রাফাল: দুর্নীতির সহজ পাঠ (দ্বিতীয় ভাগ)


  • March 30, 2019
  • (0 Comments)
  • 278 Views

নরেন্দ্র মোদী সরকারের ৩৬টি রাফাল বিমান (Ready to fly) কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে পরস্পর বিরোধী অভিযোগের সত্যাসত্য বিচার করা জটিল, কিন্তু যেভাবে আম্বানির সংস্থা রাফাল চুক্তিতে প্রবেশ করল এবং পরবর্তী ঘটনাবলি গতি পেল তা যথেষ্ট সন্দেহের উদ্রেক করে। রাফাল বিমান ক্রয় দুর্নীতি ঘিরে লিখছেন সুমন কল্যাণ মৌলিক। এটি দ্বিতীয় ও শেষ ভাগ। প্রথম ভাগের জন্য এখানে ক্লিক করুন

 

 

২০১৫ (২৮ মার্চ) রিলায়েন্স ডিফেন্স লিমিটেড গঠিত হল। ১৩ দিন পর নরেন্দ্র মোদী প্যারিসে ঘোষণা করলেন ৩৬ টি রাফাল বিমান ক্রয়ের। দুসপ্তাহ পরে ডিফেন্স লিমিটেডের অধীনস্থ রিলায়েন্স অ্যারোস্ট্রাকচার গঠিত হল (২৪শে এপ্রিল ২০১৫)। ৩০শে জুলাই ২০১৫ আনুষ্ঠানিক ভাবে পুরোনো চুক্তি বাতিল হল। ৫ই আগস্ট ২০১৫ অফসেট গাইড লাইনে নতুন সংশোধনীতে বলা হল এবার থেকে অফসেট সঙ্গীর নাম পরে ঘোষণা করলেও চলবে। জুন ২০১৬ সরকারি অনুমতি ছাড়া প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ৪৯% প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের অনুমতি। ২৪শে আগস্ট ২০১৬ প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত ক্যাবিনেট কমিটি ৩৬ টি রাফাল বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্তে সিলমোহর দিল। ২০শে সেপ্টেম্বর ২০১৬ ইন্টার গভর্নমেণ্টাল চুক্তি ও অফসেট চুক্তি একই দিনে সাক্ষরিত হল। ৩রা অক্টোবর ২০১৬ রিলায়েন্স এরোস্ট্রাকচার লিমিটেড (৫১%) ও দাসাউ এভিয়েশন (৪৯%) জয়েন্ট ভেঞ্চার গঠিত হল। ৩রা অক্টোবর ২০১৭ দাসাউ ও রিলায়েন্সের দ্বারা নাগপুরে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন।

 

উপরিউক্ত সময় সারণী প্রমাণ করে যে পুরানো চুক্তি বাতিল, Ready to fly বিমান কেনার সিদ্ধান্ত, সর্বোপরি হ্যালের প্রস্থান ও আম্বানির আগমন নেহাৎ কাকতালীয় নয়। এছাড়া আরো দুটি চর্চিত বিষয় হল – (ক) কিছুদিন আগে প্রকাশিত দাসাউ-এর একটা প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে যে রিলায়েন্স অ্যারোস্ট্রাকচারের সঙ্গে তাদের চুক্তি হয়েছিল ২০১৫ তে। এই দ্বিচারিতার উত্তর কোথায়? (খ) ডি আই পি পি (Department of Industrial policy & promotion) কর্তৃক রিলায়েন্স অ্যারোস্ট্রাকচারকে যে লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে সংস্থাকে গুজরাটের মেহসানে সামরিক বিমান ও যন্ত্রাংশ তৈরির অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে কারখানা হচ্ছে মহারাষ্ট্রের নাগপুরে ও সেখানে অনুমতি আছে জেট বিমানের যন্ত্রাংশ তৈরির। সেখানেও সঠিক সময়ে দাম মেটাতে না পারার জন্য অনিল আম্বানিদের জরিমানা করা হয়েছে।

 

