মোদি সরকারের পরিবেশ-নীতি বা গত পাঁচ বছরের পরিবেশ দুর্নীতি


  • May 15, 2019
  • (2 Comments)
  • 1613 Views

ভারতে এখনো প্রকৃতি-পরিবেশকে একটা মুখ্য বিষয় বলে ভেবে ওঠার জায়গায় রাজনৈতিক শক্তিরা নেই। তাই তাদের যাবতীয় নির্বাচনী প্রচারে কোথাও পরিবেশ বিষয় নিয়ে ন্যূনতম কোনও কথাও আপনি খুঁজে পাবেন না। গত পাঁচ বছরে প্রকৃতি-পরিবেশ এবং বিশ্ব-উষ্ণায়নকে রুখে দিতে মোদি সরকার কী করেছে তার বিষদ বিবরণ নিয়ে নন্দন মিত্র-এর এই লেখা।

 

 

বিজেপি শাসিত গোয়া সরকার ২০১৭-এ হঠাৎই নারকেল গাছকে তৃণ-জাতীয় উদ্ভিদ হিসেবে ঘোষণা করতে রাতারাতি পুরোনো আইনে বদল আনার চেষ্টা করছিল। এখন পাঠক, আপনার মনে হতে পারে, এ আবার কী বিদঘুটে খেয়াল। একটা এক-পায়ে দাঁড়ানো লম্বা-তিরিক্ষে বৃক্ষকে ঘাসে পরিণত করার পিছনে কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে! প্রাচীন টেক্সটে, মানে সঙ্ঘপরিবার অনুমোদিত রামায়ণ-মহাভারত-পুরাণ ইত্যাদিতে সনাতন ভারতীয় সংস্কৃতি অনুসারে কি নারকেলকে ঘাস-জাতীয় উদ্ভিদ বলা হয়েছে? আসলে, এসবের কিছুই হয়নি। Goa, Daman and Diu (Preservation) of Trees Act, 1984 অনুযায়ী, নারকেল গাছ কাটায় ঝামেলা আছে। গোয়ার সমুদ্র তট ছেয়ে থাকা নারকেল বন সাফা না করতে পারলে যথেচ্ছ রিয়াল-এস্টেট, হোটেল বেওসা গজাবে কী করে! অতঃ কিম! নারকেল হল ঘাস। ঘাস কাটতে আবার পারমিশন লাগে নাকি! সেই বিল আর রাজ্য বিধানসভায় বিজেপি পাশ করিয়ে উঠতে পারেনি এই রক্ষে। নইলে, ইতিহাস বইয়ের পাশাপাশি বিজেপি-সঙ্ঘপরিবারকে ক’দিন পর বোটানি বইও লিখতে হত নিজেদের ন্যারেটিভ সাপোর্ট করতে! সে যাই হোক, মোদ্দায় এই ঘটনাটাই যথেষ্ট বিজেপি-সঙ্ঘপরিবারের পরিবেশ-নীতি (অথবা, দুর্নীতি) বোঝার জন্য।

 

অরণ্য ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে!

গত পাঁচ বছরে প্রকৃতি-পরিবেশ এবং বিশ্ব-উষ্ণায়নকে রুখে দিতে তারা কী করেছে তার বিষদ বিবরণ একই ঘটনার বিবিধ পুনরাবৃত্তি। সারা ভারত জুড়ে তারা ‘বৃক্ষ’-ছেদন ক’রে মোটেও পরিবেশের ক্ষতি করেনি, অথচ দেশের ‘বিকাশ’-এর গতি বহুগুণে বাড়িয়ে দিতে চোর-ঠগ-ক্রিমিনাল বেওসায়ি আর মাল্টি-ট্রান্স-ন্যাশনল কর্পোরেটদের হাতে মূলত ‘ঘাস-জমি’ তুলে দিয়েছে। গোয়েবেলিয়-মিডিয়া-মাস্টার এবং সঙ্ঘের হোয়াটস্যাপ-আর্মির নেতৃত্বে ‘গরু’ নিয়ে যেমন গল্প রচনা হয়েছে এবং তার পরম্পরায় পিটিয়া-খুন, দাঙ্গা, ঠিক তেমনই পরিবেশ সংক্রান্ত গল্পের ‘গরু’টিও গাছে চড়েছে এবং সেকারণেই না বিজেপি তার এবারের নির্বাচনী ইস্তাহারে ‘জঙ্গল-পরিবেশ’-এর জন্য বরাদ্দ তিনটি মহার্ঘ পয়েন্টে ৫৬-ইঞ্চি ফুলিয়ে ঘোষণা করেছে, তারা গত পাঁচ বছরে ৯০০০ বর্গ কিমি ‘ফরেস্ট কভার’ যোগ করেছে। চলতি তর্জমায় যার মানে দাঁড়িয়েছে মোদির রাজত্বে ভারতবর্ষে ‘অরণ্য’ বেড়ে গিয়েছে। মোদিজীর গত পাঁচ বছরের পরিবেশ-নীতি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সেজন্যই আমাদের ‘ফরেস্ট-কভার’-এ আটকে পড়লে চলবে না, প্রচারিত ভাষ্যের মায়াপ্রপঞ্চ ঘুচিয়ে বুঝতে হবে—আসলে কী ঘটেছে…

