“হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে গিয়ে প্রাণ দিতে হল ইন্সপেক্টর সুবোধ কুমারকে”: রিহাই মঞ্চ


  • December 15, 2018
  • (0 Comments)
  • 435 Views

রাজনৈতিক সংগঠন এবং গোরক্ষকদের আক্রমনে দাঙ্গা-র পরিস্থিতি উত্তর প্রদেশের বুলন্দশহরে। গোহত্যার সন্দেহজনক গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সশস্ত্র চেষ্টায় বাদ সাধার ফলে খুন হলেন ইন্সপেক্টর সুবোধ সিংহ। প্রধান অভিযুক্ত পুলিশের অধরা থাকলেও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে ভিডিও বার্তায় দাবী করেন তিনি বজরং দলের সদস্য। পুলিশের এফআইআরে অসঙ্গতি, প্রধান অভিযুক্ত এবং সহ অভিযুক্তের বক্তব্যে অসঙ্গতি। তবু যোগী সরকারের নীরব সমর্থন। “এই ঘটনার বিচার সর্বোচ্চ আদালতের অধীনে হোক”, দাবী তুললেন উত্তর প্রদেশে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সক্রিয় জনসংগঠন “রিহাই মঞ্চ”। নিচে তাঁদের প্রেস বিজ্ঞপ্তির বাংলা অনুবাদ দেওয়া হল। অনুবাদক: মৈনাক।

 

বিজ্ঞপ্তিটিতে করা দাবীগুলির দায়িত্ব রিহাই মঞ্চ-এর। গ্রাউন্ডজিরোর তরফ থেকে সমস্ত দাবীর সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয় নি।

 

 

লখনউ ৭ ডিসেম্বর,২০১৮:  বুলন্দশহরের হিংসা নিয়ে লোহিয়া মজদুর ভবনে সাংবাদিক সম্মেলনে রিহাই মঞ্চের অধ্যক্ষ মুহম্মদ শোয়েব এবং পূর্বতন আইজি এস.আর. দারাপুরী বললেন বজরং দল, বি.জে.ওয়াই.এম., ভি.এইচ.পি.-র মতন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন গুলির ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে গিয়ে প্রাণ দিতে হল ইন্সপেক্টর সুবোধ কুমার কে।

 

মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কথায় স্পষ্ট হয়ে গেল যেসব সংগঠন গো-হত্যার নামে হিংসা ছড়িয়ে ইন্সপেক্টর সুবোধ কুমারকে হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে তিনি আগ্রহী নন। আইজি এস.কে ভগত এর বক্তব্য অনুযায়ী উদ্ধার হওয়া মাংস ৪৮ ঘন্টা আগের। এর থেকে স্পষ্ট হয় গোরু কাটা হয় অন্য জায়গায়, এবং হিংসা ছড়ানোর জন্য সেগুলি ঘটনাস্থলে নিয়ে আসা হয়। গো-মাংস রাস্তায় রেখে বড়সড় দাঙ্গা লাগাতে চেয়েছিল কিছু গোষ্ঠী। যোগী আদিত্যনাথ ওই হিংসায় সামিল থাকা মৃত সুমিতের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে বুঝিয়ে দিলেন পুলিশ বা আম-জনতা যেই মারা যাক সরকার সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে থাকবে। ওই হিংসাত্মক ঘটনার সময় সুমিতের পাথর ছোড়া আর হামলা করার ভিডিও ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া সত্ত্বেও কি করে তার পরিবারকে ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হল, এবং কি করে তার নাম এফ.আই.আর থেকে মুছে দেওয়ার কথা বলছে প্রশাসন? এইসবের একটাই কারণ ভোটের আগে আরেকটা মুজঃফরনগরের মত দাঙ্গা করানো। হামলাকারী সুমিত কে শহিদ ঘোষণা করার চেষ্টা করা হচ্ছে যাতে আগামী ইলেকশনে এর ধকল না নিতে হয়।

 

 

