সোনাগাছির দেওয়াল জোড়া ম্যুরালে রূপান্তরকামীদের নতুন শিল্পভাষা


  • June 23, 2018
  • (0 Comments)
  • 830 Views

সুদর্শনা চক্রবর্তী

এক অলস মেঘলা দুপুরে কলকাতার সোনাগাছি এলাকায় যখন গিয়ে পৌঁছলাম তখন কালো মেঘের মাঝখানে উজ্জ্বল রঙের ছবি আঁকা বাড়িটি যেন কোনও এক নতুন গল্প শোনাবার জন্য উদ্ধত ভঙ্গিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল। এই কয়েক মাসে সোনাগাছির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জুড়ে গেছে এই নতুন শিল্পের পরিচিতি। যৌনকর্মীদের পাড়া বলে পরিচিত, অধিকার আন্দোলনের কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত, যৌনকর্মীদের দুর্গাপুজোর জন্য পরিচিত, সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠানের জন্য পরিচিত সোনাগাছির শরীরে জেগে ওঠা এই ম্যুরাল তাকে সাজিয়ে তুলেছে। যা অবশ্যই তার নিজস্ব পরিচিতিকেই আরও স্পর্ধিত করেছে। শিল্প যখন ভাষা হয়ে ওঠে তখন তা কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, তারই সাক্ষী হয়ে উঠেছে এই শিল্পকর্মটি। কলকাতার বুকে এমন কাজ আশা জাগায়।

সোনাগাছির যে বাড়িটিতে কাজটি হয়েছে ও এই এলাকারই আরও একটি দেওয়ালে যে ছবি আঁকা হয়েছে, তা উদ্‌যাপনের কথা বলে। নিজের লিঙ্গ ও যৌন পরিচিতি, পেশার পরিচিতিকে স্বীকৃতি দিয়ে, তাকে সম্মান জানিয়ে সমাজের আরও পাঁচ জন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই ম্যুরাল ও গ্রাফিত্তি-কে ব্যবহার করেছেন সোনাগাছির ও তার বাইরের বেশ কয়েকজন রূপান্তরকামী মানুষ। এর ফলে যৌনকর্মীদের পাড়ায় যেন এক রূপান্তর ঘটে গেছে। যৌনকর্মীদের মধ্যেও তৈরি হয়েছে দারুণ আগ্রহ। তাঁরাও চাইছেন রং-তুলির শিল্পের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিতে। এই মাধ্যমটি তাঁদের কাছে নতুন। ফলে উদ্দীপনা বেশি। বিশেষত নিজেদের এলাকায় রঙের এমন বিচ্ছুরণে খুবই খুশি হয়ে সামিল হতে চান।

বেঙ্গালুরু-র আরাভানি আর্ট প্রজেক্ট ও ফ্রান্সের বিখ্যাত স্ট্রিট আর্ট শিল্পী শিফুমি’র সঙ্গে, কলকাতার রূপান্তরকামীদের সংগঠন সমভাবনা’র যোগাযোগ হয় এমন একটি উদ্যোগকে বাস্তবায়িত করার জন্য। সমভাবনা নিজে এর সঙ্গে যুক্ত হয় এবং পাশাপাশি দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির শাখা আনন্দম-এর সঙ্গেও যোগাযোগ করে। এরকম একটি শিল্প তৈরির জন্য সোনাগাছিকেই উপযুক্ত জায়গা বলে মনে হয় সবারই। কারণ আরাভানি, শিফুমি, সমভাবনা, দুর্বার, আনন্দম – সকলেরই ভাবনা মিলে যায় একটি জায়গাতেই, যে, শিল্পের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দৃশ্যমানতা তৈরি করা এবং শিল্পকে শুধুই মুষ্টিমেয় শিল্পরসিক বা আর্ট মিউজিয়াম-এর চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে না রেখে সকলের সামনে এনে, দিনরাত চোখের সামনে দেখা যাবে এমনভাবে, ক্রমাগত আমাদের বোধে-চিন্তায় আঘাত করতে থাকবে এরকম করে উপস্থাপিত করতে হবে। সমাজে রূপান্তরকামী মানুষদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্যই এই উদ্যোগটিকে কাজে লাগানোর কথা ভাবা হয় ও যে সময়ে এই কাজটি হয় সেটি ছিল আর্ন্তজাতিক রূপান্তরকামী দৃশ্যমানতা সপ্তাহ (ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সজেন্ডার ভিজিবিলিটি উইক)।

