কয়লা শিল্পে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ: কফিনে শেষ পেরেক


  • October 18, 2019
  • (0 Comments)
  • 569 Views

দেশের সম্পদকে নিলামে চড়ানোর ধারাবাহিকতায় নরেন্দ্র মোদি সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত হলো কয়লা শিল্পে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (FDI) অনুমতি। এই প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের বিরোধীরা সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন তুলেছেন এটা কি বহুজাতিক কোম্পানিগুলিকে ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের নতুন ক্ষেত্র তুলে দিল? লিখেছেন সুমন কল্যাণ মৌলিক।

 

 

মোদি সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত হলো কয়লা শিল্পে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (FDI) অনুমতি। দেশের এই সিদ্ধান্ত কয়লা শিল্পে স্বাভাবিকভাবে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সরকারি কোল কোম্পানির শ্রমিকরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পথে নেমেছেন। সি আই টি ইউ, আই এন টি ইউ সি, এ আই টি ইউ সি প্রভৃতি সংগঠনগুলির যৌথ মঞ্চ ইতিমধ্যে একদিনের প্রতীকী ধর্মঘট পালন করেছে। বিজেপি প্রভাবিত ভারতীয় মজদুর সংঘ পাঁচ দিনের ধর্মঘট ডেকে, দু’দিন চালানোর পর সরকার পক্ষের সঙ্গে আলোচনায় ‘খুশি’ হয়ে ধর্মঘট প্রত্যাহার করেছে। যদিও সরকার পক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবেন এমন কোন ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে এই প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের বিরোধীরা সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন তুলেছেন এটা কি বহুজাতিক কোম্পানিগুলিকে ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠনের নতুন ক্ষেত্র তুলে দিল?

 

প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর দেশের নিয়ন্ত্রণ যদি না থাকে তবে একদিকে যেমন দেশের ক্ষতি তেমনি রাষ্ট্রায়ত্ত কোল কোম্পানি (কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড) ও তার সহযোগী সংস্থাগুলি, যেমন ইস্টার্ন কোলফিল্ডস লিমিটেড (ইসিএল), ভারত কোকিং কোল লিমিটেড (বিসিসিএল), সেন্ট্রাল কোলফিল্ডস, মহানদী কোলফিল্ডসের মতো সংস্থাগুলিতে কর্মরত পাঁচ লক্ষ শ্রমিকের জীবনে সংকট নেমে আসবে।

 

যারা এই বিদেশী বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছে তাদের বক্তব্য রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কোল ইন্ডিয়া লিমিটেড উৎপাদন বাড়াতে বা কয়লা শিল্পে নতুন বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়াতে পারছে না। যেমন ২০১৮-১৯ আর্থিক বর্ষে ভারতবর্ষে ৯৬৫ মিলিয়ন টন কয়লার ব্যবহার হয়েছে। এর মধ্যে ৭৩০ মিলিয়ন টন দেশে উৎপাদন, বাকিটা আমদানি করা। আবার দেশে উৎপাদিত ৭৩০ মিলিয়ন টনের মধ্যে কোল ইন্ডিয়ার উৎপাদন ৬০৭ মিলিয়ন টন। এই পক্ষের আরও বক্তব্য হলো গত ১৩ বছর ধরে কোল ইন্ডিয়া তাদের লক্ষ্য মাত্রা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই বিদেশী বিনিয়োগ ছাড়া গতি নেই। তবে এই সিদ্ধান্তের ফলে দলে দলে বহুজাতিক কোম্পানি যে ডলারের থলি নিয়ে ভারতের কয়লাক্ষেত্রে প্রবেশ করবে – এমন আশা অবশ্য মোদিজীর অতি বড় সমর্থকও করছেন না। তাদের বক্তব্য শুধুমাত্র ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি দিলেই চলবে না, কয়লা ক্ষেত্র (কোল প্যাচ) বিতরণ ও দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিদেশী কোম্পানিগুলিকে স্বাধীনতা দিতে হবে। এছাড়া দেশের পরিবেশ ও দূষণ সংক্রান্ত আইনগুলিকে আরও নখ-দন্ত হীন করতে হবে যাতে বহুজাতিক কোম্পানিগুলির কয়লা খননের অনুমতি পেতে বিলম্ব না হয়। তাদের আরও বক্তব্য হলো জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়াকে সরল না করলে, কয়লা শিল্পে কোল ইন্ডিয়ার একাধিপত্যের অবসান না ঘটলে ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা বা মেরিল লিঞ্চের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি পুঁজি বিনিয়োগে আগ্রহী হবে না।