গো-মাতার নামে এই উপদ্রবকারীদের দেশে আগুন লাগানোর চেষ্টার যত নিন্দা করা যায় তা কম। উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসারদের ঘটনার উপর পক্ষপাতদুষ্ট বয়ান দেখে তাদের থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের আশা করা মুর্খামি। গো-মাতার নামে সংগঠিত ভীড়ের হামলা নিয়ে বলা হয়েছে এই ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষমতা প্রদর্শনের সুযোগ আসলে তৈরি করে দেয় গরু চুরি বা গোহত্যার মতো ঘটনাই। কিন্তু এটা বলা হল না যে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে কাটা গরুর মাথা নিয়ে রাস্তায় আস্ফালন করা কি ধরনের জনমত প্রদর্শন। বজরং দল, ভাজপা, ভিএইচপি দ্বারা ঘটানো হিংসাত্মক ঘটনাকে জনমত বলা, আর এই সংগঠন গুলোর নাম মুখে না আনা – এর থেকে স্পষ্ট যে সঙ্ঘ পরিবারের সদস্যদের দাপটের সামনে সরকার প্রশাসন কি পরিমাণ আত্মসমর্পণ করেছে। মূল অভিযুক্ত যোগেশরাজ যখন নিজের ভিডিও ভাইরাল করে নিজেকে বজরং দলের নেতা বলে দাবী করছে, তখন যোগী সরকার কেন বজরং দলের নাম নিতে ভয় পাচ্ছে?

 

গো-হত্যার প্রশ্নে বলা হয়েছে যোগেশরাজের করা এফআইআর এবং তারপর যোগেশরাজ ও শিখর অগ্রবালের ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে অন্তর্বিরোধী বয়ান ঘটনার সত্যতার উপর শুধু প্রশ্নই তোলে না, বরং ঘটনাটিকে মিথ্যা করে দেয়। আইজি এস কে ভগতের বয়ান স্পষ্ট করে দেয় উদ্ধার হওয়া গো-মাংস ৪৮ ঘন্টা আগের, অর্থাৎ ১ ডিসেম্বর গো-হত্যা হয়েছিল। স্পষ্টতই বলা যায় দাঙ্গা করানোর জন্যই গোরু কেটে আনা হয়েছে আর সঠিক সময়ে সেটা ব্যাবহার করার অপেক্ষায় ছিল। যদি তা না হয় তাহলে গোরুর মাংস ট্রলিতে ঝুলিয়ে রাস্তায় আনা হয়েছিল কেন? এই কথা খোদ হত্যায় অভিযুক্ত শিখর গুপ্তা স্বীকার করে নিয়েছেন যে ট্রলিতে করে মাংস আনার সময় তার ইন্সপেক্টর সুবোধ সিংহ এর সাথে ঝগড়া হয়। ভিডিওতে শিখর স্বীকার করেছেন ওই ট্রাক্টর-ট্রলিতে করে গোরুর অবশেষ যখন চিংরাবটি থানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, ইন্সপেক্টর সুবোধ সিংহ সেটাকে দাঁড় করিয়ে সেইখানেই কবর দিতে বলেন, যা মানা হয়নি। যোগেশরাজের করা ভিডিও অনুযায়ী ক্ষেতের মধ্যে মাংস দেখার পর সে থানায় এফ আই আর করাতে গিয়েছিল আর সুবোধ কুমারের হত্যার সময় সে সেখানে ছিল না। শিখরের ভিডিও মারফত জারি করা বক্তব্যে মিথ্যা প্রমাণিত হয় সহজেলাধিকারীর উপস্থিতিতে দেওয়া যোগেশরাজের বয়ান। ভিডিওটিতে সুবোধকে মুসলিম পক্ষের লোক বলে স্পষ্ট করে দাগিয়ে দেওয়া থেকে পরিষ্কার যে ইন্সপেক্টর সুবোধ সিংহ এর হত্যা ‘টার্গেট কিলিং’ ছিল।

 

 

