশংবদ হয়ে থেকে কীভাবে তাঁকে সাহায্য করা যায়, সেই প্রচেষ্টাই করে গেছেন ১৯৪৭-এ ভারতের স্বাধীনতা-প্রাপ্তি পর্যন্ত। তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ, ‘হিন্দুত্ব’ নামক এক বিভেদকামী তত্ত্ব বাজারে ছাড়া। যে তত্ত্ব মুসলিম লিগের দ্বিজাতি-তত্ত্বের আরেক রূপ।

 

১৯৪০-এর গোড়ায় নেতাজি সুভাষ সাভারকরের সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ করেন ব্রিটিশ-বিরোধী চূড়ান্ত স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিতে। সাভারকর অনুরোধ ফিরিয়ে নেতাজিকে মুখের ওপর বলেন, তাঁর এখন প্রধান কাজ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে ‘হিন্দু’ যুবকদের নাম লেখানো। তাঁর প্রিয় স্লোগান তখন ‘রাজনীতির হিন্দুত্বকরণ’ ও ‘হিন্দুত্বের সামরিকীকরণ’।

 

হিন্দুত্বের প্যারাশুট চেপে সাভারকর কি আকাশ থেকে পড়েছিলেন? না, প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানোর গল্প আছে। নানাভাষা-নানামত-নানাপরিধানের দেশ ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে গড়ে ওঠে হিন্দুত্ববাদ। আজ যার অষ্টশুঁড়, ভারতবর্ষের চিরকালীন ধর্মকে চারপাশ থেকে পেঁচিয়ে, দমবন্ধ করতে অতিসক্রিয়। এই মার-মার কাট-কাট সিনড্রোমের শুরুয়াৎ গত শতকে।

 

হিন্দু মহাসভার নেতা চক্ষুচিকিৎসক বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে দেখা করেছিলেন ইটালির ফ্যাসিস্ট একনায়ক মুসোলিনির সঙ্গে। উদ্দেশ্য ছিল মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলের আদলে একটি জঙ্গি হিন্দুত্ববাদী দল তৈরি করা। পরে মুঞ্জের হাত থেকে ব্যাটন নিয়ে হিন্দুত্ববাদের পোস্টারবয় হয়ে ওঠেন বি ডি সাভারকর।

 

এক ফ্যাসিস্টের ম্যানিফেস্টো

কাট টু পুস্তক ‘আলিবাবার গুপ্তভাণ্ডার’। প্রবন্ধের নাম, “’পুনর্‌’ বিষয়ে পুনর্বিবেচনা। আমাদের আত্ম-আধুনিকীকরণের একটি ঐতিহ্য।” লেখক চিন্তাবিদ শিবাজী বন্দ্যোপাধায়। গত শতাব্দীতে কীভাবে ‘হিন্দুত্ব’কে গড়েপিটে ‘হিন্দুত্ববাদ’ নামক এক বীজমন্ত্র বানানো হচ্ছে, তার ছানবিন করেছেন শিবাজী। আমরা সেই প্রবন্ধের সূত্র ধরে এগোব।

 

‘বর্তমান সময়ে কতকগুলি বিশেষ কারণে হিন্দু আপনার হিন্দুত্ব লইয়া ভয়ংকর রুখিয়া উঠিয়াছে। … বিশ্বরচনায় এই হিন্দুত্বই বিধাতার চরম কীর্তি এবং এই সৃষ্টিতেই তিনি তাঁহার সমস্ত শক্তি নিঃশেষ করিয়া আর-কিছুতেই অগ্রসর হইতে পারিতেছেন না, এইটে আমাদের বুলি।’

 

হঠাৎ শুনলে মনে হতে পারে, কথাটা বুঝি এখনকার সময় সম্পর্কে বলা হচ্ছে। এখন জলে-স্থলে এবং অন্তরীক্ষে (মানে ফেসবুকসহ সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়ায়) গো-রক্ষক ও হনুমান-সেনাদের যে দাপট, এই মন্তব্যটি সে-প্রসঙ্গে পুরোপুরি খাপে-খাপ হলেও, আদপে তা সমসাময়িক কোনো রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের নয়। ১৯১৪ সালে মন্তব্যটি করেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘বাস্তব’ রচনায়। এই ‘হিন্দুত্ব লইয়া ভয়ংকর রুখিয়া উঠিয়াছে’ সময়ের বছর দশেকের মধ্যেই ১৯২৩ সালে প্রকাশিত হয় বিনায়ক দামোদর সাভারকরের পুস্তিকাঃ হিন্দুত্ব / হু ইজ এ হিন্দু। মুষ্ঠি আরো পাকানো হয়, কিছুই যেন গলতে না-পারে। আরো আঁটোসাটো করা হয় হিন্দুত্বের সংজ্ঞা।

