‘আর্ন্তজাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস’-এ আওয়াজ উঠুক অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী নারীদের ইউনিয়ন-এর


  • March 7, 2019
  • (0 Comments)
  • 521 Views

৮ মার্চ ‘আর্ন্তজাতিক শ্রমজীবী নারী দিবস’। এই কর্পোরেট-শোভিত নারী দিবস উদ্‌যাপনের ভিড়ে কর্মজীবী, শ্রমজীবী নারীর পরিচয়টাই কোথায় যেন ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে। আর সেইজন্যই এই কাজের পরিচয়টা, তাঁদের শ্রমের পরিচয়ের কথাটা বারবার মনে করিয়ে দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।লিখছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

 

দিনটি শুধু আর্ন্তজাতিক নারী দিবস নয়, ৮ মার্চ ‘আর্ন্তজাতিকশ্রমজীবী নারী দিবস’। শ্রমজীবী শব্দটির উপর একটু বিশেষ জোর তো দিতেই হয়। কারণ এই কর্পোরেট-শোভিত নারী দিবস উদ্‌যাপনের ভিড়ে কর্মজীবী, শ্রমজীবী নারীর পরিচয়টাই কোথায় যেন ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে যত্ন করে। আর সেইজন্যই এই কাজের পরিচয়টা, তাঁদের শ্রমের পরিচয়ের কথাটা বারবার মনে করিয়ে দেওয়াটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। একদিকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও অন্যদিকে ক্রমাগত কর্পোরেট-এর সামনে মাথা নুইয়ে দেওয়া অর্থনীতির কাছে মহিলাদের অবস্থান অস্বীকার করতে চাওয়াটাই স্বাভাবিক। মহিলাদের গৃহকর্ম বা বাড়ির কাজকে তাঁদের স্বাভাবিক দায়িত্ব বলে বিজ্ঞাপনী চমকে মুড়ে উপস্থাপিত করা হচ্ছে আর অন্যদিকে মহিলাদের পেশায় যোগদানের খতিয়ান ও সেই সংক্রান্ত রাজনীতি থেকে চোখ ঘুরিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে।

 

অসংগঠিত ক্ষেত্রে শ্রমজীবী মহিলারা

যদি চোখ রাখা যায় অসংগঠিত ক্ষেত্রে তাহলেই বোঝা যায় যে, এক বিরাট সংখ্যক মহিলা প্রতিনিয়ত জুড়ে যাচ্ছেন বিবিধ পেশার সঙ্গে। তার মধ্যে অনেকগুলিই রয়েছে আমাদের চোখের সামনে, আলোচনার পরিসরে, আবার বহু কাজই এখনও পর্যন্ত শহর, গ্রাম, মফস্বলে রয়ে গেছে আমাদের চেনা চৌহদ্দির বাইরে। বিড়ি শ্রমিক থেকে মৎস্যজীবী মহিলা, কৃষিজমিতে চাষের কাজে যুক্ত মহিলা থেকে বাজারে সব্জি, মাছ বিক্রেতা মহিলা, ইটভাটায় কাজ করা মহিলা থেকেমহিলা হকার , গৃহ পরিচারিকা মহিলা থেকেমহিলা নির্মাণকর্মী, একশোদিনের কাজে যুক্ত মহিলা থেকে জরিশিল্পী, রাস্তায় কাগজ ও বর্জ্য কুরানো মহিলা থেকে বাড়িতে বসে হোসিয়ারির কাজ বা মুখোশ তৈরির কাজ করা মহিলা, মিড-ডে মিল-এর কাজ করা মহিলা – এদের কাউকে বাদ দিয়েই এখন আর অর্থনীতিকে কল্পনা করা সম্ভব নয়। অথচ নিপুণ চেষ্টা চলে মহিলাদের শ্রমিকের অধিকারটুকুই না দেওয়ার। কারণ শ্রমিকের স্বীকৃতি দিলেই তারসঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় শ্রমিকের অধিকারের প্রসঙ্গটিও। পিতৃতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় যেখানে সবদিক থেকেই মহিলাদের দাবিয়ে রাখার মানসিকতা স্পষ্ট, সেখানে শ্রমিকের স্বীকৃতি ও অধিকারের বিষয়টি কার্যত এড়িয়েই যাওয়া হয়।