 

এই পরস্পর বিরোধী মতামতের মধ্যে অবস্থার প্রকৃত চিত্রে যাবার আগে একটি প্রয়োজনীয় কথা জানিয়ে রাখা জরুরি। ভারতের কয়লা শিল্পে অন্তত দুটি ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই ১০০ শতাংশ বিদেশী বিনিয়োগের অনুমতি রয়েছে। প্রথমটি ‘ক্যাপটিভ মাইনস’অর্থাৎ যেখানে একটি নির্দিষ্ট মান বিদ্যুৎ/স্টিল/সিমেন্ট প্রভৃতি শিল্পের প্রকল্পে কয়লা সরবরাহ করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। অন্যটি ‘কোল ওয়াশিয়ারি’ যেখানে কয়লাকে প্রসেস করা হয় এবং তা পুনরায় সরবরাহকারী কোম্পানিকে ফেরত দেওয়া হয়। ওয়াশিয়ারির বাজারে কয়লা বিক্রির অনুমতি থাকে না।

 

কিন্তু এবার সরাসরি বিদেশী কোম্পানিগুলিকে ভারতে কয়লা খনন ও বিক্রির আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। সরকার পক্ষের আশা BHP (ব্রোকেন হিল প্রপার্টি), রিও টিন্টো, অ্যাংলো আমেরিকান এক্স স্টার্ট-এর মতো বিদেশী কোম্পানিগুলি ভারতের কয়লা শিল্পে বিনিয়োগ করবে। তবে কয়লা ক্ষেত্রে বিদেশী বিনিয়োগের প্রশ্নে যারা গেল গেল রব তুলেছেন তাদের জ্ঞাতার্থে জানানো যেতে পারে যে কয়লা শিল্পে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের অনুমতি কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, তা বেসরকারীকরণের এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফল।

দেশব্যাপী কয়লা ধর্মঘটে শামিল ভারত কোকিং কোল লিমিটেড (বি সি সি এল)-এর কর্মচারীদের বিক্ষোভ প্রদর্শন। ঝরিয়া, ঝাড়খণ্ড (ছবি: পি টি আই)।

 

ভারতের কয়লাশিল্পের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস  

১৭৭৪ সালে ভারতে প্রথম ব্রিটিশ মালিকরা কয়লা উত্তোলন শুরু করে। পরাধীন দেশেই ভারতীয়রা কয়লা খনির ব্যবসায় যুক্ত হয়। স্বাধীন হবার পরেও কয়লা শিল্প ব্যক্তি মালিকানাধীন ছিল, যাকে কোম্পানির আমল বলা হয়। ১৯৭৩ সালে কোল মাইনস ন্যাশানালাইজেশন অ্যাক্ট (CMN) অনুসারে কয়লা শিল্পের জাতীয়করণ করা হয়েছিল। এই জাতীয়করণের ক্ষেত্রে ভারত সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল দেশের শিল্পের অগ্রগতির জন্য ভারতীয় শিল্পপতিদের সস্তায় পরিকাঠামোর ব্যাবস্থা করে দেওয়া। কারণ হিসাবে দেখানো হয়েছিল সেই সময় টাটা, বিড়লা, গোয়েঙ্কার মতো ভারতের শিল্পপতিদের হাতে পরিকাঠামো তৈরির জন্য যথেষ্ট পুঁজি ছিল না। তাই শিল্পের অগ্রগতির প্রয়োজন দেখিয়ে বেসরকারি শিল্পপতিদের সাহায্য করার জন্য আমাদের দেশের জনগণের পয়সায় তৈরি হলো খনি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও ইস্পাত শিল্প। কয়লা খনি জাতীয়করণের আরও একটা কারণ ছিল। কোম্পানির আমলে বেশি লাভের আশায় কোন নিয়ম নীতি না মেনে কয়লা তোলা হতো, ফলে বহু কয়লা মাটির তলায় নষ্ট হয়। যেমন রাণীগঞ্জ কয়লা খনি অঞ্চলে বেসরকারি মালিকদের যথেচ্ছভাবে কয়লা খননের ফলে বহু কয়লা মাটির তলায় জ্বলছে ও ধ্বসের কারণে জনজীবন সহ বহু সম্পত্তি নষ্ট হয়েছে। কিন্তু খনিতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে পরিকল্পিত ভাবে বেশি পরিমাণ কয়লা তুলে আনার খরচ বেসরকারি মালিকরা বহন করবে না কারণ তাতে লাভের অঙ্ক কমে যাবে। তাই ভারত সরকার নিজে দায়িত্ব নিয়েছিল জনগণের পয়সায় কয়লাখনি চালাবার।

