ধর্মের হানাহানির বিরুদ্ধে কথাবার্তা, সৌরীন ভট্টাচার্য ও শঙ্খ ঘোষের সঙ্গে – একটি রিপোর্ট


  • April 21, 2018
  • (0 Comments)
  • 1654 Views

শমীক সাহা

হাতে হাত রাখা, বেঁধে বেঁধে থাকা এই সময় খুব জরুরি। অপরিচয়ের দূরত্ব দূর করতে ঘরোয়া আলাপচারিতায় ভুল বোঝাবুঝি মিটিয়ে ফেলা এই সময়ের দাবি।

একটা মঞ্চের সামনে দর্শক-শ্রোতারা আছেন, অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন, কিন্তু বেশির ভাগ সময়েই মঞ্চটা ফাঁকা থাকছে – এমন আজব ঘটনা কেউ কোথাও দেখেছেন কি? না দেখাই স্বাভাবিক, কারণ এমন নতুন ধারায় পথ চলব বলেই আমরা জোট বেঁধেছিলাম – ‘সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদ বিরোধী নাগরিক উদ্যোগ।’ এর আগেও আমরা অনেক নতুন ধরনের কাজ করেছি, তাই এবার আমরা চেষ্টা করলাম মাচার সঙ্গে শ্রোতা-দর্শকদের দূরত্বটা কমাতে। আমাদের দুই জ্যেষ্ঠ সহপথিক – শঙ্খ ঘোষ ও সৌরীন ভট্টাচার্যও আগেই জানিয়েছিলেন, তাঁরা নিজেরা বলার থেকে অন্যের কথা বেশি শুনতে চান।

আমি আজন্ম নিরীশ্বরবাদে লালিত হলেও মানতে হবে ঠাকুরের সিংহাসন পেরিয়ে, খাদ্য-পোশাক-ভাষা বেয়ে ধর্ম সারা গায়ে মাখা হয়ে থাকে। আর এই মাখামাখিতে পছন্দ-অপছন্দের জায়গা খুবই কম। আমার গায়ে পরিচয় সেঁটে যায় – হিন্দু। আমি হয়ে যাই ‘আমরা’ পক্ষ। ‘ওরা’ পক্ষে যতই মেলার চেষ্টা করিনা কেন, ‘আমরা’র দাগ থেকেই যায়। তাই এই মেলামেশার সভাতেও আমি আসলে ওই ‘আমরা’।

সাদিক হোসেন মুসলমান। সাদিক সমকালের সুপরিচিত গল্পকার। হ্যাঁ আগে মুসলমান পরে গল্পকার, এটা একটা বীভৎস সত্য। আমার স্বদেশ এই বীভৎসতাকে নির্মাণ করেছে, করে চলেছে, যে পথে হাঁটছে তাতে ভাবী কালে আরও বেশি করে করবে। সাদিকের আবাল্য রক্তক্ষরণ এই সত্যকে বয়ে নিয়ে চলে। সভায় এক মুসলিম শিশুকন্যার গল্প আমরা শুনি। তার টিফিন বক্স কীভাবে এড়িয়ে যায় সহপাঠীরা। মা, তোর যে বন্ধুরা টিফিন ভাগ করেনি, তারা তোকে বুঝতে দিতে চায়নি যে, আসলে তোর টিফিন ভাগ করেই আমরা সবাই খাচ্ছি রে। তুই আর তোর সইরা আমাদের অন্নপূর্ণা হয়ে আমাদের ক্ষুধার অন্ন যুগিয়ে যাচ্ছিস প্রতিদিন, শুধু তোরা ফসলের গায়ে স্বাক্ষর করে দিচ্ছিস না, শিক্ষিত শিল্পীরা যেমন দেয় তাঁদের শিল্পকর্মের গায়ে, তাই অকৃতজ্ঞতায় ভুলে থাকছি সত্যকে। বিশ্বাস কর মা, জান-প্রাণ বাজি, এই বিস্মরণের পথে দেশকে এগিয়ে যেতে দেব না।

মেমারি শুধু স্মৃতি নয় বর্ধমানের একটি সমৃদ্ধ জনপদ। সেখানে আজন্ম বড় হওয়া অর্ঘ্য, আজ যখন কাউকে মনে করায়, মেমারির পুরোনো নাম মহব্বতপুর, তখন অনেকের চোখে ওই ফারসি নাম আজ আর মহব্বত জাগায় না, আতঙ্ক জাগায়। একটা ভাষা, একটা জনসমাজ, একটা সভ্যতা, একটা সংস্কৃতি কী ভাবে মানে পালটে ভুয়ো আতঙ্কের সমার্থক হয়ে যেতে পারে? এই প্রশ্ন শুধু অর্ঘ্যর নিজস্ব থাকে না। মেমারি থেকে আসা ওর বন্ধু মহম্মদ বিট্টুর চোখে চোখ রাখতে পারছিলাম না লজ্জায়। এখানে ও সংখ্যালঘু, আমরা নাকি জমজমাট!