 

India’s State Of Forest Report (ISFR) 2017 অনুযায়ী ভারতবর্ষে ৬,৭৭৮ বর্গ কিমি ফরেস্ট-কভার বৃদ্ধি পেয়েছে ২০১৫’র সমীক্ষার তুলনায়। এ প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক, যেখানে অরণ্য ধ্বংসের খবরই নিত্তনৈমিত্তিক সেখানে কীভাবে ফরেস্ট-কভার বৃদ্ধি পেতে পারে! এর উত্তর আসলে লুকিয়ে আছে ‘কাকে ফরেস্ট বলা হবে’ তার ক্রমপরিবর্তনশীল সংজ্ঞা এবং পরিমাপ পদ্ধতির প্যারামিটারগুলির পরিবর্তনশীল ধারণার ওপর। আমরা গভীর ঘন জঙ্গল বলতে বুঝি ৭০%-এর অধিক বৃক্ষ-আচ্ছাদিত ক্ষেত্রকে, মাঝারি ঘন জঙ্গল বলা হয় ৪০-৭০%-এর আচ্ছাদিত ক্ষেত্রকে। মুক্ত অরণ্য বা ‘ওপেন ফরেস্ট’ বলা হয় ১০%’এর অধিক বৃক্ষ-আচ্ছাদিত ভূমিকে। ১ হেক্টর বা তার অধিক ক্ষেত্রভূমির মধ্যে এই আচ্ছাদন ঘনত্বের পরিমাপ করা হয়ে থাকে। ২০১৭’র রিপোর্টে ঘোষিত সংজ্ঞা অনুযায়ী কোনো অঞ্চলে যদি মাত্র ১০% আচ্ছাদন ঘনত্বও দেখতে পাওয়া যায় তবে তা ফরেস্ট-কভার হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। অন্য কোনো বিষয়কেই এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় আনা হয়নি। যেমন, জমি কার, কীসের গাছ, তার প্রজাতি-ইতিহাস, কৃষিক্ষেত্র কিনা, ইত্যাদি কোনো কিছুই বিবেচিত হয়নি। মজার ব্যাপার হল, ভারতের অধিকাংশ ফলের বাগানই এই সংজ্ঞা অনুযায়ী ফরেস্ট-কভার হিসেবে বিবেচিত হয়ে যাচ্ছে। ফলত, এই বৃদ্ধির পিছনে কারণ বিবিধ। চা-কফি-ফলের বাগানের ঘনত্ব হিসেবমতো ৪০%-এর অধিক হয়ে থাকে, নতুন হিসেবে এগুলোও মাঝারি ঘন জঙ্গলের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে। উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয় এবং এক্ষেত্রে প্রাকৃতিক অরণ্য, কৃষিক্ষেত্র, ঝোপঝাড় এসবের মধ্যে কোনো পার্থক্যই করা হয় না। ফলত, চা-বাগান থেকে আখের ক্ষেত সবই এখন অরণ্য! যত দিন যাচ্ছে, প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক বেশি সূক্ষ্মতায় উপগ্রহ চিত্র তোলা যেতে পারে। যেমন, ১৯৮০ দশকের প্রযুক্তি ৪ বর্গ কিমির নিচের ক্ষেত্রকে পরিমাপ করতে অসমর্থ ছিল আর সেখানে আজকের প্রযুক্তি ১ হেক্টরের জমিকেও পরিমাপ করতে পারে। আর এভাবেই প্রযুক্তির সূক্ষ্মতার উপর ভর ক’রে ভারতবর্ষে অরণ্য ক্রমশ বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে! একটা উদাহরণ দিয়ে এই পর্বে ইতি টানব। ১৯৮৭ সালে প্রথম ISFR রিপোর্টে দিল্লিতে ১৫ বর্গ কিমি অরণ্যের সন্ধান পাওয়া গেছিল। ২০১৭’র রিপোর্টে প্রযুক্তির যাদুদণ্ডের ছোঁয়ায় সেই অরণ্য পৌঁছল ১৯২ বর্গ কিমি’তে। ৩০ বছরে প্রায় ১৩ গুণ অরণ্য বৃদ্ধি খোদ রাজাধানী দিল্লিতে! ভাবা যায়! একটাই কথা বলা যায়… বাহ্‌ মোদিজী বাহ্‌…

 

