ছেলেধরা : বছরভর গুজব এবং একটি স্থায়ী সত্য


  • September 28, 2019
  • (0 Comments)
  • 308 Views

 

মে মাস থেকে এখন পর্যন্ত অবিরাম এসে চলেছে দেশ জুড়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি ও তাতে আহত বা মৃত মানুষদের খবর। প্রশাসন যেসময় এনআরসি, গো-রক্ষা, কাশ্মীর ইত্যাদির নাম করে সাজানো শত্রুর বিরুদ্ধে ছুরি শানিয়ে চলেছে, সেই একই সময় ছেলেধরার গুজবের শিকার হয়ে দেশের মানুষ মরছেন ও বিনা দোষে পিটিয়ে মারছেন একে অন্যকে। দেশে বাচ্চা চুরির হার তাতে এতটুকুও কমছে না। লিখেছেন মধুশ্রী বসু

 

 

ছেলেধরা গুজবের শিকার দেশের সাধারণ মানুষ।

প্রতি বছর কোনো না কোনো সময় এদেশে ছেলেধরা বা বাচ্চা চুরির গুজব রটে। গুজবের শিকার হয়ে গণপিটুনিতে প্রাণ হারান বা শারীরিক ও মানসিক ভাবে লাঞ্ছিত হন শতাধিক মানুষ। সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্ত হওয়ার সাথে-সাথে এজাতীয় গুজব আরও দ্রুত, আরও বেশি জায়গা জুড়ে, আরও বেশি সংখ্যক মানুষের ভিতর ছড়িয়ে চলেছে। এবছরও মে মাস থেকে এই গুজব দেশ জুড়ে ভয়াবহ আকার নিয়েছে। এক-এক রাজ্যে এক-একটি ঘটনার পর পুলিশ কোথাও  ১০ জন, কোথাও ৫০ জন, কোথাও ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। গণপিটুনি ও হত্যার অপরাধে অপরাধী এই মানুষেরা অধিকাংশই আহত বা মৃতদের মতোই সাধারণ মানুষ। পুলিশ ও প্রশাসন প্যাট্রোল বাড়াচ্ছে, সিসিটিভি লাগাচ্ছে, মানুষের মধ্যে গুজব দূরীকরণ মেসেজ পাঠাচ্ছে, মিটিং করছে, কড়া শাস্তির ভয় দেখাচ্ছে, কিন্তু অবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না।

 

গত বছর সুপ্রিম কোর্ট থেকে ছেলেধরার গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনির কেসে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলে গাইডলাইন তৈরি করা হয়েছে, যাতে মার খেয়ে নির্দোষ কেউ মারা গেলে রাজ্য সরকারের তরফ থেকে ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে তার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করার কথাও বলা হয়েছে।[1]

 

অন্যদিকে রয়েছে বাচ্চা নিখোঁজ বিষয়ে বিভিন্ন সূত্রে ভয়াবহ তথ্য ও পরিসংখ্যান। ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর ২০১৬-র হিসেব অনুযায়ী ওই বছর ১,১১,৫৬৯ জন শিশু ও কিশোর নিখোঁজ হয়, তার মধ্যে ৫৫,৬২৫ জনের কোনো খবর সে বছরের শেষ অবধি পাওয়া যায়নি। আশ্চর্যজনক ভাবে ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো ২০১৬-র পর থেকে আর কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। ক্রাই-এর গত বছরের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ভারতে প্রতিদিন গড়ে ১৭৪ জন বাচ্চা নিখোঁজ হয়। এবছর ৩০ অগস্টের হিন্দুস্থান টাইমসের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী উইমেন অ্যান্ড চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট মিনিস্ট্রির হিসেবে এদেশে গড়ে প্রতি দশ মিনিটে একটি বাচ্চা নিখোঁজ হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই শিশুদের বন্ডেড লেবার হিসেবে বা যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করানোর জন্য চুরি করা হয়। ২০১৩-তে সুপ্রিম কোর্টের জারি করা আইনে হারানো বাচ্চার কেসে পুলিশকে বাধ্যতামূলক ভাবে এফআইআর নিতে বলা হয়ে থাকলেও, নানান এনজিওতে যাঁরা এই ক্ষেত্রে কাজ করেন তাঁদের অভিযোগ, পুলিশ কেস নিতে চায় না, পরিবারের লোককে ফিরিয়ে দেয়। পরিবারগুলিও সাধারণ ভাবে এই নিয়ে জল ঘোলা করার অবস্থায় থাকেন না, কারণ শিশু চুরির ঘটনা মূলত ঘটে দরিদ্র পরিবারগুলিতে – পুলিশের সাথে তর্কাতর্কি করে এফআইআর দায়ের করা তাঁদের ক্ষমতার বাইরে। ট্র্যাক দা মিসিং চাইল্ড জাতীয় ডিজিটাল ইন্ডিয়ার সরকারি সাইট ব্যবহার করাও তাঁদের সাধ্যের বাইরে। তাই বাড়তে থাকে সন্দেহ। গণপিটুনির ঘটনার একটি বড় অংশও ঘটে এইজাতীয় এলাকাগুলিতে – গ্রামাঞ্চলেও, শহরে বস্তি অঞ্চলগুলিতেও।