যোগেশরাজের ছেলে সুরজভান নয়াগাঁও নিবাসী, থানা সিয়ানা, জেলা বুলন্দশহর। নিজের বয়ানে সে বলেছে ৩ ডিসেম্বর ৯টার সময় সে শিখর কুমার, সৌরভ এবং অন্যান্য বন্ধুবান্ধবের সাথে মহাবর জঙ্গলে ঘুরতে গেছিল। সেখানে তারা দেখে সুদেফ চৌধুরী, ইলিয়াস, শরাফত, ইউনুস, সাজিদ, পারভেজ, সইফুদ্দিন গোরু কাটছিল৷ ওদের চিৎকার করার ফলে গোহত্যাকারীরা ওই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। পুলিশের এফআইআর-এ সিয়ানা থানার পুলিশ ও জেলা প্রশাসক কখন ওই ঘটনাস্থলে পৌছন তার কোন উল্লেখ নেই। এফআইআর-এ উল্লিখিত অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমানে দিল্লীতে চাকরি করেন ব’লে পরে জানা যায়।। এই পরিস্থিতিতে এফআইআর-এর বয়ানে যে তথ্য রয়েছে তা বিশ্বস্ত বলে মনে হয় না। নিরপেক্ষ ভাবে তদন্ত করা দরকার যে ১২ বছর অনূর্ধ্ব নাবালক অনস এবং সাজিদ-এর নাম, এবং এলাকার বাইরের লোকেদের নাম অভিযুক্তদের তালিকায় কি করে আসে।

 

ভাইরাল ভিডিওটিতে পরিষ্কার যে যোগেশরাজ ও তার সাথীরা ট্রাক্টর-ট্রলি তে করে কাটা গরু নিয়ে বিংরাবটি এলাকায় পৌঁছায় এবং রাস্তায় ট্রাক্টর দাঁড় করিয়ে রাস্তা জ্যাম করে দেয়। কিছু প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য অনুযায়ী গো-মাংসের টুকরো আখের ক্ষেতে এমনভাবে ঝোলানো ছিল যাতে দূর থেকে দেখা যায়। ঘটনার সত্যতা বিচার করতে যোগেশরাজের বক্তব্য মন দিয়ে দেখা উচিত। তার বয়ান অনুযায়ী অপরাধীরা ঘটনাস্থলে গরু কাটছিল এবং ওদের দেখে পালিয়ে যায়। গরুর সংখ্যা অনুযায়ী পরিমাণ মত মাংস পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু এখনো এটা স্পষ্ট নয় যে ঘটনাস্থল থেকে কতটা গো-মাংস উদ্ধার হয়েছে? এও ভাবা দরকার, যারা মাংস খায় তারা গো-হত্যা ক’রে মাংস আখের গায়ে ঝুলিয়ে রাখবে, না গোমাংস, মাথা, পা, ইত্যাদি সবকিছু লুকিয়ে তুলে নিয়ে যাবে? কিন্তু এই মামলায় যোগেশরাজের বয়ান অনুযায়ী গো-হত্যাকারী রা ঘটনাস্থল থেকে মাংস তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় পায়নি। এইসব প্রমাণ করে যোগেশরাজদের উদ্দেশ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পরিস্থিতি নষ্ট করা যাতে কোনো বড় দাঙ্গা লাগানো যায়। প্রশ্ন ওঠে, যদি যোগেশরাজ গো-হত্যাকারীদের সত্যি দেখে থাকেন, তাহলে চিৎকার করে আশপাশ থেকে লোকজনদের সাহায্য নিয়ে তাদের ধরতে পারতেন৷ ঘটনাটি তো সকাল ৯টায় ঘটে।

 

 

আরেকটা বিষয়ের দিকেও নজর দেওয়া দরকার। ঘটনাস্থলে সিয়ানা থানার পুলিশ এবং উপজেলাপ্রশাসক সময় মতন পৌঁছে গেলেও এত বড় ঘটনা তাদের সামনে কি করে ঘটল। এই ঘটনায় এক সৎ নিষ্ঠাবান পুলিশ অফিসারের প্রাণ নেওয়া হল, সরকারি সম্পত্তি পুড়িয়ে ভাঙচুর করে লোকসান করা হল। যোগেশরাজের কার্যকলাপ থেকে তার অপরাধ প্রবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়। পুরো সময় সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর চেষ্টা করছিল সে।

 

