ফ্যাসিস্ত সরকারের বিরূদ্ধে দেশজুড়ে সরব ক্যুইয়ার মানুষেরা 


  • September 15, 2019
  • (0 Comments)
  • 297 Views

কেন্দ্র বিজেপি শাসিত সরকার দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় এসেছেএই সরকারের আমলে সমকামী, রূপান্তরকামী মানুষদের লড়াইও নতুন চেহারা নিচ্ছে শুধু নিজেদের অধিকারের লড়াই নয়, তাতে জুড়ে যাচ্ছে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধের আহ্বানওএই প্রেক্ষিতেই সমপ্রেমের অপরাধ তকমামুক্তির এক বছরের উদ্যাপনে কলকাতা সাক্ষী থাকল এক অন্য রকম আজাদি মিছিলেরলিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী 

 

সমপ্রেম আইনত ভারতে আর অপরাধ নয়। সুপ্রিম কোর্ট-এর এই রায়ের পর দেখতে দেখতে কেটে গেল এক বছর। একদিকে আইনি স্বীকৃতি অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অধিকার আন্দোলনে পথ চলায় এক নতুন মোড়ে এসে উপস্থিত হওয়া – নিঃসন্দেহে ভারতবর্ষের সমকামী, রূপান্তরকামী মানুষদের জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তারপর সারা দেশ জুড়েই রামধনু মিছিল, প্রাইড ওয়াক ইত্যাদি হয়েছে, আর তাতে যেন যোগ হয়েছে নতুন উচ্ছ্বাস। তবে সমপ্রেমী যুগলের উপর সামাজিক, পারিবারিক অত্যাচার, অথবা এখনও সামাজিক বয়কট বা হেনস্থার ভয়ে সমকামী মানুষদের আত্মপরিচয় গোপন করার মতো ঘটনাও ঘটে চলেছে। নিশ্চয়ই মাত্র এক বছরে বা আইনি স্বীকৃতি পেয়ে যাওয়ায় এতদিনের চেনা ছবিটা বদলাবে না, তারজন্য আরও দীর্ঘ ও কঠিন লড়াইয়ের জন্যই প্রস্তুতি নিচ্ছেন সমকামী, রূপান্তরকামী মানুষেরা।

 

এই এক বছরে বদলে গেছে আরও অনেক কিছু। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অবস্থায় যা এক সন্ধিক্ষণ। কেন্দ্র বিজেপি শাসিত সরকার দ্বিতীয় বারের জন্য ক্ষমতায় এসেছে। গণতান্ত্রিক সমস্ত কণ্ঠ আজ রুদ্ধ। ধর্মীয় উসকানি পৌঁছাচ্ছে চরমে। কার্যত পুঁজিপতিদের হাতে দেশ চালানোর ক্ষমতা। প্রান্তিক মানুষেরা দেওয়ালে পিঠ ঠেকা অবস্থায় চলে গেছেন। এই ফ্যাসিস্ত সরকারের আমলে সমকামী, রূপান্তরকামী মানুষদের লড়াইও নতুন চেহারা নিচ্ছে। শুধু নিজেদের অধিকারের লড়াই নয়, তাতে জুড়ে যাচ্ছে দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধের আহ্বানও।

 

এই প্রেক্ষিতেই সমপ্রেমের অপরাধ তকমামুক্তির এক বছরের উদ্‌যাপনে গত ৮ সেপ্কটেম্বর কলকাতা সহর সাক্ষী থাকল এক অন্য রকম আজাদি মিছিলের। সমকামী, রূপান্তরকামী মানুষেরা তাদের রামধনু পতাকা নিয়ে পথ হাঁটলেন, সমপ্রেম তথা সমকামের পক্ষে তাদের পরিচিত শ্লোগানে মুখরিত হল কলকাতার রাজপথ। বাহারি পোশাক, প্রসাধন, গান, গণমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে নিজেদের লিঙ্গ ও যৌন পরিচিতির সগর্ব প্রকাশ – এই মিছিল।

 

এন আর সি বিরোধী পোস্টার হাতে বন্ধুর সঙ্গে পথ হাঁটছিলেন রাণাঘাট থেকে আসা শাক্যদেব। রামধনু আজাদির মিছিলে কেন এন আর সি বিরোধীতা জরুরি জানতে চাওয়ায় স্পষ্ট জানালেন –