 

কয়লা শিল্প জাতীয়করণের পর উৎপাদন খরচের থেকে কম দামে কয়লার জোগান পেয়েছে বেসরকারি পুঁজি। কয়লা ব্যবহারকারী শিল্পপতিদের চাপে সরকার কয়লার দাম নিজে নির্ধারণ করতো। বিশেষ করে উচ্চতাপ মূল্যের কয়লা উৎপাদনকারী সংস্থা ইসিএল, বিসিসিএল, সিসিএল-এর কয়লা উৎপাদন খরচের থেকে অনেক কম দামে সরকার বেসরকারি মালিকদের দিতো। এছাড়া প্রথম থেকেই কোল ইন্ডিয়ার সংস্থাগুলিতে সীমাহীন দুর্নীতি, সঠিক পরিকল্পনার অভাব রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটিকে একটা অদক্ষ সংস্থায় পরিণত করলো। সরকারের তরফে যুক্তি দেওয়া হল, এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে প্রয়োজন কয়লা শিল্পে পরিকল্পিত বেসরকারীকরণ।

 

এই অবস্থায় ১৯৯১ তে নয়া আর্থিক নীতির অনুষঙ্গে শুরু হলো ধাপে ধাপে বেসরকারীকরণ পর্ব। প্রথমে কয়লার দাম বাজারের উপর ছেড়ে দেওয়া হলো। সরকার কোল প্রাইস রেগুলেটার অথরিটি থেকে উচ্চতাপ মূল্যের কয়লা উৎপাদনকারী সংস্থাদের যে অনুদান দিত, তা বন্ধ করে দেওয়া হলো। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্র কোল ইন্ডিয়ার সবকটি সংস্থাকে নিজের পায়ে চলতে বলা হলো। এতদিন যে সংস্থা দেশীয় শিল্পের বিকাশের কারণ দেখিয়ে উৎপাদন খরচের থেকে কম দামে ব্যক্তি মালিকানাধীন শিল্পে কয়লার জোগান দিয়ে এসেছে তাকে বলা হলো বাজারে প্রতিযোগিতা করে ব্যবসায়িক ভিত্তিতে কোম্পানি চালাতে হবে। ইতিমধ্যে নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি কয়লার আমদানি শুল্ক ৮৫% থেকে কমে ৩৫% হয়। তার ফলে আমদানিকৃত কয়লার দাম কোল ইন্ডিয়ার কয়লার দামের থেকে কমে গেল। তাছাড়া তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বিদেশী কয়লার গুণমান দেশীয় কয়লার থেকে উন্নত হওয়ার কারণে সরকারি ও বেসরকারি উভয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র কয়লা আমদানি করতে শুরু করলো। দেশীয় কয়লার সাথে আমদানিকৃত কয়লার ব্লেন্ডিং করে তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রয়োজন মেটানো হলো।

 

খোলামুখ খনি

এখন স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন উঠতে পারে বেসরকারি পুঁজি কয়লা শিল্পে লগ্নি করতে আগ্রহী হলো কেন? এর উত্তর একটু বিস্তারে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন। কয়লা খননের ইতিহাসে ৩০ বছর আগে পর্যন্ত বেশিরভাগ কয়লা উৎপাদন হতো মাটির তলা থেকে। তখন মাটির তলার খনি লাভজনক ছিল। মাটির তলার খনির বয়স বাড়ার সাথে সাথে উৎপাদন খরচ বেড়ে চলে। কিন্তু বর্তমানে ভারী মাটি কাটার যন্ত্র আবিষ্কারের ফলে শুরু হলো খোলামুখ খনি (ওপেন কাস্ট মাইনিং)। এই পদ্ধতিতে বর্তমানে ২০০-২৫০ ফুট গভীরতা থেকে সম্পূর্ণ যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ও খুব কম শ্রমিকে কয়লা তোলা সম্ভব হচ্ছে। তাই মনে রাখতে হবে উৎপাদন খরচ খুব কম ও লাভের হার যথেষ্ট বেশির ফলে বেসরকারি পুঁজি খোলামুখ খনি তৈরিতে আগ্রহী। এদেরই চাপে সরকারের সব নীতি ও প্রচলিত আইন যেমন খনি আইন, পরিবেশ আইন, শ্রম আইন সংশোধিত ও পরিবর্তিত হতে লাগলো। কোল ইন্ডিয়ার বিভিন্ন অধীনস্থ সংস্থা আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে প্রাইভেট কোম্পানিদের দিয়ে বড়ো বড়ো ওপেনকাস্ট প্রজেক্ট থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু করেছিল। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত মাটির তলার খনিগুলি ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেলো।

