মে দিবস দিচ্ছে ডাক যৌনকর্মী অধিকার পাক


  • May 1, 2019
  • (0 Comments)
  • 256 Views

 

চলছে লোকসভা নির্বাচন। এক দশকেরও বেশি সময় নিজেদের দাবী-দাওয়া লোকসভা, বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে পৌঁছে দেন এই যৌনকর্মীরা। কিন্তু রাজনৈতিক দলের ইস্তেহারে ঠাঁই হয় না সেগুলির। শুধু ভোটব্যাঙ্ক হয়ে থাকতে তাই এবার নারাজ সোনাগাছির যৌনকর্মীরা। মে দিবসের প্রাক্কালে যৌনকর্মী, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মহিলা সকলে মিলে দখল নিলেন কলকাতার রাজপথের। লিখেছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী 

 

 

লক্ষ্মী মল্লিকের হাসি যেন বাঁধ মানছিল না। শরীরী ভাষায় যে উৎসাহ আর আনন্দ ধরা পড়ছিল তা লিখে বোঝানো যায় না। ‘গতর খাটিয়ে খাই শ্রমিকের অধিকার চাই’- এই একটি শ্লোগান দিচ্ছিলেন গলার সব জোর এক করে। ভবানিপুরে বাড়ি। সল্টলেক-এ মাছ কাটার কাজ করেন এখন। পারিবারিক আর্থিক অবস্থার কারণে উপার্জনের জন্য বেরিয়েছিলেন। আয়ার কাজ দিয়ে শুরু করে, মাঝে যৌনকর্মীর পেশার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছিলেন। তারপর দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির বিকল্প রোজগারের উদ্যোগে পেয়েছেন এখনকার এই কাজ। “মিছিলে এসে ভালো লাগবে না দিদি! এই যে আমরা এত মেয়েরা সব রাস্তায় নেমেছি…সত্যিই তো গতর খাটিয়ে কাজ করছি। সংসার চালাচ্ছি। সবাই মিলে এই যে হাঁটছি খুব আনন্দ হচ্ছে,” এক গাল হেসে লক্ষ্মীর বক্তব্য।

 

অধিকারের জন্য মিছিল। শ্রমিকের অধিকার। মে দিবসের প্রাক্কালে যৌনকর্মী, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মহিলা সকলে মিলে দখল নিলেন কলকাতার রাজপথের। গত বহু বছর ধরেই দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির উদ্যোগে ৩০শে এপ্রিল পয়লা মে-এর শ্রমদিবস উদ্‌যাপনের জন্য এই মিছিলের আয়োজন করা হয়। যৌনকর্মীদের গত দু’ দশকেরও বেশি সময় ধরে শ্রমিকের স্বীকৃতি ও তাঁদের অধিকারের দাবীতে যে লড়াই চলছে তারই অবিচ্ছেদ্য অংশ এই মিছিল।

 

সময় যত এগিয়েছে যৌনকর্মীদের এই মিছিলের সঙ্গে জুড়ে গেছে শ্রমজীবী মহিলা, গৃহশ্রমিক মহিলা, অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলা শ্রমিকদের অধিকার আন্দোলনের দাবি-দাওয়া। যে মহিলারা শরীরের রক্ত জল করে পরিশ্রম করেন ও সেই পেশার পরিচয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চান, তাঁদের সকলের আন্দোলন ক্রমেই জোট বেঁধেছে, এই মিছিলের পরিসরও বড় হয়েছে। এ বছরের মিছিলই ছিল তার প্রমাণ।

 

উত্তর ২৪ পরগণা থেকে এসেছিলেন হাসিনা বিবি, সঙ্গে ছিলেন ঐ অঞ্চলের ৬০ জন যৌনকর্মী। হাসিনা নিজে ২০০১ থেকে এই আন্দোলনের সঙ্গী, নিজেও একজন যৌনকর্মী। মিছিলের আগে জমায়েতে বললেন, “যতদিন না আমরা পেশার স্বীকৃতি পাব, ততদিন আমাদের লড়াই থামবে না। এই মিছিলও বন্ধ হবে না। আমরা তো সকলেই সেই চেষ্টাই করছি। আমাদের সন্তানেরা যেন কোনওরকম অপমান, বঞ্চনার শিকার না হয় তার জন্যও আমাদের লড়াই চলবে। প্রতি বছর মে দিবসে তাই আমাদের মিছিল হবেই।”