 

‘হিন্দু’ কে? সাভারকরের সাফ-সাফ জবাবঃ সিন্ধুনদ থেকে সমুদ্র অবধি বিস্তৃত ভারতবর্ষকে যে একযোগে ‘পিতৃভূমি’ জ্ঞান করে সে-ই ‘হিন্দু’। ‘পিতৃভূমি ও পুণ্যভূমি’র সরল সমীকরণের ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে সাভারকরের প্রার্থিত রাষ্ট্র-কাঠামো। ওই সমীকরণের মোদ্দা কথা হল, মুসলমান বা খ্রিস্টানরা যেহেতু আরব বা প্যালেস্টাইনকে তাদের ‘পুণ্যভূমি’ জ্ঞান করে, তাদের দেশাত্মবোধ সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়া অসম্ভব।

 

শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় টিপ্পনি যোগ করছেন এখানে, ‘অল্প দিনের ভেতর, একই যুক্তি অনুসারে, অনাত্মীয়দের নাম তালিকা আর একটু বাড়ে – মুসলিম-খ্রিস্টানদের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন নামক ‘পুণ্যভূমি’র ভক্তকুল কম্যুনিস্টদের এক সারিতে ঠাঁই করে দেন আরেক হিন্দু তাত্ত্বিক (গুরুজি) গোলওয়ালকর। ‘হিন্দু’ কে, এই জটিল প্রশ্নের তড়িৎ-সমাধান ঘটিয়ে, সেই ‘হিন্দু’কেই ভাবনার একক হিসেবে ধরে, সাভারকর লেখেন তাঁর ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ বিষয়ক ইস্তেহার।’

 

সেই ইস্তেহার অনুযায়ীঃ

১. সংখ্যালঘুদের স্বাধীন ধর্মাচরণের সুযোগ থাকবে, কিন্তু কড়া নজর রাখা হবে যাতে সংখ্যাগুরুদের ন্যায়সম্মত অধিকার তারা কোনোমতেই খর্ব না করে, রাষ্ট্রের ভেতর আরেকটা রাষ্ট্র বানিয়ে না বসে।

[আসুন মিলিয়ে নিই: মহানগরের রাজাবাজার বা পার্কসার্কাসসহ রাজ্যের মুসলিম-মহল্লাগুলোকে কত সহজে ও কৌশলে দেগে দেওয়া হয় ‘পাকিস্তান’ বলে। সংখ্যালঘুদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানোই মূল উদ্দেশ্য। তার জন্যই এনার্সি-টেনার্সি।]

 

২. নাগরি জাতীয় লিপি, হিন্দি জাতীয় ভাষা ও সংস্কৃত দেবভাষা রূপে পরিগণিত হবে।

[হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ত্রহস্পর্শে হাঁফ উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে বাকি ভারতবর্ষের। হিন্দুস্থানী থেকে সযত্ন আরবি-ফারসি ছেঁটে একটি ‘হিন্দুভাষা’ তৈরি করা হয়েছে, তার নাম ‘হিন্দি’। সংস্কৃতকেও কোঅপ্ট করা হয়েছে এমনভাবে যেন সংস্কৃতভাষায় লিখিত সব ‘কর্ম’ই হিন্দু-সম্পত্তি! এতে সাফল্যও এতটাই যে অন্য ধর্মাবলম্বীরাও তাই-ই বিশ্বাস করে!]

 

৩. দু-হাত খুলে অভ্যর্থনা জানাতে হবে যন্ত্রযুগকে – শিল্পবাণিজ্যের প্রসারের লক্ষ্যে ব্যক্তিপুঁজিকে নানাভাবে জোগাতে হবে সাহায্য ও উৎসাহ।

[আম্বানি-আদানি-মালিয়াদের প্রতি অতিরিক্ত আদর ও প্রীতি দেখেই বোঝা যায়!]