“আমরা তো আসলে সকলের স্বাধীনতার কথা বলছি। এখনকার প্রজন্ম হয়ে আমরা নিজেদের লিঙ্গ পরিচিতি, যৌন পরিচিতি গোপন করতে মোটেই রাজি নয়ি। তারই পাশাপাশি মনে করছি প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার হওয়াটাও আমাদের এই সময়ের দাবি। এখন যদি আমরা এন আর সি-এর মতো রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথা না বলে শুধু নিজেদের কথা বলি, তা ঠিক হবে না।”

ময়াঙ্ক থাপা গত এক বছর ধরে কলকাতায় রয়েছেন। জন্ম, বেড়ে ওঠা ধানবাদে। তাদের আদি বাড়ি নেপাল। ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ পোস্টার ছিল তার হাতেও। মিছিলের এ মাথা থেকে ও মাথা প্রবল উৎসাহে ছুটে বেড়াচ্ছিলেন। পোস্টারে লেখা ‘স্টপ জেনোসাইড, ফ্রি কাশ্মীর’। যে মিছিলের নাম ‘ক্যুইয়ার মার্চ ফর আজাদি’ সেখানে এই ব্যানার থাকাটাই স্বাভাবিক। ময়াঙ্ক-এর কাছে এর আলাদা গুরুত্ব কী? “আমরা কখনওই নিজেদের পুরোপুরি স্বাধীন বলতে পারব না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা সব মানুষের অধিকারের লড়াইতে তাদের পাশে দাঁড়াতে পারছি। সমকামী, রূপান্তরকামী মানুষদের অধিকারকে আমরা সব সময়ে বলি মানবাধিকার। তাহলে কাশ্মীরের মানুষ আজ যখন সম্পূর্ণভাবে তাদের মানবাধিকার, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাহলে আমরা চুপ করে থাকি কীভাবে? তাহলে তো আমরা আমাদের নিজেদের লড়াইয়ের প্রতিও ন্যায় করব না,” উত্তর দিলেন ময়াঙ্ক।

 

আদপে ওড়িশার বাসিন্দা দেবাশিস দাশ। হাতে এক গুচ্ছ নানা রঙের গোলাপ, সঙ্গে পোস্টারে লেখা – ‘মাই বডি, মাই ল্যান্ড, মাই রুল’, যা লেখা রয়েছে জম্মু-কাশ্মীরের ম্যাপের উপরে। স্পষ্ট বললেন,

“আমার শরীরের পরিচয়, আমার যৌন পছন্দের উপর কোনোভাবেই রাষ্ট্র কিছু চাপিয়ে দিতে পারে না। ঠিক একইভাবে কাশ্মীরের মানুষদের উপরেও রাষ্ট্রের খবরদারি চলবে না। তাদের বাসস্থান, তাদের জীবনের উপর থেকে অধিকার কেড়ে নিতে পারে না এই রাষ্ট্র।”

সঞ্জয়ের হাতে যে পোস্টারটি ধরা ছিল, তাতে লাল দিয়ে হিন্দু রাষ্ট্র লিখে কালো দিয়ে তা কেটে দেওয়া। জিজ্ঞেস করায় বললেন এই লাল রং ও পোস্টারে লালের ছিটে আসলে রাষ্ট্রের মদতে গণপিটুনিতে হত্যার রূপ। “এখনকার কেন্দ্র সরকার খুব সূক্ষ্মভাবে চেষ্টা করছে আমাদের দেশটাকে হিন্দু রাষ্ট্র বানাতে। আমরা তা কিছুতেই হতে দিতে চাই না। ভারতবর্ষের বৈশিষ্ট্যই হল সবক্ষেত্রেই তার বৈচিত্র্যপূর্ণ অবস্থান। সেটা এই হিন্দুত্ববাদীদের চক্রান্তে নষ্ট হতে দেব না,” বক্তব্য তার। আদালতের রায় পক্ষে থাকা সত্ত্বেও এদেশের ক্যুইয়ার মানুষেরা কি এই ফ্যাসিস্ত সরকারের আমলে আশঙ্কার মধ্যে আছেন? সঞ্জয় নির্দ্বিধায় জানালেন, “অবশ্যই। দেশের সমস্ত প্রান্তিক মানুষেরা আজ বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে, এই সরকারের আমলে। তাদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুন্ন হচ্ছে। আমরাও লিঙ্গ পরিচয় ও যৌন পরিচয়ে যারা তথাকথিত প্রান্তিক, তারা এই ফ্যাসিস্ত সরকারের রাজত্বে মোটেই নিরাপদ নয়। তাই বারবার আমরা পথে নেমে প্রতিবাদ করব।”

 