 

যেভাবে তাদের বঞ্চিত করা হয় তার ধরনটিও স্পষ্ট – (১) মহিলারা শ্রমিক হিসাবে কাজ করতে চাইলেও নানাভাবে তাদের কাজের সুযোগ কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত শ্রমের কাজ পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট করা হচ্ছে। মনে করা হয় এবং সেভাবে প্রচারিতও হয় যে মহিলারা তা পারবেন না। ফলে তাদের কম পারিশ্রমিকের কাজে নিয়োগ করা হয়। (২) সমান কাজে সমান বেতন দেওয়া হয় না। (৩) মহিলাদের কাজের ন্যূনতম মজুরি নির্দিষ্ট নয়। কোনও কোনও ক্ষেত্রে তা নির্ধারিত হলেও কাজের ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়িত হয় না বা সরাসরি তাদের বঞ্চিত করা হয়।

 

কমছে ট্রেড ইউনিয়নে মহিলাদের অংশগ্রহণ

লেবার ব্যুরো-র ২০১৬ সালের রিপোর্ট-এ দেখা যাচ্ছে সারা দেশে মহিলাদের ট্রেড ইউনিয়ন-এ অংশগ্রহণের পরিসংখ্যান মাত্র ৭.৬%। এই পরিসংখ্যান রীতিমতো আশঙ্কা তৈরি করে। যে বিরাট সংখ্যক মহিলা-শক্তি আমাদের দেশের অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করে চলেছেন, নানা দিক থেকে তাদের অধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার বিষয়টি যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, তা বোঝানোর জন্য এই পরিসংখ্যানটিই যথেষ্ঠ। পাশাপাশি এইটি আরও একটি বিষয়ে দৃষ্টি দিতে বলে – অসংগঠিত ক্ষেত্রে কাজ করা মহিলাদের সংগঠিত করে ইউনিয়ন তৈরির মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে তাদের অধিকারের দিকটি সুরক্ষিত করা কতটা প্রয়োজনীয়। তবে শুধু অসংগঠিত নয়, সংগঠিত ক্ষেত্রের কথা মাথায় রেখেও প্রশ্ন উঠে আসে, যে অংশগ্রহণের সংখ্যা কেন এতটা কম?

 

কী বলছেন অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবী মহিলারা

কথা হচ্ছিল মহিলা হকার্স ফেডারেশন-এর অপর্ণা ঝা, রেখা মারিক-এর সঙ্গে। তাঁদের বক্তব্য মহিলাদের মধ্যে অনেক সময়েই এক ধরনের ‘নার্ভাসনেস’ কাজ করে। পুরুষশাসিত কাঠামোয় বিভিন্ন বিষয়ে খোলাখুলি কথা বলতে অস্বস্তি বোধ করেন তাঁরা। কিন্তু এখন নানা দাবি-দাওয়া আদায় করে তাঁরা অনেকটাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। ইস্টার্ন বাইপাসে উচ্ছেদ হওয়ার পর আন্দোলন করে তাঁরা পুনর্বাসন আদায় করেছেন। রেখার অঞ্চলে ইউনিয়নে ৫০ জন ও অপর্ণার অঞ্চলে ২০ জন সদস্য। সংখ্যাগুলি হয়তো এখনও কম,তবে বাইরে বেরিয়ে দোকান সামলানো এবং ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে গত কয়েক বছরে তা বেশ কিছুটা বেড়েছে বলেই মনে করছেন তাঁরা। কালীঘাট রিফিউজি হকার্স ইউনিয়নে পরিচালিত হকার্স কর্নার-এ যেমন আনুমানিক ১৮০টি স্টলের মধ্যেপ্রায়কুড়ির কাছাকাছি স্টলের মালিকানা রয়েছে মহিলাদের। কেউ কেউ যেমন একা দোকান সামলান, অনেকে আবার পরিবারের পুরুষ সদস্য (দাদা/ভাই, স্বামী)-দের সঙ্গে দোকানে বসেন। এখানে হকার্স ইউনিয়নে একজনই মাত্র মহিলা প্রতিনিধি রয়েছেন। ইউনিয়ন-এর সহকারী সম্পাদক বঙ্কু সাহা বললেন, “আজ থেকে ২৫ বছর আগে তো কোনও মহিলাই ছিলেন না। এখন তো তবু তাঁরা ব্যবসা সামলাচ্ছেন এখানে। আশা করি ভবিষ্যতে ব্যবসা ও ইউনিয়নে তাঁদের অংশগ্রহণ বাড়বে।”হকার্সকর্নারের কাকলি দাস একা শাড়ির স্টল সামলান। অন্য কোনও অসুবিধা না থাকলেও শৌচালয়ের সমস্যার কথা জানালেন। সহকারী সম্পাদক অবশ্য জানিয়েছেন শৌচালয় ও সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানোর কাজ তাড়াতাড়িই করা হবে। অন্যদিকে গীতা দাস ও ইলা সাহা যথাক্রমে স্বামী ও ভাইয়ের সঙ্গে দোকানে বসেন। ব্যবসার কাজে দু’জনেই দক্ষ। কিন্তু ইউনিয়ন-এর কাজকর্মে উৎসাহ নেই কোনওই। শুধু নির্বাচনের সময় ভোট দেন। দু’জনেরই বক্তব্য, “আমরা কখনও কখনও মিটিং-এ যাই। কিন্তু ডিসিশন নেওয়ার জন্য তো স্বামী/ভাই রয়েইছেন। আমরা শুনে চলে আসি।”বোঝা যায় পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর উপর নির্ভরশীলতা কাটাতে সচেতনতা তৈরির কাজ নাগাড়ে চালিয়ে যেতে হবে।

