কেটে ফেলা হল আরের জঙ্গল


  • October 6, 2019
  • (4 Comments)
  • 980 Views

“কয়েকটা গাছ অন্তত বাঁচতে দিন যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেবল মেট্রোর দেওয়ালে আঁকা ছবিতে গাছ দেখতে না হয়!” মুম্বই মহানগরের ধুলো-ধোঁয়ায় দমবন্ধ পরিবেশে সবুজ ফুসফুস আরে কলোনি লাগোয়া ১৬ বর্গ কিমি বিস্তৃত প্রাচীন বনাঞ্চল ও পশুচারণক্ষেত্র গত দুই দিন ধরে কেটে ফেলছে সরকার। লিখছেন দেবেশ সাঁতরা

 

মুম্বই মহানগরের ধুলো-ধোঁয়ায় দমবন্ধ পরিবেশে সবুজ ফুসফুস হল আরে মিল্ক কলোনি (সংক্ষেপে আরে কলোনি) লাগোয়া ১৬ বর্গ কিমি বিস্তৃত প্রাচীন বনাঞ্চল ও পশুচারণক্ষেত্র। পৃথিবীর আর কোনও মেট্রোপলিস-মহানগরীর বুকে এমন বনাঞ্চল নেই। আরবসাগরের খুব কাছে এই শহরঘেরা বনে যেমন বহু বিপন্ন ও স্থানিক প্রজাতির জীবের বাস, তেমনি রয়েছে বিশ্বখ্যাত ওরলি আর্টের জনক-জননী ওরলি আদিবাসীদের ২৭টি ছড়ানো ছেটানো গ্রাম। ৭০০০-এরও বেশি মানুষ। বহু শতকের বাস। আর আছে ছোট্টো নদী মিঠি। বন কাটলে সেও মরে যাবে। শিল্পনগরী মুম্বইয়ের প্রকৃতিপ্রেমী মানুষের কাছে আরের জঙ্গল যেন নন্দনকানন!

 

বর্তমানে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার এই সবুজের ওপর রাতারাতি ঘাসমারা বিষ ঢালার বরাত পেয়েছে। ঘটনার শুরু ২০১৪-র নভেম্বরের শেষদিকে। মানুষজন দেখেন গাছের গায়ে নোটিশ— ‘৩টি মেট্রো কারশেড বানানো হবে, ২২৯৮ খানা গাছ কাটা হবে। কারো আপত্তি থাকলে ১৫ দিনের মধ্যে বনদপ্তরকে জানান’। মানুষজন বনদপ্তরকে চিঠি দেন, মেট্রোরেল কর্পোরেশনকেও চিঠি দেন— ‘প্রজেক্ট অন্যখানে সরিয়ে নিন’। আর মুম্বই হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়। আইনি লড়াইয়ের পর কোর্ট প্রকল্পের উপর স্থগিতাদেশ দিতে বাধ্য হয়। বিচারপতিরা সরকারী ও মেট্রোর উকিলদের বলেছিলেন, “কয়েকটা গাছ অন্তত বাঁচতে দিন যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেবল মেট্রোর দেওয়ালে আঁকা ছবিতে গাছ দেখতে না হয়!”

 

প্রকল্প করলে পরিবেশের উপর তার কী প্রভাব (এনভায়রনমেন্টাল ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, EIA) পড়বে, সেই সমীক্ষার ফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে নির্দেশ দেয় কোর্ট। মুম্বইয়ের মানুষ নিজেরাই এগিয়ে আসেন বন বাঁচাতে। সই সংগ্রহ করেন, রাস্তায় পথসভা মিছিল করেন, পোস্টার লিফলেট ব্যানার লিখে প্রচার করেন, বিখ্যাত জুহু বিচে হাত ধরে দাঁড়িয়ে মানব শৃঙ্খল গড়েন, যাতে বহু সেলিব্রিটিও অংশ নেন। তাঁরা ফেসবুক হোয়াটস্যাপ গ্রুপে বহু মানুষকে জানাতে থাকেন আরে বন বাঁচানোর এই আন্দোলনের কথা। আপনা মুম্বাই অভিযান, আরে কনসারভেশন গ্রুপ, বনশক্তি নামের তিনটি সংগঠন যুক্ত হয়। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের কারণে আম আদমি পার্টি ও শিবসেনা দল এই আন্দোলনের (লোকদেখানো) সমর্থনে এগিয়ে আসে।