 

রাজ্যগুলির মধ্যে এবছর ইউপি, ঝাড়খণ্ড, বিহার ইত্যাদি রাজ্যে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি ও হত্যা(মব-লিঞ্চিং)-র সংখ্যা সবচাইতে বেশি। দিল্লি, মহারাষ্ট্র, উত্তরাখণ্ড, আসাম, ত্রিপুরা, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাত, উড়িষ্যা, রাজস্থান, কর্নাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ু, পশ্চিমবঙ্গ, মণিপুর, হরিয়ানা ইত্যাদি রাজ্যেও একাধিক ঘটনা ঘটেছে – বহু ক্ষেত্রে প্রমাণপত্র বা পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও। বাচ্চার মা-বাবার অনুমতিক্রমে বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে বেরনোর সময় মার খেয়েছেন কেউ কেউ।

 

এবছর জুলাই মাসে, মধ্যপ্রদেশের কোটা গ্রামে এক রেলওয়ে ট্র্যাকে কর্মরত শ্রমিক ফোনে স্ত্রীর কাছে তাঁদের অসুস্থ বাচ্চার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন। যে গ্রামে তিনি তখন ছিলেন, সেখানকার মানুষ ফোনে তাঁর কথা শুনে তাঁকে ছেলেধরা সন্দেহে মারধোর করে। এরপর কি নিজের বাচ্চাকে সঙ্গে নিয়ে বেরোতে, বা ফোনে তাকে নিয়ে কথা বলতেও ভয় পেতে হবে এদেশের মানুষকে?

 

হরিয়ানা

হরিয়ানার কথা দিয়ে শুরু করার কারণটা ব্যক্তিগত। গুরগাঁও শহরের এক-দু’টি বস্তি ও কলোনিতে বাচ্চাদের অল্পস্বল্প পড়ান, এমন ক’জন মানুষের সাথে আমার বছর দেড়েক আগে যোগাযোগ ঘটে। সেই সূত্রে ওই এলাকাগুলিতে যাতায়াত করতে-করতে, গত এক-দেড় মাস ধরে ছোটবড় সবার মুখে শুনতে থাকি, শহরে ছেলেধরার দল এসেছে। কখনো তারা নাকি অমুক গলি থেকে তিনজন বাচ্চাকে নিয়ে যেতে চেষ্টা করেছে। কখনো তমুক মন্দিরের পিছন থেকে কোনো বাচ্চাকে তুলে নিয়ে গিয়ে তার উপর ভয়ানক অত্যাচার করা হয়েছে, খুবলে নেওয়া হয়েছে গালের মাংস, কিডনি বেচে দিয়ে ফেলে দিয়ে যাওয়া হয়েছে – এইরকম নানাকিছু। প্রমাণ, ঝাপসা কিছু হোয়াটসঅ্যাপ ভিডিও। কোথাও নাকি পুলিশ ফোন করে জানিয়েছে, যে বাচ্চাদের সামলে রাখা হোক। কোথাও আবার কোনো এনজিওকর্মী মহিলা এসে ছেলেধরাদের গতিবিধির কথা জানিয়েছেন। কে কথা বলেছে পুলিশের সাথে? কোন্ এনজিও-তে কাজ করেন সেই মহিলা? কে দেখেছে তাঁকে? সে নিয়ে কে মাথা ঘামাবে? খবর যখন রটেছে, না-ই বা বেরোল সে খবর কোনো কাগজে বা টিভি চ্যানেলে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ডিজিটাল অক্ষরে রটেছে, মানেই, সেটা সত্যি!