ভারতীয় অর্থনীতিতে আম্বানিদের ’৮০-র দশক থেকে উল্কাসদৃশ উত্থান ও ভারতীয় রাজনীতিতে তাদের নিরবচ্ছিন্ন প্রভাব বহু আলোচিত বিষয়। সে আলোচনায় আমরা প্রবেশ করব না। কিন্তু অনিল আম্বানি গোষ্ঠীকে ঘিরে যে সন্দেহের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে সে নিয়ে আলোচনা জরুরি। যে গোষ্ঠী কস্মিনকালে প্রতিরক্ষা তো দূর, ম্যানুফাকচারিং শিল্পের সঙ্গেও যুক্ত না – সে রকম একটা অপরিচিত কোম্পানিকে কেন প্রতিরক্ষার মত সংবেদনশীল বিষয়ে ভারতের বাজি হিসাবে গণ্য করা হচ্ছে তার জবাব অবশ্যই আমাদের চাইতে হবে।

 

এখানে যে প্রশ্নটা উঠছে তা হলো অনিল আম্বানি গ্রুপ যাদের বাজারে দেনার পরিমাণ ১,২০,০০০ কোটি টাকা, তাদের দাসাউ-এর মত একটা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সংস্থা অফসেট সঙ্গী হিসেবে নির্বাচন করল কীভাবে? একটি প্রায় দেউলিয়া হতে যাওয়া কোম্পানিকে এভাবেই কি লাইফলাইন দিল মোদি সরকার?

 

এ আশংকা যে অমূলক নয় তার প্রমাণ হিসাবে আমরা আরেকটা উদাহরণ পেশ করব। সেখানেও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে অনিল আম্বানিদের প্রবেশ নেহাৎ কাকতালীয় বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

 

২০১৪ সালের ডিসেম্বর : রিলায়েন্স ডিফেন্স সিস্টেম প্রাইভেট লিমিটেডের জন্ম। তিন দিন পর নৌসেনা কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে ৮০,০০০ কোটি টাকা মূল্যের ৬টি সাবমেরিন তৈরি করা হবে। মার্চ ২০১৫ : রিলায়েন্স ডিফেন্স ভারতের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট জাহাজ নির্মাতা পিপভের ১৮ শতাংশ শেয়ার ৮১৯ কোটি টাকায় কিনে নিল। জুলাই ২০১৫ – ব্রিকস সম্মেলনে রাশিয়া ঘোষণা করে সে দেশের ভায়ামোগা কোম্পানি পিপভকে সাথে নিয়ে ভারতীয় নৌসেনার জন্য ফ্রিগেট তৈরি করবে। ডিসেম্বর ২০১৫ – মোদির রাশিয়া ভ্রমণের সময় ঘোষণা করা হল অনিল আম্বানির পিপভ ও রাশিয়ান কোম্পানি ৩০,০০০ কোটি টাকার বিনিময়ে ৪টি ফ্রিগেট তৈরি করবে। মার্চ ২০১৬ – রিলায়েন্স কোম্পানি পিপভের সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারের দখল নিল এবং কোম্পানির নতুন নাম হল রিলায়েন্স ডিফেন্স অ্যাণ্ড ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড, পরে যার নাম হয় নেভাল। জানুয়ারি ২০১৭ – আর নেভাল কোস্ট গার্ডের জন্য ২১টা পেট্রল ভেসেল তৈরির বরাত পেল ৮০০ কোটি টাকার। মার্চ ২০১৭- কোম্পানির বাজারে দেনা ৮,৯৫১ কোটি টাকা, কিন্তু সাবমেরিন তৈরির জন্য কোম্পানি শর্টলিস্টেড হল। নভেম্বর ২০১৭ – ঋণদাতা সংস্থাগুলি অভিযোগ দাখিল করল। মার্চ ২০১৮ – অডিট রিপোর্টে কোম্পানির স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ। জুলাই ২০১৮- ওএনজিসি তাদের বরাত বাতিল করল। ২৮ শে আগস্ট পর্যন্ত সাবমেরিনের খবর নেই।

 

