ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়


  • May 26, 2019
  • (0 Comments)
  • 661 Views

গোটা ভারতবর্ষ জুড়েই সাধারণ শিক্ষার্থীদের থেকে উচ্চশিক্ষার অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং শিক্ষার বেসরকারিকরণের যে প্রথা চালু হয়েছে তার প্রকোপ এসে পড়েছে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়েও। ধীরে ধীরে অচলায়তন হয়ে উঠতে থাকা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা মেনে নিতে নারাজ। সেমেস্টার চলাকালীনও তাই তারা শিক্ষার অধিকার সুরক্ষিত করতে আন্দোলনে নেমেছে। এই আন্দোলনের কথা লিখেছেন বিশ্বভারতীর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

 

 

বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর নিজের হাতে গড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল নীতি, “যত্র বিশ্বং ভবেত্যকনীড়ম”: অর্থাৎ যে বাসায় সারা বিশ্বের মানুষ ঘর বাঁধেন। ১৯০১ সালে, ব্রিটিশদের কেরানি তৈরির শিক্ষা ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ গড়ে তুললেন একটি বিদ্যালয় – পাঠভবন, যার মধ্যে নিহিত ছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বীজ। উদ্দেশ্য ছিল মুক্ত চিন্তা ও শিক্ষার বিকাশ ঘটিয়ে কেরানি তৈরির নয়, ‘পরিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার শিক্ষা’ দেওয়া। আশেপাশের গ্রামের দুঃস্থ পরিবারের ছেলেমেয়েদের জীবিকা নির্ভর শিক্ষাদানও ছিল অন্যতম উদ্দেশ্য। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত হলো বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রথম থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন ছিল সমস্ত শ্রেণীর ও আর্থিক স্তরের ছাত্রছাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত। অর্থ, শ্রেণী, লিঙ্গ পরিচয় কোনোদিন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নি। এই বিশ্ববিদ্যালয় জন্ম দিয়েছে সত্যজিৎ রায়, নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেজ, অমর্ত্য সেন, সুচিত্রা মিত্র, কনীকা ব্যানারজী প্রমুখ নক্ষত্রের। বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ, আশ্রমিক পরিবেশ উজ্জীবিত করেছে অসংখ্য মানুষকে, হয়েছে অনেক নতুন সৃষ্টির প্রেরণা। উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীদের অন্যতম আকর্ষণ এই বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ আজ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কিছু সিদ্ধান্ত রুদ্ধ করছে প্রতিষ্ঠানের প্রাণধারাকে। সম্প্রতি কিছু অবাঞ্ছিত ঘটনার দরুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকে যে ভাবে সাজানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তা মুক্ত পরিবেশের পরিপন্থী। তবে সবচেয়ে বড়ো সমস্যা অস্বাভাবিক হারে ফিস্ বৃদ্ধি।

 

প্রতি বছরের মতো এবছরও বিশ্বভারতী ভর্তি প্রক্রিয়ার জন্য বিজ্ঞপ্তি বের করে, ৮ই মে, ২০১৯ তারিখে। উক্ত বিজ্ঞপ্তিতে ভর্তির আবেদন পত্রের দাম একধাক্কায় ২ গুন (৫০০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা), সার্ক অন্তর্ভুক্ত দেশের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে ১০ গুন (৫০০০ টাকা), ও অন্যান্য দেশের ক্ষেত্রে ১০ গুন (১০০০০ টাকা) বৃদ্ধি পেয়েছে। এই আবেদন পত্রের এত পরিমান মূল্য বৃদ্ধির পিছনে যৌক্তিকতা কি? যেখানে বিশ্বভারতী সারা দেশ জুড়ে কোনো প্রবেশিকা পরীক্ষা চালায় না। কেন্দ্রীয় অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো অবধি ভর্তির জন্য পরীক্ষা ব্যাবস্থা চালু আছে। সেই সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সারা ভারত জুড়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে বা অনলাইনের মাধ্যমে ভর্তির পরীক্ষা নেয়। সেই সমস্ত কিছু করবার জন্য যে কিছু অর্থের প্রয়োজন সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু বিশ্বভারতী তো তার ভর্তির পরীক্ষার পর্ব (VBCAT) সেই কোনকালে বন্ধ করে দিয়েছে, এখন সবটাই হয় “অটোজেনারেটেড অনলাইন”-এর মাধম্যে, উচ্চমাধ্যমিকের নম্বরের উপর ভিত্তি করে।