 

ভারতে বর্তমানে নব্বই শতাংশ কয়লা খোলামুখ খনি থেকে উৎপাদন করা হয়। খোলামুখ খনি থেকে কয়লা তোলার খরচ সারা পৃথিবীতে গড়ে সাবেকি মাটির তলার খনির থেকে চারভাগের এক ভাগ। তবে মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশের ক্ষতি বহুগুণ বেশি। ভারতে বেসরকারি খোলামুখ খনি সম্পূর্ণ ঠিকা শ্রমিকের উপর নির্ভরশীল। আর ঠিকা শ্রমিকেরা মালিকদের দ্বারা চূড়ান্ত শোষিত। ভারতে সরকারি কয়লা শ্রমিকদের গড় মজুরি যেখানে ৪০,০০০ টাকা (বাড়িভাড়া ও মেডিক্যাল বাদে), সেখানে বেসরকারি কোলিয়ারির শ্রমিকদের গড় মজুরি (নির্ধারিত) ১২,০০০ টাকা। প্রকৃত মজুরি আরও কম। কোল ইন্ডিয়ার ঠিকা শ্রমিকদের মাইনে সরকার নির্ধারিত গড় নূন্যতম মজুরির থেকে দেড়গুণ বেশি। কিন্তু কয়েকটি ব্যতিক্রম (পশ্চিম বর্ধমানের পাটমোহনা ও কালিদাসপুরের ঠিকা শ্রমিকেরা আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের দাবি আদায় করেছেন) বাদ দিলে সে মজুরি ঠিকা শ্রমিকেরা পান না। এছাড়া বেসরকারি কোল কোম্পানিগুলি সারা ভারতের কয়লা শ্রমিকদের জন্য যে দ্বিপাক্ষিক বেতন চুক্তি (ন্যাশনাল কোল ওয়েজ এগ্রিমেন্ট) হয়, তাতে সেই সই করেনি। ভারত সরকারও এইসব ব্যক্তি মালিকানাধীন কোল কোম্পানিগুলিকে বেতন চুক্তি মানতে বাধ্য করার জন্য একটিও পদক্ষেপ নেয়নি। ফলে বলা যায় এই বেসরকারি খোলামুখ খনিগুলি ঠিকা শ্রমিকদের জন্য বধ্যভূমি। তাই এটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে বেসরকারি কোল কোম্পানির কয়লা যেকোন রাষ্ট্রায়ত্ত খনি থেকে উত্তোলিত কয়লার থেকে সস্তা।

ঝাড়খণ্ডে কয়লাশ্রমিকদের এফ ডি আই-বিরোধী ধর্মঘট।

 

