ন্যায় ও নীতির লড়াইয়ে জয়ী মেডিক্যালের ছাত্ররা


  • July 23, 2018
  • (0 Comments)
  • 1958 Views

দু’সপ্তাহ ব্যাপী অনশন-আন্দোলন-প্রতিবাদের পরে ন্যায্য দাবি আদায় করে নিলেন কলকাতা মেডিকাল কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। মিলল হোস্টেল।

দেবাশিস আইচ

অবশেষে মাথা নত করলেন মেডিক্যাল কলেজ কর্তৃপক্ষ। ১৪ দিন ধরে ছাত্রদের অভুক্ত রেখে, তাদের চরম শারীরিক ক্ষতির ঝুঁকির সামনে ঠেলে দিয়েছিলেন তাঁরা। অবশেষে আজ কাউন্সিলের বৈঠকে প্রিন্সিপাল সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে নতুন ভবনের দুটি তল সিনিয়র ছাত্রদের জন্য ছেড়ে দিতে রাজি হলেন। অনশন সত্যাগ্রহ তুলে নিয়েছেন ছাত্ররাও।

মেডিক্যাল কলেজের সমস্যা ছিল একান্তই অভ্যন্তরীণ। ঝকঝকে হস্টেল বাড়ি হয়েছে, স্বাভাবিক ভাবেই নোংরা, আবর্জনা পূর্ণ চত্বর, মাথার উপর ভেঙে পড়ো পড়ো ছাদের নীচে যারা তিন-চার বছর কাটিয়ে দিল তাদের তো মনে হতেই পারে – এবার একটু ভালো থাকি। সব মানুষের তো তাই মনে হয়। সকল মানুষই তো খারাপ পরিস্থিতি থেকে আরও একটু ভালো, আরও ভালোর খোঁজেই যাত্রা করে চলে। আর সরকারও তো জানে, হস্টেলের অপ্রতুলতা, ভগ্নদশার কথা। তাই তো অমন বহুতল হস্টেল নির্মাণ।

হবু ডাক্তাররা যে হোস্টেলে থেকেছেন গত তিন-চার বছর:

ছাত্র-ছাত্রীরা দাবি করল, এবার তবে নিয়ম নীতি মেনে হস্টেলের ঘর মিলুক। নিয়মও তো সাধারণ, রুটিনবাঁধা। দূর জেলা থেকে আসা, অর্থনৈতিক ভাবে কিংবা সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা, প্রতিবন্ধী ছাত্র-ছাত্রীদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। মোটামুটি তো তাই। আর অনশনরত ছাত্র-ছাত্রীরা তো নিজের স্বার্থসাধন করতে চায়নি, সবার চেয়েছে। এই স্বাভাবিক অধিকারটির জন্য তারা প্রায় দু’বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। কান দেননি কেউ। এর জন্য তো, রাজা-উজির মারার দরকার ছিল না। কলেজ, হস্টেল কর্তৃপক্ষ ও ছাত্র-ছাত্রীদের বিষয়। নির্দিষ্ট নিয়ম মানার বিষয়। এই সামান্য অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাজটিও আজ এ রাজ্যে নানা কুতর্ক এবং রাজনৈতিক অভিসন্ধিতে জর্জরিত। এমন সময় সুমন্তবালা দেবীর কথা মনে পড়ে। পূর্ণ বয়সেই তিনি গত হয়েছেন। তা প্রায় ৩৩ বছর হল। সাধারণ সমস্যা ঘেঁটে গিয়ে পরিবারে রাগারাগি হলে, তিনি নিশ্চিত গলায় বলতেন, “অইব, অইব অত উতলা হইস না। কয় না, গাধায় জল খায় ঘুলাইয়া।” এ ক্ষেত্রে কী করে আর উতলা না হয়ে থাকা যেত? সমস্যাটি তো আর হস্টেলের আসন বণ্টনে থেমে ছিল না। হয়ে উঠল জীবনমরণ সমস্যা।

হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে এক অনশনকারী ছাত্রকে

ছাত্ররা তো প্রথমে হস্টেল নিয়ে আলোচনাই করতে গিয়েছিল অধ্যক্ষের সঙ্গে। এই কলেজ, এই হস্টেল তো তাদের। তার উন্নতিতে কথা বলার হকও তাই তাদেরই। এই তো ক’দিন আগেই শিক্ষা বিষয়ক এক রিপোর্টে অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের বক্তব্য পড়ছিলাম। তিনি বলছেন, “স্কুল শিক্ষায় কী কী উন্নতি ঘটানো দরকার তার বিশ্লেষণে ছাত্রছাত্রীদের মতামত থেকে খুবই সাহায্য পাওয়া যেতে পারে। স্কুলটা যে তাদের – এই বোধটা জাগানোর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নেই। “এটা আমার স্কুল”, বা “আমার মতামতেরও দাম আছে” – স্কুলের বাচ্চাদের এই উপলব্ধির চেয়ে প্রেরণদায়ক ব্যাপার আর কী হতে পারে?” স্কুলের বদলে কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বসিয়ে দিলে তাঁর বক্তব্যের মূল ভাবটি একটুও টোল খায় না। এই কথা শুনবে কে? চোরা আর কবে ধর্মের কাহিনি শুনেছে।

আসলে ঘটেছে ঠিক উল্টোটি। হস্টেল সংক্রান্ত আলোচনা করতে গিয়ে তারা কাউন্সিলের বৈঠকে মুখঝামটা খেয়েছে। যাদের হওয়ার কথা সমব্যথী, সহমর্মী, সহভাগী সেই শিক্ষক- প্রশাসকরা যদি শত্রুর মতো ব্যবহার করেন তবে রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, এমন রাগ-অভিমান বাড়িতেও হয়। রাগ বর্ষিত হয় মুখের সামনে বেড়ে দেওয়া খাবারের পাতে। আবার সস্নেহ আচরণে রাগ জল হতে সময় লাগে না। কিন্তু সন্তানসম ছাত্রদের প্রতি এ কী আচরণ করলেন কর্তৃপক্ষ?

অনশনের মাঝে এক শিক্ষক চিকিৎসক মন্তব্য করলেন, “অনশন করে মরে গেলে ফুলের মালা দিয়ে শহিদ মিছিল করো।” দুর্ভাগ্য সে দেশের, দুর্ভাগ্য শিক্ষক জগতের যেখানে অনশনরত ছাত্রদের সিনিয়র শিক্ষক-চিকিৎসকের মুখ থেকে এমন নিষ্ঠুর কটুবাক্য শুনতে হয়। এর পর তাদের অনশন চালিয়ে যাওয়া ছাড়া পথ কী ছিল? আর কী করার ছিল ছাত্রদের যদি রাজ্যের স্বাস্থ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তারা মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন? কী করার ছিল ছাত্রদের যদি ডিরেক্টর অভ মেডিক্যাল এডুকেশন-এর স্বাস্থ্য ও শিক্ষা অধিকর্তাদের মেরুদণ্ড ন্যুব্জ হয়ে পড়ে? তা তারা বিকিয়ে দিয়ে বসে এক চিকিৎসক বিধায়কের পায়ের নীচে? কী করবে ছাত্ররা যদি শিক্ষামন্ত্রী যাদবপুর, প্রেসিডেন্সি আর দলীয় তোলাবাজ ছাত্রনেতাদের কর্মকাণ্ডে নাকানিচোবানি খেয়ে প্রায় স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান? কী করবে ছাত্ররা যদি স্বাস্থ্য তথা মুখ্যমন্ত্রী ৪২-এ ৪২ এবং দেশনেত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর থাকেন?ক্ষমতার কাছে এ আসলে বেয়াদবি। বেয়াদবিই বটে। চোখে লাগার মতো বেয়াদবি। কলেজে কলেজে স্বাভাবিক রীতি যখন দুষ্কৃতী আর তোলাবাজ নেতাদের দৌরাত্ম্য, তখন শাসকের চোখে চোখ রাখা বেয়াদবি তো বটেই। ক’দিন আগেই যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগে ভর্তি নিয়ে হয়ে গেল এক দফা চরম কুনাট্য। তোলাবাজির অভিযোগে-অভিযোগে দিশেহারা সরকার একদিকে তার ‘দুষ্টু’ ছাত্রনেতাদের লোক দেখানো গ্রেফতার করেছে, পাশাপাশি, ছাত্রনেত্রীকে অর্ধচন্দ্র দিয়েছে মুখ রক্ষা করার জন্য। এ দলের ট্র‍্যাক রেকর্ড বলছে, আবার সে আসিবে ফিরিয়া। উলটো চিত্র তখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে। শিক্ষামন্ত্রীর মনে হয়েছে, ভর্তি হবে সরাসরি এবং মেধার ভিত্তিতে। প্রথামাফিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নয়। এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ ছিল, আলাপ-আলোচনার অবকাশ ছিল। তবে তা শুরু করার প্রয়োজন ছিল ঢের ঢের আগে। সে পথে কর্তৃপক্ষ হাঁটলেন না। ছাত্র-ছাত্রীরা সিঁদুরে মেঘ দেখল।

