এই সময়ের উবাচ 


  • June 4, 2019
  • (0 Comments)
  • 514 Views

 

একটা অদ্ভুত সময়ে বাস করছি আমরা। সবকিছু গুলিয়ে দেওয়ার, ভুলিয়ে দেওয়ার এক উন্মত্ত সময়। এইরকম পরিস্থিতিতেই পথ খুঁজে নেওয়াটা খুব জরুরি আর সেই পথ ধরে হাঁটতে গেলে কিছু কথা বারবার করে মনে করতে হয়, ফিরে যেতে হয় এমন মানুষ আর তাঁদের বক্তব্যের কাছে যা হয়তো এই অন্ধকার সময়ে কিছুটা হলেও আমাদের মনের কুয়াশা সরাতে সাহায্য করে। সেই জন্যই  ‘এবং আলাপ’ সংস্থার উদ্যোগে কলকাতার গোর্কি সদনে হয়ে যাওয়া ‘উবাচ’ নামের পোস্টার প্রদর্শনীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রইল। লিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

 

লিঙ্গসাম্য বিষয়টি নিয়ে কয়েক শতক ধরে চর্চার পরেও সমাজ আর মিডিয়ায় প্রতিফলিত খবরগুলি দেখলে মনে হবে আমরা ক্রমশই পিছিয়ে যাচ্ছি। বিশেষত এই মুহূর্তে আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নারীদের তথাকথিত উন্নয়ন ও বৈষম্য দূর করার কিছু প্রকল্প সামনে এনে প্রতিদিনের জীবনে লিঙ্গ পরিচিতি, যৌন পরিচিতি, জাত, বর্ণ, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস এই সব কিছুর ভিত্তিতে তাঁদের সঙ্গে যে নিদারুণ বৈষম্য করা হয়, যে অপমান তাঁদের সহ্য করতে হয়, প্রাণ দিতে হয় তখন ইতিহাসের কাছে ফিরে যাওয়া ছাড়া, বর্তমানে সব লড়াই সামলে জবাব দিতে পারা মেয়েদের সামনে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় কী!

 

সেইজন্যই ‘এবং আলাপ’ সংস্থার উদ্যোগে কলকাতার গোর্কি সদনে হয়ে যাওয়া ‘উবাচ’ নামের পোস্টার প্রদর্শনীটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে রইল। গোর্কি সদনের প্রদর্শনীকক্ষটি সেজে উঠেছিল নানা রঙের সুতির শাড়ির উপরে ৩৮টি পোস্টারের সজ্জায়। পরাধীন ভারতবর্ষ থেকে স্বাধীন দেশ – মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নিজের শর্তে জীবন বাঁচার আন্দোলন, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অংশগ্রহণের সমানাধিকার, সামাজিক পরিসরে নারীকণ্ঠকে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হিসাবে সামনে নিয়ে আসার যে বহুমাত্রিক লড়াই চালিয়ে গেছেন ও যাচ্ছেন যে নারীরা তাঁদের মধ্যে থেকে বেছে নেওয়া কয়েকজন নারীর উদ্ধৃতি দিয়ে সাজানো হয়েছিল এই প্রদর্শনী। ‘উবাচ’ সিরিজটি তাদের ‘এবং আলাপ’ ব্লগ-এ নিয়মিত প্রকাশিত হয়।

 

এই তালিকায় যেমন রয়েছেন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম, গণ আন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলন, অহিংস আন্দোলন, ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের আগুন ঝরানো নেত্রীরা, তেমনি উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবী থেকে বাংলা – সাহিত্যের নানা ভাষায় সাহিত্যসৃষ্টি করে নারীজীবন তথা সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়কে সামনে নিয়ে আসা সাহিত্যিকের পাশাপাশি রয়েছেন সঙ্গীত, অভিনয়ের পরিসরে স্টিরিওটাইপ ভেঙে সমাজের ভ্রূকুঞ্চন উপেক্ষা করে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করা মহিলারা, রয়েছেন সমাজকর্মী, সমাজসংস্কারক, নারীশিক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা নেওয়া শিক্ষয়িত্রী, খেলাধূলার মতো ‘পুরুষালি’ বিষয়ে নিজেদের প্রতিভা ও দক্ষতায় প্রতিষ্ঠা করা মহিলা খেলোয়াড়েরা।