 

২০১৫-র মার্চের মধ্যে কয়েকটি মিছিল হয়। ২৫০০ জনগণ মিছিল করে মুখমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের সঙ্গে দেখা করলে তিনি বিষয়টি বিবেচনার জন্য একটি কমিটি গড়েন।

 

ইতিমধ্যে আন্দোলনকারীরা পুনের ন্যাশনাল গ্রীন ট্রাইব্যুনালে আরে থেকে প্রকল্প সরানোর আবেদন করেন। ট্রাইব্যুনাল প্রকল্পে স্থগিতাদেশ দেয়, আরে কলোনির ১০০ মিটারের মধ্যে যেকোনো নির্মাণ নিষিদ্ধ করে। আর এদিকে মুখ্যমন্ত্রীর কমিটিও পরিবেশের কথা ভেবে প্রকল্প সরানোর জন্য সুপারিশ করে। এরই মধ্যে রাজ্য সরকার ৩৩ একর দাবী করে, গ্রীন ট্রাইব্যুনাল ৩ একরের সম্মতি দেয়। এর বিপক্ষে ৪০০০ প্রতিবাদ পত্র জমা পড়ে।

 

আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে তথ্য জানার অধিকার বা RTI করে (সরকারি বেসরকারি অফিসার ও দপ্তরের বিভিন্ন তথ্য, সাধারণ লোক ১০টাকা খরচ করে জানতে পারে এই আইনে। যদিও নতুন কেন্দ্র সরকার একে ভোঁতা করে ফেলেছে)। জানা যায়, আরে কলোনির জমি অনেকদিন আগেই রাজস্ব দপ্তরের হাত থেকে লাগোয়া সঞ্জয় গান্ধী ন্যাশানাল পার্কের অধীনে চলে গেছে। জানা যায়, ১৯৪৯ সালে জঙ্গলের এই অংশ আরে মিল্ক কলোনির হাতে হস্তান্তরিত হওয়ার পর বনাঞ্চলটিকে ‘নো ডেভেলপমেন্ট জোন’ ঘোষণা করা হয়েছিল। এও জানা যায় যে ২০১৪ সালে রাজ্য সরকার আরের জঙ্গলকে ‘ডেভেলপমেন্ট জোন’-এর আওতায় নিয়ে আসে। বিষয়টি আন্দোলনকারীরা গ্রীন ট্রাইব্যুনালে জানায়। মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ মেট্রো রেলকে প্রকল্প স্থানান্তর করতে বলেন কালিনা নামক অঞ্চলে।

 

কিন্তু মেট্রো কর্তৃপক্ষ কোন কারণ না দেখিয়েই কালিনার প্রস্তাব খারিজ করে দেয়। ২০১৭ সালে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ (MMRCL) গ্রীন ট্রাইব্যুনালের স্থগিতাদেশ অমান্য করে কাজ শুরু করে, এবং এর পর হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ তুলে নেয়। পুলিশ মোতায়েন করে বিক্ষোভকারীদের হঠিয়ে কাজ শুরু করা হয়। বুঝতেই পারা যায়, সরকার বন বাঁচানোর কথা মুখে বললেও কাজে কী করে!

 

২০১৭-র শেষদিকে আন্দোলনকারীরা সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করতে বাধ্য হন। সুপ্রীমকোর্ট বলে, তারা স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়াতে আইনি অসঙ্গতি দেখেনি, কিন্তু নাগরিকেরা চাইলে আবারও হাইকোর্টে বিশেষ কমিটি গড়ার আবেদন করতে পারেন। সেই কমিটি গাছ না কেটে, তাকে উপড়ে অন্য জায়গায় বসানো যায় কিনা দেখবে।

 

