মোদির রাজত্বে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ক্রমে নিম্নমুখী


  • April 20, 2019
  • (0 Comments)
  • 255 Views

 

বিশ্ব জুড়ে সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে শাসকের আক্রোশ বেড়ে চলেছে। আমাদের দেশ তার ব্যতিক্রম নয়। ‘প্রেস ফ্রিডম ইন্ডেক্স’ অনুযায়ী ২০১৯ সালে ভারতে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক গত বছরের তুলনায় দু’ধাপ নীচে নেমেছে। ১৮০টি দেশের মধ্যে এ দেশের স্থান ১৪০। ভারতের হালহকিকত নিয়ে গ্রাউন্ডজিরো একটি রিপোর্ট।

 

অবনমন অব্যাহত। ২০১৯ সালের ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্স অনুযায়ী ১৮০টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ১৪০ তম। গত বছরের তুলনায় দু’ধাপ নীচে। বিগত চার বছর ধরেই এই অধঃপতনের ট্র‍্যাডিশন বজায় রেখেছে মোদির ভারত। বিগত চার বছরে ভারতে সাংবাদিকতার নিম্নমুখীনতার পর্যায়টি এরকম – ২০১৬ঃ ১৩৩; ২০১৭ঃ ১৩৬; ২০১৮ঃ ১৩৮; ২০১৯ঃ১৪০। বিগত পাঁচ বছরে দেশের তাবড় সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের উপর বার বার আঘাত নেমে এসেছে, আক্রান্ত মৌলিক অধিকার, সর্বোপরি ভারতীয় বোধ, ভারতীয়ত্বের বৈচিত্র্যপূর্ণ ধারণাটাই আজ সঙ্কটের মুখে। সাংবাদিকের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতার এই ক্রমপতন তারই সঙ্গে যেন পূর্ণতই সাযুজ্যপূর্ণ।

 

সম্প্রতি রাফাল মামলায় ‘দ্য হিন্দু’ সংবাদপত্রে প্রকাশিত নথি বিষয়ক প্রশ্নে এক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এই রায়ে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বিচারপতিরা। ‘চুরি’ যাওয়া নথি প্রকাশের যৌক্তিকতা বিষয়ে রায়ে বলা হয়েছেঃ

 

“No question has been raised and, in our considered opinion, very rightly, with regard to the publication of the documents in ‘The Hindu’ newspaper. The right of such publication would seem to be in consonance with the constitutional guarantee of freedom of speech.”

 

সংবাদপত্রের এই স্বাধীনতা ভারতে প্রতি মুহূর্তেই লঙ্ঘিত হচ্ছে। বিশেষ ভাবে দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত সংবাদপত্রের সাংবাদিকরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন বলে ‘রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডাস’ -এর রিপোর্টে অভিযোগ। ২০১৮ সালে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে পাঁচ জন সাংবাদিকের। রিপোর্টে অভিযোগ তোলা হয়েছে, সাংবাদিকরা হিন্দুত্ববাদীদের  সমালোচনা করলে সমাজ মাধ্যম জুড়ে তাদের বিরুদ্ধে দলবদ্ধভাবে হেট ক্যাম্পেন চালানো হচ্ছে। ২০১৮ সালের রিপোর্টেও ভারতে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা খর্বের জন্য ‘মোদির ট্রোল ব্রিগেড’কে মুখ্যত দায়ী করা হয়েছিল।

 

শুধু ট্রোল ব্রিগেড নয়, মণিপুরে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকার এবং মুখ্যমন্ত্রীর সমালোচনা করায় সাংবাদিক  কিশোর চন্দ্র ওয়াংখেমকে জাতীয় নিরাপত্তা আইনে (এনআইএ) গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় পাঁচ মাস আটক থাকার পর মণিপুর হাইকোর্ট সম্প্রতি তাকে বেকসুর খালাস করে দেয়। কয়েকদিন আগেই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক অসমের চার জন সম্পাদক এবং একটি নিউজ চ্যানেলের বিরুদ্ধে আর এস এস অনুগামী এক সংগঠনের অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। অসম পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল কুলাধর শইকিয়া এবং স্বরাষ্ট্র সচিব আশুতোষ অগ্নিহোত্রীকে এই তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন প্রতিদিন টাইমস -এর প্রধান সম্পাদক নিতুমণি শইকিয়া, অসমিয়া প্রতিদিন -এর প্রাক্তন সম্পাদক মনজিৎ মহান্ত, প্রাগ নিউজ চ্যানেলের সম্পাদক অজিত কুমার ভূঁইয়া এবং নিউজ পোর্টাল ইনসাইডএনই-র সম্পাদক আফ্রিদা হোসেন। অভিযোগ পত্রে নিউজ এইট্টিন আসামও রয়েছে। প্রধানত সিটিজেনশিপ (য়্যামেন্ডমেন্ট) বিল-এর তীব্র বিরোধিতা করার জন্যই এই সম্পাদকেরা আর এস এস ও বিজেপি সরকারের চক্ষুশূল হয়ে পড়েছেন। যদিও এর সঙ্গে এ অভিযোগও জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে, ‘সংবাদমাধ্যম সৃষ্ট অস্থিরতা’র জন্য আলফা’র মতো জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেওয়ার মাত্রা বেড়ে গিয়েছিল। এবং সে খবর এই সংবাদমাধ্যমগুলি প্রচারও করে। সম্পাদকদের দাবি সম্পাদকীয় নীতি ও অবস্থানের উপর চাপ সৃষ্টি এবং ‘চুপ’ করিয়ে দেওয়ার জন্য এই তদন্তের নির্দেশ জারি করা হয়েছে। সম্পাদক এবং সংবাদমাধ্যমগুলি তদন্তের এই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছে।

 

একই ভাবে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কাশ্মীরের প্রধান দুই দৈনিক সংবাদপত্র গ্রেটার কাশ্মীর ও কাশ্মীর রিডার-এ সমস্ত ধরনের রাজ্য সরকারি বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুলওয়ামা কাণ্ডের পর পরই কোনও সরকারি বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই এই নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যায়। ২২ ফেব্রুয়ারি সংবাদপত্র দুটি খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারে ‘উচ্চপদস্থ আধিকারিক’-এর নির্দেশে বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এই দুটি সংবাদপত্রের উপর সেপ্টেম্বর ২০১৬ থেকে ডিএভিপি’র বা কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞাপন পাওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। এর আগেও সরকারের কড়া সমালোচক এই দুই সংবাদপত্রের প্রকাশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে একদিন কাশ্মীরের ইংরেজি ও উর্দু দৈনিকগুলি প্রথম পাতা সম্পূর্ণ খবর-শূন্য অবস্থায় প্রকাশ করে। এও একজাতীয় চাপ যাতে সরকারি নীতির বিরোধিতা কিংবা সমালোচনা থেকে সংবাদপত্রগুলি সরে আসে। কাশ্মীরে সাংবাদিকতা এক দুঃসাধ্য কাজ। তারও ইঙ্গিত দিয়েছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার।

 

Cover image courtesy : ALIVE, all other images from www.rsf.org

Share this
Leave a Comment