প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন বরাত প্রায় দেউলিয়া হতে যাওয়া অনিল আম্বানির সংস্থার কাছে কতখানি গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝা যায় অনিল আম্বানির বক্তব্যে – “আমরা বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্পক্ষেত্রে ১৫ লক্ষ কোটি টাকার ব্যবসা দেখতে পাচ্ছি।” এ বছর জুলাই মাসে দাসাউ আম্বানিদের সঙ্গে তাদের জয়েন্ট ভেঞ্চারে ১০০ মিলিয়ন ইউরো বিনিয়োগ করেছে। রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচারের ২০১৭-১৮ আর্থিক বর্ষের হিসাবে দেখা যাচ্ছে তারা তাদের অধীনস্থ রিলায়েন্স এয়ারপোর্ট ডেভলপার্সের ৩৪.৭ শতাংশ শেয়ার দাসাউ অ্যাভিয়েশনকে বিক্রি করেছে। এতে তার লাভ হয়েছে ২৮৪.১৯ কোটি টাকা। এই কোম্পানি দীর্ঘ সময়ে ক্ষতিতে চলছিল। এইভাবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের বরাতই হয়ে উঠেছে অনিল আম্বানির জিয়নকাঠি।

 

রাফাল দুর্নীতি বিতর্কে তুলনায় কম আলোচিত বিষয় হল কর্পোরেট বান্ধব নরেন্দ্র মোদির সরকারি সংস্থাগুলির প্রতি তীব্র আক্রমণ। একই সঙ্গে ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর স্বর্নিভর হয়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টির ক্ষেত্রেও রাফাল চুক্তি এক উদাহরণ সৃষ্টি করল। একের পর এক দুর্নীতির কারণে মুখ পোড়ানো প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সাধারণভাবে যে ‘ডিফেন্স প্রকিউরমেন্ট পলিসি’ তৈরী করেছিল তার মূল কথা হল জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা, সামরিক শিল্পের বিকাশ এবং অস্ত্র কেনাবেচার ব্যাপারে স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা। এক্ষেত্রে একথা সবাই জানেন যে বিগত পাঁচ বছরের শাসনকালে মোদী বার বার ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’-র শ্লোগান তুলেছেন। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হ্যাল-এর বিরুদ্ধে তার সরকার ধারাবাহিক ভাবে প্রচার করে গেছে।

 

হ্যাল-এর পূর্ব ইতিহাস স্মরণ করলে নরেন্দ্র মোদীর সরকারের এই বিষোদ্গার সত্যিই বিস্ময়কর। তথ্যের খাতিরে মনে করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে এই হ্যাল ব্রিটেনের ফল্যাণ্ড কোম্পানির জি ন্যাট ও তার উন্নত সংস্করণ ভারতে তৈরি করছিল। সেই বিমান ১৯৬৫ সালে ভারত-পাক যুদ্ধের সময় পাকিস্তানের বায়ুসেনার আমেরিকায় প্রস্তুত ‘এফ-৮৬’ ও ‘এফ-১০৪’ বিমানের বিরুদ্ধে অনেক বেশি কৃতিত্বের পরিচয় রেখেছিল। ভারতীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘এইচ এফ -২৪ মারুৎ’ হ্যাল-এরই সৃষ্টি। রাফাল যে সংস্থা তৈরি করেছে সেই দাসাউ-এর আগের বিমান ‘মিরাজ-২০০০’, রাশিয়ার ‘মিগ-২৯’, ‘সুখোই-৩০’, ‘ইক-১৩২’ প্রচুর সংখ্যায় হ্যাল তৈরি করেছে। এছাড়া সম্পূর্ণ ভারতীয় কৃৎকৌশলে তৈরি তেজস বিমান নির্মাণের দায়িত্বও হ্যাল-এর হাতে। এই ট্র্যাক রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও হ্যালকে বাদ দিয়ে একটি ফড়ে সংস্থাকে দাসাউ-এর সঙ্গী নির্বাচন করা হল।

 