দূষণ নিয়ন্ত্রণ সূচক

কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্যদ ২০০৯-এ ইউপিএ সরকারের আমলে Comprehensive Environmental Pollution Index (CEPI) নামে একটি স্কেল নির্ণয় করেছিল যার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন ভারী শিল্প-বলয়গুলির সার্বিক দূষণের পরিমাপ করা হয়েছিল ০-১০০’র স্কেলে। এই স্কেল অনুযায়ী, যে সমস্ত বলয়ের সূচক ৭০ অতিক্রম করেছিল সেগুলোকে ‘মারাত্মকভাবে দূষিত’ অঞ্চল ঘোষণা ক’রে ওইসব অঞ্চলে আরো নতুন ভারী শিল্প প্রোজেক্টকে ছাড়পত্র দেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছিল। সম্প্রসারণে নিষেধাজ্ঞা এবং ওই অঞ্চলে বিশেষ অ্যাকশন-প্ল্যান ইত্যাদি নেওয়ার মধ্যে দিয়ে অনেক এলাকাই ক্রমশ ‘মারত্মকভাবে দূষিত’ এলাকার ‘নিষেধাজ্ঞা লিস্ট’ থেকে বেরিয়ে আসে। আসেনি গাজিয়াবাদ, পানিপথ, সিঙরাউলি, ইন্দোরের মত আটটি ভারী-শিল্প-বলয়। ২০১৩’তে ধারাবাহিক CEPI সূচক পরীক্ষা ক’রে সরকার লক্ষ করে যে, ওই আটটি অঞ্চল কোনোভাবেই উন্নতি করতে পারছে না দূষণ নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে। তাই, পূর্ব-আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে। মোদি-সরকার ক্ষমতায় এসে আমলাতান্ত্রিক মারপ্যাঁচে এই নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়। কয়েক বছর ধরে বড়ো কোম্পানিদের চাপ সত্ত্বেও যে নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখা হয়েছিল তা উঠে যায়।

 

ইউপিএ আমল থেকেই দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদকে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক সূচক এবং নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত নির্দেশটি পুনর্মূল্যায়ন করার (আসলে বড়ো কোম্পানিদের চাপে নির্দেশ লঘু করার) জন্য আবেদন ক’রে আসছিল। মোদি-সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪’র জুনে পুনর্মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শেষ হয়ে নতুন সূচক এবং নির্দেশাবলি তৈরি না-হওয়া অবধি ওই আটটি ‘মারাত্মকভাবে দূষিত’ শিল্প-বলয় থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। অতএব, ওই অঞ্চলে আরো শিল্প-প্রোজেক্টের ছাড়পত্র দিতে আর কোনো বাধা রইল না। তাহলে গল্পটা কী দাঁড়াল! যে সূচক দূষণ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তৈরি হয়েছিল এবং যা মোতাবেক আটটি অঞ্চলে শিল্প-বিকাশ বন্ধ রাখা হয়েছিল, সেই সূচকটি যেহেতু পরীক্ষাগারে তাই, ওই আটটি অঞ্চলে আর কোনো বাধা থাকল না। এখানে ‘মারাত্মভাবে দূষিত’, এইটা কোনো বিষয়ই নয়। বিষয় হল সূচক এবং নিষেধাজ্ঞা। দূষণ বৃদ্ধি পাক, প্রয়োজনে সূচক নিজেকে বদলে নিয়ে দূষণকে নিয়ন্ত্রিত প্রমাণ করবে!

 

ক্যুমুলেটিভ এনভায়রনমেন্ট ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট

যে কোনও শিল্পের ছাড়পত্র পেতে হলে এনভায়রনমেন্ট ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট অর্থাৎ উক্ত শিল্প-উদ্যোগটি পরিবেশ-প্রকৃতির উপর কী ধরণের প্রভাব ফেলতে পারে তার একটি বিজ্ঞানসম্মত আঁচ-আন্দাজ করতে হয়। সেই তথ্যের উপর দাঁড়িয়েই ঠিক হয় আদৌ কোনও প্রোজেক্ট ছাড়পত্র পাবে কী না। বলা বাহুল্য, ভারতবর্ষের মত কর্পোরেটের মৃগয়াক্ষেত্রে এইসব অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট দিয়ে প্রজেক্ট (পড়ুন, উন্নয়ন!) আটকে রাখা যায় না। যাঁরা এই রিপোর্ট বানানোর দায়িত্ব পান সেই রাজ্য বা কেন্দ্রীয় অথোরিটি প্রকৃতি-পরিবেশ-প্রাণের থেকে কর্পোরেট মুনাফার জন্য রাস্তা চওড়া করতে বেশি উদ্যত। আমরা দেখেছি, থুথুকোডিতে স্টারলাইটের প্ল্যান্টের EIA নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইন্সটিটিউট (NEERI/নিরি)-এর ভূমিকা। মারাত্মক দূষণ সৃষ্টিকারী দূষিত উপকরণের সন্ধান পেলেও বারবারই তারা রিপোর্ট এমনই লঘু ক’রে প্রকাশ করেছিল যে তাতে স্টারলাইটের দোষ হালকা হয়ে যায়। বর্তমানে আমরা দেখছি, পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে ঠুড়্গা নদীর উপর পাম্প স্টোরেজ বিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষেত্রেও ঠিক একই ধরণের ঘটনা ঘটছে। যে কোনো জায়গায় নতুন একটি শিল্প প্রকল্প হতে হলে সেইটির পরিবেশের ওপর প্রভাব কী হতে পারে তা জানার জন্য EIA গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ভেবে দেখুন, যে অঞ্চলে আগে থেকেই বেশ কিছু একই ধরণের বা ভিন্ন ধরণের শিল্প প্রকল্প চলছে সেখানে নতুন প্রোজেক্টটির ফলে পরিবেশের উপর প্রভাব তো শুধুমাত্র নতুন প্রোজেক্টির জন্য পড়বে না, পড়বে আগে থেকে চলা প্রোজেক্টগুলির সম্মিলিত প্রভাবের সাথে নতুন প্রোজেক্টের সম্মিলিত প্রভাব। অর্থাৎ, আলাদা করে নতুন প্রোজেক্টের প্রভাব বোঝার পাশাপাশি সম্মিলিত বা ক্যুমুলেটিভ ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টের গুরুত্ব অনেক বেশি। আন্তর্জাতিকভাবে একারণে ক্যুমুলেটিভ ইম্প্যাক্ট অ্যাসেস করাকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু, ভারতে হয় না। বরং, ভারত সরকার মোদি-শাহের আমলে কীভাবে EIA প্রক্রিয়াকে আরো সহজ ক’রে ছাড়পত্র দেওয়া যায় তার চেষ্টা করে চলেছে।