 

বীণা দাস, কমলা দাসগুপ্ত, শান্তিসুধা ঘোষ, মণিকুন্তলা সেন, গীতা মুখার্জী, বাণী দাশগুপ্ত, নিবেদিতা নাগ, বিমলা মাজী, কল্পনা দত্ত, পার্বতীবাঈ ভোর, সুহাসিনী দাস, জাহানারা ইমাম, সৈয়দ মানোয়ারা খাতুন, সাবিত্রীবাই ফুলে, পন্ডিতা রমাবাঈ, বেগম রোকেয়া, রাসসুন্দরী দাসী, জ্ঞানদানন্দিনী দেবী, শান্তা দেবী, রেণুকা রায়, মহাদেবী ভার্মা, অমৃতা প্রীতম, ইসমত চুঘতাই, বিনোদিনী নীলকন্ঠ, রাধারাণী দেবী, সাধনা বসু, রেবা মুহুরি, জোহরা সেহগল, কেতকী দত্ত, রেবতী, বামা, তসলিমা নাসরিন, বেবী হালদার, মেরি কম, মিতালী রাজ, হিমা দাস, পিঙ্কি প্রামাণিক – পারিবারিক, সামাজিক, রাজনৈতিক বাধার পাহাড় পেরিয়ে বিভিন্ন সময়ে এই নারীরা বৃহত্তর পরিসরে বেরিয়ে এসেছেন, কাজ করেছেন ও নিজেদের সময়ের দলিল ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন লেখায় ও বক্তব্যে। প্রতিটি পোস্টার-এর সামনে দাঁড়ালে আরও একবার যেন লিঙ্গসাম্যের সঠিক ধারণাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে এখনকার বিজ্ঞাপন-সর্বস্ব সময়ের প্রেক্ষিতে।

 

এই প্রদর্শনী উপলক্ষ্যেই ১৬ বছরের পুরনো সংস্থা ‘এবং আলাপ’ তাঁদের দ্বিতীয় বছরে পা দেওয়া ‘লিঙ্গসাম্য সম্মান’ প্রদান করল দু’জন ব্যক্তি মানুষ ও দু’টি প্রতিষ্ঠানকে। মুর্শিদাবাদের লস্করপুর হাইস্কুল এই সম্মান পেল এলাকায় নাবালিকা বিবাহ ও মেয়েদের পড়াশোনা ও স্কুলে ভর্তির হার বৃদ্ধির লক্ষ্যে গত কয়েক বছরের নিরবচ্ছিন্ন কাজের জন্য। সীমান্তের জেলা মুর্শিদাবাদ যেখানে পাচার ও নাবালিকা বিয়ের মতো ঘটনার পরিসংখ্যান অত্যন্ত বেশি সেখানে একটি স্কুলের বিশেষত তার প্রধান শিক্ষক ও অন্যান্য শিক্ষক-কর্মীদের প্রয়াসে এমন উদ্যোগে মেয়েদের স্কুলমুখী করা অনেকটাই সম্ভব হয়েছে, বুঝছেন অভিভাবকেরাও। এমনকী ভর্তির আগে একটি অঙ্গীকারপত্রে অভিভাবকদের দিয়ে সই করানো হচ্ছে যে তাঁরা আঠারো বছরের আগে তাঁদের মেয়েদের বিয়ে দেবেন না। অন্যদিকে কলকাতার বিবেকানন্দ কলেজ ফর উইমেন-এ প্রিন্সিপাল ও কয়েক জন শিক্ষিকার ব্যক্তিগত উদ্যোগে তহবিল তৈরি করা হয়েছে অনেকটা দূর থেকে কলেজে আসা ও আর্থিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত পড়ুয়াদের জন্য মিড ডে মিল-এর ব্যবস্থা করার জন্য। শুরু হয়েছিল মাত্রই কয়েকজন ছাত্রীকে দিয়ে, সেই সংখ্যাটি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫-এ। কোনও অসুবিধা বা খিদের কারণে যাতে ছাত্রীদের কলেজে আসা বন্ধ না হয় তার জন্য কোনও কলেজে এমন উদ্যোগ এই প্রথম। তাই তাঁরা সম্মানিত হল এই পুরস্কারে।

