বীরভূম: অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের কয়েকটি কথা


  • May 16, 2018
  • (0 Comments)
  • 1175 Views

যখন ভাঙ্গর সহ রাজ্যের সর্বত্রই পঞ্চায়েত নির্বাচনে নজিরবিহীন হিংসা ও সন্ত্রাস, ঠিক তখনি ‘উন্নয়ন’-এর পীঠস্থান বীরভূম দেখলো ‘অবাধ ও শান্তিপূর্ণ’ ভোট। পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রেক্ষিতে সাতদিন বীরভূমে কাটিয়ে এই অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোট-এর আস্তরণের নিচের ইঁট-চুন-সুরকি নিয়ে লিখছেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

ফোনটা যখন আসে তখন মোবাইলের ঘড়িতে ঠিক রাত বারোটা। অচেনা নম্বর দেখেই ফোনটি ধরি। ওপারে এক উদ্বিগ্ন পুরুষ কণ্ঠ – “দিদি, আমার মেয়ের সঙ্গে আপনার গতকাল নলহাটিতে দেখা হয়েছিল। পঞ্চায়েত ভোটের প্রার্থী। ওর উপর হামলা হতে পারে, খবর আসছে। একটু কথা বলুন ওর সঙ্গে।” তারিখ – ১৩ মে, ২০১৮। একদিন আগে, বীরভূমের নলহাটিতে সিপিএম-এর স্থানীয় অফিসে দেখা হয় এমন প্রার্থীদের সঙ্গে যাঁরা মনোনয়ন জমা দিতে পেরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে অনেকেই পরে প্রত্যাহার করে নেন। শাসক দলের চাপের মুখে দাঁড়িয়েও যে ক’জন প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করেননি, তাঁদের মধ্যে এই মহিলা একজন। মনোনয়ন জমা দেওয়ার দিন নলহাটিতে প্রচণ্ড হিংসাত্মক ঘটনার সাক্ষী, ভয় পেলেও পিছিয়ে আসেননি। এই প্রথমবার ভোটের ময়দানে। শ্বশুরমশাই আমৃত্যু দলের সদস্য ছিলেন, অনেকটাই তাঁকে দেখে অনুপ্রাণিত। আর তারপর ভেবেছেন, এত যখন ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে, তাহলে তো আরওই সরে আসা যাবে না। ফোন ধরে বললেন, “দিদি, আমাদের গ্রামে রাত থেকে অচেনা লোকেরা ঢুকতে শুরু করেছে। আমাদের ভোটে বলুন তো ওদের কী কাজ! আর পাশের গ্রাম থেকে চেনা-পরিচিত সূত্রে আমার ভাই খবর এনেছে কাল এখানে ঝামেলা করার জন্য তৈরি হচ্ছে। আমি বেরোলেই আমার উপর হামলা করবে। পুলিশকে ফোন করেছিলাম। বলল, প্রার্থীকে তো তুলে এনে নিরাপত্তা দিতে পারব না। কিছু হলে খবর দেবেন, স্টেপ নেব। বলুন তো, আমি মরে গেলে কী ওরা স্টেপ নেবে?” “সাবধানে থাকুন” – এটুকু বলেই ফোন রেখেছিলাম।