 

৪. পুঁজিপতি ও শ্রমিক, দু-পক্ষের স্বার্থকেই নিয়ন্ত্রণ করা হবে জাতীয় প্রয়োজনের নিক্তিতে – কোনো শিল্পসংস্থা যদি দুর্ভাগ্যবশত লোকসানের মুখ দেখে, তাহলে তার দায়ভাগ শ্রমিকদেরও নিতে হবে।

[কী আনন্দ! বিপুল মুনাফায় ভাগ নেই, লোকসানে দায় আছে!]

 

৫. ধর্মঘট-লকআউটের জেরে যদি উৎপাদন-ব্যবস্থা টালমাটাল হয়, তাহলে সে-সব কঠোর হস্তে দমন করবে রাষ্ট্র।

[রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নই ফ্যাসিবাদের মূল অস্ত্র।]

 

৬. ব্যক্তিগত মালিকানা হবে রাষ্ট্রীয় নীতির অন্যতম স্তম্ভ।

[যৌথ যা কিছু, সামাজিক বিন্যাস থেকে অর্থনীতি, সবেতেই এদের বিরাট আপত্তি। ফলত আম্বানি-আদানিরাই হয়ে ওঠে রাষ্ট্রীয় নীতির স্তম্ভ।]

 

৭. হিন্দুদের ‘পুণ্যভূমি’র নাম হবে ‘ভারত’ অথবা ‘হিন্দুস্থান’।

[আর্যাবর্ত, যেখানে চতুঃবর্ণ ব্যবস্থার চল, অর্থাৎ উত্তরভারত, তাকেই গোটা ভারতের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অন্যায় জোরাজুরি।]

 

যেভাবে বিষ ঢালার প্রক্রিয়া শুরু হল ভারতে:

১৯২৫ সালে সাভারকর শুরু করেন ‘মরাঠি ভাষাশুদ্ধি’ আন্দোলন – মারাঠির সঙ্গে আরবি-ফারসির সংস্রব চুকিয়ে দেওয়ার আয়োজন ছিল সেটি। পিতৃভূমির যোগ্য জাতীয় পতাকার জন্যে সাভারকর বাছেন তিন প্রতীক – কুণ্ডলিনী, ওঙ্কার ও কৃপাণ। নকশাটি ‘হিন্দু মহাসভা’ গ্রহণ করলে ফাউ হিসেবে যুক্ত হয় স্বস্তিক। সাভারকরের অভিমত: শস্ত্রবিহীন যে তার প্রণবনাদে কেউ কান দেয় না, হাতে কৃপাণ না থাকলে মূলাধারচক্রে ঘা দিয়ে কুলকূণ্ডলিনীকে চাগিয়ে তোলা যায় না; ঐশীশক্তির দুর্লভ প্রেরণা কাম্য হলে হিন্দুদের আগে পরতে হবে যুদ্ধসাজ, অর্জন করতে হবে সামরিক প্রতিভা।

 

আমাদের মনে পড়ে যাবে, ১৯২০তেই কংগ্রেস ত্যাগ করছেন সঙ্ঘীদের আদিগুরু বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে মূলত দুটো কারণ দেখিয়ে। কী সেই জোড়া কারণ?

তিনি গান্ধীর অহিংসা ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধী। বুকে মণ্ডল, হাতে কমণ্ডলু, চোখে খোয়াইশ: একটি জঙ্গি হিন্দুত্ববাদী দল তৈরি করতে হবে। ১৯২৫-এ তৈরি হয়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ। আরএসএস। ১৯৩১-এ মুঞ্জে দেখা করে ফেলছেন ফ্যাসিস্ট একনায়ক মুসোলিনির সঙ্গে। মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দলের আদলে গড়তে হবে সঙ্ঘ। মুঞ্জে-শিষ্য সাভারকর গুরুর স্বপ্ন সাকার করতে জানকবুল করলেন।

 

১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়, সাভারকার সদস্যদের সাবধান করে দিয়েছিলেন, তারা যেন আবেগের আতিশয্যে তাদের প্রশাসনিক দায়দায়িত্ব ভুলে না-যায়। ব্রিটিশ লুঠেরাদের কাছে জমা দেওয়া মুচলেকার কথা এক মুহূর্তের জন্যও ভোলেননি তিনি। সঙ্ঘের আদর্শ বরাবরই স্ববিরোধী। জাতীয়তাবাদী চিন্তাধারার কথা ঢাক পিটিয়ে বলবে, আবার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সঙ্গে গলা জড়াজড়ি করতে দ্বিধা নেই!