 

 

টি-শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার-এ সেজেছিলেন ফিরোজা। চোখ টানছিল তাঁর পিঠে আঁকা যৌনপেশার স্বীকৃতির ট্যাটু। আট, ন’বছর এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। গত পাঁচ, ছয় বছর ধরে হাঁটছেন এই মিছিলে। কোনওভাবেই যাতে তাঁদের অধিকারের লড়াই থেমে না যায়, তারজন্যই এই মিছিল জরুরি বলে মনে করেন ফিরোজা আর সেইজন্যই সবার সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে পথ হাঁটা।

 

শেফালী রায় এই আন্দোলনের বহুদিনের সাথী। সোনাগাছিতে পরিচিতজনের সঙ্গে তাঁর হাসিমুখ ব্যবহার চোখ টানবেই। মাথায় টুপি, হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাঁটছিলেন শেফালী। জানালেন, “শ্রমিক দিবসে আমাদের তো পথে নামতেই হবে। সুস্থভাবে যাতে পেশা করতে পারি, বাচ্চাদের যাতে ঠিকভাবে মানুষ করতে পারি, তারজন্যই তো আমাদের লড়াই। সেই ২০০৪ সাল থেকে এই লড়াই চলছে। আমরা চাই আমাদের কাজকেও আর পাঁচটা কাজের মতোই মনে করা হোক।”

 

এ কথা ঠিক, পয়লা মে যে মে দিবস, শ্রমদিবস সে বিষয়ে মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের কিছু জন হয়তো অবগত ছিলেন না। কিন্তু এই না জানা লজ্জার নয়। কারণ তাঁরা নিজেদের লড়াইটা জানেন। জানেন তাঁদের শ্রমের প্রতিটি বিন্দুতে লেখা আছে তাঁদের অধিকারের কথা, সম্মানের কথা। আর তাই প্রতি বছরের এই মিছিলের জন্য তাঁরা অপেক্ষায় থাকেন। এর যে একটি আলাদা গুরুত্ব আছে তাও বোঝেন। এই জানা ও বোঝার প্রতি নাগরিক সমাজের শ্রদ্ধাশীল থাকা প্রয়োজন। যেমন মিছিলে হাঁটা কল্পনা দাশ বললেন, “বেআইনি উপায়ে আমাদের ব্যবসা বন্ধ করতে চায়, আমাদের অপরাধী বলতে চায়, পুলিশ আমাদের উপর যে জুলুম চালায়, সেই সবই আমরা বন্ধ করতে চাই।”

 

গৃহশ্রমিক অধিকার আন্দোলনের সংগঠন দুর্বার দিশা-র সদস্য বেবি মিছিলে হাঁটতে হাঁটতেই বললেন, “এই মিছিলে আমরা সব দিদি-বোনেরা একসঙ্গে হাঁটি। প্রত্যেকের অধিকারের দাবীই সকলের দাবী। আমরাও রয়েছি যৌনকর্মী দিদিদের সংগ্রামের সাথী হয়ে। আর এই যে শ্রমিকের স্বীকৃতির দাবী এ তো আমাদের অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদেরও দাবী। তাই একসঙ্গে তো থাকতেই হবে।”

 

এদিন সোনাগাছির শীতলা মন্দিরের সামনে থেকে দীর্ঘ পথ হেঁটে মিছিল পৌঁছায় শ্রদ্ধানন্দ পার্ক-এ। মিছিলের মাঝপর্বে মশাল-মিছিলও হয়। এই মিছিলে প্রতিবারের মতো অংশ নিয়েছিল যৌনকর্মীদের সন্তানদের সংগঠন ‘আমরা পদাতিক’, তাদের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘কোমলগান্ধার’, রূপান্তরকামীদের সংগঠন ‘আনন্দম’-এর সদস্যরাও। আসলে সকলের দাবিই যে এক – সমাজের তথাকথিত মূলস্রোতে কোনও বিভাজন ছাড়া সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার, পেশা ও শ্রমের স্বীকৃতি।

 