হ্যাল-এর বিরুদ্ধে কী ধরণের মিথ্যাচার করা হয়েছে তার দু একটা নমুনা পেশ করা যেতে পারে। প্রথমত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে দাসাউ হ্যাল-এর সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক নয়। কিন্তু ২০১০ সালের ২৬ মার্চ এক প্রেস কনফারেন্সের দাসাউ চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার এরিক ট্র্যাপিয়ার বলেন যে হ্যাল-এর সঙ্গে তাদের চুক্তি ৯৫ শতাংশ তৈরি হয়ে গেছে। হ্যাল-এর সদ্য অবসরপ্রাপ্ত ম্যানেজিং ডাইরেকটর সুবর্ণ রাজুও এই খবরের সত্যতা স্বীকার করেছেন। দ্বিতীয়ত প্রতিরক্ষা মন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আমাদের জানিয়েছেন যে হ্যাল-এর বেঙ্গালুরুর কারখানায় অতিরিক্ত জমি ছিল না, তাই দাসাউ চুক্তিতে আগ্রহী হয়নি। কিন্তু আজ একথা প্রমাণিত যে হ্যাল-এর বেঙ্গালুরু কারখানায় অতিরিক্ত জমি ছিল এবং প্রয়োজনে আরো জমির সংস্থান করা সম্ভব ছিল। বরং আম্বানিরা চুক্তির পরে নাগপুরে সরকারি সাহায্যে জমি জোগাড় করে। তৃতীয়ত সরকার থেকে বারংবার দাবি করা হচ্ছে যে হ্যাল-এর কারখানায় রাফাল বিমান তৈরী হলে ফ্রান্স সরকার সম্পূর্ণ গ্যারান্টি (Sovereign guarantee) দিত না। কিন্তু এখনও কি দিচ্ছে? না, দিচ্ছে না। সরকারি হলফনামা ও সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত নথিপত্রে দেখা যাচ্ছে সরকারের দেওয়া শর্ত ফরাসি সরকার মানেনি, বরং ভারত সরকার “Core elements of Government to Government” চুক্তির শর্তগুলিকে লঘু করে দিয়েছে।

 

রাফাল ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রথমে যখন চুক্তি প্রক্রিয়া চালু হয়েছিল তখন ভারত সরকারে ঘোষিত দরপত্রের প্রধান শর্ত ছিল প্রযুক্তি হস্তান্তর, যে শর্ত আমাদের প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা জোগাতে সহায়ক হতে পারত। কিন্তু ৩৬ টি রাফাল বিমান কেনার ক্ষেত্রে কোথাও প্রযুক্তি হস্তান্তরের কথা বলা নেই। তাহলে অনিল আম্বানিদের সংস্থার কাজ কী হবে? ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা প্রযুক্তিতে তাদের কোন ভূমিকা থাকবে না, তারা নেহাৎই ফ্রান্স থেকে আমদানি করা যন্ত্রাংশ জোড়া লাগানোর ব্যবস্থা করবে। শিল্পের ভাষায় যাদের বলা হয় Screw Driver Partner। গোটা প্রক্রিয়াতে এইভাবে নরেন্দ্র মোদির বহু বিজ্ঞাপিত ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ প্রকল্পের স্বরূপ আমাদের কাছে উন্মোচিত হয়।

 

শেষের কথা

দীর্ঘ আলোচনার শেষে রাফাল চুক্তির অসংগতি ও দুর্নীতির রূপগুলি আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিন্তু পূর্ববর্তী প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত দুর্নীতির আখ্যানগুলির সঙ্গে রাফাল চুক্তির একটা মূলগত পার্থক্য রয়েছে। এতদিনকার চুক্তিগুলির দুর্নীতির প্রধান ক্ষেত্রটি ছিল কাটমানি ও কমিশন এজেন্ট-কেন্দ্রিক। কিন্তু এবারেরটা চরিত্রগতভাবে Crony Capitalism এর গল্প। বিশ্বায়নের অর্থনীতির সঙ্গে এই ধরণের বিকৃত পুঁজিবাদ অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত। ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের অর্থ কোনও গোষ্ঠী বা সংস্থার স্বার্থে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিদ্যমান নিয়মাবলিকে সরকারি মদতে লঙ্ঘন করা। এতে রাজনৈতিক নেতৃত্ববৃন্দ ও আমলাতন্ত্রের মদতে সেই গোষ্ঠী বা কোম্পানিটি উপকৃত হয়। বাজার অর্থনীতির মূল কথা প্রতিযোগিতা, কিন্তু এখানে সেই প্রতিযোগিতাই থাকে না। আম্বানি আদানিদের লীলাক্ষেত্রে তাই রাফাল দুর্নীতি অনিবার্য ছিল, ঘটনা পরম্পরা সেই কথাই প্রমাণ করে।