কয়লা বেসরকারীকরণের ইতিহাস

কয়লা বেসরকারীকরণের প্রক্রিয়াটিকে ধাপে ধাপে কার্যকরী করার ইতিহাসটাও খুব সংক্ষেপে জেনে নেওয়া জরুরি। ১৯৯২ সালে ১৪৩ টা কয়লা ব্লক ও সিঙ্গারেনি খনি কয়লা তোলার জন্য রাজ্যগুলোর হাতে দেওয়া হলো। ১৯৯৩ ও ২০০০ সালে দুটি সংশোধনীর মাধ্যমে কয়লা শিল্পকে সরাসরি বেসরকারি উদ্যোগের হাতে দেওয়া হলো। ১৯৯৩ (জুন) সালে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানি, ১৯৯৬ (মার্চ) সিমেন্ট কোম্পানি ও ২০০৭ সালে বেসরকারি কোল গ্যাসিফিকেশন ও লিকুইডিফিকেশন সংস্থাকে ক্যাপটিভ কয়লা খনি করার অনুমতি দেওয়া হলো। মাইনস অ্যান্ড মিনারেল (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেশন) অ্যাক্ট (২০০০) সংশোধনী অনুসারে সমস্ত রাজ্যগুলোকে কয়লা খনি চালানোর অনুমতি দেওয়া হলো। একই সঙ্গে এ কথাও বলা হলো যেহেতু রাজ্য সরকারগুলোর কয়লা উৎপাদনের অভিজ্ঞতা নেই, তাই রাজ্যগুলো অভিজ্ঞতা আছে এমন বেসরকারি কোম্পানিকে দিয়ে আউটসোর্সিং করতে পারবে। তারপর থেকে রাজ্য সরকারগুলো বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দিচ্ছে মূল্যবান কয়লা সম্পদ। কয়লা শিল্প জাতীয়করণ আইনে ১৯৯৩ সালের সংশোধনী অনুসারে বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিকে প্রায় বিনা পয়সায় কয়লা ব্লক বরাদ্দ করা হলো। ২০০৬ সালে ক্যাপটিভ মাইনসে ১০০ শতাংশ বিদেশী পুঁজি আসার ছাড়পত্র পেলো। বেসরকারীকরণের প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করার জন্য ২০১০ সালে মাইনস অ্যান্ড মিনারেল (ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেশন) অ্যাক্টে সংশোধনী এনে অন্যান্য খনিজ দ্রব্যের সাথে কয়লাকেও নিলামে চড়ানোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়। ২০১২ সালে ২১৪ টি কয়লা ব্লক বিভিন্ন রাজ্য সরকার ও বেসরকারি কোম্পানিকে নিলাম ডেকে বরাদ্দ করা হলো। এই পর্বেই সামনে এলো বহু আলোচিত ‘কোল-গেট কেলেঙ্কারি’। যেহেতু কোল ব্লকের বরাদ্দ পাওয়ার জন্য কোন ব্যক্তি মালিকের সেই কয়লা ব্যবহার করার উপযুক্ত নিজস্ব সংস্থা থাকতে হবে তাই এই মালিকরা ভুয়ো বিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখিয়ে নিলামে অংশ নেয়। ২০১৪ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বন্টন হওয়া ২১৪টি কয়লা ব্লক ভারত সরকার ফিরিয়ে নেয়। যদিও আশ্চর্যের বিষয় আদানি গোষ্ঠীর মালিকানাধীন সংস্থা PKCL (রাজস্থান রাজ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিগমের অধীন) এখনও কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। আদানি গ্রুপের সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে Directorate of Revenue Intelligence-এর ২৯,০০০ কোটি টাকার over invoicing এর অভিযোগে আছে। অনেকের আশঙ্কা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে ইতিমধ্যে বিদেশে পাচার করা কালো টাকা আইনী পথে ভারতে ফিরবে।

 

যাই হোক, মোদি সরকারের প্রথম পর্বে কোল মাইনস স্পেশাল প্রভিশন অ্যাক্ট (২০১৫) পাশ হয়। মোদি সরকারের দ্বিতীয় পর্বে কয়লা শিল্পে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের ঘোষণা আদতে বৃত্তটাকে সম্পূর্ণ করলো।

 

যারা শুধু মোদি সরকারকে কয়লা শিল্পের বেসরকারীকরণের জন্য দায়ী করছে তারা নিশ্চিতভাবে সত্যের অপলাপ করছে। ১৯৯০ থেকে ২০১৯ – প্রায় তিরিশ বছর সময়ে কেন্দ্রীয় সরকার পরিচালনা করেছে হয় কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ বা বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার। যদি এই দুটি জোটের দল বিন্যাসকে আমরা মাথায় রাখি তাহলে দেখা যাবে দল-মত-আদর্শ নির্বিশেষে ভারতের প্রায় সব রাজনৈতিক দল এই সরকারগুলিকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করেছে। আর এদের পৌরোহিত্যেই সম্পূর্ণ হয়েছে বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া। ১৯৯২ সাল থেকে ধাপে ধাপে বেসরকারীকরণকে কার্যত সমর্থন করেছে সব কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন। বামফ্রন্ট শাসিত পশ্চিমবঙ্গে প্রায় বিনা বাধায় ভারতের প্রথম সম্পূর্ণ বেসরকারি কয়লা খনি গোয়েঙ্কাদের মালিকানায় চালু হয়েছে। পরবর্তীকালে ২০১৫ সালে রাজ্যের বর্তমান শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস লোকসভা ও রাজ্যসভায় বেসরকারীকরণের পক্ষে কোল মাইনস স্পেশাল প্রভিশন অ্যাক্ট (২০১৫)-কে সমর্থন করেছে। ২০১৫ সালের ৬’ই জানুয়ারি থেকে ১০’ই জানুয়ারি পর্যন্ত পাঁচদিনের ডাকা ধর্মঘটের প্রথম দু’দিন সারা ভারতে শ্রমিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামিল হওয়াতে বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিতে কয়লার জোগান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। স্থায়ী শ্রমিকদের পাশাপাশি ঠিকা শ্রমিকদের একটা বড়ো অংশ ধর্মঘটে যোগ দেয়। এই ধর্মঘটের সরাসরি বিরোধিতা করেছিল তৃণমূল আশ্রিত ইউনিয়ন। কিন্তু ধর্মঘটের দ্বিতীয় দিন শুধুমাত্র কমিটি গঠনের আশ্বাসে সিটু ছাড়া বাকি চারটি কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়ন ধর্মঘট তুলে নেয়। ২০১৮ সালের ২০শে ফেব্রুয়ারি ইউনিয়ন ক্যাবিনেট থেকে বেসরকারি কয়লাখনির মালিকদের বাজারে কয়লা বিক্রির অনুমতি দেবার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর ১৬ই এপ্রিল ২০১৮-এর ডাকা বনধ্ কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি শুধু মন্ত্রকের সাথে আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তুলে নেয়। কেন্দ্রীয় ট্রেড ইউনিয়নগুলি ঠিকা শ্রমিকদের প্রশ্নে দীর্ঘদিন ধরে যে নীরবতা পালন করে চলেছে তাও একইভাবে সমালোচনার যোগ্য।