 

অতএব অনির্দিষ্টকালের জন্য স্কুলে যাওয়া বন্ধ কোনো কোনো বাচ্চার – বিশেষ করে মেয়েদের। কারুর বাড়ি থেকে মানা, কেউ নিজেই যেতে রাজি নয়। স্কুলে না গেলে পড়া জেনে নিতে অসুবিধা হবে না? না। স্কুলে গেলেই বা কি শেখা হয়? এমনিতেই অনেকের ভাগ্যে স্কুলে গেলেও পড়া না পারা, বা ‘নোংরা থাকার’ কারণে নিত্য উপেক্ষা বা লাঞ্ছনা।

 

অতএব দিনমজুর যাঁরা, সঙ্গে করে কাজের জায়গায় নিয়ে যাচ্ছেন ছেলেমেয়েদের। নজরে রাখাও হবে, ছোটখাটো কাজ পেয়ে গেলে কিছু রোজগারও হবে। স্বল্প পরিচিত এক বস্তিতে ছেলেধরার গল্পে ঘাবড়ে গিয়ে চারটে ঝুপড়ি খালি করে নাকি গ্রামেই চলে গেলেন এক পরিবার – সঙ্গে নানান ক্লাসে পড়া জনা চারেক বাচ্চা। যাবার আগে হাত জোড় করে বলে গেলেন, “আপনারা ক’দিন আসবেন না, লোকজন বড় ভয়ে আছে। অচেনা মানুষ বাচ্চাদের সাথে মিশছে, কথা বলছে দেখলে মেরেধরে তাড়িয়ে দিতে পারে…”

 

পরিচিত যাঁরা ওখানে কাজ করেন, তাঁদের অবশ্য কেউ ছেলেধরা বলে মারতে-ধরতে আসেননি। গোটা হরিয়ানাতেই এবছরের ছেলেধরা গুজব এখনো কোনো মৃত্যু বা গুরুতর মারধোরের ঘটনা ঘটায়নি। তবে এক হরিয়ানভি যুবক উত্তরপ্রদেশের শাজাহানপুরে জড়িবুটি বেচতে গিয়ে জনা পঞ্চাশেক স্থানীয় মানুষের হাতে বেধড়ক মার খান, যাদের মধ্যে বেশ কিছু বাচ্চাও ছিল, যারাও মারধোরে হাত লাগায়।

 

উত্তরপ্রদেশ

উত্তরপ্রদেশের মিরাটের নানা এলাকা – লোনি, শামলি, সম্ভাল, বুলন্দশাপুর, হাপুর, জৌনপুর, গাজিয়াবাদ, মথুরা, আমরোহা, উন্নাও, রায়বেরিলি, ঝাঁসি, দেওরিয়া ইত্যাদি বিভিন্ন এলাকা মিলিয়ে মিথ্যে ছেলেধরা সন্দেহে গণহিংসার ঘটনার সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে, যদিও সঠিক পরিসংখ্যান বলা যাচ্ছে না। মার খেয়েছেন, লাঞ্ছিত হয়েছেন এবং মারা গেছেন বহু নির্দোষ মানুষ। যাঁরা মারছেন ও যাঁরা মার খাচ্ছেন, তাঁদের মধ্যে পুরুষ, নারী দুই-ই রয়েছেন।

 

অগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে এই রাজ্যে প্রহৃত হয়েছেন এক ঠাকুমা যিনি তাঁর নাতিকে নিয়ে দোকানে যাচ্ছিলেন; একাধিক শারীরিক ও মানসিক ভাবে অসুস্থ মানুষকে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারা হয়েছে; প্রহৃত হয়েছেন দুই মধ্যবয়স্ক ভাই, যাঁর একজন মারা গেছেন, আরেকজন এখনো হাসপাতালে, এবং যাঁরা তাঁদের সাত বছর বয়েসি ভাইপোকে সঙ্গে নিয়ে তার জন্য ওষুধ কিনতে যাচ্ছিলেন; এক মহিলাকে অর্ধনগ্ন করে হাঁটানো হয়েছে; কাউকে মেরে বোরখা ছিঁড়ে দেওয়া হয়েছে; এক ভিক্ষাজীবীকে কালো কাপড় পরে থাকায় ছেলেধরা সন্দেহে তাঁকে মারধোর করা হয়েছে; এক ব্যক্তির ব্যাগে (তাঁর স্ত্রীর) বোরখা পাওয়ার পরে তাঁকে বাচ্চা চোর বলে পেটানো হয়েছে; দেওরিয়ার এক গ্রামে একটি চোদ্দ বছরের ছেলেকে অবধি ছেলেধরা সন্দেহে মারধোর করা হয়েছে। প্রতিটি ঘটনাই ভয়াবহতায় ও নিষ্ঠুরতায় এক অন্যের সাথে পাল্লা দিতে পারে। রাজ্যের ডিজিপি জানিয়েছেন, দোষীদের বিরুদ্ধে এনএসএ (ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট) ধারায় চার্জ আনা হয়েছে এবং খুন, খুনের চেষ্টা, দাঙ্গা ও অন্যান্য ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের তরফ থেকে নাকি ভিডিও মেসেজও পাঠানো হচ্ছে ছেলেধরার গুজবকে মিথ্যা বলে জানিয়ে। কিন্তু তার কোনো প্রভাব এখনো দেখা যাচ্ছে না। পুলিশের তরফ থেকে এখনো পর্যন্ত রাজ্যে ২০০-২৫০ জনের নামে কেস করা হয়েছে।

 

ঝাড়খণ্ড

ঝাড়খণ্ডে ইতিমধ্যেই গো-রক্ষকদের হাতে গণপিটুনি খেয়ে মারা গেছেন বেশ কয়েকজন মানুষ। ছেলেধরা প্রসঙ্গেও ঝাড়খণ্ড উত্তরপ্রদেশের চেয়ে বিশেষ পিছিয়ে নেই। যেমন, এমাসের শুরুতে রামগড়ে জনতার মার খেয়ে গুরুতর ভাবে আহত হয়ে একজন মাঝবয়েসী মানুষ রাঁচি হাসপাতালে ভর্তি হবার পর মারা যান। এই রাঁচিতেই গো-রক্ষকদের মার খেয়ে মারা পড়েছিলেন আলিমুদ্দিন আনসারি, যাঁর হত্যাকারীদের জামিনে ছাড়া পাবার পরে তাঁদের মালা পরিয়ে অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন এক বিজেপি নেতা।

 

একই সপ্তাহে ওই রাজ্যে জয়নগরে বোনের বাড়ির যাবার পথে তিনজন আদিবাসী যুবককে ছেলেধরা সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়, পুলিশের হস্তক্ষেপ সত্ত্বেও।

 

বিহার

বিহারে সাধারণ ভাবে বাচ্চা কিডন্যাপ, চাইল্ড ট্র্যাফিকিংয়ের হার বেশ উঁচুতে, কিন্তু পাটনা পুলিশের সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্টের বক্তব্য অনুযায়ী এবছর ছেলেধরা সন্দেহে গণহিংসা চলাকালীন একটিও বাচ্চা বাস্তবে নিখোঁজ হয়নি। অগস্ট ১ তারিখ থেকে শুরু করে বিহারে ৩০টিরও বেশি এজাতীয় ঘটনা ঘটেছে।

 