 

বিভিন্ন হস্টেলের মাসিক খরচও আগের তুলনায় অনেকটা বাড়িয়েছে কর্তৃপক্ষ। সমস্যায় পড়েছে আন্তর্জাতিক ছাত্রছাত্রীরাও; অ্যাপ্লিকেশান এবং অ্যাডমিশন ফি বেড়েছে তাদেরও। ইউরোপ বা আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ছাত্রছাত্রীদের ক্ষেত্রে সমস্যা না হলেও তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর সাধারণ পড়ুয়াদের ক্ষেত্রে ১২০০০ টাকামূল্যের “ইকুইভ্যালেন্ট ফর্ম” (উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যা Association Of Indian Universities-এর থেকে সংগ্রহ করতে হয়), ও ১০০০০ টাকার বিনিময়ে অ্যাপ্লিকেশানফর্ম এবং ভর্তির ফি জোগাড় করা যথেষ্টই দুরূহ। প্রসঙ্গত বিশ্ববিদ্যালয়ে SAARC অন্তর্ভুক্ত উন্নয়নশীল দেশের পড়ুয়াদের সংখ্যাই বেশি। এই সবটাই হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব অর্থভান্ডার তৈরি করার দোহাই দিয়ে।

 

এর ফলস্বরূপ অর্থনৈতিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবার থেকে উঠে আসা ও কষ্ট করে উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করা ছাত্রছাত্রীরা ভর্তির আবেদন করতে পারছে না। কারণ ফর্মের দাম আকাশছোঁয়া,আর আবেদন করলেই সে যে পড়ার সুযোগ পাবেই তারও কোনো গ্যারান্টি নেই। গরীব ছাত্রছাত্রীদের বিশ্বভারতীতে পড়ার স্বপ্ন এক নিমেষে ভেঙে দিয়েছে কর্তৃপক্ষই। কর্তৃপক্ষের এই সিদ্ধান্ত থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে রবীন্দ্র আদর্শের উপর ভিত্তি করে চলা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অধিকার কেবল মাত্র উচ্চবিত্ত শ্রেণীরই রয়েছে। তাহলে একটা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য কোথায় ?

 

‌রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শ কোনোদিনই শিক্ষাকে পণ্য হিসাবে দেখায় না,বা এক সম্প্রদায়ের মানুষই শিক্ষার নাগাল পাবে -এমন কথা বলে না। শিক্ষা সকলের অধিকার।সকলে যাতে নির্দ্ধিধায় সেই পরিপূর্ণতায়বেঁচে থাকার শিক্ষা, সেই সামাজিক শিক্ষা লাভ করতে পারে,তার জন্য এই প্রতিষ্ঠান। অত্যধিক ফি বৃদ্ধি অন্যান্য সবকিছু বাদে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্থাপক রবীন্দ্রনাথেরও অবমাননা।

 

এই অত্যধিক ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে গত ১৩ই মে, বিশ্বভারতীর সাধারণ শিক্ষার্থীরা একটি সাধারণ সভার ডাক দেয়। এই সভা থেকে উঠে আসা দাবি গুলি হল –

 

১. অবিলম্বে ফর্ম-এর মূল্য কমিয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে পুরোনো অর্থ কাঠামো বহাল রাখতে হবে।

২. ইতিমধ্যেই যে ফর্ম গুলি জমা পড়েছে ও পেমেন্ট সম্পূর্ণ হয়েছে, তাদের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে টাকা ফেরত দিতে হবে।

৩. অ্যাডমিশন, সেমেস্টার, হোস্টেল ফি বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত কর্তৃপক্ষকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে।

৪. ভবিষ্যতে ফিস সংক্রান্ত যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ছাত্রছাত্রীদের সাথে আলোচনা করতে হবে।

 

