বীরভূমে কয়লাখনির বিরুদ্ধে আদিবাসী সমাজ


  • July 23, 2019
  • (0 Comments)
  • 1139 Views

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে বীরভূমের খয়রাশোলে কয়লা তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কয়লা খাদানের জন্য প্রস্তাবিত বীরভূমের খয়রাশোল ব্লকের গঙ্গারামপুর মৌজার যে বনভূমি, সেখানে একেবারেই নতুন খোলামুখ খনি হতে চলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী খনি অঞ্চলের পরিমাপ ১০১ হেক্টর বা প্রায় ২৫০ একর।গ্রামবাসীরা একসাথে জড়ো হয়ে জঙ্গল থেকে আদিবাসীদের তাড়ানোর এই মারাত্মক সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করছেন। সুনীতি মুখোপাধ্যায় ও আরোহণ বল-এর প্রতিবেদন।

 

 

বেশ কয়েকবছর আগে খয়রাশোল মৌজার বড়জোড় অঞ্চলে কয়লা উত্তোলন শুরু হয়। কিন্তু শুধু বড়জোড়েতেই আটকে না থেকে তার আশেপাশের নানা জায়গাতেও কয়লা উত্তোলন হতে থাকে। কয়লা উত্তোলনের কাজ শুরু হতে ক্রমাগত ব্লাস্টিং, ড্রিলিঙের কম্পনে গ্রামবাসীদের মাটির বাড়ির দেওয়ালে ফাটল ধরতে, দেওয়াল পড়ে যেতে দেখা যায়। এমনকী, খাদানে ব্লাস্টিঙের পাথর ছিটকে অন্ধ হয়ে যাওয়া, মাথা ফাটার ঘটনাও ঘটেছে। গ্রামবাসীদের বলা হয়েছিল খনি হলে তাঁরা সেখানে কাজ পাবেন। খুব কম স্থানীয় মানুষই কাজ পেয়েছেন। যাঁরাও বা পেয়েছেন তাঁরা খনির বিষাক্ত পরিবেশে, বিষ ধুলোয়, ধোঁয়ায় খাদানের কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন; সিলিকোসিস, শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। অতি সামান্য মজুরির বিনিময়ে হাড়ভাঙা খাটুনির কথা বাদ দিলেও, ওই পরিবেশে কেউ এক বছরের বেশি টিকতে পারেন না বলে জানাচ্ছেন তাঁরা। তবে এরমধ্যেই অনেকগুলি কয়লাখনিতে কয়লা শেষ হয়ে যায় এবং কিছু জায়গা থেকে কয়লা উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে কেন্দ্রীয় সরকার এখান থেকে কয়লা তোলার অনুমতি বাতিল করে। যদিও বড়জোড় অঞ্চলে কয়লা উত্তোলন এখনও চলছে। সেই কয়লার দখল নিয়ে নানা সময়ে মাফিয়া নেতাদের মধ্যে ঝুটঝামেলা, খুনখারাপি চলতেই থাকে। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে আবার এই অঞ্চলে কয়লা তোলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। শোনা যাচ্ছে পোল্যান্ডের কোনও কোম্পানির প্রযুক্তিগত সহায়তায় রাজ্য সরকার কয়লা তোলার কাজ করবে। নতুন করে কয়লা খাদানের জন্য প্রস্তাবিত বীরভূমের খয়রাশোল ব্লকের গঙ্গারামপুর মৌজার যে বনভূমি সেখানে একেবারেই নতুন খোলামুখ খনি হতে চলেছে।  সরকারি তথ্য অনুযায়ী খনি অঞ্চলের পরিমাপ ১০১ হেক্টর বা প্রায় ২৫০ একর বলা হলেও প্রস্তাবিত এলাকায় গিয়ে শেষ প্রান্ত খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। অন্যদিকে দেউচাপাচামিতেও অন্য একটি কয়লা খনির কাজ শুরু হচ্ছে