বীরভূম – পশ্চিমবঙ্গে ২০১৮-র ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনে “অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের” অসাধারণ উদাহরণ তৈরি করে ফেলেছে। ভোট হয়েছে এই জেলার পাঁচটি ব্লক-এ। তবে “ভোট হয়েছে” বলা কতটা যুক্তিসঙ্গত সেই প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠে এসেছে, তা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটাই – এই অগাধ শান্তির বিচরণভূমির একটা বিশ্লেষণ খুঁজে দেখা প্রয়োজন। গত এক সপ্তাহ ধরে বীরভূমের বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরার সুবাদে একটি বিষয় স্পষ্ট – শুধু ভয় নয়, কোনও বিকল্প খুঁজে না পাওয়াটাও বীরভূমের তৃণমূলের অন্যতম শক্ত ঘাঁটি হয়ে ওঠার কারণ। হ্যাঁ, অবশ্যই সেই কৃতিত্ব তৃণমূলের বীরভূম জেলার সর্বশক্তিমান নেতা ও তাঁর চেয়েও বেশি দক্ষ পারিষদদের প্রাপ্য। কিন্তু সেই সংগঠনকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনও বিরোধী দলই যে এখন বীরভূমে নেই তা দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। ফলে জোট বাঁধার মতো মনের জোরটুকুও মানুষের মধ্যে নেই। এই ভয় আর হুমকির সামনে দাঁড়িয়ে মানুষকে জোটবদ্ধ হয়ে বিরোধী শক্তি করে তোলার মতো যোগ্য নেতৃত্ব বীরভূমে নেই। যেন ধরেই নেওয়া হয়েছে এর বিরূদ্ধে দাঁড়িয়েও বিশেষ কিছুই করার নেই। সঠিক যোগাযোগের অভাবও চোখে পড়ে। তাই দলের প্রার্থী হামলার আশঙ্কা করছেন, এই খবরটি দলের নেতৃস্থানীয়দের এই সংবাদদাতার কাছ থেকে জানতে হয়।

পুলিশকে ফোন করেছিলাম। বলল, প্রার্থীকে তো তুলে এনে নিরাপত্তা দিতে পারব না। কিছু হলে খবর দেবেন, স্টেপ নেব।

বীরভূমে পৌঁছনোর পর থেকেই ক্রমশ একটা বিষয় স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, নির্বাচনে যে কোনও হিংসাত্মক ঘটনা সে অর্থে ঘটবে না, তা নিয়ে মানুষও নিশ্চিত ছিলেন। কারণ, তাঁরা এমতাবস্থায় শান্তি বজায় রাখার জন্য কোনওরকম বিরোধের পথে যাওয়ার সাহস রাখেন না। যেহেতু সেই সাহসটুকু দেখালে একদিকে যেমন যে কোনওরকম বিপদ থেকে বাঁচার নিরাপত্তা আর থাকবে না, তেমনি সাহস দেখানোর পর এমন বিরোধী নেতৃত্বও তো চাই, যারা পাশে থাকবেন, লড়াই চালানোর নানা পথ বাতলে দেবেন, শক্তিশালী বিরোধী হিসাবে “সংসদীয় রাজনীতি”, “গণতন্ত্র” এই শব্দগুলির যথার্থতা প্রমাণ করবেন। বীরভূমে তেমন কিছুই অদূর ভবিষ্যতে ঘটার কোনও সম্ভাবনা এই ত্রিস্তরীয় পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে পৌঁছে দেখা গেল না। স্থানীয় মানুষের মধ্যে যেটুকু বিরোধী শক্তি অবশিষ্ট আছে, স্থানীয় সাংবাদিকেরা, এবং শাসক দল তো বটেই – সকলেই বেশ নিশ্চিন্ত ছিলেন যে, সারা রাজ্যে যাই হোক, বীরভূমের নামমাত্র ভোট অবাধ ও শান্তিপূর্ণই হবে।

ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে একটি বিষয় যেন ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছিল, বীরভূম জেলার মধ্যে দৃশ্যত মানুষ, সমাজ এই সবেরই অনেকগুলি স্তর তৈরি হয়ে গেছে। এবং সেই স্তরগুলিতে তাই রাজনীতির খেলাটাও চলছে নানা পরতে। বোলপুর –শান্তিনিকেতন ও সেই সংলগ্ন এলাকায় মনে হচ্ছিল, নির্বাচন, শাসক দলের সন্ত্রাস, বিরোধীদের ব্যর্থতা, হিন্দুত্বর মাথাচাড়া দেওয়া, ইত্যাদি কিছুই সে অর্থে যেন এখনও স্পর্শ করতে পারে না। অনেক বেশি নাগরিকতার কাছাকাছি সেই সমাজ, বরাবরের মতোই। রাজপাট বদলে যাওয়া, সন্ত্রাসের আবহাওয়া – এই সবের মধ্যে যতটা কম ঢোকা যায়, তাতেই যেন আগ্রহ বেশি। এখনও নিশ্চয়ই এমন মানুষ আছেন, যারা চিন্তিত, অতীতের উদাহরণ আজও যাঁদের তাড়া করে ফেরে, শাসক দলের শক্তিবৃদ্ধি, উন্নয়নের বাড়বাড়ন্ত, বিজেপি যদি অন্যতম বিরোধী হয়ে ওঠে তাহলে ভয়ের জায়গাটা কী – তা নিয়ে তাঁরা চর্চা করছেন। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে তার প্রকাশ নেই। বাম রাজনীতিতে সমর্থকের সংখ্যা কমে যাওয়া নিঃসন্দেহে একটা বড় কারণ। দলের সাংগঠনিক শক্তি কমে গেছে বহু অংশে। এখনও দলনিষ্ঠ যে কয়েকজন মানুষ রয়েছেন, তাঁরা দলের জন্য সব ভয়, বাধা পেরিয়ে, হিংসার সামনে দাঁড়িয়েও মনোনয়ন জমা করেছিলেন। কিন্তু সেই দল-ই যদি তাঁদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, সেক্ষেত্রে উন্নয়নের চোখ রাঙানির কাছে নতি স্বীকার ছাড়া আর উপায় কী! বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী কিছু মানুষ এখন চেষ্টা করছেন রাজনীতি নয়, সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে বার্তা পৌঁছে দেওয়ার। অনেকটাই সাফল্য আসছে। শাসক দলের এই ক্রমাগত প্রচার যে, দলমত নির্বিশেষে সকলের ঘরে ঘরে সরকারের সবুজ সাথী, কন্যাশ্রীর সুবিধা পৌঁছে যাওয়ায় গ্রামের পরিবারগুলির কিশোর-তরুণেরা শাসক দলের উন্নয়নের নিরপেক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে তাদের প্রতিই আকৃষ্ট হচ্ছে, এই ধারণা চোখ-কান বন্ধ করে বিশ্বাস করার কোনও কারণ নেই। অন্তত এখনও।

মনোনয়ন জমা দেওয়া ও তা প্রত্যাহার করার দিনগুলিতে যে পরিমাণ হিংসা বীরভূমবাসী দেখেছে তারপরে আর নির্বাচনের দিনের কথা তারা ভাবতেও চাইছিল না।
নির্বাচনের আগের ছ’দিন আর নির্বাচনের দিন তাই বীরভূমের জেলা শহরগুলিতে নির্বাচনকালীন উত্তেজনা চোখে পড়ে না। সকলের মধ্যেই এক আশ্চর্য নির্লিপ্ততা। আগে থেকেই ফলাফল ঘোষণা হয়ে যাওয়ার কারণে। যে পাঁচটি ব্লকে নির্বাচন হয়েছে, সেগুলি ছাড়া আর অন্য কোথাওই নির্বাচন ঘিরে কোনও আগ্রহ চোখে পড়ে না। “আমাদের তো নির্বাচন হচ্ছে না, ফলে আমাদের কিছুই যায় আসে না” – এরকমই মনোভাব যেন। মনোনয়ন জমা দেওয়া ও তা প্রত্যাহার করার দিনগুলিতে যে পরিমাণ হিংসা বীরভূমবাসী দেখেছে তারপরে আর নির্বাচনের দিনের কথা তারা ভাবতেও চাইছিল না। একটু অন্যভাবে দেখলে এ যেন অনেকটা এমন ভাবা যে, নির্বাচন না হয়ে, একদিকে ভালোই হয়েছে, হলেই তো আরও ভয়ানক পরিস্থিতি তৈরি হত। মুখে না বললেও এই থমথমে, দমবন্ধ ভাবটিই বীরভূমের সর্বত্র। যা শান্তিনিকেতনের ট্যুরিস্ট হয়ে গেলে নিশ্চয়ই চোখে পড়বে না। নির্বাচনের দিনও তাই চোখে পড়ে না পুলিশের গাড়ির টহল, ভোট দিতে যাওয়ার তৎপরতা। জানা যায়, জেলায় যেহেতু নির্বাচনই প্রায় হচ্ছে না, তাঁরা অন্যত্র ডিউটি পালন করছেন। তাই কড়াকড়িও অনেকটাই শিথিল।