অগস্টের ২৫ তারিখ পাঁচজন বিভিন্ন বয়েসের মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ এরকম একটি ঘটনার শিকার হন। তাঁরা একটি গাড়ি করে এক গ্রামের মুখিয়ার সাথে দেখা করতে যাচ্ছিলেন। সাথে ছিল তাঁদেরই একজনের ৮ বছর বয়েসি ছেলে – মোহাম্মেদ আয়ান। পাঁচজনই স্থানীয় সম্ভ্রান্ত পরিবারের সদস্য। একজনের দাদু স্বাধীনতা আন্দোলন ও খিলাফত আন্দোলনের কর্মী ছিলেন এবং বিহার সরকারের আইন বিভাগে কর্মরত ছিলেন। ছেলেধরা বলে এই পাঁচজনের গাড়িতে পাথর ছোঁড়া হয় এবং তাঁদের তাড়া করে গাড়ি থেকে টেনে নামিয়ে মারা হয়। তাঁদের মুসলমান বলে বুঝতে পেরে জনতা থেকে ‘মার মিয়া হ্যায়’, ‘হিন্দুস্থান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান মুর্দাবাদ’ ইত্যাদি স্লোগানও দেওয়া হয়। আয়ান গাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে দোষীদের আটকাতে গেলে সেও আহত হয়। স্থানীয় মুসলমানরা মারপিট থামিয়ে এঁদের আশ্রয় দিলে তাঁদের সন্ত্রাসবাদীদের সহায়ক বলে গালাগালি করা হতে থাকে।

 

পশ্চিমবঙ্গ

এ রাজ্যেও সমানতালে চলছে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি। জুলাই মাসে আলিপুরদুয়ারে একটি চা-বাগান এলাকায় প্রায় ২৫০ জন মিলে পিটিয়ে মারে একজন নির্দোষ মানুষকে। এমাসে আসানসোলের কাছে একইভাবে মারা যান আরেকজন। এছাড়াও মাঝেমাঝেই আসছে সন্দেহের বশে মারধোরের খবর। গত সপ্তাহে জলপাইগুড়ি জেলার এক গ্রামে চারজন ২০ থেকে ৫০ বছর বয়স্ক মহিলাকে ছেলেধরা সন্দেহে মারধোর করা হয় ও দুজনের জামাকাপড় খুলে নেওয়া হয় – প্রত্যেকেই বারবার তাঁদের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করে যাওয়া সত্ত্বেও। ৩০ আগস্ট মব লিঞ্চিং-এর বিরুদ্ধে মমতা সরকার একটি কড়া শাস্তিমূলক বিল পাশ করলেও তার কোনো ফল এখনো দেখা যাচ্ছে না।

 

ছেলেধরা কে বা কারা বলে সন্দেহ করা হচ্ছে?

ছেলেধরা বলে কারা মার খাচ্ছেন – তারও একটা ধরন আছে। হয় এঁরা ‘বহিরাগত’, অর্থাৎ ওই এলাকার বাইরে থেকে আসা, অনেকসময়ই স্থানীয় ভাষা বলতে না পারা মানুষ – যেমন অভিবাসী শ্রমিক বা কোনো কোম্পানির কর্মচারী (দক্ষিণ ভারতে যেমন গত বছর একাধিক হিন্দিভাষী মানুষকে ছেলেধরা সন্দেহে মারা হয়)। নয় এটা একটা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের গল্প – অর্থাৎ কারুর উপর শোধ নিতে তার ছবি ছেলেধরা নামে সোশ্যাল মিডিয়ায় মেসেজ ছেড়ে দেওয়া এবং সেই মেসেজ ভাইরাল হয়ে যাওয়া। জুলাই মাসে পাঞ্জাবের ভাতিন্ডায় এই অপরাধে ধরা পড়েছে একজন

 