সোনাগাছির যে বাড়িটিতে ম্যুরাল-এর কাজ হয়েছে সেখানে যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য দুর্বারের ক্লিনিক চলে। এই বাড়িটিতে কাজ করেছে সমভাবনার সদস্যরা। এলাকারই অপর একটি দেওয়ালে গ্রাফিত্তির কাজ করেছেন আনন্দমের সদস্যরা। দুর্বারের পক্ষ থেকে ডঃ সোমা রায় জানালেন, “শিল্পভাবনা ছিল আরাভানি আর্ট প্রজেক্ট ও শিফুমি-র। তাঁদের প্রশিক্ষণেই তৈরি হন সমভাবনা ও আনন্দমের রূপান্তরকামী মানুষেরা। এই প্রক্রিয়াটি চলে প্রায় এক মাস। কিন্তু কাজ দু’টি শেষ করতে সময় লেগেছিল এক সপ্তাহেরও কম। এই কাজে সোনাগাছির যৌনকর্মী মহিলাদের মধ্যে যে সাড়া পড়েছে আমরা তাতে অভিভূত। কাজ চলাকালীন তাঁরাও অংশগ্রহণের জন্য আগ্রহ দেখান। পরবর্তী সময়ে আরাভানি-র সঙ্গে আমরা এরকম আরও কাজ করার পরিকল্পনা করছি।”

আরাভানি আর্ট প্রজেক্ট-এর পূর্ণিমা সুকুমার-এর সঙ্গে কথা বলতে গিয়েও উঠে এল সোনাগাছির গুরুত্বের কথা। তিনি বলছিলেন, কলকাতায় ফাঁকা দেওয়াল বা ম্যুরাল করার মতো বাড়ি পাওয়া সহজ নয়, “তাই যখন সোনাগাছিতে কাজের সুযোগ এল আমরা দ্বিতীয় বার ভাবিনি। বিশেষত আমরা যে ধরনের সামাজিক বার্তা দেওয়ার কথা ভাবছিলাম তারজন্য সোনাগাছি খুবই উপযুক্ত ছিল। আরাভানি-তে আমরা রূপান্তরকামী নারীদের নিয়ে কাজ করি। সেই সুযোগটিও যখন এসে গেল তার চেয়ে ভালো আর কী হতে পারত!” এই কাজটি ছিল এক সমন্বিত প্রচেষ্টার ফসল।

পূর্ণিমা যেমন স্পষ্ট জানালেন যে তাঁরা যৌনকর্মীদের জন্য কোনও সহানুভূতির পরিবেশ তৈরি করতে চাননি। যারা পাচারের শিকার হয়ে যৌনপল্লিতে এসে পড়েন তাদের কথা আলাদা। তাছাড়া এই পেশার স্বীকৃতি, পুনর্বাসন ইত্যাদি বিষয়গুলিই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তাঁরা। সেইজন্য সহযোগী সকলের সঙ্গে আলোচনা করেই স্থির হয় কী ধরনের ডিজাইনের উপরে কাজ করবেন। বেছে নেওয়া হয় পরিচিতি, আত্মবিশ্বাস ও উদ্‌যাপনের ভাবনা। কী ধরনের ফলাফল আশা করছেন তাঁরা? “আমরা আসলে ফলাফলের কথা ভাবছি না। এর একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব তৈরি হবে। আমরা চট্‌জলদি কোনও পরিবর্তন আনতে চাই না। চিন্তাভাবনায়, অনুভূতিতে যাতে বদল আসে সেই চেষ্টা করি। কয়েক মাস পরে কলকাতা সংলগ্ন মফস্বল এলাকায়, জেলায় কাজের পরিকল্পনা আছে,” জানালেন পূর্ণিমা।