বীরভূমের প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে কার্যতই উন্নয়নের বিরূদ্ধে কথা বলা অসম্ভব। এক সময়ে যে নেতৃত্বের উপরে ভরসা করে তাঁরা নিজেদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা, জীবন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তা যে এত দ্রুত, তাঁদের মুখের ভাষা কেড়ে নেবে তা সম্ভবত বুঝতে পারেননি। কৃষিজীবী মানুষগুলি পূর্বতন শাসকদলের মাত্রাহীন দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ হয়ে তৎকালীন বিরোধী দলের মধ্যেই পরিবর্তন খুঁজেছিলেন। আশা করেছিলেন স্থিতি ফিরবে। কিন্তু ক্ষমতার ভাষা যে কখনওই বদলায় না তা জানতেন না। তাই মাত্রই কয়েক বছরের মধ্যে ধীরে ধীরে মতপ্রকাশের যাবতীয় অধিকার যখন হাতছাড়া হয়ে যায় তখন নির্বাক দেখা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। খাতায়-কলমে উন্নয়ন যাই হোক না কেন (ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য মার্কেট হাব, জলাধার, পাকা রাস্তা মজুদ আছে), মগজধোলাই করে উন্নয়নের ভাবনা মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে। তাই নিজের, পরিবারের, অঞ্চলের শান্তিরক্ষার তাগিদেই সারা জেলার গুটিকয় পঞ্চায়েত বাদে আর কোথাওই কেউ না মনোনয়ন দেওয়ার, না ভোট দিতে চাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন। এই ভয় দেখানো রাজনীতি অবশ্য নতুন আমদানি নয়। স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা প্রসঙ্গেই জানা গেল, ক্ষমতা ও নিরাপত্তার জন্য পূর্ববর্তী শাসক দলের বহু সমর্থকই নতুন শাসক দলের সমর্থক হয়ে যান রাতারাতি (সারা রাজ্যের ধারা অনুসরণ করেই) আর যারা তা হননি, তারা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বামেদের ক্রমশ বাড়তে থাকা দুর্বলতা ও বিজেপি-র তুলনায় শক্তিবৃদ্ধি দেখে বিজেপি-তে যোগ দেন। কোনটিতেই উন্নয়ন আটকায়নি।