 

লিপিকা বিশ্বাস অ্যাডভেঞ্চার স্পোর্টসে গত ২৫ বছর ধরে ভারতের অন্যতম পরিচিত মুখ। তাঁর সাফল্যের তালিকা ক্রমশই দীর্ঘ হচ্ছে। তবে সম্প্রতি তিনি সংবাদের শিরোনামে আবার এসেছেন একা সাইকেলে ইউরোপ-এর সাতটি দেশ ভ্রমণ করার সুবাদে। যখন রাস্তায় সাইকেল চালানো কিশোরীদের এখনও বহু ক্ষেত্রে ইভ-টিজিং-এর শিকার হতে হয় তখন লিপিকা নিঃসন্দেহে রোল মডেল। এবং অবশ্যই ‘লিঙ্গসাম্য সম্মান’-এর যোগ্য প্রাপক। আবার এখনও রাস্তায় কোনও মহিলা তাঁর নিজের গাড়ি চালালে যখন পুরুষ চালক থেকে পথচারী সকলেরই অযাচিত টিপ্পনি শুনতেই হয় তখন বিলকিস বিবি ক্ষমতায়ন বলতে বুঝেছেন গাড়ির স্টিয়ারিংটি শক্ত হাতে ধরে পেশাদার গাড়িচালক হয়ে ওঠা। বিলকিস বিয়ের পর থেকে গৃহহিংসার শিকার। বুঝেছিলেন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে স্বনির্ভর হলে তবেই যোগ্য সম্মান পাবেন। যোগাযোগ হয় আজাদ ফাউন্ডেশন-এর সঙ্গে। সেখানেই গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে আজ একজন পেশাদার গাড়িচালক তিনি। পরিবারে ন্যায্য সম্মান আদায় করে নিয়েছেন। এমন ঋজু শিরদাঁড়ার মেয়েকেই সম্মানিত করেছে ‘লিঙ্গসাম্য সম্মান’।

 

বিলকিস বললেন, “আজকে আমি গর্ব অনুভব করছি যে এতগুলো চ্যালেঞ্জ ফেস করে আমি আজকে এই জায়গায় এসেছি যেখানে আমি এই পুরস্কার পাচ্ছি। প্রথম থেকেই আমার লাইফের দাম ছিল না। বাবা, স্বামী কারওর কাছেই নয়। তবু আমার সন্তান হয়েছে। এমনও সময় গেছে যখন পাড়াপ্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন সবাই আমার সম্পর্কে খারাপ কথা বলেছে, মারধর করেছে স্বামী। গরীব ঘরের মেয়ে তো তাই প্রটেস্টও করিনি কখনও। কিন্তু আজকে আমি আর সেসব সহ্য করব না, কারণ আমি রোজগার করছি, আমি জেন্ডার ট্রেনিং নিয়েছি। আমার স্বামীই কিন্তু এখন সবটা বুঝতে পেরে আমার কেয়ার করছে, বাড়ির কাজে আমায় সাহায্য করছে। একটা সময়ে আমি বাঁচতেই চাইতাম না। কিন্তু এখন আমি অনেক বাঁচতে চাই আর চাই যেসব মেয়েরা বাড়িতে বসে নির্যাতন সহ্য করছে, বেরোতে পারছে না তারা সাহস করে একবার বাইরে আসুক, আমরা তাদের পাশে দাঁড়াব, তারাও সাকসেসফুল হবেই।”

 