সবচাইতে বেশি যাঁরা ছেলেধরা গুজবের শিকার হচ্ছেন, মারা পড়ছেন, তাঁরা সমাজের তথাকথিত নিচুতলার মানুষেরা – নানা অর্থে। আর্থিক ভাবে নিচুতলার, যেমন ভিক্ষাজীবী, ফেরিওয়ালা ইত্যাদি – যেমন উত্তরপ্রদেশের একাধিক ঘটনা। জাতিগত ভাবে নিচুতলার, যেমন আদিবাসী ও অন্যান্য দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ – যেমন ঝাড়খণ্ডের জয়নগরের ঘটনা। ধর্মের দিক দিয়ে সংখ্যালঘু, যেমন মুসলমান (বিশেষ করে বিজেপি সরকারের শাসনকালে)। এখনো সরাসরি মুসলমানদের লক্ষ্য করে ছেলেধরা অজুহাতে হিংসা শুরু হয়নি, কিন্তু বিহারের ঘটনায় পরিষ্কার যে ধর্মের সাথে এ বিষয়টিকে মিলিয়ে দিতে উৎসাহী লোকের অভাব নেই; এর মধ্যেই রোহিঙ্গা মুসলমানদের লক্ষ করে ছেলেধরা বলে তীব্র মিথ্যে প্রচার শুরু হয়েছে। শারীরিক ও মানসিক ক্ষমতার দিক থেকে নিচুতলার, যেমন প্রতিবন্ধী মানুষেরা – যেমন দিল্লিতে এক মূকবধির অন্তঃসত্বা মহিলাকে পেটানো হয়েছে, বা উত্তরপ্রদেশের নানা অঞ্চলে মানসিক প্রতিবন্ধী মানুষকে মারধোর। লিঙ্গভেদে নীচতলার – যেমন জয়পুরে এবং হায়দ্রাবাদে দু’জন ট্রান্সজেন্ডার ব্যক্তিকে ছেলেধরা বলে মারা হয়েছে।

 

অথচ যাঁরা মার খাচ্ছেন আর যাঁরা মারছেন, তাঁরা অধিকাংশই খেটে খাওয়া শ্রেণির মানুষ। যে শ্রেণি আবার শিশু চুরির বাস্তব পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে, বা শিশু স্বাস্থ্য ও শিশু মৃত্যুর দিক দিয়ে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। তবে প্রান্তিক মানুষেরা ছাড়াও রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার, শাদা পোশাকের পুলিশ, জিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার কর্মচারী, সাংবাদিকদের টিম – বিচিত্র কারণে এমন মানুষেরাও সন্দিহান জনতার হাতে মার খেয়েছেন, বা মার খাবার উপক্রম হয়েছে। কোনো যুক্তি, কোনো পরিচয়পত্র, কোনো মানবিকতাই মারমুখী জনতার হাত থেকে কাউকে বাঁচাতে পারছে না।

 

২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৮-র ৫ জুলাই পর্যন্ত  ছেলেধরা বলে সন্দেহে অন্তত ৯৯ জন আহত ও ৩৩ জন মৃত মানুষের কথা জানা যায়। এ বছর সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও নানা রাজ্য মিলিয়ে অগস্ট ও সেপ্টেম্বরে অন্তত ৮৫টি এরকম গণহিংসার খবর সংবাদ মাধ্যমে উঠে এসেছে।

 

একটি অনলাইন ফ্যাক্টচেকার পেজ (পেজটি এখন বন্ধ আছে) থেকে গত মাসের কিছু পরিসংখ্যান:

 

 

সোশ্যাল মিডিয়া : গুজবের মূল সূত্র

যে ভিডিওগুলি সোশ্যাল মিডিয়ায় আসছে, তার বিষয় দুরকমের। এক, যেখানে ছেলেধরার মিথ্যে ঘটনা সাজিয়ে, মিথ্যে অভিনয় করে, অথবা ঘটনার সাথে একেবারেই জড়িত নয়, এরকম ছবি ও ভিডিওর সাথে ইচ্ছেমতো লেখা ব্যবহার করে বানানো ভিডিও, যা দেখিয়ে মানুষকে প্ররোচিত করা হচ্ছে। এর বেশ কিছু উদাহরণ রয়েছে। যেমন, ব্রাজিল বা পাকিস্তানের পুরনো শিশু চুরির ঘটনার ভিডিওর উপরকার লেখা পাল্টে, তাকে বর্তমান ঘটনার খবর হিসেবে দেখানো, দিল্লির হজরত মহম্মদ স্টেশনে একটি ভারতীয় যুগলের বাচ্চা চুরির ঘটনাকে ভোপালে রোহিঙ্গাদের বাচ্চা চুরি করা বলে দেখানো ইত্যাদি। এই মেসেজগুলিতে অনেক সময়ই যোগাযোগ করতে বলে ফোন নম্বর দেওয়া থাকে, বা থাকে লোকাল থানার নাম, যা এগুলিকে সাধারণ মানুষের কাছে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

