উচ্ছেদের রায়ে বিপন্ন ৮৬ হাজার বনবাসী। নির্বাচনী ইস্তাহারে শ্মশানের নীরবতা।


  • April 10, 2019
  • (0 Comments)
  • 759 Views

কী উত্তরবঙ্গ, কী সুন্দরবন বা জঙ্গলমহলে বনাধিকার আইনের সার্থক প্রয়োগ, বনবাসীদের উচ্ছেদের কেন্দ্রীয় ও আইনি চক্রান্ত্রের বিরোধিতা, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহারে স্থান পায় না। অতঃপর বনবাসীদের বুঝটা তাদেরই বুঝে নিতে হবে। বুঝিয়েও দিতে হবে। লিখছেন দেবাশিস আইচ

 

 

ভারতের বনাঞ্চলে ব্রিটিশ শাসন ফিরিয়ে আনতে তৎপর মোদি সরকার। নয়া মোড়কে মুড়ে ঔপনিবেশিক আইনের নয়া খসড়া প্রস্তুত। ১৮৭৮ সালে আইনের বলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ বনের দখল নিয়েছিল। তার সঙ্গে সঙ্গেই সব অধিকার হারিয়ে নিজ দেশে, নিজ বনে পরবাসী হয়ে পড়েছিল লক্ষ লক্ষ আদিবাসী, বনবাসী। এবার ১৯২৭ সালের আর এক ঔপনিবেশিক বন আইনকে ঢেলে সাজিয়েছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। আর ঢেলে সাজানোর নামে — বিশেষজ্ঞরা বলছেন — আইনে যোগ করা হচ্ছে আরও বেশি পেশি, আরও বেশি বেশি নখ-দাঁত। যাতে বনবাসীদের যাবতীয় অধিকারের দাবিকে আঁচড়ে-কামড়ে ফালাফালা করে দেওয়া যায়। ছড়রা বন্দুকের দিন শেষ, আইনের খসড়ায় বনের পাহাড়াদারদের জন্য আধুনিক মারণাস্ত্র ব্যবহারের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আর আইনরক্ষার নামে গোলাগুলিতে যদি কোনও বনবাসীর প্রাণও যায় তবে অভিযুক্ত আধিকারিককে সরাসরি গ্রেপ্তার করা যাবে না।বনে বেআইনি কাজের অভিযোগে ধরা পড়লে অভিযুক্তকেই প্রমাণ করতে হবে সে নির্দোষ। রাজ্য সরকারের কাঁধে দায়িত্ব পড়বে বনে লক-আপ সেল, লাঠি-সোঁটা, গুলি-গোলা, বন্দুক, কাঁদানে গ্যাস, ওয়ারলেস ব্যবস্থা সহ বন-থানা গড়ে তোলার।বনে যেন জারি হতে চলেছে আফস্পার পকেট সংস্করণ। এই পুলিশি ও আধা-বিচার ব্যবস্থার নিষ্ঠুর আইনের বলে বন পরিচালনার সব ক্ষমতা ফের তুলে দেওয়া হবে বনকর্তাদের হাতে। তারাই হয়ে উঠবে বনের হর্তাকর্তাবিধাতা। বন আর বনবাসীরা তাদের বলির পাঁঠায় পরিণত হবে, তাদের ল্যাজে কাটবে না মাথায়, তা হবে বনআমলাদের মর্জিমাফিক। আর এই সবই হবে কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশ মন্ত্রকের অঙ্গুলিহেলনে। প্রশাসনিক কিছু বিষয়ে এমনও কিছু ব্যবস্থার প্রস্তাব রাখা হয়েছে যেখানে রাজ্য সরকারের রা কাড়ার সুযোগ থাকবে না।

 