আরে বাঁচানোর জন্যে তাবৎ পরিবেশ আন্দোলনকারীরা আরেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ঘোষণা করার দাবী জানান গ্রীন ট্রাইব্যুনালে। ‘১৮-র সেপ্টেম্বরে ট্রাইব্যুনাল বলে, তাদের এই এক্তিয়ার নেই। আবার গাছ কাটা শুরু করে MMRCL।

 

আন্দোলনকারীরা গাছ জড়িয়ে ধরে চিপকো আন্দোলন করে। যারা গাছ বাঁচাচ্ছে, পুলিশ তাদের থানায় ধরে নিয়ে গিয়ে রেলের কাজে বাধা দেওয়ার জন্য হুমকি দিয়ে ছেড়ে দেয়। আরের জন্য আন্দোলন করা মানুষগুলি হাল না ছেড়ে আবার প্রকল্প বন্ধ করতে জনসমর্থন আদায় করতে নামেন।
মামলা চলতে থাকে। ২০১৯-এর মাঝামাঝি হাইকোর্ট প্রকল্পে পুনরায় স্থগিতাদেশ দেয়। আন্দোলনকারী মুম্বাইয়ের সচেতন চাকুরিজীবী ছাত্রীছাত্র বয়স্ক নাগরিকেরা এই জয়ে আনন্দিত হন।

 

আমরা কিন্তু ভয় পাচ্ছিলুম। আমরা দেখেছি, নতুন কেন্দ্র সরকার পরিবেশের কথা ভাবে না, মানুষ না-মানুষের কথা ভাবে না (কোনো সরকারই কি ভাবে?); ভাবে বেসরকারি সংস্থার আর্থিক লাভের কথা। এই মেট্রো প্রকল্পের ৩৩.৫ কিমি তৈরিতে ৩০ হাজার কোটি টাকা খরচ হবে মূলত জাপান (জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি বা JICA) ও চীনের থেকে ধার নিয়ে। এই JICA এখন ভারত সরকারের খুব বন্ধু হয়েছে! সরকার গাছ কাটে, টাকা দেয় JICA। এদের টাকায় গুজরাট-মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ ম্যানগ্রোভ বন কেটে চালু হবে বুলেট ট্রেন। এদেরই টাকায় পুরুলিয়ার অযোধ্যায় পাহাড় বন নদী কেটে তৈরি হবে ঠুড়্গা পাম্পড স্টোরেজ বিদ্যুৎ প্রকল্প। সেই বুলেট ট্রেনের ভাড়া হবে এরোপ্লেনের চেয়ে বেশি, আর ঠুড়্গায় বিদ্যুৎ বানাতে লাগবে তার চেয়েও বেশি বিদ্যুৎ!

 

গত ৪ঠা অক্টোবর, আমরা যখন দুর্গাপুজোর আনন্দে আর মহারাষ্ট্রসহ উত্তর ও পশ্চিমভারতের মানুষ নবরাত্রির আনন্দে মশগুল, কোর্ট আরে জঙ্গলের গাছ কাটায় স্থগিতাদেশ তুলে নিল। সরকার যুক্তি সাজিয়েছিল যে মুম্বই শহরের ক্রমবর্ধমান যাত্রীর চাপ সামলাতে মেট্রো জরুরি, কারণ প্রতিদিন ভীড়ের জন্য দুর্ঘটনায় মারা যান শহরের বহু নিত্যযাত্রী। সরকার নামক কর্পোরেট কোম্পানিকে এই যুক্তি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করার জন্য দূষণবিহীন যান হিসেবে মেট্রোরেলের বিজ্ঞাপন দিয়েছেন অমিতাভ বচ্চনের মতন সেলিব্রিটিরা।

 

আচ্ছা, যে জঙ্গল দুর্মূল্য অক্সিজেন দিত, আশ্রয় দিত পশু পাখি মানুষকে, জল জমাত মাটির নীচে, মেঘ বানাত, যে বন মিঠি নদীকে ঝিরঝির করে বইতে দিত, পৃথিবীর উত্তাপ কমাত, রুখে দিত আরবসাগরের দিককার সামুদ্রিক ঝড়ঝাপটা সেই বনের বদলে মেট্রো কত প্রাণ বাঁচাবে? আরো তাপ, আরো দূষণ ছড়ানো এসি মেট্রো পারবে কি পৃথিবীকে জলে ডুবে যাওয়া থেকে বাঁচাতে?