দুর্বারের শাখা সংগঠন আনন্দম-এর সেক্রেটারি সিন্টু বাগুই। সিন্টু একজন রূপান্তরকামী। তিনি তাঁর সঙ্গে আরও কয়েক জনকে নিয়ে সোনাগাছির একটি দেওয়ালে গ্রাফিত্তির কাজ করেছেন। সেই প্রসঙ্গে কথা বলার সময়ে দৃশ্যতই খুশি দেখাল তাঁকে। এই কাজটি করতে গিয়ে যে আত্ম-পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে তাঁদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের এক উত্তরণ ঘটেছে তা স্বীকার করলেন। সিন্টু-রা যে ডিজাইনের উপর কাজ করেছেন, তাতে দু’দিকে নারী ও পুরুষের মুখ, মাঝে উড়ে যাচ্ছে একটি পাখি – সঙ্গে লেখা আমি কে? আমাকে চেনো, আমি আছি। মুখ দু’টি রূপান্তরকামী মানুষের এবং কথাগুলির মধ্যে দিয়েই সমাজে তাঁদের অবস্থান মনে করিয়ে দেওয়া। সিন্টু’র সঙ্গে মাত্র দু’ঘন্টায় এই দেওয়ালে কাজটি শেষ করেছিলেন নিতাই গিরি, বাপি পাত্র, এমনকি হাত মিলিয়েছিলেন ডঃ সোমা রায় নিজেও। সিন্টু জানালেন, “আমরা এই নতুন রকমের কাজটি করে খুবই আনন্দ পেয়েছি। যখন ছবি আঁকছিলাম, পড়ার কত মানুষ দেখছিলেন, জানতে চাইছিলেন। কত উৎসাহ তাদের! এরকম কাজ আমরা আরও করব। আরাভানি-র সঙ্গে কথা বলে আমরা জেলা ও মফস্বলের বিভিন্ন এলাকায় রূপান্তরকামীদের নিয়ে কাজ করা ও সচেতনতা বাড়ানোর জন্য এই উদ্যোগটি নেওয়ার কথা ভাবছি।”

সমভাবনা যে বাড়িটিতে ম্যুরাল-এর কাজ করেছেন তাঁর একটি দেওয়াল জুড়ে ফরাসি শিল্পী শিফুমি-র বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী হাতের নানা রকম মুদ্রা, একটি দেওয়ালে দুর্বারের দুর্গাপুজার কথা মনে রেখে শামিয়ানার ডিজাইন ও আরেক দেওয়ালে একজন রূপান্তরকামী মানুষের মুখ, যার প্রতিটি রেখায় ফুটে উঠেছে চরম আত্মবিশ্বাস। এই বাড়ির ডিজাইনের কাজ শেষ করতে সময় লেগেছিল মাত্রই তিন, চার দিন।