স্বাভাবিক। নয়া নিয়ম-নীতির সূচ হয়ে ঢুকে ক্ষমতার কারবারিরা দুর্নীতির ফাল হয়ে বেরোবে না, এ কথা কে বলতে পারে? শিক্ষাবিদরা সরকারের বকলমে উপাচার্যের ভূমিকাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাধীকার হরণের চক্রান্ত বলে মনে করলেন। জো হুজুর কর্তৃপক্ষ সে পথে হাঁটতে গিয়ে পোড়ালেন মুখ। মেনে নিতে হল ছাত্র-ছাত্রী ও অধ্যাপকদের দাবি, পরীক্ষার মাধ্যমেই ভর্তি হবে কলার ছ’টি বিভাগে। এ সব দেখলে শুনলে সুমন্তবালা দেবী নির্ঘাত ছড়া কাটতেন, “সেই তো মল খসালি, তবে কেন লোক হাসালি!” এমন বলার মতো আজ তেমন কাউকে দেখি না। প্রেসিডেন্সি কর্তৃপক্ষ আবার আর এক কাঠি সরেস। মেধা তালিকা প্রকাশ না-করেই ভর্তির নোটিশ জারি করে বসেছিলেন। স্বাভাবিক ভাবেই ছাত্ররাও বেঁকে বসল। তারাও তো ঘর পোড়া গরু। তো মল খসল এক্ষেত্রেও। যথারীতি লোকও হাসল।

হোস্টেল অ্যালটমেন্টের কপি

তাহলে রাস্তাটা তো একটিই ছিল, অগণন সাধারণ মানুষের বিবেক, মানবিকতা বোধকে বাঙ্ময় করে তোলা। গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। স্বৈরতন্ত্র মানুষের কণ্ঠস্বরকে ভয় পায়। তাকে আলোচনায় বসতে বাধ্য করা। স্বাধীনতার জন্য নিরন্তর জেগে থাকা ছাড়া উপায় নেই যে। সে প্রচেষ্টা সফল হয়েছে। দূর-দূরান্তরের অসংখ্য মানুষ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সামাজিক মাধ্যমে। অ-চিকিৎসক সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী, সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মী অনশনরত ছাত্রদের লড়াইকে সমাজের বৃহৎ পরিসরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রবীণ চিকিৎসক থেকে চিকিৎসক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ধরনা মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন। তাঁদের সমালোচনার স্বর তীব্র থেকে তীব্রতর হলে, পাশে দাঁড়িয়েছেন, কাছে এসেছেন, মুখ খুলেছেন সমাজের বিশিষ্ট মানুষেরা। সে পথেই নিশ্চিত সুষ্ঠু সমাধান সম্ভব হল। কর্তাদের আত্ম অহমিকা ছাত্রদের জীবন বিপন্ন করে তুলেছিল। তাদের পরিবার, সমাজকে ঠেলে দিয়েছিল চরম ঝুঁকির মুখে। শাসকেরা এমন অনেক তরুণ প্রাণ ক্ষমতার বেদিতে বিসর্জন দিয়েছে। শাসক মনে করতেই পারে কিন্তু রাজ্যের মানুষ তো কোনও শিক্ষা-শহিদ চায়নি। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন নাগরিক সমাজ তা চায়নি। ছাত্র, শিক্ষক, চিকিৎসক সমাজ তা চায়নি। সংকীর্ণের রাজনীতিকে মহতের রাজনীতি দিয়েই পরাস্ত করতে হয়। আত্মত্যাগ, স্থৈর্য, ধৈর্য, তিতিক্ষার সেই অগ্নিপরীক্ষায় শেষ পর্যন্ত ছাত্ররাই জয়ী হল।

বিজয় মিছিল

ছবি – ফেসবুক ও অন্যান্য অনলাইন সূত্র থেকে

লেখক একজন স্বতন্ত্র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।
Share this
Leave a Comment