 

একটি সংযোজনী

রাফাল সম্পর্কিত মূল নিবন্ধটি লেখার পর (আসানসোল শিল্পাঞ্চলের উদ্যোগ পত্রিকা, জানুয়ারী ২০১৯) প্রায় তিন মাস সময় অতিক্রান্ত। এই তিন মাসে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে গেছে যা রাফাল বিমান ক্রয় সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সেই গুলো আলোচনা করার লক্ষ্যে এই সংযোজনীটির অবতারণা।

 

প্রথমে ঘটনাক্রমকে সংক্ষিপ্ত আকারে দেখে নেওয়া যেতে পারে:

 

১৪ই ডিসেম্বর, রাফাল দুর্নীতি সংক্রান্ত মামলায় সর্বোচ্চ আদালতের রায়- যাতে নিরপেক্ষ সংস্থা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে পৃথক তদন্তের আর্জি খারিজ করা হয়।

এক সপ্তাহের মধ্যে সর্বোচ্চ আদালতের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য রিভিউ পিটিশন দাখিল করা হয়। যে মামলাটির শুনানি বর্তমানে চলছে।

 

১৩ই ফেব্রুয়ারি (২০১৯) “দি হিন্দু” পত্রিকায় বিশিষ্ট সাংবাদিক এন. রাম-এর তদন্তমূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। রাফাল সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি নথির উল্লেখ ও সে সংক্রান্ত নতুন নতুন প্রমাণ সারা দেশে আলোড়ন তোলে।

 

এরিকসন মোবাইল সংস্থার একটি মামলার সূত্রে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে রাফালের ভারতীয় অপারেটর অনিল ধীরুভাই আম্বানি গ্রুপ দোষী সাব্যস্ত হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করতে পারলে অনিল আম্বানির জেল যাত্রা নিশ্চিত।

 

পুলওয়ামা জঙ্গি হামলা ও তার পর বালাকোটে ভারতীয় বায়ুসেনার সার্জিকাল স্ট্রাইকের প্রেক্ষাপটে দেশব্যাপী যুদ্ধ উন্মাদনার আবহে এই প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী সুকৌশলে রাফাল সংক্রান্ত জটিলতার জন্য বিরোধীদের দায়ী করে তাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

 

৬ই মার্চ (২০১৯) রাফাল সংক্রান্ত মামলায় “দি হিন্দু” প্রকাশিত নথিগুলোকে অ্যাটর্নি জেনারেল কে কে বেণুগোপাল প্রতিরক্ষামন্ত্রক থেকে চুরি করা বলে অভিযোগ করেন ও আদালতে জানান এ জন্য অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট লঙ্ঘন করার জন্য মিডিয়া গ্রুপটির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

৮ই মার্চ রীতিমত নব্বই ডিগ্রি ঘুরে গিয়ে বেণুগোপাল বলেন নথিগুলি চুরি করা নয় বরং মূল নথির ফটোকপি।

 