যে যে জায়গায় বিরোধীরা দাঁড়িয়েছিল, সেইসব জায়গায় যেমন বলা যেতে পারে ঝাড়খণ্ড ও বীরভূমের সীমান্ত ঘেঁষা চরিচা সংলগ্ন আদিবাসী গ্রাম, মল্লারপুরের আদিবাসী গ্রামগুলির কথা। এই আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষগুলি তাঁদের জনগোষ্ঠীর সনাতন ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আপাতত এগুলি বিজেপি নির্ধারিত পথে ভাবতে তৈরি। কারণ, তাঁরা আপাতত নিজেদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থ উপার্জনের কথা ভাবতে বেশি আগ্রহী। শাসক দলের জেলার সর্বাধিনায়ক দাবি করছেন তিনি ডাকলে চার লক্ষ আদিবাসী মানুষের জমায়েত হয়ে যায় রাতারাতি। অন্যদিকে বিজেপি ধীরে ধীরে তাদের হিন্দুত্ব অ্যাজেন্ডা বাদ দিয়ে অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে আদিবাসীদের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাগুলি নিয়ে সম্পূর্ণ গ্রামস্তরে পৌঁছে গিয়ে কথা বলছেন। তাঁদের মারাংবুরু-কে যেমন হিন্দু দেবতার মর্যাদা দিচ্ছেন, হনুমান মন্দির আর জয় শ্রীরাম-এর উদ্‌যাপনেও তাঁদের সঙ্গী করে নিচ্ছেন। এটি চলছে আপাতভাবে চোখে না পড়ার মতো করেই। প্রচার চলছে এই দেখিয়েই যে তৃণমূলের শাসনেও এই গ্রামগুলিতে আসলে কোনও উন্নয়ন পৌঁছয়নি, বরং তাদের উপর অত্যাচার বেড়েছে, মহিলাদের নিরাপত্তার অভাব রয়েছে, তাঁদের সন্তানদের ভবিষ্যত আদৌ সুরক্ষিত নয়। এইসব প্রচার ধীরে ধীরে আদিবাসীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে, তাঁরা বিজেপি-র সমর্থনে তির-ধনুক ধরছেন। এবং সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, শাসক দল ও বিজেপি উভয়ই আগ্রহী হচ্ছে একই আদিবাসী গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য, সেখানে তাদের প্রভাব ও উন্নয়ন দেখানোর জন্য! আদিবাসীদের মধ্যে শাসক দলের প্রতি ক্রমশ বাড়তে থাকা অসন্তোষ কিন্তু কিছু গ্রামে বেশ স্পষ্ট আর বিজেপি ছাড়া তাদের কাছে কোনও বিকল্প নেই। রাজ্য বিজেপি সম্পর্কে তাঁরা আদৌ জানেন না। তাঁদের কাছে বিজেপি-র মুখ প্রধানমন্ত্রী। সুলভে গ্যাস, আবাস যোজনায় ইটের বাড়ি পাওয়া, তাঁদের নিজেদের হিন্দু ভাবতেও বাধা দিচ্ছে না। এভাবেই আদিবাসী সংস্কৃতিকে কব্জা করার প্রক্রিয়া ভোটব্যাঙ্ক বাড়ানোর জন্য জোরদার হচ্ছে।

পঞ্চায়েত ভোটে এখানে কোনও হিংসার খবর হয় না, শান্তি বজায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খাঁ খাঁ জমি, ওয়েবেল আইটি পার্ক, গীতবিতান টাউনশিপের মডেল বাড়ি সব কিছু সাক্ষী থাকে বিরোধীশূন্য হয়ে যাওয়ার।
অন্যদিকে বীরভূমের বিশ্ববাংলা বিশ্ববিদ্যালয় ও গীতবিতান টাউনশিপ তৈরি নিয়ে যে জমি আন্দোলন, তাকে কেন্দ্র করেও তিনটি গ্রামের মানুষ এক শাঁখের করাতের পরিস্থিতিতে রয়েছেন। সরকার তাঁদের থেকে মুখ ফিরিয়েছে। সরকারবিরোধী তকমা তাঁদের উপর। অন্যদিকে এই গ্রামবাসীদের এক সময়ের জমি আন্দোলনের সাথি দলের উপর থেকে সমস্ত ভরসা উঠে গেছে জমি ফেরত পাওয়ার সব আশা ক্রমেই দূরে সরে যাওয়ায়, এবং তাঁদের উপর শাসক দলের হুজ্জুতি বাড়ার ফলে। রোজগার হারিয়ে, এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সামনে এসে তাঁরা এখন দিশেহারা। বীরভূমে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটির কারণে মাত্রই কিছু দল বা সংগঠন খানিকটা তাঁদের পাশে দাঁড়াতে পারছে, প্রশাসনিক হুমকির কারণে অনেকেই পৌঁছতে পারছে না। গ্রামবাসীরা লড়াইয়ের ময়দান ছাড়বেন না বললেও নেতৃত্বের অভাবে কিছুটা হতাশ। তাই ভাঙড়ের জমি আন্দোলনের কথা জানেন, জানেন সেখানে কতটা বিরোধের মুখে দাঁড়িয়েও মনোনয়ন জমা দিয়ে শাসকের বিরূদ্ধে দাঁড়াচ্ছে আন্দোলনকারীদের প্রার্থী, কিন্তু তাঁদের কোনও গ্রাম পঞ্চায়েতে ভোট হচ্ছে না। যাঁরা ভেবেছিলেন তাঁরা ছড়িয়ে পড়া হিংসার খবর পেয়ে আর গ্রামের বাইরে যাওয়ার কথা ভাবেননি। মুসলমান অধ্যূষিত এই এলাকায় বিজেপি লড়াইয়ের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিল, কিন্তু নানা মতান্তরে তা সম্ভব হয়নি। তাই পঞ্চায়েত ভোটে এখানে কোনও হিংসার খবর হয় না, শান্তি বজায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের খাঁ খাঁ জমি, ওয়েবেল আইটি পার্ক, গীতবিতান টাউনশিপের মডেল বাড়ি সব কিছু সাক্ষী থাকে বিরোধীশূন্য হয়ে যাওয়ার।