 

আন্দোলনকারীরা বিকল্প রুটের প্রস্তাব দিয়েছেন। MMRCL শোনেনি। আন্দোলনকারীদের অনেকের অভিযোগ, গত দুই দিনে ২৭০০ গাছ কাটা হয়ে গেছে ঝড়ের বেগে। আরে কলোনির বাসিন্দা আদিবাসী পরিবারগুলিকে কারফিউ করে আটকে রাখা হয়েছে— তাঁদের ওই অঞ্চল থেকে বেরনো বা ঢোকা বারণ। ৫ অক্টোবর, ২৯জন আন্দোলনকারীকে সরকারের পুলিশ জেলে আটক করে ‘সরকারি কাজে’ বাধা দেবার জন্যে। বটেই তো! সরকারের তো এটাই কাজ!

 

শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের তরফ থেকে কয়েকজন ছাত্রছাত্রী চিঠি পাঠিয়েছেন সুপ্রীম কোর্টের প্রধান বিচারপতি (CJI) রঞ্জন গগৈ-কে উদ্দেশ্য করে। সেখানে তাঁরা উল্লেখ করেছেন আরে-র এই জঙ্গলের অপরিহার্যতা আর এই জঙ্গল কেটে ফেললে কীভাবে মুম্বই ডুবে যেতে পারে বন্যায় (মিঠি নদী আর তার শাখা-উপশাখাগুলি বৃষ্টির জল শহর থেকে আরব সাগরে বয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করে)। তাঁরা ওই চিঠিতে নিজেদের সহ-আন্দোলনকারী বন্ধুদের পুলিশি আটক নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন আর দাবী জানিয়েছেন সুপ্রীম কোর্ট যেন বিশেষ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে অবিলম্বে এই গাছকাটার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। ৬ই অক্টোবর আটক ২৯জন আন্দোলনকারীকে দায়রা আদালতে জামিন দেওয়া হয়।

 

এখন থেকে পরিচয়পত্র ছাড়া আরে কলোনিতে কেউ ঢুকতে পারবে না। দেবেন্দ্র ফড়নবিশ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বলছেন, ‘উন্নয়ন জরুরি’। আর দেশের পরিবেশমন্ত্রী প্রকাশ জাভড়েকর বলেছেন, দিল্লিতেও তো মেট্রো তৈরির সময় গাছ কাটা পড়েছিল; কেমন উন্নয়ন হল সেখানে! এখন যত গাছ কাটা পড়ল আমরা তার পাঁচগুণ গাছ লাগিয়ে দেব।

 

সত্যিই কি উনি পরিবেশ মন্ত্রী হয়েও এতটাই বোকা? নাকি ভণ্ড চালাক শয়তান? একটা বিরাট বড়ো গাছ তার সমস্ত শেকড়বাকড় ডালপালা পাতাফুলফল নিয়ে যে প্রাণের জগৎ বানায়, পাঁচটা সদ্য চারাগাছ তার কতটুকু পারে!

 

পরিবেশ প্রকৃতি ধ্বংসের মাধ্যমে নিজেদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করছি আমরা। আর সময় নেই। এখুনিই রুখে দাঁড়াতে হবে। যেমন করে সুইডেনের ছোট্টো গ্রেতা পৃথিবীর তাবড় নেতাদের সামনে দাঁড়িয়ে বলেছে— ‘আপনাদের এত সাহস হয় কী করে, আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে ক্রমাগত আর্থিক লাভের কথা ভাবতে?’ বলতে পারা চাই, দুনিয়াজোড়া প্রাণ প্রকৃতিকে ধ্বংস করা উন্নয়ন আমরা চাই না। এই মারণ উন্নয়ন বন্ধ হোক। এক্ষুনি।

 

লেখক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রকৃতি-পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীসমর্থক।

 

 

Share this
Recent Comments
4
Leave a Comment