রাজনীতি ও পরিবেশের খামখেয়ালের প্রথম কোপটাই পড়ে কৃষকের উপর….


  • February 7, 2019
  • (0 Comments)
  • 233 Views

পরিবেশের পরিবর্তন এবং ফসলের ফলন ও উৎপাদিত পণ্যের বাজারীকরণ ও ন্যায্য দাম পাওয়া, সবকিছুই একসূত্রে গাঁথা। গোসাবা ব্লকের সাতজেলিয়া এলাকায় এবিষয়ে একটি সমীক্ষা করেছিলেন সংগ্রাম মণ্ডল। তারই কথা  লিখে পাঠালেন এই প্রতিবেদনে।

 

 

পরিবর্তন ঘটছে ঋতুর অবস্থানের, রাজনীতিও কৃষককে বেগ দিচ্ছে যথেষ্ট। তাই পরিশ্রমকে বাজারজাত করার নতুন পন্থার প্রয়োজন। একইসাথে ফসলের নির্দিষ্ট ও ন্যায্য মূল্যও দরকার। এসব নিয়েই কথা হচ্ছিল মঙ্গল আউলিয়া-র সাথে, মঙ্গল সুন্দরবনের টিপলিঘিরি নামের এক দ্বীপের বাসিন্দা। পশ্চিমবঙ্গের শেষপ্রান্তে সাতজেলিয়ার টিপলিঘিরি, দেড়শ মিটার চওড়া গড়াল নদী তাকে আলাদা করেছে জঙ্গল থেকে। মঙ্গল সেখানে প্রায় সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলেন। মঙ্গল বলছিলেন তার ছোটবেলার কথা, তখন সুন্দরবনে ছিল না পর্যাপ্ত পানীয় জল, ছিল না ন্যূনতম বিদ্যুৎ পরিবহন ও পরিষেবা। নোনা হাওয়ার সুন্দরবনে তখন বর্ষাকালকে চেনা যেত তার নির্দিষ্ট সময়েই, শীতকাল বছরের পর বছর নিজেকে জানান দিত কার্তিকের শিশিরবিন্দু থেকেই। তারপর সরস্বতীপুজো আর তরমুজ রোয়ার সময় পেরিয়ে শীত সঙ্গী হত বসন্তের। আজকাল বসন্ত ঋতুকে চেনা যায় না আলাদা করে, যেন সারাবছরটাই গরমকাল, আর তার মাঝে খুচরো ক’দিনের শীতকাল যেন কম গরমের এক সময়, যেন সান্ত্বনা পুরস্কার। সারাবছর যখন তখন হওয়া বৃষ্টি আসলে নিম্নচাপজনিত বৃষ্টি বৈ অন্যকিছু নয়। স্বাভাবিক বৃষ্টি আর স্বাভাবিক বর্ষাকাল মঙ্গল অনেকদিন দেখেননি বলেই জানালেন। যে ভাদ্রমাসের অবিরাম বর্ষণের জন্য তাঁরা বলতেন পচা ভাদ্র, তা আর বলার সুযোগ পান না তাঁরা। যেমন গত বছর বৃষ্টিহীন সময়ে ২৫শে জুন মঙ্গল ধানের বীজতলা করেছিলেন অতি কষ্টে সেচের মাধ্যমে সামান্য জলে। তারপরেই ১১ই জুলাই নিম্নচাপের দরুন প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতে বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়। কোনোরকমে ১৮ই জুলাই জমি প্রস্তুত করে ধান রোয়ার কাজ শুরু হয়। সেই ধান যখন ডিসেম্বরে কাটার জন্য উপযুক্ত হয়, ঠিক তখনি অনভিপ্রেত নিম্নচাপের জন্য বহু কৃষকের ধান নষ্ট হয়ে যায় এবং দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফলাফল হয় শূন্য।

 