ঝাড়খণ্ড ও বীরভূমের সীমান্ত এলাকায় বালি ও পাথর খাদানের রমরমা। তার কতটা আইনি আর কতটা বেআইনি সে বিষয়ে সকলেই অবগত। তবু কারও-ই কিছুই বলার সাহস নেই। উন্নয়নের স্বার্থে এটুকু মেনে নিতেই হয়। সেই খাদানগুলিতে কতটা ঝুঁকির সঙ্গে শ্রমিকরা কাজ করছেন, মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষগুলো উপার্জনের নামে কতটা শোষিত হচ্ছেন, দূষিত পরিবেশে কাজ করায় তিলে তিলে কেমন করে ক্ষয়ে যাচ্ছেন আর তাঁদের জীবনে কোন্‌ আলো পৌঁছচ্ছে, তা নিয়ে কথা বলা হয় না। তাই নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে সকালে এরকমই এক খাদানে দশের বেশি শ্রমিক মারা গেলেও তা নিয়ে হইচই হয় না। আসল সংখ্যাটুকুও জানা যায় না। তবে নির্বাচন তো শান্তিপূর্ণ হয়।

বীরভূমে শাসক দলের আধিপত্য প্রশ্নাতীত। তাদের ক্ষমতা প্রশ্নাতীত। তাদের চারপাশে অনুগতদের সংখ্যা তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। বাম দল বা বিজেপি তাদের ধারেকাছেও পৌঁছায় না। হয়তো অনেকের মধ্যেই ক্ষোভ, অসন্তোষ জন্মেছে। কিন্তু তা প্রকাশ করার মতো সংগঠিত শক্তি এখনও কোনও দলেরই নেই। নির্বাচনের দিন সকালে দলের জেলা সদর দপ্তরে ভিড়, খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ও হাসিমুখে সপারিষদ জেলা সর্বাধিনায়কের উপস্থিতি জানান দেয় জয় ও শান্তিপূর্ণ ভোটদান ও প্রতিদ্বন্দ্বীহীন নির্বাচন ঘিরে কতটা একনায়কতন্ত্র বীরভূমে চলছে। গণতন্ত্র? সে কোনও এক আজব শব্দ, যা বীরভূমবাসী আপাতত চিনছে না।

ভালো কথা, নির্বাচনের দিন ১৪ মে সেই প্রার্থী মহিলার সঙ্গে আমি ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তিনি বাড়ি থেকেই বেরোতে পারেননি। তাঁর বাড়ি অপরিচিত ব্যক্তিরা ঘিরে রেখেছে, সারা গ্রামেই টহল দিচ্ছে। কোনও অস্ত্র দেখানোর প্রয়োজন নেই, উপস্থিতিটুকুই যথেষ্ঠ। তিনি বা তাঁর পোলিং এজেন্টরা কেউই বুথে গিয়ে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেননি। দলের নেতারাও পরামর্শ দিয়েছিলেন ঝুঁকি না নিতে। ফলে মনোনয়ন জমা দিয়েও তিনি লড়তে পারলেন না। দৃঢ় গলায় বললেন, “আমি তো আমার জন্য আমার দলের ছেলেদের মরতে যেতে বলতে পারি না। আর আমিও মরতে চাই না। তাই আর ভোট করা গেল না।” অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন এভাবেই সম্পন্ন হয়।

সুদর্শনা চক্রবর্তী স্বাধীন সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।

Share this
Comments are closed