 

ইতিমধ্যেই জঙ্গল কাটা শুরু হয়েছে। শ্রমিকদের থাকার জন্য কিছু কোয়ার্টার বানানো হয়েছে। কোম্পানির লোকজনদের থাকার জন্যও পার্সোনাল কেবিনের ব্যবস্থা হয়েছে। একটা প্রকাণ্ড পরিধির কুয়ো খোঁড়া হয়েছে। আরও কাজের অপেক্ষায় বিশাল বিশাল দাঁতওয়ালা যন্ত্র কোয়ার্টারের কাছেই রাখা। অফিসার/কোম্পানির লোকের যাতায়াত চলছে। একদা আদিবাসী নেতৃত্বের মুখকে সরকারি জমি অধিগ্রহণ কমিটিতে রেখে রাজ্যের শাসক দলের পক্ষ থেকে সাধারণ আদিবাসী বনগ্রামবাসীদের ক্ষোভকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে পাচামি ব্লকের কয়লাখনি সংক্রান্ত ক্ষেত্রে

 

গাছ কাটতে আসা কর্মীদের থেকেজঙ্গল কাটছি না, ঝাঁটিবন কাটছি“— এমন কথা উত্তর হিসেবে পেয়েছেন গঙ্গারামপুরের আদিবাসী মানুষেরা। দেবগঞ্জ গ্রামটির দিকে বেশ ভাল পরিমাণ ঘন জঙ্গল রয়েছে। শাল, সেগুন, পলাশ, মহুয়া, বহেরা, হরিতকী, আমলকি ইত্যাদি গাছ রয়েছে। নানারকম ভেষজ ওষুধ রয়েছে জঙ্গলে। তেতো স্বাদের এক প্রকার বুনো আলু পাওয়া যায় এই অঞ্চলে। প্রাণীর মধ্যে বুনো শুয়োর দেখতে পাওয়া যায় বেশি। এছাড়া সজারু আছে; খরগোশ, শিয়াল তো আছেই। মোবাইলে প্যাঙ্গোলিনের (পিপীলিকাভুক) ছবি দেখালে জঙ্গলের মধ্যে প্যাঙ্গোলিন দেখেছেন এমন জানান অঞ্চলের সাধারণ আদিবাসী মানুষজন নানারকমের সাপও রয়েছে প্রচুর

 

প্রস্তাবিত জঙ্গলে বেশ কিছু পোস্ট পোঁতা হয়েছে, যাতে ল্যাটিচিউড/ লঙ্গিচিউড লেখা রয়েছে। সগরভাঙা, বাস্তবপুর, ভাদুলিয়া, গাংপুর, দেবগঞ্জ, বেলডাঙা এবং মুসলিয়া ইত্যাদি বনগ্রামের মানুষজন ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এই প্রকল্পের ফলে। পরিকল্পিত খাদানের সবথেকে কাছে বাস্তবপুর গ্রামটি। দূরত্ব যা, তাতেসেফটি মেজারএর জন্য এই গ্রামের মানুষজনকে উচ্ছেদ না করলেও ব্লাস্টিং হলেই বাড়িঘর ভাঙবে। এমনিতেও কিছু বাড়ির দেওয়ালে ফাটল লক্ষ করা গেল। বাস্তবপুরে ৫০৬০ ঘর মানুষের বসবাস। যাদের সম্পূর্ণ জীবিকা বননির্ভর। যে বছর বৃষ্টি হয়, টুকটাক ধান, গম চাষ হয়। প্রকল্পের জন্য এই গ্রামে কোনো জনশুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি

 