 

সাধারণত যে কোনো প্রোজেক্টকে ক্যাটেগরি এ এবং ক্যাটেগরি বি—এই দুইভাগে ভাগ করা হয়। সাধারণত বৃহৎ এবং বেশি প্রভাব পড়তে পারে যে প্রকল্পগুলি থেকে সেগুলি ক্যাটেগরি এ-তে রাখা হয়। ক্যাটগরি এ’র প্রোজেক্টগুলির ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের বিশেষজ্ঞ কমিটির ছাড়পত্র আনতে হয় আর ক্যাটেগরি বি’এর প্রোজেক্টগুলি স্টেট অথোরিটিই ছাড়পত্র দিতে পারে। এই সরকার এই ক্যাটেগরিটি পুনর্বিন্যাস করে নানা ক্ষেত্রে এমন কিছু সূচক নির্দিষ্ট করেছে যার ফলে ক্যাটেগরি বি’এর সীমা বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ যে প্রোজেক্টগুলিকে আগে স্টেট অথরিটি ছাড়াও কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের থেকে ছাড়পত্র আনতে হচ্ছিল তাদের অনেককেই নতুন ক্যাটেগরাইজেশনের পর শুধুমাত্র স্টেট অথরিটির ছাড়পত্র আনলেই চলবে। অর্থাৎ, বহু প্রোজেক্টের ক্ষেত্রে আর ‘ডাবল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স’-এর ঝক্কি রইল না, ‘সিঙ্গল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স’ ম্যানেজ করলেই কেল্লাফতে। বাস্তুতান্ত্রিকভাবে সংবেদী অঞ্চলের খুব কাছে কোনো প্রোজেক্ট করতে গেলে আগে যেখানে নিয়ম ছিল ১০ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে প্রোজেক্ট-এরিয়া হলে কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের পারমিশন লাগবে সেখানে ব্যাসার্ধ কমিয়ে ৫ কিমি করা হয়েছে। অর্থাৎ বাস্তুতান্ত্রিকভাবে সংবেদনশীল এলাকার মাত্র ৫ কিমি ব্যাসার্ধের মধ্যে শিল্প-প্রোজেক্টের জন্য স্টেট অথরিটির সায়ই যথেষ্ট! এই হচ্ছে মোদী সরকারের EIA সংক্রান্ত নতুন বিধি। এবার তাহলে আপনি ভাবুন ক্যুমুলেটিভ ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট আদৌ এখানে কতদূর সম্ভব। যেমন ঠুড়গা প্রকল্পের একদম কাছেই বামনি নদীর উপরে আগে থেকেই আরেকটি পাম্প-স্টোরেজ প্রকল্প চলছে Purulia Pumped Power Storage Project। ঠুড়গা নিয়ে ক্লিয়ারেন্স দেবার আগে উচিত ছিল সেইটির এতদিনকার প্রভাব এবং ঠুড়গায় পাম্প স্টরেজ প্রকল্প হলে তার সম্মিলিত প্রভাবের তুল্যমূল্য চর্চা। বলা বাহুল্য, এসবের কিছুই হয়নি। বাস্তুতান্ত্রিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি এলাকায় জঙ্গল সাফ করে একটা প্রকল্প এখন চলছে, তার গায়ের ওপর আরেকটাও শুরু করার তোড়জোড় চলছে। কী ক্ষয়ক্ষতি হবে তার কোনো সদর্থক বিচার না করেই ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিষদে জানতে গ্রাউন্ডজিরোয় প্রকাশিত ঠুড়গা বিষয়ক রিপোর্টটিতে চোখ বোলানো যেতে পারে।

 