 

বৃহৎ পুঁজির সেবাদাস সঙ্ঘ একই সঙ্গে ভয়ানক পিতৃতান্ত্রিকও বটে। মেয়েদের জন্য তাঁদের পরিষ্কার বার্তা: রাষ্ট্রের বিপদে শক্তিস্বরূপিনী বেশে মেয়েরা ঘরের আঙিনা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারে, না-হলে তাঁদের থাকতে হবে ঘরের নিভৃতে, নিশ্চিন্তে এবং নিরাপদে। পুরুষের সর্বার্থসাধিকা হলেই চরিতার্থ হয় নারীর জীবন, পূর্ণ হয় তার সকল আকাঙ্ক্ষা।

 

সাভারকরের মতাদর্শে সাম্যের কোনো জায়গা ছিল না, তেমনি সব রকমের আন্তর্জাতিকতাবাদী চিন্তার প্রতি ছিল গভীর বিরাগ। ১৯৬১ সালের ১৫ই জানুয়ারি, প্রকাশ্য সভায় দেওয়া জীবনের শেষ অভিভাষণে সাভারকর বলেন:

‘কেবলমাত্র সামরিক সামর্থ্যের বাটখারা দিয়েই দেশীয় মহত্ত্বের পরিমাপ করা যায়; যে গণতন্ত্র ভীরু এবং পদে-পদে শত্রুর সামনে মাথা নোয়াতে কুণ্ঠিত হয় না তা ত্যাজ্য; নপুংসক গণতন্ত্রের চেয়ে হিটলার শতগুণে শ্রেয়; ভারতের উচিত, তার সামরিক বাহিনীকে আরো আধুনিক ও জোরদার করা; ভারতের কর্তব্য, ক্রমাগত নতুন ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধোপকরণ বানিয়ে চলা – যথা, হাইড্রোজেন বোমা।’

 

সঙ্ঘরত্ন  

সাভারকরের সেই অভিপ্রেত হিন্দু-সামরিকীকরণ আজ সম্পূর্ণ হয়েছে। যোগী ও মোদীর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে গো-রক্ষক সেনা, যারা গোস্তের গন্ধে গন্ধে ঢুকে যেতে পারছে বিধর্মীর অন্দরমহলে। তাকে ‘যোগ্য’ সাজাও দিতে পারছে। খাঁটি-ভারতবাসীর-খোঁজ নামক উইচ-হান্টিং এনার্সির জুজু দেখিয়ে তারা আতঙ্কিত করতে পেরেছে সংখ্যালঘু-সহ দলিত ভারতবাসীকে। সমগ্র কাশ্মীর ও আসামকে পরিণত করতে পেরেছে আস্ত ডিটেনশন ক্যাম্পে। বৃহৎ পুঁজির সেবাদাস হয়ে লুঠেরাদের হাতে তুলে দিতে পেরেছে জনগণের আমানতসহ তামাম ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা। যুদ্ধ-যুদ্ধ ভাব ও জাতীয়তাবাদী জিগির তুলে ক্রমশ দূষিত করতে পেরেছে মুক্তচিন্তার নির্মল বাতাস। সাভারকরের বিষবৃক্ষ আজ ফুলে-ফলে ভরন্ত। ভারতবর্ষকে সর্বনাশের দোরগোড়ায় ঠেলতে পেরে, স্বপ্ন-সফল সঙ্ঘের আজ উদ্বাহু নৃত্য-দশা। সাফল্যের সেই ঘোরেই তারা হিটলার-শিষ্য যুদ্ধবাজ ‘বীর’ সাভারকরকে ভারতরত্ন দিতে চায়। এ আমার গুরুদক্ষিণা।

 

ভারতরত্ন আমাদের দেশের সর্বোচ্চ অ-সামরিক সম্মান। যেকোনও সরকার তাঁর রাজনীতি-কূটনীতি অনুযায়ী যে-কারোকেই এই সম্মান দিতে পারেন। দেনও। কিন্তু প্রাপক সাভারকরের মতো ‘মুচলেকা-রত্ন’ হলে, আমাদের মতো পাঁচ-পাব্লিকের ছানবিন করে দেখে নেওয়ার অধিকার আছে সে রত্ন কতটা সঙ্ঘের, কতটাই বা ভারতবর্ষ নামক সূর্যের।

 

ঋণঃ শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়, দ্য ওয়র

 

দেবতোষ দাশ ঔপন্যাসিক ও গল্পকার, মূলত নানান লিটল ম্যাগাজিনে লেখালেখি করেছেন বহু বছর ধরে। 

Share this
Leave a Comment