আমরা এবার এই প্রত্যেকটি ঘটনাকে তাঁর উপযুক্ত প্রেক্ষিত সহ বিচার করার চেষ্টা করব। প্রথমে আমরা দেখব ১৪ই ডিসেম্বর (২০১৮) দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়টিকে। এই রায়ে মাননীয় বিচারপতিরা বলেন যে তারা রাফাল কেনার সিদ্ধান্তে কোন পদ্ধতিগত ত্রুটি খুঁজে পান নি। তাদের এটাও পর্যবেক্ষণ ছিল যে দামে বর্তমান সরকার রাফাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা সঠিক। সেজন্য তারা তদন্তের আবেদনকে খারিজ করছেন। এই রায়ের ভিত্তি ছিল সরকারের জবানবন্দী খাতে বলা হয়েছে যে গোটা বিষয়টা ক্যাগ (কম্পোজার অ্যাণ্ড অডিটর জেনারেক) পরীক্ষা করেছে ও তাদের রিপোর্ট পার্লামেন্টের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি দ্বারা পরীক্ষিত হয়েছে। কিন্তু রায় বেরোনোর পরই সরকারের জবানবন্দী যে সত্যি নয় তা প্রমাণ হয়ে যায়। পরিষ্কার হয়ে যায় যে ক্যাগের রিপোর্ট সংসদে উপস্থিত করা হয়নি। এমন কি রাষ্ট্রপতির কাছেও তা পাঠানো হয় নি, পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি সে রিপোর্ট চোখেও দেখে নি। দেশব্যাপী প্রতিক্রিয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে সরকার আদালতের কাছে সংশোধনীর জন্য আবেদন জানায়। তাই স্বাভাবিক ভাবেই সর্বোচ্চ আদালতের রায়কে সত্যের জয় বলে প্রচার করতে শুরু করে যে বিজেপি, তারা রায়ের মূল ভিত্তিটি মিথ্যা প্রমাণ হবার পর সাময়িক চুপ করে যেতে বাধ্য হয়। কিন্তু দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ক্যাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠে যায় কারণ অনেকে অভিযোগ করেন যে ক্যাগ আদালতকে ভুল পথে চালিত করেছে। বিগত ৫ বছরে নরেন্দ্র মোদি সরকার বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক ভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন বলে বারংবার অভিযোগ উঠেছে, সেই তালিকার সর্বশেষ উদাহরণ হল ক্যাগ। আদালতের রায় রিভিউ করার আবেদন গৃহীত হওয়ার পর এটা নিশ্চিত হয়ে যে রাফাল বিতর্ক যে সব প্রশ্নগুলো তুলেছিল তার কোনটারই সঠিক উত্তর পাওয়া যায় নি।

 

রাফাল সংক্রান্ত বিতর্ক নতুন মাত্রা পায় যখন বিশিষ্ট সাংবাদিক এন. রাম তাঁর ‘দি হিন্দু’ পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদনে এমন কিছু সরকারি নাম প্রকাশ করেন যা রাফাল সংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতাকে নতুন ভাবে প্রমাণ করে। অনেকের স্মরণে থাকতে পারে বহু বিতর্কিত বোফর্স মামলায় এন.রাম-ই প্রথম সরকারি নাম ফাঁস করেন। হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলি থেকে জানা যাচ্ছে রাফাল নির্মাণকারী সংস্থা দাসাউ-এর সঙ্গে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রক আলোচনার জন্য এয়ার মার্শাল আর.কে ভাদুরিয়ার নেতৃত্বে একটি টিম গঠন করে। সেই দলের তিন সদস্য অ্যাডভাইসার এম পি সিং, ফিনানসিয়াল ম্যানেজার এ আর সুলে এবং বায়ুসেনার জয়েন্ট সেক্রেটারি রাজীব ভার্মা পৃথক নোট প্রস্তুত করে রাফাল বিমান ক্রয় সংক্রান্ত মোদী সরকারের চুক্তিটির বিভিন্ন অসংগতি তুলে ধরেন। তাদের নোটে বলা হয়েছে যে শর্তে মোদি সরকার বিমান কেনার চুক্তি করেছে তা পূর্ববর্তী চুক্তির থেকে কোনভাবেই উন্নত বা সস্তা নয়। রাফালের মত মিডিয়াম মাল্টি রোল কম্ব্যাট এয়ারক্রাফটের ক্ষেত্রে যে চূড়ান্ত দাম স্থির করা হয়েছে তা ঠিক নয় এবং যৌথ বিবৃতিতে যে কথা বলা হয়েছিল তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। এমনকি সময়সীমাকে লঙ্ঘন করা হয়েছে। নোটে অভিযোগ করা হয় যে চুক্তিতে আবশ্যক ব্যাঙ্ক গ্যারান্টির ধারাটিকে রাখা হয়নি। তার বদলে ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ‘A Letter of Comfort’  নেওয়া হয়েছে যার কোন আইনি বৈধতা নেই। একই সঙ্গে যে কোন প্রতিরক্ষা চুক্তির ক্ষেত্র আবশ্যক “anti corruption penalty” ধারাটিকে ছাড় দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। তা হল প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সমান্তরাল ভাবে দাসাউ ও ফরাসি সরকারের সঙ্গে রাফাল ক্রয়ের ব্যাপারে আলাপ আলোচনা চালানো হচ্ছিল। এই ব্যাপারে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক থেকে আপত্তি তোলা হয়। তৎকালীন প্রতিরক্ষা সচিব জি মোহনকুমার বলেন যে এই সমান্তরাল আলোচনা কাঙ্খিত নয়। তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পরিকরকে সে কথা জানানো হয়। ৬ই ও ৮ই মার্চ অ্যাটর্নি জেনারেল সর্বোচ্চ আদালতে যে বক্তব্য রেখেছেন(প্রথমে চুরি করা নথি, পরে ফটোকপি) তাতে নথিগুলির সত্যতা নিয়ে আর কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। বরং বর্তমান নিবন্ধে উত্থাপিত প্রশ্নগুলি যেমন যে দামে রাফাল কেনা হয়েছে তা সঠিক কি না, এক্ষেত্রে কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার জন্য সরকার পক্ষ অনৈতিক ভাবে সক্রিয় হয়েছিল কি না – তার এক স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়।