বড়ো কর্পোরেটদের ব্যবসা করার যাবতীয় সুযোগ-সুবিধে করে দেওয়ার শপথ নিয়েই মোদি-সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। এমনকি তাদের নির্বাচনী ইস্তাহারেও সেই কথা লেখা ছিল। তারা কোম্পানিদের ‘পরিবেশগত ছাড়পত্র’ দেওয়ার জন্য যাবতীয় পদ্ধতিকে সরল এবং বিজনেস-ফ্রেন্ডলি করে তুলেছে। অনলাইনে পরিবেশগত ছাড়পত্রের আবেদন নেওয়ার ব্যবস্থা করা, দ্রুত ছাড়পত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি। ফলাফল, ২০১৪’র জুলাই থেকে প্রায় ১৫০০ প্রোজেক্টকে পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। EIA প্রক্রিয়াকে ক্রমাগত দুর্বল এবং নিছক ফর্মালিটির স্তরে নামিয়ে আনার সুবাদে শেষতম Environmental Performance Index (EPI)-এ ভারত শেষের দিক থেকে চতুর্থ হয়েছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে ২০১৬-তে যেখানে ১৪১ স্থানে ছিল, ২০১৮-তে এসে ১৭৭ তম স্থান অর্জন করেছে। ২০১৭’র মার্চে প্রকাশিত ক্যাগ (Comptroller and Auditor General of India (CAG) ) রিপোর্টেও এই কথা ধরা পড়েছে। EIA করতে দেরী, ক্যুমুলেটিভ ইম্প্যাক্ট কী হচ্ছে ভালো ক’রে তলিয়ে না দেখেই পরিবেশগত ছাড়পত্র দিয়ে দেওয়া, সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশিত জাতীয় নিয়ামক (National Regulator)-এর অধীনে পুরো প্রক্রিয়া না চালানো, দুর্বল পরিকাঠামো ইত্যাদি বিবিধ বিষয়কে তুলে ধরেছে ক্যাগ রিপোর্ট। আর অন্যদিকে পরিবেশ, অরণ্য এবং জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রক ২০১৯-এর জানুয়ারিতে নির্মাণ এবং পরিকাঠামো শিল্প এবং অঞ্চল উন্নয়ন প্রোজেক্ট—এই মুহূর্তের সবথেকে বেশি দুটি পুঁজি-বিনিয়োগ ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্র রুজু করার জন্য স্ট্যান্ডার্ড এনভায়রনমেন্ট ক্লিয়ারেন্স কন্ডিশন প্রকাশ করেছে। প্রতিটা ক্ষেত্রে EIA প্রক্রিয়া নামমাত্র, দুর্বল এবং নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হয়েছে। ক্যুমুলেটিভ প্রভাবের কোনো চর্চা করা হয়নি। প্রতিটা ছাড়পত্র দেবার আগে স্থানীয় অধিবাসীদের মতামত, জনশুনানিকে নিপুণভাবে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।

 

‘ক্লিন টেকনোলজি’

কারা যেন লিখেছিল মোদির রাজত্বে ‘শব কা সাথ, ‘শব কা বিকাশ’ হচ্ছে। তা যে খুব ভুল নয় তা তো গো-রক্ষার নামে পিটিয়ে মারা, দাঙ্গাপ্রবণ পরিস্থিতি তৈরি করা, প্রতিবাদী লেখক-বুদ্ধিজীবীদের খুন হওয়া, হিন্দু-উগ্রপন্থীদের বাড়বাড়ন্ত দেখেই মালুম হচ্ছে। কিন্তু, পরিবেশ প্রশ্নে মোদিজীর ‘স্বচ্ছ’ ভূমিকা দেখে বিস্মিত (নাকি বিষ-স্মিত!) এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তাপ-বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলি ‘ক্লিন টেকনোলজি’ গ্রহণ করার খরচ বহন করতে পারছে না। তাই ২০১৫ সালের রেগুলেশন অনুযায়ী নাইট্রোজেন এবং সালফার অক্সাইডের মত মারাত্মক দূষণ সৃষ্টিকারী গ্যাসগুলির নির্গমন রোধে যে উচ্চ-মাত্রা ঠিক করা হয়েছিল তা অগ্রাহ্য করে ৪০০’র বেশি তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রকে ওই ক্ষতিকর দূষিত গ্যাস নির্গমনের ছাড়পত্র দিয়েছে কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ২০১৭’র ডিসেম্বরে। এবং তাদের আরো পাঁচ বছর সময় দেওয়া হয়েছে পুরোনো পদ্ধতি বাতিল করে ‘ক্লিন টেকনোলজি’ গ্রহণ করার জন্য (পুরোনো তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির ক্ষেত্রে এই সময় সীমা দু’বছরের)। অর্থাৎ, তাপবিদ্যুৎ কোম্পানির টেকনলজি আধুনিক করার পয়সা নেই তো কী হয়েছে, দেশের লোকের ফুসফুস তো আছে। বিদ্যুৎ কোম্পানির বেওসা বাড়ুক, মুনাফা বাড়ুক আর দেশের লোক দূষণ গিলে খাক। খেয়াল করুন, ২০১৮’তে ‘দা হিন্দু’তে প্রকাশির এক প্রতিবেদনে একটি সমীক্ষা উদ্ধৃত করে দেখানো হয়েছে, বিশ্বের প্রথম ২০টি দূষিত শহরের ১৫টিই ভারতের। আর বাকি ৫টি? না, সেগুলোও বেশি দূরের নয়। এই মুহূর্তে সারা বিশ্বের সোর্স-হাব এই এশিয়ারই। দুটি পাকিস্তানের, দু’টি চিনের এবং একটি বাড়ির পাশের ঢাকা। প্রথম বিশ্বের ফেলে দেওয়া টেকনোলজিগুলো তো চলে এই সব দেশেই। চিনের গল্প ঈষৎ ভিন্ন। চিন বাদ দিলে ১৮টি শহরই এই ভারতীয় উপমহাদেশের। প্রথম বিশ্বের সস্তায় মুনাফা লোটার সুবর্ণভূমী। এই সমস্ত ফেলে দেওয়া, বাতিল, মারাত্মক দূষণ সৃষ্টিকারী প্রকল্পগুলির জন্য দেশের দরজা হাট ক’রে দিয়ে মোদিজী ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ নামিয়েছেন। আমাদের রক্ত-ঘামে তৈরি মুনাফা লুটবে বহুজাতিক হাঙরেরা। আমরাই ওই প্রযুক্তির বিষ-বাষ্পে ধুঁকব। তারপর আমাদেরই দুর্বল ফুসফুসের চিকিৎসার জন্য খোলা হবে কর্পোরেট হাসপাতাল বা দেওয়া হবে কর্পোরেট স্বাস্থ্যবিমা। দেশ বিক্রির নীল নক্‌শা আগের আমল থেকে তৈরি হলেও তার সফল রূপকার যে মোদিজী তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। যখন এসব চলছিল তখন তিনি আমাদের ‘মন কি বাত’ শুনিয়ে, গোমাতা-চাড্ডি-বিপ্লব দেবের জোক্‌স নিয়ে ব্যস্ত রেখেছিলেন…