ক্যুইয়ার মার্চ ফর আজাদি-তে তাই রামধনু পতাকার নীচে সগর্বে বহন করা হয় লম্বা ব্যানার – ‘নো ওয়ান ইজ ফ্রি আনটিল এভরিওয়ান ইজ ফ্রি’ – ‘প্রত্যেকে স্বাধীন না হলে একজনও স্বাধীন নয়’। ‘আমার শরীর আমার মন/দূর হঠো রাজশাসন’- শ্লোগান-এর সাথেই মিশে যায় ‘কাশ্মীর মাঙ্গে আজাদি/বস্তার মাঙ্গে আজাদি’।

 

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বারেবারেই সামনে আসছেন ক্যুইয়ার মানুষেরা। কারণ তারা মনে করছেন কোনও লড়াই-ই শুধু ব্যক্তিগত বা কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের পরিসরে আটকে থাকার আর জায়গা নেই। তাই রাষ্ট্র যখন যেভাবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় আঘাত হানছে সোচ্চার হচ্ছে দেশের ক্যুইয়ার মানুষদের কণ্ঠস্বর।

 

যেমন কিছুদিন আগেই অনৈতিকভাবে সিবিআই হানা দিয়েছিল ল-ইয়ার্স কালেক্টিভ-এর অফিস ও সুপ্রিম কোর্ট-এর বরিষ্ঠ আইনজীবী আনন্দ গ্রোভার ও ইন্দিরা জয়সিং-এর বাড়িতে। কারণ একটাই – তাঁরা ক্ষমতাসীন কেন্দ্র সরকারের তীব্র বিরোধীতা করে চলেছেন। রাষ্ট্রের দমননীতির এ আরও এক নিকৃষ্ট উদাহরণ, যেখানে বিরোধী কণ্ঠকে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। এর আগে থেকেই ‘ল-ইয়ার্স কালেক্টিভ’-কে এধরনের সমস্যার মধ্যে পড়তে হচ্ছে, ভু্য়ো অভিযোগ তোলা হচ্ছে যে তারা এফসিআর-এর নিয়মভঙ্গ করেছেন ইত্যাদি। তখন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের প্রায় ১৫০ শহরের ৯০০ এলজিবিটিআইকিউ সংগঠন ও ব্যক্তি এবং সারা বিশ্বের আরও ১৪ জন ক্যুইয়ার আন্দোলনকারীরা তাঁদের সমর্থনে একটি পিটিশন (Open Letter from LGBTIQ citizens, groups and organisations in support of Lawyers Collective) তৈরি করেন। আনন্দ গ্রোভার ও ইন্দিরা জয়সিং-এর অফিস ও বাড়িতে সিবিআই হানার পর তারা সেই পিটিশন-টিই আবার প্রকাশ করেন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তাদের সমর্থন জানাতে।

 

এই পিটিশন-এ যারা সই করেছিলেন তাদের প্রত্যেকের জীবনেই কোনও না কোনও সময়ের আইনি লড়াইয়ে এই দুই আইনজীবী ও ল-ইয়ার্স কালেক্টিভ-এর অবদান রয়েছে। তাই সই করেছেন বরপেটা থেকে বরাবাঁকি, সোন্‌পত থেকে শিলং, আইরোলি থেকে ডিব্রুগড়, গাজিয়াবাদ থেকে কোল্লমা-এর প্রান্তে বিভিন্ন সামাজিক অবস্থান থেকে উঠে আসা ও নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত ক্যুইয়ার মানুষেরা।

 

ল-ইয়ার্স কালেক্টিভ এবং ইন্দিরা জয়সিং ও আনন্দ গ্রোভার গত কয়েক বছরে সামনের সারিতে থেকে ভারতীয় নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও স্বাধীনতা বজায় রাখার লড়াইতে নেতৃত্ব দিয়ে চলেছেন এবং লড়ছেন যাতে সরকার আইনের প্রতি দায়িত্বশীল হয়। এইজন্যই এই পিটিশন দাখিল করা হয়েছিল যাতে ল-ইয়ার্স কালেক্টিভ-এর উপর হেনস্থা বন্ধ করা হয় ও ভিত্তিহীন কেসগুলি তুলে নেওয়া হয়। পিটিশন-এ স্বাক্ষরকারী ক্যুইয়ার মানুষেরা স্পষ্ট জানিয়েছিলেন তারা এই দু’জন ও কালেক্টিভ-এর অতীতের যাবতীয় কর্মকাণ্ডও বর্তমান কাজকর্মের পাশে সর্বতোভাবে থাকছেন।

 

সুদর্শনা চক্রবর্তী ডকুমেন্টারি নির্মাতা এবং স্বতন্ত্র সাংবাদিক  

 

Share this
Leave a Comment