সুদর্শন টিভির মালিক সুরেশ চৌহানের ভূমিকাও বিচার করে দেখা উচিত। ৩ ডিসেম্বরের রাত ১:১৯-এ তিনি ট্যুইট করে ইঙ্গিত দেন যে, বুলন্দশহর সম্বন্ধে কোন বড় খবর পরের দিন সুদর্শন টিভিতে প্রকাশ্য করা হবে। এমনটা নয় তো যে যা কিছু ঘটেছে তা পূর্ব-নির্ধারিত কোনো পরিকল্পনার ফলাফল। হয়ত বড় দাঙ্গা করানোর পরিকল্পনা ছিল কিন্তু সময় মত পুলিশ ও প্রশাসন সক্রিয় হয়ে ওঠায় তা সফল না হওয়ার ফলে ক্রোধের শিকার হলেন পুলিশ ইন্সপেক্টর?

 

 

 

ভাইরাল ভিডিও তে পরিষ্কার শোনা গেছে “কুন্দন গোরু কেটেছে”। ভিডিওটি যে বানাচ্ছিল তার উপর গালিগালাজ করা হয়, সেটাও শোনা যাচ্ছে। কুন্দন এবং যোগেশরাজের মধ্যে কি সম্পর্ক সেটাও জানা দরকার। এই ভিডিও সাব-ইন্সপেক্টর সুভাষচন্দ্র- র করা রিপোর্টের সত্যতা সমর্থন করে। পুলিশফোর্স ঘটনাস্থল থেকে পিছু হটতে থাকে এবং ক্ষেতের মালিকেরা সিয়ানা থানায় ঢুকে নিজেদের প্রাণ বাঁচায়। এই কথার সমর্থনও ভিডিওটিতে পাওয়া যায়। ইন্সপেক্টর সুবোধ সিংহকে হত্যা করার উদ্দেশ্যও আগের ঘটনা থেকে স্পষ্ট, কারণ তিনি সেই ইন্সপেক্টর যিনি গো-রক্ষকদের হাতে খুন হওয়া আখলাক হত্যার তদন্তকারী অফিসার ছিলেন। একজন তদন্তকারী পুলিশ অফিসারকে রাস্তা থেকে সরানোর জন্যও এই ঘটনা ঘটানো হয়ে থাকতে পারে৷ যা-ই বাস্তবে ঘটে থাকুক, এই ঘটনার বিচার সর্বোচ্চ আদালতের অধীনে হোক।

 

গ্রাউন্ডজিরো সংযোজন: উল্লেখ্য এই যে নিহত পুলিশ ইন্সপেক্টর সুবোধ কুমার সিংহ ২০১৫ সালে (গোমাংস বাড়িতে রাখার সন্দেহে খুন হওয়া) মহম্মদ আখলাক-এর হত্যার তদন্তকারী অফিসার ছিলেন, এবং বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী তিনি ওই মামলায় উল্লেখনীয় অগ্রগতি করেছিলেন। কিছু সময়ের মধ্যে তাঁকে বেনারাসে বদলি করে দেওয়া হয়। এও উল্লেখযোগ্য যে আখলাক হত্যাকাণ্ডে মূল অভিযুক্ত রুপেন্দ্র রানা ২০১৯ নির্বাচনে উত্তর প্রদেশের নবনির্মাণ সেনা-র প্রার্থী হতে চলেছেন বলে খবর। শুধু রুপেন্দ্র নয়। রাজস্থানে মহম্মদ আফরাজুল নামে বাঙ্গালি মুসলমান দিনমজুরকে ক্যামেরার সামনে জ্যান্ত কুপিয়ে খুন করেছিল যে শম্ভুলাল রেগার, এবং তরুণ জুনেইদ খানকে ট্রেনের কামরায় সর্বসমক্ষে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগে অভিযুক্ত নরেশ সেহরাওয়াত-ও ২০১৯-এ প্রার্থী হতে চলেছে বলে খবর। প্রত্যেকেরই প্রার্থীপদ দেওয়া হচ্ছে উত্তর প্রদেশের দক্ষিণপন্থী হিন্দু সংগঠন নবনির্মাণ সেনা-র তরফ থেকে।

Share this
Leave a Comment