অর্থাৎ, এই যে ফরেস্ট রাইট  অ্যাক্ট বা বনাধিকার আইন ২০০৬, যার বলে বনবাসীদের অরণ্যের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল, স্বীকার করা হয়েছিল সেই ব্রিটিশ যুগ থেকে আজ পর্যন্ত অরণ্যবাসীদের উপর ‘ঐতিহাসিক অন্যায়’ করা হয়েছে — সে আইন সমূলে উপড়ে দিতে কেন্দ্রীয় সরকার যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। বন আইন ২০১৯-এর মধ্য দিয়ে ফের বনবাসীদের উচ্ছেদের নীল নকশা প্রস্তুত। গত ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট প্রায় ১১.৮ লক্ষ বনবাসীকে উচ্ছেদ করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে। বনবাসীদের বিরুদ্ধে কারা এই মামলা করেছিল? সহজ কথায় বনাধিকার আইন যাদের কাছে চক্ষুশূল, আদিবাসী, দলিতদের যারা মনে করে অনুপ্রবেশকারী, দখলদার, বন ও পশুপাখির দুশমন তারাই এই মামলার হোতা। আপাতত কেন্দ্রের আবেদনের ভিত্তিতে এই রায় স্থগিত রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের সুপ্রিম কোর্টে দ্বারস্থ হওয়ার কারণ স্রেফ সংসদীয় নির্বাচন। ভোটের মুখে আদালতের রায়কে সাময়িক ধামাচাপা দেওয়ার প্রয়াস। কেন্দ্র তো চায়, ওডিশা, ঝাড়খণ্ড, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, মহারাষ্ট্র তো চায় বনাঞ্চল কর্পোরেটগুলিকে বেচে দিতে। কোন রাজ্যই বা চায় না! সম্প্রতি কেন্দ্রীয় পরিবেশ ও বনমন্ত্রক সিংভূম ও চাইবাসায় খনি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এশিয়ার বৃহত্তম শাল অরণ্য, এলিফ্যান্ট রিজার্ভ তুলে দিতে চাইছে খনি মালিকদের হাতে। ছত্তিশগড়ের হাসদেও আরান্দ ভারতের অন্যতম গভীর এক বনাঞ্চল। সেই বনের ১৭০,০০০ হেক্টর এলাকায় খোলামুখ খনির জন্য ছাড়পত্র মিলেছে আদানিদের।

 

তরাই-ডুয়ার্স-পাহাড় সহ আমাদের রাজ্যে সম্ভাব্য উচ্ছেদের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন ৮৬ হাজার ১৪৬ জন আদিবাসী এবং অন্যান্য পারম্পরিক বনবাসী। এই ভয়াবহ ও অন্যায় রায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে দেখা যায়নি রাজ্যের কোনও রাজনৈতিক দলকে। উল্টে ক্যাডার লেলিয়ে কিংবা পুলিশ-প্রশাসন দিয়ে বনবাসীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন, প্রতিবাদ মিছিল কিংবা স্মারকলিপি দেওয়ার মতো নিরীহ কর্মসূচিও ভেস্তে দেওয়া হয়েছে। ২০০৮ সাল থেকে বনাধিকার আইন সরকারি ভাবে চালু হয়েছে। সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত বন এবং বনজ সম্পদের উপর বনবাসীদের গোষ্ঠী মালিকানার মৌলিক অধিকার স্বীকার করা হয়নি। উত্তরবঙ্গের প্রায় ৩০০টি বনগ্রামকে আইন অনুযায়ী রাজস্ব গ্রামে পরিণত করা হয়েছে। অভিযোগ, সেখানকার প্রায় আড়াই লক্ষ বাসিন্দাকে জমির মালিকানার দলিল না দিয়ে তা বনদপ্তরের হেফাজতে রেখে দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের কোথাও বন ও বনজ সম্পদের উপর বনবাসীদের আইনি অধিকার স্বীকৃত নয়। এ বিষয়ে প্রতিবাদের ফলে জুটেছে হেনস্থা এবং গুচ্ছ গুচ্ছ মামলা-মোকদ্দমা। কী উত্তরবঙ্গ, কী সুন্দরবন বা জঙ্গলমহলে বনাধিকার আইনের সার্থক প্রয়োগ, বনবাসীদের উচ্ছেদের কেন্দ্রীয় ও আইনি চক্রান্ত্রের বিরোধিতা, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলির ইস্তাহারে স্থান পায় না। অতঃপর বনবাসীদের বুঝটা তাদেরই বুঝে নিতে হবে। বুঝিয়েও দিতে হবে।

 

লেখক সাংবাদিক ও সমাজকর্মী।

ফীচার ছবি: ABNTV

Share this
Leave a Comment