 

অসংগঠিত ক্ষেত্রের কাজের ক্ষেত্রগুলি যেমন বিভিন্ন তেমনি বিভিন্ন দাবিও রয়েছে যা পেশার ক্ষেত্র-নির্দিষ্ট। কিন্তু কিছু দাবি সবক্ষেত্রেই এক। যেমন,(১) সমকাজে সম-বেতন, (২) সামাজিক সুরক্ষা ও কাজের সুরক্ষা, (৩) নির্দিষ্ট ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ, (৪) নির্দিষ্ট কাজের সময়, (৫) মাতৃত্বকালীন ছুটি ও বেতন, (৬) বার্ধক্যভাতা, (৭) কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা থেকে সুরক্ষা।

 

এই দাবিগুলি উঠে আসে কোন্‌ জায়গা থেকে তা বোঝা যায় ঘরে বসে কাজ করেন এমন মহিলাদের সঙ্গে কথা বললে। যেমন হোসিয়ারি, মুখোশ, রাখি তৈরির কাজ করেন প্রিয়া, মিঠু, সঞ্চারী, মিনা, দীপালি, পিয়ালী, নমিতা, হাসি। প্রথমত তাঁদের কাজের কোনও নির্দিষ্ট মজুরি নেই। তাঁরা কাজ পান একজন মধ্যবর্তী ব্যক্তি (ফড়ে)-র মারফত। আর্থিকভাবে তারা চূড়ান্ত শোষিত হন। কাজের সময় বাঁধাধরা থাকে না। অতিরিক্ত কাজের চাপে অনেক সময়েই অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হয়, যারজন্য কোনও টাকা তাঁরা পান না। পারিশ্রমিক বাড়ানোর কথা বললেই তাদের আর কাজ না দেওয়ার ভয় দেখানো হয়। কম পারিশ্রমিকেই কাজ করতে বাধ্য হন দৈনন্দিন জীবনধারণের তাগিদেই। তাঁদের সমবেত দাবি, “ইউনিয়ন তৈরি হোক, তাহলে আমরা এক হয়ে মজুরি বাড়ানোর দাবি তুলতে পারব। এখন আমরা একসাথে নেই বলেই আমাদের শোষণ করতে পারে।”সংসার, সন্তান সামলে ইউনিয়ন করতে পারবেন তো সবাই? সাফ জবাব, “কাজ করতে পারছি যখন, ইউনিয়নও করতে পারব। নাহলে তো আমাদের ঠকিয়ে কাজ করিয়ে নেবে।”

 