লিপিকার বক্তব্য, “এই পুরস্কারটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমরা এমন একটা সমাজে বাস করি যেখানে ছোট থেকেই লিঙ্গ সাম্য ব্যাপারটা চোখেই পড়ে না। আমি ব্যক্তিগতভাবে কোনও বৈষম্য পরিবারে দেখিনি। কিন্তু আমি যে ধরনের খেলায় যুক্ত তা কোনওভাবে লিঙ্গভেদের চেনা ছবিটা ভেঙে দেয়, তাই এটা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাডভেঞ্চার্স স্পোর্টস একটি মেয়েকে ভীষণভাবে এমপাওয়ার করে। আমরা ছোট থেকে মেয়েদের এমন অবলা করে তৈরি করি যে তাদের আলাদা করে ‘এমপাওয়ার’ করার ‘প্রোগ্রাম’ করতে হয়। আমরা ভারতীয় মেয়েরা নানা বাধা-নিষেধের মধ্যে বেড়ে উঠি। অ্যাডভেঞ্চার্স স্পোর্টস এই বেরিয়ারগুলো ভাঙতে সাহায্য করে, আত্মবিশ্বাস দেয় যে ‘তুমি পারো’। মনে রাখতে হবে ‘অ্যাটিটিউড’ আসে ‘কনফিডেন্স’ থেকে। আমি যখন বেরোই তখন এই আত্মবিশ্বাস নিয়ে যে যা হবে দেখা যাবে, একা একটা মেয়েকে এই অ্যাডভেঞ্চার্স স্পোর্টস দারুণ আত্মবিশ্বাস দেয়।”

 

সেদিনের অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে ছিলেন নবনীতা দেবসেন, অনিতা অগ্নিহোত্রী, পিঙ্কি প্রামাণিক, বেবী হালদার। তাঁদের প্রত্যেকের বক্তব্যেই উঠে এল সব প্রতিবন্ধকতা দূরে ঠেলে সমাজের সব ক্ষেত্রে এক অসম লড়াই পেরিয়ে মেয়েদের নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার কথা, ছুঁয়ে গেল ব্যক্তিগত জীবনের স্মৃতিও।

 

‘এবং আলাপ’ সংস্থার শর্মিষ্ঠা দত্তগুপ্ত এই প্রদর্শনী ও সম্মান প্রদানের গুরুত্ব নিয়ে বলতে গিয়ে বললেন – “যে দু’টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এই সম্মান পেলেন তাঁরা মেয়েদের শিক্ষা, নাবালিকা বিয়ে বন্ধ, লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠা বিষয়গুলিতে কতটা সংবেদনশীল তা তাদের উদ্যোগগুলির মধ্যে দিয়েই স্পষ্ট। আরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেন এভাবে ভাবতে পারে। বিরাট কোনও পরিকাঠামো তো দরকার নেই। সেই ভাবনা ও উদ্যোগটুকু থাকা দরকার। এভাবে ভাবলেই পশ্চিমবঙ্গের চিত্রটা বদলাতে পারে। সরকার স্কিম করবে আর আমরা কিছু করব না তেমন হলে চলবে না। সেই জায়গা থেকে নিশ্চয়ই এধরনের উদ্যোগ বার্তা দেবে।” লিঙ্গসচেতনতা নিয়ে দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতায় আগামী দিনে কী ধরনের কাজের কথা চিন্তা করছেন জানতে চাওয়ায় তিনি জানালেন যে বিভিন্ন জেলা ও প্রান্তিক অঞ্চলে স্কুলে তাঁরা এই পোস্টারগুলি নিয়ে গিয়ে দেখিয়ে ছোট ছোট করে লিঙ্গসাম্য নিয়ে আলোচনা চালু রাখতে চাইছেন। পড়ুয়া, অল্পবয়সি ছেলেমেয়ে, অভিভাবক, শিক্ষাকর্মী প্রমুখের ভাবনাচিন্তাগুলো জানাও যাবে এভাবে, তৈরি হবে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ার নতুন পরিসর।

 

আজ সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন শেষে যখন সাধ্বী প্রজ্ঞা নারী ক্ষমতায়নের মুখ হয়ে উঠছেন রাষ্ট্রের পিঠ চাপড়ানিতে তখন প্রতিদিন বেগম রোকেয়া, সাবিত্রী ফুলে, বামা-র কথাগুলি পড়ে যেতে, শুনিয়ে যেতে হবে। ‘উবাচ’-এর মতো প্রদর্শনী ছড়িয়ে যাওয়া দরকার শহর থেকে গ্রাম, মফস্বল থেকে সীমান্তছোঁয়া প্রান্তরে।

 

 


লেখক সুদর্শনা চক্রবর্তী সাংবাদিক এবং ডকুমেন্টারি নির্মাতা।

ছবির সুত্রঃ লেখক।

 

 

Share this
Leave a Comment