 

অরণ্য নীতির নতুন অ্যামেন্ডমেন্ট

প্রকৃতি-পরিবেশ এবং প্রকৃতি-লগ্ন মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর সব থেকে বড় আঘাত আসতে চলেছে মোদি সরকার প্রস্তাবিত ভারতের অরণ্য নীতির নতুন অ্যামেন্ডমেন্টকে কেন্দ্র করে। অরণ্য এবং অরণ্য সম্পদ কর্পোরেট মুনাফার হাতে তুলে দেবার জন্য, অরণ্যক্ষেত্রকে পুঁজিকরণের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ক’রে দেবার জন্যই এই বদল আনা হচ্ছে। দীর্ঘ লড়াই-আন্দোলনের ফসল হিসেবে অরণ্যের অধিকার আইন, ২০০৬ যে আইনি অধিকার স্বীকৃত করেছিল অরণ্য ঘিরে থাকা মানুষের, সেই অধিকারগুলিও নতুন প্রস্তাবনায় খরচের খাতায় পরে যেতে চলেছে। অরণ্যে কোনো শিল্প-প্রজেক্ট হতে গেলে অরণ্যের অধিকার আইন মোতাবেক যে গ্রামসভার মান্যতা আবশ্যিক ছিল সেই গ্রামসভার অধিকার এবং ক্ষমতা ক্রমশ স্তব্ধ করার চেষ্টা চলছে নতুন প্রস্তাবনায়। আমলাতান্ত্রিক দখল জঙ্গলের ওপর যাতে আরো মজবুত হয়, আরো সহজে যাতে জঙ্গল সম্পদের বণ্টন কর্পোরেট-বেওসায়িদের হাতে তুলে দেওয়া যায় তার জন্য অরণ্য-গ্রাম-সমাজকে যাবতীয় নীতি-নির্ধারণের জায়গা থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নতুন প্রস্তাবনায় অরণ্যের ওপর ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের কর্তৃত্ব এবং ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট ‘অরণ্য বাঁচানোর’ জন্য প্রয়োজনে অরণ্যবাসী মানুষের জীবন-জীবিকার ওপর নিজ ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবে। দেওয়া হচ্ছে ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের রক্ষীদের আগ্নেয়ান্ত্র ব্যবহারের লাইসেন্সও। অরণ্য আধিকারিক অফিসারদের এতটাই ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে যে তারা অরণ্যবাসী মানুষের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এমনকি বিক্রিও করতে পারবে।

 