 

কয়লাশিল্প ও শ্রমিকের ভবিষ্যৎ

আজ কোল ইন্ডিয়ার একটা বড়ো অংশের শ্রমিকদের ভ্রান্ত ধারণা হলো আউটসোর্সিং-এর মাধ্যমে ঠিকা শ্রমিকদের ঘাম-রক্তকে ব্যবহার করে বেসরকারি সংস্থাগুলিকে দিয়ে কয়লা উৎপাদন না করালে রাষ্ট্রায়ত্ত কোল ইন্ডিয়া বাঁচবে না। কিন্তু বাস্তবে ধীরে ধীরে কোল ইন্ডিয়ার কয়লার চাহিদা কমতে থাকবে। হয় কোল ইন্ডিয়া বন্ধ হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে বা প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সব মাটির তলার খনি বন্ধ করে দিতে হবে, স্থায়ী শ্রমিকদের স্বেচ্ছা অবসর নিতে বাধ্য করা হবে। মাটির তলার খনি বন্ধ করার অনুমতি ইতিমধ্যে দশম বেতন চুক্তিতে পাঁচটি ট্রেড ইউনিয়নের কাছ থেকে তারা নিয়ে নিয়েছে এবং নানা কৌশলে শ্রমিকদের স্বেচ্ছা অবসর নেওয়ার হুমকি দিচ্ছে। মাটির তলার খনি বন্ধ হয়ে গেলে শুধুমাত্র কয়েকটি আউটসোর্সিং হওয়া খোলামুখ কয়লা খনির মালিক থাকবে রাষ্ট্রায়ত্ত কোল কোম্পানি কোল ইন্ডিয়া।

 

বিপদটা এখানেই শেষ হচ্ছে না। কয়লা শিল্পের বেসরকারীকরণের ফলে ব্যক্তি মালিকরা কয়লার মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে খুব সামান্য রয়ালটি দিয়ে মুনাফা কামিয়ে নিচ্ছে। এই মুনাফার একটা বড়ো অংশ বিদেশী পুঁজির হাত ধরে চলে যাচ্ছে দেশের বাইরে। পাশাপাশি খোলামুখ খনি আরও বেশি বেশি করে যান্ত্রিকীকরণের দিকে এগোতে থাকায় ছাঁটাই হতে শুরু করেছে কয়লা শিল্পের শ্রমিকেরা। খোলামুখ খনির জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রের নির্মাণ বিদেশের মাটিতে হওয়ায় সেখানেও কর্মসংস্থানের সুযোগ নেই। বরং খোলামুখ খনির সংখ্যা যত বাড়বে তত উজাড় হবে হাজার হাজার গ্রাম, লক্ষ লক্ষ গাছ, বন্য প্রাণী তথা মানুষের জীবন জীবিকা। কয়লা শিল্পে ১০০ শতাংশ প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি সেই প্রক্রিয়াকেই সম্পূর্ণ করবে।

 

লেখক একজন স্কুল শিক্ষক গনতান্ত্রিক অধিকার আন্দোলনের কর্মী 

 

 

Share this
Leave a Comment