সৌরীন ভট্টাচার্য্

আজ এই যে ভুয়ো আতঙ্ক, রটনা, গুজব আমাদের আস্থাকে চুরমার করছে, এ কোনও নতুন ঘটনা নয়। বহু দিন ধরে বহুবার এই আস্থাহীনতা ও বিভেদের পরিস্থিতিকে বানানো হয়েছে। এই সত্যকে মনে করিয়ে দিয়ে সৌরীন ভট্টাচার্য্ আমাদের চেনাতে চান মিথ্যার নির্মাণ। কীভাবে সত্যকে ধাঁধায় মুড়ে নাগালের বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জনবিন্যাসের বাস্তবতাকে কীভাবে গুলিয়ে দিয়ে অযথা আতঙ্ক তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু, পাশাপাশি সহজেই স্বীকার করেন, বিগত তিরিশ বছরে মুক্তিপথের নিশানা খুব স্পষ্ট করে চেনা, ক্রমাগত কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সফল হবার জন্য দৌড়তে গিয়ে পরস্পরের থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাচ্ছি, এই দূরত্বর ফাঁক গলেই অবিশ্বাস ঠাঁই পেয়ে যাচ্ছে, আনাচে-কানাচে। আজ নতুন কথা, নতুন পথের সন্ধান তিনি আশা করেন আগামী প্রজন্মের কাছে।

শঙ্খ ঘোষ বাবরি মসজিদ ভাঙার কিছু দিন বাদে এক কাল্পনিক কথোপকথন লিখে ছিলেন, তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথের। সুদর্শনা আর সিদ্ধার্থ পাঠ করল সেই কথোপকথন। আমারাও যেন দাঁড়ালাম রবীন্দ্রনাথের সামনে। তাঁর হাজার কথা, অযুত চেষ্টার অতি সামান্যই আত্মস্থ করেছি আমরা, অধোবদনে আবার ঋদ্ধ হলাম। হারিয়ে যাওয়া আত্মবিশ্বাস খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করলাম দুই কবির কাল্পনিক কথোপকথনে।

কর্ডলেস মাউথপিস মঞ্চ থেকে নেমে এল, স্বর থেকে স্বরান্তর মেলে দিল ডানা।

– সোশাল নেটওয়ার্কে দোষারোপ পালটা দোষারোপের পর্ব চলতেই থাকে পাশাপাশি সত্যও প্রচারিত হয়, কিন্তু অযথা ভয়ের কারবার কি উন্মাদনাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে?

– ধর্মের নামে ভীতির পরিবেশ তৈরি করে রুটি-রুজির সমস্যাকে ঢেকে রাখা হচ্ছে।

– হিন্দু-মুসলমান পরিচয়টাকেই সবার চেয়ে বড় করে তোলাটা কি খুব দরকারি? আমাদের বাকি পরিচয়গুলো কি ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে ?

– শ্রমের মর্যাদা, হাতের কাজ শেখার উৎসাহ মুসলিম এবং হিন্দু নিম্ন বর্গের মধ্যেই সব থেকে বেশি। তাদের উৎপাদনেই সকলের অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান জোটে। কিন্তু,তখন কিন্তু মনে থাকে না সোনার ফসল কে ফলিয়েছে – হিন্দু না মুসলিম! বিভেদ মেটানোর রাস্তা শ্রমের মর্যাদার প্রতিষ্ঠার পথেই আসতে পারে। বিজেপি সরকার ধর্মের বাহানায় তার অর্থনৈতিক শোষণের প্রকল্পগুলি – নোট বন্দি, বিমার বেসরকারিকরণ, জিএসটি, এফআরডিআই – থেকে দেশবাসীর নজর ঘুরিয়ে দিচ্ছে বারংবার।

– একটা সরকার শুধু কয়েক বছরের মেয়াদকালে ইসলামোফোবিয়া তৈরি করে দিতে পারে না, এটা আগেই ছিল, কারো মনে সক্রিয় ছিল, কারো ঘুমন্ত ছিল। এই সরকার ভয়ের সংক্রমণে ইন্ধন যুগিয়েছে। এই অযথা ভয় তৈরি হচ্ছে পরস্পরকে জানি না বলেই। যত বেশি জানব, কাছাকাছি আসব সব সম্প্রদায়ের মানুষ, ততই ভয়ের গ্রাস থেকে মুক্ত হতে পারব।