ভাবুন, অভিযুক্তের কোনো বিচার কোর্ট-আইনুকানুন মেনে হবার কোনো প্রয়োজন নেই, অরণ্যবাসীদের কাছে বনের অফিসার-আমলারাই সর্বোচ্চ আদালত এবং নিয়ামক! অরণ্যের অধিকার আইন অনুযায়ী অরণ্যবাসী মানুষ বা অরণ্য নির্ভর জীবন যে সব মানুষের তারা অরণ্যের ক্ষুদ্র প্রাকৃতিক উৎপাদনগুলি তাদের জীবিকা স্বার্থে ব্যবহার করতে পারতেন। কোনো কর দিতে হত না। নতুন প্রস্তাবনায় সমস্ত অরণ্য উৎপাদনেই কর বসানোর ক্ষমতা সরকার নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। গৌণ, মুখ্য এমন কোনো বিভাজন সেখানে নেই। নতুন প্রস্তাবনাটি মুখ্যত অরণ্যের অধিকার আইনকে খারিজ করার আইনি হাতিয়ার হিসেবে দেখলেই তা যথার্থ দেখা হবে। ভারতের অরণ্যবাসী, প্রকৃতি সংলগ্ন জীবন এবং যাপনে থাকা মানুষেরাই বিগত দশকে বহুজাতিক কর্পোরেটের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সে নিয়মগিরিই হোক, উত্তরবঙ্গের জঙ্গলই হোক বা পুরুলিয়ার অযোধ্যা। অরণ্যের অধিকার আইন অরণ্য বাঁচানোর লড়াইয়ে আইনি দিককে শক্তিশালী করেছে। এ’কারণেই অরণ্য আইনে বদল এনে অরণ্যের অধিকার খারিজ ক’রে অরণ্য এবং অরণ্য সম্পদ কর্পোরেট মাফিয়াদের কুক্ষিগত করে তোলার এত আয়োজন। আর এসবই হচ্ছে অরণ্য বাঁচানোর নাম ক’রে।

 

একথা স্মরণে রাখতে হবে এক শ্রেণির বড় গ্রিন এনজিও, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণবাদী গোষ্ঠি এহেন অগণতান্ত্রিক জনবিরোধী প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসের প্রস্তাবনায় সায় দিয়ে চলেছে। এখানেও আসলে কার্যকরী সেই ভাষ্য বা ন্যারেটিভ নির্মাণের প্রক্রিয়া, যা উপরিতলে একধরণের প্রকৃতি বাঁচানোর ছবি বড় ক’রে তোলে, রঙিন ক’রে তোলে এবং তার চাকচিক্যের বহর ভিতর দিকে তলিয়ে দেখতে দেয় না। মোদি সরকারের প্রতিটি নীতির মতোই তার পরিবেশনীতিই এরকমই ফাঁপা, ধ্বংসাত্মক এবং ‘বিকাশ’ তথা কর্পোরেট-ফ্রেন্ডলি। যা নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা, এই সরকারের, বিজেপি-সঙ্ঘপরিবারের সামগ্রিক রাজনৈতিক দর্শনের আলোচনা ব্যতিরেকে করা সম্ভব নয়। কিন্তু, এই লেখার পরিসর তা নয়।

 

উপসংহার

এমন ভেবে নেবার কোনো কারণ নেই, আগের সরকারের আমলে প্রকৃতি-পরিবেশ প্রশ্নে ভারতবর্ষ খারাপ ছিল না। নয়া-উদারবাদী অর্থনীতির প্রণয়ণের মুখ্য কথাই হল সস্তা শ্রম আর বেলাগাম দূষণ। এই দুয়ের মিলিত ককটেলেই সর্বাধিক মুনাফা তোলা যেতে পারে। আর তার সাথে আছে ভারতের বিপুল অরণ্য এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ক্যাপিটালাইজেশন বা পুঁজিকরণ। অর্থাৎ অর্থনীতির হিসেব-নিকেশের মধ্যে প্রাকৃতিক-অরণ্য-সম্পদের মূল্য নির্ধারণ, কেন-বেচা। এক জায়গায় প্রকৃতি ধ্বংস করে অন্য জায়গায় পুষিয়ে দেওয়া—অর্থনীতির মানদণ্ডে। অর্থাৎ আপনি এক জায়গায় যে মূল্যের প্রকৃতি ধ্বংস করলেন অন্য জায়গায় সম মূল্যে পুষিয়ে দিলেই চলবে। আভিধানিক ভাষায় একে বলে বায়োডাইভার্সিটি অফসেটিং। এরই হাত ধরে আসে অরণ্যায়নের প্রসঙ্গ। অর্থাৎ এক জায়গায় অরণ্য ধ্বংস করে অন্য জায়গায় অরণ্য ‘বানিয়ে’ দিলেন। অরণ্য যে ‘বানানো’ যায় না সে কথা এখানে উহ্য। আপনাকে অর্থনীতির মানদণ্ডে ‘বানিয়ে’ দিতে হবে। যেমন ঠুড়গা প্রকল্পের অরণ্য ধ্বংসের ক্ষতিপূরণ-অরণ্যায়ন হবে জলপাইগুড়ি জেলায়। এবার আপনি ভাবতেই পারেন, ঠিক আছে একজায়গায় তো হল। এখন যে সমস্ত মানুষেরা ঠুড়গা প্রকল্প এলাকায় অরণ্য-নির্ভর জীবন কাটান তাঁদের জীবন-জীবিকার জন্য সরকার অযোধ্যা-টু-জলপাইগুড়ি রেগুলার-বুলেট-ট্রেন প্রকল্প ঘোষণা করবে কীনা সে কথাও উহ্যই থাক! মোদ্দা কথা হল, আগের সরকারের আমলে ঠিক যে যে কারণের জন্য প্রকৃতি বিকিয়ে দেওয়ায় সমস্যা হচ্ছিল মোদি সরকার এসে সেই সমস্যাগুলো মিটিয়ে দেবার আপ্রাণ চেষ্টা করেছে গত পাঁচ বছরে। কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রককে একটি হাস্যকর সংস্থায় পরিণত করেছে, যাদের কাজ পরিবেশের লোকদেখানি রক্ষার থেকেও বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে দূষণ সৃষ্টিকারী, প্রকৃতি ধ্বংসকারী কোম্পানিদের ছাড়পত্র দেওয়া। আর যাবতীয় মিথ্যে ভাষ্য প্রচারের মধ্যে দিয়ে সাধারণ আম-জনতাকে এসব থেকে দূরে রাখার জন্য আছে গোয়েবলীয়-মিডিয়া-মাস্টারেরা এবং আর-এস-এসের অসংখ্য প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য শাখা সংগঠন।