 

 

এরিকসন মামলার রায় স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে অনিল আম্বানির মত এক প্রায় দেউলিয়া শিল্পপতির হাতে দেশের নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া প্রায় জুয়াখেলার সামিল।

 

পুলওয়ামা ও বালাকোটের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে যে ভাবে রাফাল সংক্রান্ত প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের দেশদ্রোহী তকমা দেওয়া হচ্ছে তারও যথাযোগ্য জবাব দেওয়া জরুরি। রাফাল বিতর্কে আমরা দেখেছি কীভাবে অনিল আম্বানির মত প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ দেউলিয়া শিল্পপতিকে যোগ্য প্রমাণ করার জন্য মোদীর পারিষদবর্গ রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা হ্যাল-এর প্রতি ধারাবাহিক ভাবে বিষোদ্গার করতে থাকে। কিন্তু আজ যে সফল সার্জিকাল স্ট্রাইকের জন্য বায়ুসেনাকে অভিনন্দন জানানো হচ্ছে, সেখানে হ্যাল-এর তৈরি মিরাজ ২০০০ জেট ও মিগ-২১ কে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই আমাদের প্রশ্ন করতে হবে হ্যালকে যারা অযোগ্য বলে ঘোষণা করেছিল তারা সত্যিই দেশপ্রেমী কি না। আর একইসঙ্গে বলতে হবে ১২৬টি বিমানের চুক্তিকে বাতিল করে ৩৬টি বিমান ক্রয়ের সিদ্ধান্ত, প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুবিধাকে বাতিল করা বিমান বাহিনীর স্বনির্ভর হওয়ার স্বপ্নকে আরো দূরগামী করবে। আর তার দায় মোদী সরকারকেই নিতে হবে।

 

তথ্যসূত্র:

On a wing and a prayer: Sagar (Caravan Sept-2018)

Limits of Credibility: Divya Trivedi (Frontline, Oct-12, 2018)

Murky Deal: Ravi Nair (Frontline Nov -2018)

Problematic All the Way: S D Raghunandar (Frontline Nov-9, 2018)

Rafale Deal: The Mystery of the 3 billion Euro price hike: Ravi Nair (Wire.in)

Rafale Twist: Why did the France refuse to give india a sovereign gurantee? : M K Venu (Wire.in)

Post Rafale, Dassault investment in inactive Anil Ambani Company gave Reliance Rs 284 crore Profit: Rohini Singh and Ravi Nair (Wire.in)

Full Text: French Report on how Modi Govt pushed Anil Ambani as Rafale Deal Partner (Wire.in)

Unbearable stink from the Rafale Deal : Gauta, Navlakha (Newsclick.in)

Rafale Deal: Government Explanation is Misleading: D Raghunandar (Newsclick.in)

 

 

লেখক একজন স্কুল শিক্ষক ও  গনতান্ত্রিক অধিকার  আন্দোলনের কর্মী।

Share this
Leave a Comment