এই দাবি গুলো পূরণ করার লক্ষ্যে বিশ্বভারতীর সাধারণ শিক্ষার্থীরা ১৪ই মে গৌরপ্রাঙ্গনে জমায়েতের ডাক দেয়। ছাত্র, শিক্ষক, অধ্যাপক, অশিক্ষা কর্মচারী থেকে শুরু করে সকল সচেতন ব্যক্তিবর্গ আহ্বান জানানো হয়, প্রতিবাদে সামিল হবারজন্য।

 

এরপর ১৫ই মে অব্দি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে চলে ফি বৃদ্ধির বিরুদ্ধে লাগাতার পোস্টারিং এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষের নির্দেশে সেই সমস্ত পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা হয়। শিক্ষার্থীরা পোস্টারিং এর বদলে দেওয়াল লিখন শুরু করলে তাও মুছে দেয় এবং শিক্ষার্থীদের কণ্ঠ রোধ করবার চেষ্টা জারি রাখে বিশ্বভারতী কতৃপক্ষ। এই সময়ই উপরতলার নির্দেশ অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় নিরাপত্তা বিভাগীয় প্রধান শিক্ষার্থীদের জানান, আগামী ১৭ তারিখ উপাচার্য উপস্থিত থাকবেন, সেদিন কথা বলতে। কণ্ঠরোধ করার প্রচেষ্টার ফলে ইতিমধ্যে ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভ আরো ঘনীভূত হয়, কারণ তাঁরা মনে করেন এই মুহূর্তে তাঁদের কাছে ফি-বৃদ্ধির চেয়ে বড় কোনো সমস্যা নেই।

 

সংঘবদ্ধ ছাত্রছাত্রীরা ১৭ই মে, গান ও স্লোগানে গলা মিলিয়ে মিছিল করে এসে যখন কেন্দ্রীয়ভবনের সামনে জমায়েত হন তখন ভবনের মূলদরজা বন্ধ রাখা হয়। ৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ৬ঘন্টারও বেশি সময় শিক্ষার্থীদের অপেক্ষা করিয়ে রেজিস্ট‍্রার এসে জানান উপাচার্য ১৯ তারিখ আসবেন সেদিন দেখা করতে। গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে ততক্ষণে ১জন ছাত্র এবং ১জন ছাত্রী অসুস্থ হয়ে বিশ্বভারতীর পি এম হাসপাতালে ভর্তি হতে বাধ্য হয়। কতৃপক্ষের কেউ তাদের দেখতে যাওয়া তো দূর, খোঁজ নেবারও প্রয়োজন মনে করেননি।

 

১৯শে মে, শিক্ষার্থীরা আবার মিছিল করে কেন্দ্রীয় ভবনের সামনে পৌঁছালে তাদের আবার ফিরে যেতে বলেন রেজিস্ট্রার, উপাচার্যের অনুপস্থিতির কথা বলে। শিক্ষার্থীদের বলা হয় ২১শে মে, লিপিকা সভাগৃহে এই নিয়ে আলোচনায় বসবেন উপাচার্যসহ বিশ্বভারতী কতৃপক্ষ। এইবার শিক্ষার্থীরা লিখিত বিজ্ঞপ্তি দাবি করে কতৃপক্ষের কাছ থেকে। তাদের আবারও ২ঘন্টা অপেক্ষা করিয়ে একটা বিজ্ঞপ্তি বের করা হয়, যেখানে জানানো হয় ২১শে মে’র সভায় প্রত্যেকটি ভবনের অধ্যক্ষ দ্বারা নির্বাচিত শিক্ষার্থীরাই শিক্ষার্থীদের হয়ে উক্ত সভায় প্রতিনিধিত্ব করবার সুযোগ পাবে। আবারও আন্দোলনের কণ্ঠ রোধ করবার প্রচেষ্টা। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা এই বিজ্ঞপ্তি কেন্দ্রীয় ভবনের সামনেই পুড়িয়ে ফেলে তাদের প্রতিবাদ জানায়। বিশ্বভারতী কতৃপক্ষ এরপরে বাধ্য হয় শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে ৮০ জনকে প্রতিনিধি হিসেবে মেনে নেয়।