আয়লার ফলে সুন্দরবনের কি পরিমাণে ক্ষতি হয়েছে তা নতুন করে বলার কিছু নয়। নোনাজলের প্লাবনে নষ্ট হয়েছে জমি, ফসল এবং ফসলের দীর্ঘকালীন সম্ভাবনা। আজ প্রায় দশ বছর পরে আয়লার ক্ষত ভুলে মানুষ নতুন করে এগোনোর চিন্তাভাবনা করছেন। একফসলী সুন্দরবনের ধানের মাঝে টুকিটাকি কুমড়ো বেগুন ইত্যাদি আবার চাষ করা শুরু হয়েছে। তবে ধানের থেকেও অর্থকরী ফসল হিসাবে সুন্দরবনের মানুষ আয়লার আগে দীর্ঘকাল যা চাষ করতেন সেই তরমুজ তাঁরা আর চাষ করতে পারেন না, আয়লার ফলে তরমুজের জন্য জমি একেবারেই অনুপযুক্ত হয়ে পড়েছে। মঙ্গল জানাচ্ছেন, আয়লার আগে শেষবার তাঁরা ভালো করে তরমুজ চাষ করতে পেরেছিলেন ২০০৮ নাগাদ। জমি তৈরী থেকে বীজবপন করার পর সমস্ত খরচ ধরেও প্রতিবিঘা জমিতে ৬০০০ টাকার বেশী খরচ হত না। এক বিঘা জমি থেকে যে পরিমাণ তরমুজ উৎপন্ন হত, তার মধ্যে প্রায় ২৩ থেকে ২৫ কুইন্টাল বাজারে বিক্রয়যোগ্য। প্রতি কুইন্টাল ৭০০ টাকা হারে এক বিঘা জমি থেকে চাষী প্রায় ১৬১০০ থেকে ১৭৫০০ টাকা আয় করতেন এবং তাতে মুনাফা থাকত ১০১০০ থেকে ১১৫০০ টাকা পর্যন্ত। আয়লার পর এই আয় আর সুন্দরবনের কৃষক পরিবারগুলি করতে পারছেন না। উপরন্তু অন্যান্য ফসলগুলিরও অত্যন্ত অনিয়মিত এবং অনিশ্চিত চাষ কৃষক পরিবারগুলিকে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভাবে পিছিয়ে দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার বিগত শতকের শেষ দশকের দ্বিতীয় ভাগে স্কুল সার্ভিস কমিশন চালু করে। এর ফলে সুন্দরবনের প্রত্যন্ত এলাকার প্রচুর মেধাবী ছাত্রছাত্রীরা চাকরি পায় ঠিকই, কিন্তু সারা দেশের সাথে তাল মিলিয়ে কর্মহীনতাও বাড়তে থাকে এই অঞ্চলে। এই পরিস্থিতিতে চাকরি পাওয়া জনসংখ্যার প্রায় সমস্ত অংশই কর্মস্থলের চাহিদায় বাসস্থান পরিবর্তন করে এবং আয়লায় প্রায়-ধ্বংসপ্রাপ্ত সুন্দরবনে কখনোই ফিরে আসে না। তাই কয়েক লক্ষাধিক জনসংখ্যার সুন্দরবন দিনে দিনে এক পরিত্যক্ত জনপদ হয়ে পড়ছে। যাঁরা এখন সেখানে বসবাস করেন, তাঁদের পরিস্থিতি আঁচ করা যায় মঙ্গল আউলির কথাতেই। আয়লা পরবর্তী এই সময় সম্পর্কে তিনি বলছেন, “এক আয়লা আমাদের পিছিয়ে দিয়েছে এক্কেবারে পঞ্চাশ বছর’’।

 

এখন জায়গাটা যখন সুন্দরবন তখন তাকে শুধু একদেশের বাঁধনে বেঁধে কিইবা হবে। পাকেচক্রে রাজনীতি মাঝখান দিয়ে বিভেদ রেখা টানলেও দুইপারেই দুর্দশা একইরকম। আয়লার করাল গ্রাসে নত হয়েছে কূটনৈতিক সীমানা। জীবন ও পরিবেশের প্রতি রক্তচক্ষু সমান প্রকট। বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলা, তারই এক গ্রাম পাখিমারা। বাসিন্দা রামকৃষ্ণ জোয়ারদার এবং স্থানীয় পাখিমারা পরিবেশ বান্ধব IFM কৃষি নারী সংগঠনের সদস্যরা জানালেন আয়লা পরবর্তী তাঁদের রোজনামচার কথা। যা জানা গেলো, তা মঙ্গল আউলিয়ার বলা কথা থেকে আলাদা কিছুই নয়, বরং যেন পানীয় ও ব্যবহারযোগ্য জলের অধিকার হরণের স্বাভাবিক অভ্যাস বজায় রয়েছে এলাকাটিতে। প্রত্যেকটি জলের জারের দাম ১২ টাকা এবং তা আনার খরচ প্রায় ২০ টাকা। আরও নানাখাতে নানারকমের খরচ লেগেই আছে শুধু একপাত্র জলের জন্য। আশেপাশে পদ্মপুকুর, সাতক্ষীরা, পাখিমারা, শ্যামনগর ইত্যাদি সব এলাকাতেই চলছে এই কারবার, জানালেন স্থানীয় বনজীবি নারী উন্নয়ন সংগঠনের সদস্যরা। অতএব এখন বিকল্প কৃষি ও বিকল্প অর্থনীতির সন্ধান ছাড়া কোনও গতি নেই। ওয়েলফেয়ার স্টেট মডেল অথবা সনাতনী ধ্রুপদী উন্নয়নের বিজ্ঞাপন কিছুই আর কাজ দিচ্ছে না, তাই আগামী প্রজন্মকে সুন্দর ও সফল পৃথিবী উপহার দিতে গেলে এগোতে হবে জীবন ও পরিবেশের সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে, তার জন্য যতদূর অবধি যাওয়া যায় তাঁরা যাবেন। তার প্রথম পদক্ষেপ সুন্দরবনেই।

 

 

লেখক বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ছাত্র।

ফটো: South Asian Forum for Environment (SAFE)

Share this
Leave a Comment