বিউটি দাশ এসেছিল মা জ্যোৎস্না দাশের সঙ্গে, হাতে প্ল্যাকার্ড, মুখে এক অদ্ভূত ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া। জ্যোৎস্না জানালেন গত ১৩ বছর যৌনকর্মীর পেশার সঙ্গে যুক্ত, তাঁর পরিবারের সবাই জানেন তাঁর পেশার কথা, লুকিয়ে রাখেননি তিনি। বিউটি মাথা উঁচু করে বলল, “আমি যৌনকর্মীর সন্তান। এ কথা বলতে, এই মিছিলে এসে আমার গর্ব হয়।” পড়াশোনা ছাড়া আর কী কর জানতে চাওয়ায় এই বালিকা জানাল সে ক্যারাটে শেখে। কেন? “বড় হয়ে আর্মি হব।”

 

 

কালনা, শান্তিপুর থেকেও এসেছিলেন যৌনকর্মীরা। শুধু মিছিলে অংশ নেবেন বলে সকালের ট্রেনে এসে আবার রাতেই ফেরার ট্রেন ধরবেন। পথের ধকল সামলিয়েও দীর্ঘ মিছিলে সকলের হাসি মুখ, “দুর্বার তো আমাদেরই। মিছিলে তো আসতেই হবে।”

 

নিজের পেশার প্রতি এই নারীদের রয়েছে পূর্ণ আস্থা। তাই মিছিলে অধিকাংশেরই মুখ আবরণহীন, সেই মুখে স্থির প্রত্যয়ের ছাপ, ছবি তুলতে বা নাম বলতেই কোনওই আপত্তি নেই। যাঁরা হয়তো এখনও অস্বস্তি কাটিয়ে উঠতে পারেননি, তাঁদের মনোবল দিচ্ছেন সাথীরাই। মুখ ঢেকে নয়, নিজেদের পরিচয়েই যে পেশার স্বীকৃতির লড়াই লড়তে হয়, তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন ধৈর্য ধরে।

 

তবে এ বছরের মিছিল আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। চলছে লোকসভা নির্বাচন। এক দশকেরও বেশি সময় নিজেদের দাবী-দাওয়া লোকসভা, বিধানসভা নির্বাচনের আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে পৌঁছে দেন এই যৌনকর্মীরা। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ইস্তেহারে ঠাঁই হয় না সেগুলির। শুধু ভোটব্যাঙ্ক হয়ে থাকতে তাই এবার নারাজ সোনাগাছির যৌনকর্মীরা। সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন নোটা করার। এমতাবস্থায় এই মিছিলের কি আলাদা কোনও গুরুত্ব তৈরি হল?

 

 

শেফালী রায় যেমন বললেন, “আমাদের দীর্ঘদিনের দাবিদাওয়া কেউ শোনে না, শুধু ভোটের আগে তাদের দেখা পাওয়া যায়। আমাদের অবস্থা না বদলালে ভোট কেন দেব? তাই নোটা-ই করব।” হাসিনা বিবির সাফ কথা, “আমরা তো সরকার থেকে স্বীকৃতি চাইছি। এতদিনের লড়াই নেতাদের চোখে পড়ে না! আমরা শ্রমিকের অধিকার পাচ্ছি না, আমাদের বাচ্চারা শিক্ষা ও জীবিকার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তাহলে আমাদের ভোট দিয়ে কী লাভ? কেন ভোট দেব?” রূপান্তরকামী অধিকার আন্দোলনের সদস্য নিতাই গিরি’র কাছে কোনও দলের নির্বাচনী ইস্তেহারে যৌনকর্মীদের দাবীর উল্লেখ না থাকার কথা বলায় উত্তেজিত হয়ে বললেন, “কেন আসবে না? কিসের জন্য আসবে না? এরা চোর না ডাকাত না কারওর ছিনিয়ে খাচ্ছে। এরা গতর খাটাচ্ছে, তার বিনিময়ে কিছু পাচ্ছে। আমার মতে ম্যানিফেস্টোতে আসা অবশ্য দরকার ছিল। আমরা যে প্রত্যেক বছর ভোট-টা দিই, কাদেরকে দেখে দিই? কাওকে দেখে দিই, যে আমাদের কথা বলবে, আমাদের হয়ে লড়বে, আমাদের সুবিধা-অসুবিধা-দুঃখ-কষ্ট সব বুঝবে। তো তারা যখন সেটা শোনে না, বোঝে না, সেই জায়গায় আমাদের মনে হয় ভোটটাকে বয়কট করাই উচিত। এই দিনটা প্রতি বছর বেছে নিয়ে আমরা হাজার হাজার মানুষ আমাদের অধিকারের কথা বলি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো আমাদের জন্য কী করেছে? শুধু ভোটের আগে আসে, বড় বড় কথা বলে চলে যায়। বছরের পর বছর কিছুই করে না। তাই ভোট চলাকালীন আমাদের এই মিছিল তাদেরও চোখে পড়বে আশা করি।” রমা দেবনাথ বললেন, “ভোটের যে গুরুত্ব আছে, তা দলগুলো বুঝছে, অথচ যারা ভোট দিচ্ছে তারা যে তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, স্বীকৃতি পাচ্ছে না সে দিকে নজর নেই। তাই আমরাও এই কথাটা পৌঁছিয়ে দিয়েছি যে এত বছর ধরে ভোট হচ্ছে, আমরা আমাদের কথা পৌঁছেও দিচ্ছি, কিন্তু কোনও কিছু হচ্ছে না। এবারেও যদি কিছু না হয় আমরা নোটা করব, ভোট দেবই না। এই পরিস্থিতিতে আমাদের এবারের মিছিল গুরুত্বপূর্ণ তো বটেই!”