 

স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ নামে আর-এস-এস পরিচালিত একটি মঞ্চ আছে যারা নাকি দেশীয় বীজের প্রসার, জিন-বদলানো বীজের বিরোধিতায় আন্দোলন ক’রে। স্বদেশের পরিবেশ-প্রকৃতি রক্ষায় তারা নাকি ভূমিকা নেয়। মোদি সরকারের এই যাবতীয় প্রকৃতি-ধ্বংসের নীল নকশা নিয়ে তাদের একটাও কথা আপনি শুনতে পাবেন না। ভারতের রাজনৈতিক শক্তিরা এখনো প্রকৃতি-পরিবেশকে একটা মুখ্য বিষয় বলে ভেবে ওঠার জায়গায় নেই। তাই তাদের যাবতীয় নির্বাচনী প্রচারে কোথাও পরিবেশ বিষয় নিয়ে ন্যূনতম কোনও কথাও আপনি খুঁজে পাবেন না। ভোটের রাজনীতিতে তাই প্রকৃতি-পরিবেশ প্রশ্নের কোনো ভ্যালু নেই। বুলেট ট্রেনের জন্য ৫৩০০০ ম্যানগ্রোভ কাটা পড়ুক, কেন-বেতোয়া নদী সংযুক্তি হলে ৪০০০-এর অধিক হেক্টরভূমির পান্না টাইগার রিসার্ভ ধ্বংসের মুখে পড়ুক, উত্তরাখন্ডে ট্যুরিস্ট-তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে হাইওয়ে বানানোর জন্য ২৫,০০০ গাছ কাটা পড়ুক, ছত্তিশগড়ের জঙ্গল কয়লা খনির জন্য উজাড় হয়ে যাক কিংবা অযোধ্যা পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য মুছে যাক—ভারতের সংসদীয় বড়ো রাজনৈতিক খেলোয়াড়দের তাতে কীই বা আসে যায়…।

 

আসলে, সব-কা-সাথ সব-কা-ভিকাশ হলে সকলেই খুশি… মোদিজী, আর-এস-এস, সঙ্ঘপরিবার এবং অতিজাতিক-বহুজাতিক কর্পোরেটেরা সেটা ভালোই বোঝেন।

 

প্রকৃতি-পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রশ্নে ‘ভিকাশ’/’উন্নয়ন’/’শিল্পায়ন’-এর এজেন্টরা কিছু করবে না। একথা বুঝে নেবার দিন এসে গেছে।

 

সূত্রঃ

https://www.hindustantimes.com/india-news/goa-s-coconut-grows-from-grass-to-tree/story-CQvaJw86KIHqo3TX8IxVGL.html

https://www.ecologise.in/2019/05/02/how-the-narendra-modi-government-is-diluting-green-clearance-norms/

https://www.thehindu.com/sci-tech/energy-and-environment/fifteen-of-the-20-most-polluted-cities-in-the-world-are-in-india/article26440603.ece

https://scroll.in/article/864715/special-report-how-the-government-ignored-the-cost-of-pollution-and-undermined-its-clean-air-rules

https://www.business-standard.com/article/economy-policy/dirty-clusters-to-grow-as-pollution-index-is-tweaked-114071801212_1.html

https://www.groundxero.in/2018/10/17/new-hydro-project-at-ajodhya-hills-recipe-for-a-disaster/

https://www.groundxero.in/2018/06/05/another-june-5-celebrating-environment/

https://theprint.in/opinion/environment-is-the-most-under-reported-failure-of-narendra-modi-government/223670/?utm_source=TPweb&utm_medium=1sig&utm_campaign=browser

https://www.downtoearth.org.in/news/forests/moef-releases-draft-national-forest-policy-2018-59898

https://www.downtoearth.org.in/news/forests/extensive-amendment-to-forest-law-will-dehumanise-forests-64046

https://www.bjp.org/en/manifesto2019

 

The author is an environmental activist.

Share this
Recent Comments
2
  • comments
    By: Manik Samaddar on May 19, 2019

    I would like to join this group because Environment is my area of of interest !

  • comments
    By: groundxero on May 25, 2019

    Hi, thanks for expressing interest! Could you send your email address/phone number to our email: groundxero2018@gmail.com

    We will contact you ASAP.

    Thanks,
    GX team

Leave a Comment