 

২১শে মে, দুপুর ৩টে থেকে মিটিং শুরু হয়, কবিতা এবং আরো অনেক জ্ঞানের মাধ‍্যমে । বিরক্ত ছাত্রছাত্রীরা (‘লিপিকা’র ভিতরে থাকা ৮০ জন) উপাচার্য কে প্রসঙ্গে ফিরে আসতে বাধ্য করেন।ছাত্রছাত্রীদের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর,উপাচার্যসহ আরো অনেক অধ্যাপক অধ্যাপিকারা বক্তব্য রাখেন।বিশ্বভারতীর কাছে যে “টাকা নেই”,সেই বিষয় উঠে আসে।ছাত্রছাত্রীরা তার পরিপ্রেক্ষিতে সমস্ত সাহায্য করার কথা বলেওছিলেন।বলেছিলেন, “আমরা সকলে মিলে কীভাবে ইন্টারনাল রিসোর্স জেনারেশন বাড়ানো যায় তার চিন্তাভাবনা করবো,কিন্তু এই ফি কমানো হোক।”কিন্তু উপাচার্য ও কিছু অধ্যাপক অধ্যাপিকার বক্তব্যের মধ্যে কোথাও ফি কমানোর কথা উঠে আসেনি (একজন অধ্যাপক নিজেকে সাম্প্রদায়িকও বলেন।অন্য এক অধ্যাপক বলেন যে “Privatisation in education sector is a reality”)। ঘুরিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বোঝানো হচ্ছিল, যে তারা কেন বাইরে থেকে পড়তে আসা নতুন ছাত্রছাত্রীদের জন্য লড়াই করছে, কেন বাংলাদেশি ছাত্রছাত্রীদের কথা বলছে।এই অস্বাভাবিক ফি বৃদ্ধির কোনো প্রভাব বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের উপর পড়ছে না (স্নাতক প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ, স্নাতকোত্তর প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষ), তাও কেন তারা এই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন ভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কথাবার্তায় এই বক্তব্যগুলো উঠে আসে,মাঝে মাঝে ক্ষোভও প্রকাশ পেয়েছে বক্তব্যে।

 

রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত এক্সেকিউটিভ কাউন্সিল-এর মেম্বার ডঃ সুশোভন ব্যানার্জি বিভিন্ন হিসেব দেন। কেন্দ্র সরকার এর আগে যে টাকা দিয়েছে তার খতিয়ান কেন প্রকাশ করেন নি কর্তৃপক্ষ এতদিন, সেটাও বলেন। কর্তৃপক্ষ সুশোভন বাবুকে তার বক্তব্যের পর সরিয়ে দেন। এত কিছুরপরও ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের দাবিতে অনড় ছিলেন।শেষমেশ বাতাসা ছড়ানোর মতো করে ৫০০ টাকা এডমিশন ফি থেকে কমিয়ে দেওয়ার কথা হয়। আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীরা এই প্রস্তাব খারিজ করেন, এবং ফি বৃদ্ধি (২০১৮-১৯ কার্যবর্ষের উপর) ২০%-এরভিতরে রাখার প্রস্তাব দেন।দ্বিতীয় দফায় সেই ডেপুটেশন জমা দেওয়ার পর ১০ মিনিটের মাথায় কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে তারা এই নেগোসিয়েশন মানছে না। এবং এরপর৮০ জন ছাত্রছাত্রীকে ‘লিপিকা’র ভিতরে আটকে রেখে গেটে তালা ঝুলিয়ে দেয়।

 

এরপর ছাত্রছাত্রীদের সকলের সিদ্ধান্তে শুরু হয় ঘেরাও ও প্রতিবাদ।স্লোগান ও গানের মাধ্যমে সারা রাত প্রতিবাদ চলে এই অমানবিক সিদ্ধান্তের বিরুধ্যে। কর্তৃপক্ষ রাতে বিরিয়ানি খেয়েছে, ভাবে নি বাকিদের কথা।

 