দেবগঞ্জ গ্রামটিতে ১০০১৫০ ঘর মানুষের বাস। এই গ্রামটির দিকেই বড় গাছের ঘন জঙ্গল অবশিষ্ট রয়েছে। গ্রামবাসীদের কথামতো পুরো জঙ্গলটা কাটা না হলেও প্রায় সবটাই শেষ হয়ে যাবে। এখানেও কোনোরকম জনশুনানি হয়নি। বনাধিকার আইন ২০০৬ মোতাবেক উদ্যোগী হয়ে সরকারপ্রসাশন যেহেতু কোথাওই গ্রামসভা তৈরিতে উৎসাহিত করার ভুমিকা নেয়নি, তাই জনশুনানি তাদের থেকে আশা করারও মানে হয় না। দেবগঞ্জে সোলার লাইট রয়েছে। সিমেন্টের বাড়িও রয়েছে কিছু। তবে তা দিয়ে সংসার চলে এমন নয়। বেশিটাই নির্ভর করে জঙ্গলের ওপর। এঁরাও জঙ্গলে প্যাঙ্গোলিন দেখতে পাওয়ার কথা জানান। 

 

ক্ষতিপূরণমূলক বনসৃজনের যে গল্প প্রাতিষ্ঠানিক মিডিয়ায় বলা হয়েছে সে সম্বন্ধে কিছুই জানেন না গ্রামবাসীরা। বিষয়টি তাঁদের বলাতে তাঁরা নিজেরাই জীবনজীবিকা, প্রকৃতির সাথে এর ফারাকের কথা বলেন। তাঁদের মতে— “বনসৃজন করলেও জঙ্গল কখনো তৈরি করা যায় না। জঙ্গল প্রাকৃতিক। বড় জোর কিছু বড় গাছের বাগান তৈরি করা যেতে পারে হয়তো।প্রস্তাবিত প্রকল্পের পাশেই রয়েছে একটি ড্যাম। সাধারণ নিয়মেই সেই ড্যামের জল এঁরা চাষের কাজে ব্যবহার করতে পারেন না। এঁদের চাষাবাদ সবটাই বৃষ্টির জলের ওপর নির্ভরশীল। যদিও এঁদের ব্যক্তিগত চাষজমি প্রায় শূন্য। গ্রামবাসীদের অধিকাংশই জঙ্গল থেকে বহেরা, হরিতকী, পিয়াল ফল, মধু সংগ্রহ করে বাজারে বেচে সামান্য রোজগার করে কোনোমতে চালান। জঙ্গল থেকে শালপাতা সংগ্রহ করে সেলাই করে বিক্রি করেন। পশুপালনের জন্যও তাঁদের নির্ভর করতে হয় জঙ্গলের ওপরেই।জঙ্গল চলে গেলে গরু চরানোর জন্য ঘাসও পাওয়া যাবেনা। আর জঙ্গল না থাকলে জঙ্গলের প্রাণীরাই বা কোথায় যাবে? আমরাই বা কোথা থেকে কেন্দু, শালপাতা পাব!”– প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন তাঁরা

 

তাই, গত ১৮ জুলাই গ্রামবাসীরা একসাথে জড়ো হয়ে জঙ্গল থেকে আদিবাসীদের তাড়ানোর এই মারাত্মক সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ করেন।  বিডিওকে তাঁরা তাঁদের অসুবিধার কথা জানালে তিনি জানিয়েছেনতাঁর হাতে কিছুই নেই। স্থানীয় মানুষেরা অবশ্য তাঁদের দাবি ছাড়ছেন না। কয়লাখাদান তাঁদের জীবনজীবিকাবাসস্থানপরিবেশের সমস্তভাবে ক্ষতি করবে, তাই তাঁদের পক্ষে এই প্রকল্প মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। আগামী ২৫ জুলাই তাঁরা জড়ো হবেন আগামী আন্দোলনের প্রুস্তুতি নিতে। অন্যান্য জেলার আদিবাসীসহ সাধারণ মানুষ এসে দাঁড়াচ্ছেন তাঁদের পাশে, প্রাণপ্রকৃতির সমর্থনে

 

 

ছবি : লেখক সুনীল সরেনের সৌজন্যে প্রাপ্ত।

 

 

Share this
Leave a Comment