নানাজী দেশমুখকে ভারতরত্ন প্রদান : ভাজপা সরকারের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি


  • February 3, 2019
  • (0 Comments)
  • 374 Views

২০১৯ সালে ভারতরত্ন প্রাপকদের মধ্যে একজন হলেন শ্রী নানাজী দেশমুখ। মরণোত্তর পুরস্কার প্রাপ্ত নানাজী দেশমুখ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পর যে শিখবিরোধী দাঙ্গা, তার অন্যতম সমর্থক ছিলেন নানাজী। ঠিক কি ধরনের রাজনৈতিক ভাষা ও ধ্যানধারণার মধ্য দিয়ে নানাজী এই সমর্থন ব্যক্ত করেন? তো, এহেন নানাজীকে  এই মরণোত্তর ভারতরত্ন জ্ঞাপন ভাজপা সরকারের যে ভিত্তিগত সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, তার প্রতিই আরেকবার অঙ্গুলিনিৰ্দেশ করে।  লিখছেন পৃথা মণ্ডল

 

২০১৯ সালের ভারতরত্নপ্রাপকদের মধ্যে অন্যতম হলেন শ্রী নানাজী দেশমুখ। মরণোত্তর পুরস্কার প্রাপ্ত নানাজী দেশমুখ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার পর সমস্ত দেশজুড়ে শিখ সম্প্রদায়ের উপর যে গণহত্যা চলে নানাজী তার সপক্ষে মতপ্রদান করেন। ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার ফলস্বরূপ  হাজার হাজার শিখ পুরুষ, মহিলা ও শিশুকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়, নির্বিচারে হত্যা করা হয় ও তাদের সম্পত্তি ও ধর্মস্থান ধ্বংস করা হয়। অনুমান করা হয় এই হত্যাকাণ্ডের পিছনে কংগ্রেস ক্যাডার দের সক্রিয় ভূমিকা আছে। কিন্তু অন্যান্য প্রাদেশিক শক্তিগুলি র ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। এদের এই কার্যের কখনও কোনও সক্রিয় অনুসন্ধান হয়নি। এ হল সেই শক্তি যা পরে বাবরী মসজিদ ধ্বংস, গ্রাহাম স্টেইনের হত্যা ও এহেন আরও বহু নারকীয় ঘটনার মদতকারী।

 

ভারতের ফ্যাসিস্ট শক্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ মুসলমান ও ক্রিশ্চিয়ানদের বিরোধী বলে দাবী করে কারণ তারা এই ধর্মগুলিকে বিদেশী ধর্ম বলে মনে করে। কিন্তু আসলে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন ধর্মমতাবলম্বী সম্প্রদায়  শিখদের ও ধ্বংস চায়। তারা শিখ ও হিন্দু ধর্মের সমন্বয়ের কথা বললেও ১৯৮৪ সালে মুদ্রিত নানাজীর একটি লেখা থেকে প্রমাণিত হয় এরাও আসলে কংগ্রেসের মতই শিখ গণহত্যার সোচ্চার সমর্থন কারী।

 

৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ তে নানাজী একটি লেখা রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির মধ্যে বিতরণ করেন। ২৫ নভেম্বর ১৯৮৪ সালে জর্জ ফার্নান্দেজের সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত হিন্দী পত্রিকা ‘প্রতিপক্ষ’তে নানাজীর এই লেখাটি প্রকাশিত হয়। সম্পাদক নানাজীকে আর.এস.এস-এর নীতিনির্দেশক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে এই লেখাটির কিছু ঐতিহাসিক মূল্য আছে। তাই পত্রিকার কিছু নিয়ম লঙ্ঘন করেও লেখাটি মুদ্রিত হল।

 

নানাজী তার লেখায় যে বক্তব্য রাখেন তার মূল প্রতিপাদ্যগুলি নিম্নে পেশ করা হল:

ক) শিখহত্যা কোন বিচ্ছিন্ন সমাজবিরোধীদের কার্য নয় বরং তা ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর কারণে আমজনতার স্বতস্ফুর্ত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