মিড-ডে মিল-এর সঙ্গে যুক্ত মহিলা কর্মীদের সমস্যা আবার ভিন্ন। এক্ষেত্রে কাজে নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলছেন তারা, নিয়ম যেখানে স্বনির্ভর গোষ্ঠী থেকে কর্মীর উপর দায়িত্ব দেওয়ার। তাছাড়া অনেক সময়েই তাঁরা কোনও পরিচয় পত্র পান না। সরকারের তরফ থেকে ঘোষিত বেতনও পাচ্ছেন না তাঁরা। তাছাড়া স্কুল ছুটির দু’মাস বেতন পান না। নেই মাতৃত্বকালীন ছুটিও। মিড-ডে মিল-এর কর্মীদের সংগঠন থাকা সত্ত্বেও এই সমস্যাগুলির উঠে আসাই বলে দেয় তা আরও দানা বাঁধা প্রয়োজন।

 

১০০ দিনের কাজে যুক্ত মহিলাদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গে উঠে আসে বিবিধ সমস্যা। পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায় যেখানে গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা বেশি সেখানে বছরে ১০০ দিনেরই কাজের কোটা পূর্ণ করতে পেরেছেন এই মহিলারা। কিন্তু মাটি কাটা ছাড়া অন্য কোনও কাজের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। বয়স্ক মহিলাদের জন্য এই কাজ অবশ্যই অসুবিধাজনক। তাছাড়া অনেক মহিলাই পরিবারে বা অন্যের জমিতে খেতমজুরের কাজ করেন, চাষের সময়ে তারা আবার ১০০ দিনের কাজ পেলে তাদের ফসল নষ্ট হয়। কখন কাজ পাওয়া যাবে তার কোনও নিশ্চয়তা না থাকায় সমস্যা তৈরি হয়।

 

বয়ঃজ্যেষ্ঠ নির্মাণকর্মী অর্চনা গোলদারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিনি প্রায় ৩০ বছর শ্রমিক হিসাবে কাজ করছেন, বললেন, “আমি ঢালাইয়ের সব রকম কাজ করতে পারি। কিন্তু এখন হাতের জোর কমে যাচ্ছে। রোজ কাজও পাই না। এই কাজ না পেলে তখন বাসা বাড়িতে কাজ করি (গৃহ পরিচারিকার কাজ)।”জানালেন কোনও রকম স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়ার কথা তিনি জানেন না। নির্মাণকর্মীদের সংগঠন সম্পর্কে ওয়াকিবহালও নন। তার মতো বয়স্ক শ্রমজীবী মহিলার না জানাটাই বুঝিয়ে দেয় সংগঠনের প্রচারে কতটা ফাঁক আছে। অর্চনার মতো অসংখ্য বয়স্ক শ্রমিক তাদের বার্ধক্যভাতার দাবি তুলছেন, তাছাড়া মহিলা নির্মাণকর্মীদের কাজ দেওয়ার শর্তে যে যৌন হেনস্থারও শিকার হতে হয় তা নিয়েও কথা বলবার সময় হয়েছে। কার্যকরী ইউনিয়ন তৈরি না হলে এগুলির কোনোটিরই সমাধান সম্ভব নয়।

 

পশ্চিমবঙ্গে জরিশিল্পীদের সংগঠন রয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও কর্মীদের আর্থিক শোষণ বন্ধ হচ্ছে না। ওস্তাগরেরা মুনাফা লুটছেন অথচ শিল্পীদের পারিশ্রমিক বাড়ছে না, অভিযোগ করলেন জরিশিল্পী অনিতা বাগ। তাদের দাবি দৈনিক মজুরি বৃদ্ধি, কল্যাণ বোর্ড, কম সুদে ঋণ পাওয়ার সুবিধাজনক ব্যবস্থা ইত্যাদি। মনে রাখা দরকার সংগঠন থাকা সত্ত্বেও মহিলা কর্মীদের দাবি আদায় না হলে আন্দোলন ও সংগঠন আরও সুসংবদ্ধ হওয়ার কথা বলে।

 