 

জুলাই মাসে একটি ৩ মিনিটের ভিডিও ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপের কল্যাণে ভাইরাল হয়ে পড়ে, যাতে একজন যুবককে কয়েকজন ছেলেধরা হিসেবে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করছে বলে দেখা যায় এবং যাতে যুবকটি দোষ স্বীকারও করে। এবছরের ছেলেধরা বিষয়ক গুজবের বাড়াবাড়ির পিছনে বিশেষ ভূমিকা থাকা ভিডিওগুলির মধ্যে এটি একটি। অন্য নানান মিথ্যে করে বানানো ভিডিওর (বাচ্চাদের হার্ট, কিডনি ইত্যাদি বার করে নেওয়া, সাজানো বাচ্চা চোরদের ধরা পড়া, পুলিশের বক্তব্যকে কাটছাঁট করে ঘুরিয়ে দেখানো ইত্যাদি) পাশাপাশি পুলিশ এটিকেও সাজানো বলেই সন্দেহ করছে।

 

দ্বিতীয় যে ধরনের মেসেজ ফোন থেকে ফোনে ছড়িয়ে পড়ছে, তা হল সত্যি-সত্যি ঘটে যাওয়া গণপিটুনির ভিডিও। প্রায় প্রতিটি ঘটনাতেই অপরাধীরা নিজেরাই ভিডিও তুলছেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় নির্দ্বিধায় তার প্রচার করছেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক রবীশ কুমার কিছুদিন আগে একটি বক্তৃতায় সাধারণ ভারতবাসীকে এই বলে অভিনন্দন জানান, যে সৎ সাংবাদিকতা বস্তুটি তাঁরা অনেকেই নিজেদের জীবনে ‘আপন করে নিয়েছেন’ – যে সততা মাইনে করা সাংবাদিকদের মধ্যে থেকে হারিয়ে গেছে। এই সৎ সাংবাদিকতা, যাকে রবীশ ‘নাগরিক সাংবাদিকতা’ বলছেন, মূলত ঘটছে ফোন ক্যামেরার মাধ্যমে। রবীশ যে প্রসঙ্গে কথাগুলি বলেছেন, ছেলেধরা সন্দেহে মারার ঘটনার ক্ষেত্রে (বা গরুখেকো বলে মারার সময়, বা গণধর্ষণের সময়) সেই নাগরিক সাংবাদিকতার ক্ষমতার অন্ধকার দিকটি সামনে চলে আসে।

 

মারধোরের ঘটনায় বিভিন্ন জায়গায় পুরুষ-নারী-বাচ্চা সবাই অংশ নিচ্ছেন, ভিডিও তুলছেন। ক্ষমতাশালী সংখ্যাগুরু হিসেবে ক্ষমতাহীন সংখ্যালঘুকে ‘উচিত শিক্ষা’ দেবার গর্বে গর্বিত এই মানুষদের কাছে, এই ভিডিও প্রচার আসলে সমাজের সামনে তাঁদের ক্ষমতার প্রদর্শনী, যাকে বিজেপি-আরএসএস চালিত প্রশাসন নানাভাবে মদত দিয়ে চলেছে। যে বিজেপি-আরএসএস প্রশাসন তার ধামাধারী মিডিয়া, আইটি সেল আর সোশ্যাল মিডিয়া যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক প্রচার চালিয়ে ইচ্ছেমত রাজনৈতিক ফায়দা তুলে নিতে পারে, যথেচ্ছ ব্লক করে দিতে পারে যেকোনো ওয়েবসাইট, তিলকে তাল করে তুলতে পারে, সেই একই প্রশাসন এধরনের প্রাণঘাতী নকল ভিডিওর স্রোত বন্ধ করতে, তার বিরুদ্ধে গণপ্রচার চালাতে পারে না? নাকি চায় না? কারণ, মানুষকে এই অসহায় প্রতিহিংসা, এই অনর্থক ক্ষমতা প্রদর্শনীর আনন্দ থেকে বঞ্চিত করলে হয়তো তখন প্রশ্নের তির প্রশাসনের দিকেই ঘুরে যেতে পারে।

 

নকল ছেলেধরারা মরলে কাদের লাভ?