ঘেরাও, অবস্থান শান্তিপূর্ণ ভাবেই চলছিল। এরই মধ্যে মাস কমিউনিকেশন ডিপার্টমেন্টের এক অধ্যাপক এসে জানান যে সেই ডিপার্টমেন্টের নাকি পরীক্ষা আছে আর তিনিই একমাত্র প্রফেসর। তিনি না গেলে পরীক্ষাটা আর হবে না। ছাত্রছাত্রীরা বিবেচনা করে ছেড়ে দেওয়ার কথা আলোচনা করছিলেন,এমন সময়ে সমুদ্র স্রোতের মতো লিপিকার ভিতর থেকে নেমে আসে অধ্যাপক অধ্যাপিকার দল। সেখানে ছিলেন মাননীয় রেজিস্ট্রার মহাশয়ও। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে অনেকেই তখন ক্লান্ত, কিছুজন বাড়িও চলে গেছিলো, সারা রাতের ধকল ছিল। ছিলেন গোটা কয়েক জন।বাকিরা একটু পরেই ফিরে আসত। তো সেই জনসমুদ্র (প্রায় ২০০ জন অধ্যাপক, অধ্যাপিকা ও এডমিনিস্ট্রেশন কর্তাব্যক্তি) লিপিকার গেটের কাছে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। শুরু হয় ধাক্কা ধাক্কি, মেয়েদের কলার ধরে টানাটানি, কথায় কথায় উঠে আসে কয়েক জনের একাডেমিক কেরিয়ার বরবাদ করে দেয়ার হুমকি, ‘বাংলাদেশিরা বর্বর’ সেই কথাও উঠে আসে। সিকিউরিটিরা বীভৎস ভাবে ঠেলাঠেলি, চুল ধরে টানাটানি শুরু করে। কিন্তু ছাত্রছাত্রীরা শেষমেশ আটকে দেন তাদের। এই লেখকের হাত ভেঙে যাওয়া থেকে বেঁচেছে, কয়েকজন মেয়ের পা কেটে গেছে।

 

এই ঘটনার পর ক্ষোভ আরো বাড়তে থাকে। ছাত্রছাত্রীরা অধ্যাপকদের কাছ থেকে এই ধরণের ব্যবহার ও বক্তব্য প্রত্যাশা করে নি। কেন তারা এটা হবে জেনেও আটকালেন না। ঘটনার পর তার কেটে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে কয়েকজন।

 

দুপুরে জেনারেল বডি মিটিং ডাকা হয়, উপস্থিত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে যেকোনো ৫ জন কে লিপিকার ভিতরে যেতে অনুমতি দেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে ভর্তির ফি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হবে কিন্তু এপ্লিকেশন ফি কমানো হবে না। পরীক্ষার জন্য ছাত্রছাত্রীরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য হয়। পরীক্ষা এমনিতেই পিছিয়ে গেছিল, আরো পিছলে সমস্যায় পড়তে পারত অনেক ছাত্রছাত্রীরা। কতৃপক্ষ এই দিন পরবর্তী মিটিং ২৫শে মে হবে বলে জানিয়েছিলেন, কিন্তু সেই মিটিং পরে পিছিয়ে ২রা জুন হবে বলে জানানো হয়েছে। অফিসিয়ালই সিধান্ত মেনে নেওয়া না হলে আন্দোলন জারি থাকবে।

 

Update: আজ রীতিমতো, সান্ত্বনা পুরস্কারের মতো করে সার্ক (SAARC) অন্তর্ভুক্ত দেশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ৪০০০ টাকা করা হয়েছে ফর্মের দাম, ১০০০ টাকা কমিয়ে, নন-সার্ক ( non-SAARC) দেশের ছাত্রছাত্রীদের জন্য একই মূল্য ধার্য্য থাকলো। কর্তৃপক্ষ অধ্যাপক উপাচার্য্য সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিলো, অচলায়তন বজায় থাক।

 

উল্টোদিকে একাধিক প্রফেসররা মিলে, (যাদের কেউ কেউ ছাত্রছাত্রীদের আক্রমণের মুলমুখ ছিলেন) উল্টে ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে উপাচার্য্যর কাছে ডেপুটেশন জমা দিলেন।

 

 

 

 

Share this
Leave a Comment