ইউনিয়নের স্বপ্নপূরণ গৃহ পরিচারিকাদের

দীর্ঘ আন্দোলনের পর ট্রেড ইউনিয়ন-এর সরকারি স্বীকৃতি পেয়েছে পশ্চিমবঙ্গ গৃহ পরিচারিকা সমিতি। ইউনিয়ন হওয়ার ফলে আজ তারা শ্রমিক হিসাবে স্বীকৃত। তাই তাদের দাবিগুলি নিয়ে নতুন উদ্যমে লড়াই করতে পারছেন। তাঁদের ১৩ দফা দাবির কয়েকটি – (১) ন্যূনতম নির্দিষ্ট মজুরি, (২) সামাজিক সুরক্ষার আওতাভুক্ত হওয়া, (৩) কেন্দ্রীয় স্তরে পূর্ণাঙ্গ বোর্ড গঠন, (৪) মাতৃত্বকালীন ভাতা, (৫) লেবার কার্ড পাওয়া, (৬) ইএসআই চালু হওয়া, (৭) কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থা রুখতে লোকাল কমপ্লেইন কমিটিগুলিকে কার্যকর করা ইত্যাদি। ইউনিয়ন থাকার সুবাদেই লোকসভা নির্বাচনের আগে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে দেখা করে আলোচনায় বসছেন তাঁদের দাবিগুলি রাজনৈতিক দলগুলির নির্বাচনী ম্যানিফেস্টো-তে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য।

 

কী বলছেন ট্রেড ইউনিয়ন, অধিকার আন্দোলনের ব্যক্তিরা

মূলধারার ট্রেড ইউনিয়ন-এর সঙ্গে যুক্ত ও শ্রমজীবী মহিলাদের অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে উঠে এল আরও কিছু বিষয়। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস (আইএনটিইউসি)-এর মহিলা কর্মী সমিতির সর্বভারতীয় চেয়ারপার্সন প্রফেসর অলকা ক্ষত্রিয় যেমন মনে করেন, সংগঠিত ক্ষেত্রে মহিলাদের কাজের সুযোগ কমে যাচ্ছে। ইউনিয়ন হিসাবে তাঁরা ইতিমধ্যেই সংগঠিত ক্ষেত্র, ইনফর্মেশন টেকনোলজি (আইটি), সরকারি ক্ষেত্র ইত্যাদিতে মহিলাদের সঙ্ঘবদ্ধ করার কাজ করেছেন। তবে সংখ্যাটি যে আশাপ্রদ নয় তাও জানালেন। প্রফেসর ক্ষত্রিয় জানালেন, “আমাদের দাবিসমকাজে সম-বেতন। এই মুহূর্তে আমরা মন দিচ্ছি অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলাদের জোটবদ্ধ করার। চুক্তিভিত্তিক কাজে মহিলাদের সংখ্যা যেমন গত কয়েক বছরে অনেকটাই কমে গেছে। রয়েছেন কৃষিক্ষেত্রে কাজ করা মহিলারা। তাদের তো শ্রমিক হিসাবে এমনকী তাদের পরিবারও মানতে রাজি হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রে। আমরা লড়াই করছি গৃহ পরিচারিকা ও নির্মাণকর্মী মহিলাদের শ্রমিকের অধিকার নিয়ে। সামাজিক সুরক্ষা ও কাজের অধিকার সুনিশ্চিত করার জন্য, তাঁদের যে শারীরিক ও মানসিক শোষণ চলে তার বিরূদ্ধে আগামী দিনে আমাদের লড়াই আরও সংঘটিত হবে।”

 

তাঁর বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া গেল অল ইন্ডিয়া আন-অর্গানাইজড ওয়াকার্স কংগ্রেস-এর কো-অর্ডিনেটর চন্দ্রলেখা পাণ্ডের বক্তব্যে। সংগঠিত ক্ষেত্রে মহিলাদের জন্য কাজের সুযোগ যে ক্রমেই কমে যাচ্ছে এবং তার ফলে ইউনিয়নে অংশগ্রহণও তা বলার পাশাপাশি তিনি জানালেন, অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলাদের মধ্যে এখনও ইউনিয়ন তৈরির গুরুত্ব বিষয়ে যথেষ্ঠ সচেতনতা নেই, অথচ এই মহিলাদের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে। এছাড়া রয়েছে রাজনৈতিক চাপ, রাজনৈতিক মদতপুষ্ট দুষ্কৃতীদের ভয় দেখানো, চুক্তিভিত্তিক মালিকদের কাজ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি। আই টি সেক্টর-এ আবার যেমন তরুণ প্রজন্ম রাজনীতি, ইউনিয়ন ইত্যাদি বিষয়ে উদাসীনতা দেখাচ্ছেনপাশাপাশি দীর্ঘ সময়কাজ সত্ত্বেও বিরাট অঙ্কের বেতন ও নিজেদের জীবনযাত্রার ভাবনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছেন। চন্দ্রলেখা পাণ্ডেমনে করেন, “অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলারা যে আর্থ-সামাজিক অবস্থান থেকে আসছেন তাঁরাই সরকার তৈরি করেন। তাঁদের মনে রাখতে হবে নির্বাচনে তাদের মতামতের প্রতিফলন থাকে। তাই ইউনিয়ন-এর রাজনৈতিক গুরুত্ব তাঁদের বোঝাতে হবে। প্রয়োজনে একটা বড় ছাতার তলায় আনতে হবে। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলে দাবি আদায় হবে না, ইউনিয়ন তৈরি করতেই হবে। এরজন্য তৃণমূল স্তরে পৌঁছে, স্থানীয় স্তরে ছোট ছোট দল তৈরি করে, মূলত মহিলাদের দল সংগঠিত করে সচেতনতা তৈরির প্রয়াস নেওয়া জরুরি।”