ছেলেধরার আসল র‍্যাকেটগুলিকে ধরা ও বাচ্চা চুরির প্রতিকার করা আসলে একটি জটিল, কঠিন কাজ। তা নয়তো জাস্টিস ভার্মা কমিটির রিপোর্ট অনুযায়ী চাইল্ড ট্র্যাফিকিং-এর শিকার বাচ্চাদের যৌনকর্মী হিসেবে ব্যবহারকে অপরাধ বলে চিহ্নিত করলেও, তাদের বন্ডেড লেবার বা দাস হিসেবে ব্যবহারকে এখনো অপরাধ বলে ঘোষণা করা গেল না কেন? কেন নতুন শ্রমিক আইনে শিশু শ্রমিক ব্যবহারের অপরাধীকরণ ঘটল না? সামান্য ফাইনটুকু অবধি চাপানো হল না মালিকদের উপর?

 

আসলে সরকারি তরফে সত্যিকারের বাচ্চা চুরির প্রতিকারে শক্তি ব্যয় না করে, মিথ্যে প্রচারের মাধ্যমে দেশের মানুষকে নিজের হাতে আইন তুলে নেবার প্ররোচনা দেওয়া অনেক বেশি সহজ। একভাবে দেখতে গেলে, এ যেন বিজেপি সরকারের ‘অন্ত্রেপ্রনারশিপ নীতি’, অর্থাৎ সরকারি সাহায্যের ভূমিকা কমিয়ে স্ব-উদ্যোগে জীবনধারণ করার নীতিরই এক অংশ, যেখানে, এমনকী আইন-আদালতের কাজটাও সাধারণ মানুষকে এবার নিজেকেই করতে হবে! তাই ছেলেধরা, গরুখেকো, চোর-পকেটমার, গোপন প্রেমিক বা প্রেমিকা – যেখানে যে নামটা চলে, যার উপর যতখানি হাতের সুখ করে নেওয়া যায়। তাই নানান ধরনের গণপিটুনি অবাধে ঘটে চলেছে সরকারের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্ররোচনায়। চলেছে অল্প কিছু ক্ষমতাবান লোকের রাজনৈতিক প্রয়োজনে, সাধারণ মানুষকে একজোট হওয়া থেকে যতভাবে পারা যায় আরও দূরে সরিয়ে রাখা।

 

[1] সুপ্রিম কোর্টের গাইডলাইনে বলা হয়েছে – ১) গণপিটুনি আটকাবার জন্য প্রতিটি জেলায় এসপি র‍্যাঙ্কের কোনো অফিসারকে নোডাল অফিসার বলে ঠিক করা; ২) কেন্দ্র ও রাজ্য স্তরে রেডিও, টিভি ও অনলাইন মেসেজের মাধ্যমে গণপিটুনির অপরাধে অপরাধী ব্যক্তিদের কড়া শাস্তির ব্যবস্থার কথা প্রচার; ৩) নকল ভিডিও, বা দায়িত্বহীনের মতো নকল মেসেজ ছড়িয়ে দেওয়া ব্যক্তিদের নামে এফআইআর দায়ের করা; ৪) পুলিশ বা জেলাশাসকের তরফে সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশপত্র না মানতে পারাকে ইচ্ছাকৃত অবহেলা নাম দেওয়া; ৫) প্রতিটি রাজ্যে গণপিটুনির শিকার কোনো ব্যক্তিকে বা তাঁর নিকটতম আত্মীয়কে ঘটনার ৩০ দিনের মধ্যে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে; ৬) সম্ভব হলে ঘটনার ৬ মাসের ভিতর জেলার কোনো ফার্স্ট-ট্র্যাক কোর্টে  ঘটনার বিচার হবে।

Share this
Leave a Comment