খ) ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকারী দুইজন শিখ রক্ষী আসলে শিখ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে কার্যটি করে।

গ) শিখ সম্প্রদায় নিজেরাই এই গণহত্যাকে আহ্বান করেছে। কংগ্রেসের মত তিনিও বিশ্বাস করেছেন যে এই গণহত্যার প্রয়োজন ছিল।

ঘ) নানাজী ‘অপারেশন ব্লু স্টার‘-এর কার্যকলাপকে সমর্থন করেন। এর বিরোধিতা করাকে তিনি সমাজবিরোধী কার্য বলে উল্লেখ করেন।

ঙ) পাঞ্জাবের হিংসাত্মক ঘটনার জন্য তিনি পুরোদস্তুর শিখ সম্প্রদায়কে দায়ী করেন।

চ) শিখদের এই গণহত্যার বিরোধিতা না করে সহনশীল ও ধৈর্য্যশীল হওয়া উচিত ছিল বলে তিনি মনে করেন।

ছ) তিনি মনে করেন শিখ সম্প্রদায়ের কিছু বুদ্ধিজীবী মানুষ শিখ সম্প্রদায়কে উসকানি দিয়েছে। তিনি বলতে চেয়েছেন যে শিখরা ভারতীয়দের মূলস্রোত থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার কারণে এই জনরোষের শিকার হয়।

জ) ইন্দিরা গান্ধীকে তিনি ভারতীয় উপমহাদেশের উপযুক্ত কর্ণধার বলে সাব্যস্ত করেন এবং তার হত্যার ফলস্বরূপ এরূপ শিখহত্যাকে সমীচীন বলেই মনে করেন।

ঝ) রাজীব গান্ধী যখন শিখহত্যাকে একটি বৃহৎ বৃক্ষপতনের ফলে যে কম্পন অনুভূত হয় তার সাথে তুলনা করেন নানাজী তাকে সমর্থন করেন।

ঞ) নানাজী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকে মহাত্মা গান্ধীর হত্যার সাথে তুলনা করেন।তার মতে গান্ধীজী হত্যার পর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের সদস্যরা যেমন সংযত ব্যবহারের পরিচয় দিয়েছে শিখদের তেমনই সংযত থাকা উচিত। অথচ এটা সর্বজনবিদিত যে মহাত্মাজী হত্যার সাথে এই সংঘের  যোগ ছিল যেখানে ইন্দিরাজীর হত্যার সাথে নিরীহ শিখ সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের কোন প্রত্যক্ষ যোগ ছিল না।

 ট) নানাজী এই লেখাটি ৮ নভেম্বর , ১৯৮৪-তে লেখেন ও প্রচার করেন। ৩১ অক্টোবর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত নির্বিচারে শিখহত্যা চলে। ৫ নভেম্বর থেকে ১০ নভেম্বর পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী মাত্রায় হত্যা সংঘটিত হয়। এই লেখাতে কোথাও কংগ্রেস সরকারের কাছে শিখদের নিরাপত্তার দাবিতে কোন আর্জি জানানো হয় না।

ঠ) রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ তাদের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ছবি সহযোগে প্রচার করে থাকে। কিন্তু শিখহত্যার প্রতিকারে তাদের কোন উদ্যোগের কোন পরিচয় মেলে না।

 

ছবির সূত্র – https://www.quora.com/

 

শিখহত্যার প্রকৃত দোষীরা বছরের পর বছর পর্দার আড়ালে থেকে গেছে। সম্প্রতি কংগ্রেস নেতা সজ্জনকুমারের শাস্তি হয়েছে। এমতাবস্থায় শিখহত্যার সক্রিয় সমর্থনকারী নানাজী দেশমুখের ভারতরত্নপ্রাপ্তি ভাজপা সরকারের প্রকৃত চরিত্র উপস্থাপিত করে।

 

 

লেখক পেশায় শিক্ষক।

Share this
Leave a Comment