 

সেন্টার অফ ইন্ডিয়ান ট্রেড ইউনিয়ন (সিআইটিইউ)-এর জেনারেল সেক্রেটারি তপন সেন অবশ্য স্পষ্টতই বললেন কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের অংশগ্রহণই সামগ্রিকভাবে কমে যাচ্ছে, এই তথ্য পাওয়া যাচ্ছে সরকারি রিপোর্টে। সুতরাং তার প্রতিফলন ইউনিয়নে অংশগ্রহণেও পড়বে। তবে তিনি এও জানালেন, “সিআইটিইউ একক বৃহত্তম ট্রেড ইউনিয়ন যেখানে মহিলারা সংখ্যাগরিষ্ঠ। আমাদের অঙ্গনওয়াড়ি, মিড-ডে মিল ও আশা কর্মীদের ইউনিয়ন রয়েছে ও সেখানে মহিলাদের অংশগ্রহণ চোখে পড়ার মতো। তাছাড়া আমাদের বিভিন্ন আন্দোলনে ৫০শতাংশেরওবেশিমোবিলাইজেশন মহিলাদের দ্বারাই হয়ে থাকে।”

 

ন্যাশনাল হকার ফেডারেশন ও হকার সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক শক্তিমান ঘোষ স্বীকার করে নিলেন ইউনিয়ন-এ মহিলাদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম। অথচ অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, আশা কর্মী,  ১০০ দিনের কাজের কর্মী সব মিলিয়ে এক বিরাট সংখ্যক শ্রমজীবী মহিলা শ্রম দিচ্ছেন।  কিন্তু তাদের একত্রিত করার ক্ষেত্রে এখনও নানা সমস্যা রয়েছে।  অসংগঠিত ক্ষেত্রে মহিলাদের ভূমিকা অস্বীকারের জায়গাই নেই। অথচ তাদের কম মজুরি দেওয়া থেকে অতিরিক্ত সময়ে কাজ করিয়ে নেওয়া, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার মতো বিষয়গুলি উপেক্ষিতইরয়ে যাচ্ছে। এরজন্য প্রয়োজন তাঁদের কাজের দৃশ্যমানতা তৈরি করা। “সারা পশ্চিমবঙ্গে আনুমানিক ১৬ লক্ষ হকারের মধ্যে সাত থেকে আট লক্ষ মহিলা হকার রয়েছেন।  আগে যেমন মহিলারা রাস্তার ধারে হকারি করতে লজ্জা, অস্বস্তি বোধ করতেন, ধীরে ধীরে তা কেটেছে।  তেমনি পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় তাদের অনেক কাজকেই ঘরের কাজ বলে উপেক্ষা করা হচ্ছে। এই মানসিকতা দূর করতে অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলাদের জোট বাঁধতে হবে। ভাবতে হবে একটা সাধারণ মঞ্চের কথা। তবেই অধিকার সুরক্ষিত হবে,”তাঁর মত।

 