এই কাজগুলি যে এলাকার মানুষের মধ্যে যথেষ্ঠ প্রভাব ফেলেছে তা বোঝা গেল তাঁদের সঙ্গে কথা বলেই। ব্যস্ত সোনাগাছিতে চা, শিঙাড়া খাবারের দোকানের ভিড় সামলানোর মাঝেই পুরনো দোকানি বললেন, “বেশ ভালোই লাগছে দেখতে। পাড়ার মধ্যে এমন একটা রং-চঙে বাড়ি তো ভালোই লাগে। কতদিন পরে বাড়িটায় রং পড়ল। ভালো লাগছে বেশ।” সিন্টুদের কাজের সময়ে পাড়ার বেশ কয়েক জন তরুণ ছিলেন তাঁদের পাশে। সেই দুপুরে যখন দেখা হল তাঁদের কয়েক জনের সঙ্গে বললেন, “আমরা তো ওদের চিনি। আমরা ভাবি ওরা-ও তো আমাদেরই মতো, একইরকম মানুষ। আলাদা হবেন কেন? যখন কাজটা করছিলেন আমরা তো ছিলাম, দেখছিলাম। খুব ভালো লেগেছে। কী সুন্দর যত্ন করে আঁকলেন। এরকম কাজ আরও হওয়া দরকার। আমরা থাকব ওদের পাশে।” যখন জানতে চাইলাম, ছবিটায় কী বলতে চেয়েছে, জানালেন – “দু’জন মানুষের মুখ রয়েছে। একটা ছেলে, একটা মেয়ে। ছেলেটা মেয়ে হয়ে উঠছে। এরকম মানুষদের তো আমরা চিনি। ছবিটাতে খুব সুন্দর বোঝাচ্ছে সেটা।” পাড়ার বয়স্ক মহিলা বিকেলে বসেছিলেন বাড়ির সামনে নাতির সঙ্গে, তার বাড়ির সামনের দেওয়ালেই রয়েছে ছবি। তার বক্তব্য, “আমার তো ভালো লাগছে ছবিটা। ওরা যেমন, তেমন থাকবে। কেন ওদের নিয়ে হাসব? ঈশ্বর যে মানুষকে যেমন বানিয়েছেন, তিনি তেমন। সকলকেই এক চোখে দেখতে হবে।”

একটা ছবি, একটা ডিজাইন, একটা শিল্প আসলে অনেক দিনের বলতে চাওয়া কথা এক লহমায় বলে দিতে পারে। মানুষের মন বদলে দিতে পারে। সচেতনতার আন্দোলনে যোগ করতে পারে নতুন মাত্রা। ম্যুরাল করা বাড়িটির পেছন দিকে শেষ হয়ে আসা বিকেলের আলো মেখে দাঁড়িয়ে ছিলেন যে যৌনকর্মী মহিলারা তাঁদের দু’জনের কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম, “দিদি, কেমন লাগছে এই বাড়িটায় যে ছবি আঁকা হয়েছে?” দু’জনেই বললেন, “জানো, বেশ ভালো লাগছে কিন্তু। আমরা তো এখানে দাঁড়াই। এই যে এত রং, সুন্দর ছবি, দেখলে বেশ মন ভালো হয়,” হাসির রেখা ছিল তাঁদের ঠোঁটের কোণে। একজন বললেন, “দাঁড়াও, আরেকবার ঘুরে দেখে আসি, কী সুন্দর হয়েছে না!” “কোন্‌টা ভালো লেগেছে সব থেকে?” “ঐ যে বাড়িটার একদম উপরে একটা মেয়ের মুখ আছে না, ঐটা সবচেয়ে ভালো। মেয়েটার মুখের মধ্যে বেশ সাহস আছে। ঐটাই সবচেয়ে ভালো লেগেছে।”

পড়ন্ত বিকেলের আলোয় সোনাগাছির গলি, রূপান্তরকামীদের অস্তিত্বের প্রকাশ, প্রান্তিক মানুষদের অধিকারের স্বীকৃতি সব মিলে যায় ঐ একটি শব্দে – সাহস। যে সাহস শিল্পের স্পর্ধায় ভাষা পায়। যেমন করে ছবিতে, রঙে বলা হয়ে যায় নিজেদের লিঙ্গ পরিচয়, যৌন পরিচয়, পেশার পরিচয়ে বাঁচার কথা। আমার শহরে তৈরি হয় ছবির নতুন ক্যানভাস।

সুদর্শনা স্বাধীন সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা। 
Share this
Leave a Comment