 

“আমরা ভোটের আগে প্রত্যেক দলের সাংসদের কাছে আমাদের সাত দফা দাবী নিয়ে গেছি। বলেছি যে আমাদের কথা ভাববে, আমরা তাকে ভোট দেব। আর যদি আমাদের দাবীদাওয়া না মানে নোটা করব। এটা বহু বছর ধরে আমরা বলছি, কিন্তু কখনওই কোনও সাড়া পাইনি। সব সাংসদই কথায় বলেছেন যে তারা জিতে আসলে আমাদের দেখবেন। কিন্তু সেই আশ্বাসে আস্থা রাখতে পারছি না। আমরা যে দাবীগুলো নিয়ে গেছি তা হল – আমাদের যৌনপেশাকে পেশার স্বীকৃতি দেওয়া হোক, আমাদের শ্রমিকের স্বীকৃতি দেওয়া হোক তা হলে সরকারের তরফ থেকে শ্রমিকের সুযোগ-সুবিধা আমরাও পাব, আমাদের উপর আলাদা করে চাপানো আইপিটিএ আইন বাতিল হোক, ৪৫ বছরের উর্দ্ধে যে যৌনকর্মীরা তাদের বার্ধক্যভাতা দেওয়া হোক, পুলিশের জুলুম বন্ধ হোক, আমাদের বাচ্চারা স্কুল-কলেজে ভর্তি হতে গেলে যে হেনস্থা হয়, যে ড্রপ-আউট হয়ে যায় তাও যেন বন্ধ হয়। আমরা শ্রমিক হিসাবেই মে দিবসের এই র‍্যালি করে আসছি। গত ২৫ বছর ধরে আমরা দাবি-দাওয়া পৌঁছে দিচ্ছি কিন্তু কিছু হচ্ছে না। আমরা সংসদে যাঁরা যাচ্ছেন তাঁদের কাছে আমাদের অনেক আশা। যদি কেউ আমাদের জন্য ভাবেন, নিশ্চয়ই তাদের ভোট দেব, নাহলে নয়। আমরা তো ভোটার, দেশের নাগরিক, ভোট তো দিতেই চাই। এখনও আশা রাখি…,” বললেন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির সচিব কাজল বোস।

 

নির্বাচন আসে যায়, কিন্তু অধিকার আন্দোলন থেমে থাকে না। যৌনকর্মী ও শ্রমজীবী মহিলাদের শ্রমদিবস উদ্‌যাপনের মিছিলের বহুস্বর আর দৃপ্ত প্রত্যয় তারই প্রমাণ, যেখানে শ্লোগানে কেঁপে ওঠে নিশ্চিন্ত নাগরিক জীবন – “মে দিবস দিচ্ছে ডাক/ যৌনকর্মী অধিকার পাক”, “সারা দুনিয়ার নারী মজদুর, যৌনকর্মী এক হও”।

 

লেখক সাংবাদিক এবং ডকুমেন্টারি নির্মাতা। ছবির সুত্রঃ লেখক। 

 

Share this
Leave a Comment