শ্রমজীবী আন্দোলনের দীর্ঘ দিনের কর্মী চন্দনা মিত্র তাঁর অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে জানালেন অতীতে সংগঠিত শিল্প ও চাকরি ক্ষেত্রে যেমন কটন মিল, জুট মিল, রেল ইত্যাদিতে ইউনিয়নে মহিলা কর্মীদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য ছিল। কিন্তু বর্তমানে এইসব ক্ষেত্রে কাজ কমছে সঙ্গে নির্দিষ্টভাবে কমছে মহিলাদের জন্য কাজ। তাছাড়া তিনি মনে করেন এখনকার ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় সঠিক রাজনৈতিক চর্চার অভাবও এই অংশগ্রহণ কমে যাওয়ার পেছনে একটা বড় কারণ। তিনিও এক কথায় স্বীকার করলেন যে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলাদের নিয়েই আগামী দিনে লড়াই দানা বাঁধবে। শিক্ষার অভাব, দক্ষ শ্রমিক হয়ে ওঠার সুযোগের অভাব এই মহিলাদের সামনে বাধা তৈরি করছে। কিন্তু নিম্নবিত্ত অবস্থানে থাকা এই মহিলাদের প্রতিদিনের জীবন-জীবিকার  লড়াইয়ের মধ্যেই রয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিয়ে কাজের বীজ। অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলাদের জন্য সরকারি তরফে বিভিন্ন সময়ে বহু কিছু ঘোষণা হলেও তার বাস্তবায়ন হয় না। নজর দিতে হবে সেদিকেও। সমকাজে সম-বেতন তো নেই-ই, তাছাড়া কাজের সময় নির্দিষ্ট আট ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যে আর্ন্তজাতিক শ্রম আইন ভাঙা হয় তিনি নজর টানলেন সেদিকেও। “তাছাড়া জরিশিল্পী, হোসিয়ারি শিল্পের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিতে কাজ করা বা ছোট কারখানার মহিলারা সংগঠিত হতে চাইলে কন্ট্র্যাক্টর বা মালিক পক্ষ থেকে নানাভাবে তাদের হেনস্থা করা হয়। সেই কারণেও তারা ইউনিয়ন তৈরি বা জোটবদ্ধ হতে দ্বিধায় পড়েন। এই সমস্যাগুলির মোকাবিলায় তাদের পাশে থাকতে হবে। এইজন্যই সকলে একত্রিত হয়ে মঞ্চ বা ইউনিয়ন তৈরি প্রয়োজন,” বক্তব্য তাঁর।

 

প্রয়োজন জোটবদ্ধ হওয়ার বিষয়ে সচেতনতা

শ্রমিকের স্বীকৃতি আদায়ের লড়াই, নিজেদের জীবিকায় অধিকারের লড়াই, বৈষম্যের বিরূদ্ধে লড়াই, পিতৃতান্ত্রিক আর্থ-সামাজিক পরিকাঠামোর বিরূদ্ধে লড়াইতে জোট বাঁধা, ইউনিয়ন তৈরির কোনও বিকল্প নেই এই কথা অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলাদের বুঝতে হবে। অনেকেই বুঝতে পেরেছেন, সংগঠিত হচ্ছেন। কিন্তু যে পরিমাণ মহিলা অংসগঠিত ক্ষেত্রে যুক্ত, তার তুলনায় সংখ্যাটা নেহাতই কম। এরজন্য প্রয়োজন ব্যাপক প্রচার ও সচেতনতা তৈরি। তাঁদের মধ্যে সেই সাহস ও বিশ্বাসের জায়গাটা তৈরি করা দরকার যে ইউনিয়ন করে নিজেদের অধিকারের কথা বললে মালিক পক্ষের কাছে কাজ হারানোর হুমকি শুনতে হবে না বা অন্য ভাবে হেনস্থা হতে হবে না। নাগরিক সমাজেরও সেক্ষেত্রে দায়িত্ব তৈরি হয় শ্রমজীবী মহিলাদের পাশে দাঁড়ানোর, তাঁদের অধিকার আন্দোলনকে সমর্থন করার। প্রত্যেক মহিলার কাজই যে শ্রম হিসাবে গন্য হওয়ার যোগ্য ও তাদের যে নির্দিষ্ট অধিকারগুলি রয়েছে সে বিষয়ে রাজনৈতিক ভাবনা তৈরি হলেই ইউনিয়নে মহিলাদের অংশগ্রহণ বাড়বে বলে আশা করা যায়।

 

লেখক সাংবাদিক এবং ডকুমেন্টারি নির্মাতা

 

Photo courtesy : Bijoy Choudhury

Share this
Leave a Comment