– বাস্তবতা স্থানিক। আমরা প্রত্যেকে একই বাস্তবতায় থাকি না। এই দুনিয়ার অতি সামান্য অংশ আমাদের গোচরে থাকে। একই ঘটনা দর্শক ভেদে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, দুজনের কাছে দুরকমের সত্যকে নির্মাণ করে। এই পার্থক্য খুব স্বাভাবিক, অপরের দৃষ্টি ভঙ্গিকে সম্মান না দিলে অযথা সংঘাত তৈরি হবে। এই অযথা সংঘাত আমাদের ক্রমাগত আসল সমস্যা – অর্থনৈতিক সমস্যা – থেকে দূরে নিয়ে যাবে। আসল সমস্যার সমাধান করতে দেবে না।

– একটা ছোটো কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ চলছে – ‘প্রতিবেশীকে চিনুন’ – মহল্লা, পাড়ায় হিন্দু-মুসলমান মিলে মুখোমুখি খুব ছোট ঘরোয়া আলাপচারিতার আসর। পরস্পরের ধর্ম সংস্কৃতি রীতি-রেওয়াজকে জানা ও চেনার প্রচেষ্টা। অত্যন্ত কার্যকরী এই প্রক্রিয়ায় অনেক সম্ভাবনার পথ খুলে যাচ্ছে।

– প্রকৃতি কোথাও শূন্যস্থান থাকতে দেয় না, রাজনীতিতেও তাই। অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কার্যকরী রাজনৈতিক সক্রিয়তার অভাব বহু দিন ধরেই আমাদের দেশে ছিল। সেই শূন্যস্থানই পূরণ করছে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি। আজ তাদের বাড়বাড়ন্ত দেখে আমরা আমাদের নিজেদের দায়িত্ববোধের ঘাটতিকে ভুলে থাকতে পারি না। স্বাস্থ্য-শিক্ষার মতো বিষয়গুলো মারাত্মক সমস্যা আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও আমরা এই খুব জরুরি দাবিতে কোনও গণ আন্দোলন গড়ে তুলতে পারিনি। রাজনৈতিক আন্দোলন আর গণ আন্দোলন এক নয়। গণ আন্দোলনের অভাব রাজনৈতিক আন্দোলন দিয়ে পূরণ করা যাবে না। এর দায় আমাদের নিতে হবে।

শঙ্খ ঘোষ

সব শেষে শঙ্খ ঘোষ মনে করিয়ে দেন, সামাজিক মেলামেশার প্রয়োজনীয়তার কথা, ঘরোয়া আলাপচারিতায় পরস্পরের কাছাকাছি আসার খুব জরুরি প্রক্রিয়া বেশ কিছু জায়গায় চলছে, এই সাফল্যের সুসংবাদও তিনি দেন।

কষা মানে কৌস্তভ আয়ত ক্যানভাসে রঙচঙে হত্যার ছবি আঁকে। মন্দির মসজিদের প্রেক্ষাপটে গরুমুখো, নিশান মগজ জহ্লাদরা সজীব হয়ে ওঠে সেই ছবিতে আর লাশ হয়ে শুয়ে থাকে আমার স্বদেশ।

শেষ করার আগে একটি সংযোজন :

প্রিয় আজাহারউদ্দিন,

জানো, আজব সত্যটা এখনও দিব্যি জলজ্যান্ত। তুমি আজও ছেয়ে আছ হিন্দু-মুসলিম সংক্রান্ত সব আলোচনায়। তোমার কবজির অসামান্য মোচড়ে বাউন্ডারি ছোঁয়া দুরন্ত ফ্লিক। কভারে অতন্দ্র প্রহরা, বিদ্যুৎগতির রানিং বিটুইন দ্য উইকেট সব, সব চোখে লেগে আছে এক গোটা প্রজন্মের। তোমায় জুড়ে আছে আমাদের রোমাঞ্চিত কৈশোর। ১৯৯৮-এর ঢাকা। আমাদের সৌরভ তখনও উঠতি কিন্তু একাই ১২৪। তুমিই তো সটান বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলে দাদার পাশে। ১১ বলে মাত্র ৪ রান, কিন্তু দাদার পাশে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলে – আলো কমে গেলেও ব্যাটিং করবে। ওই একবারই ফিল্ডিং টিম কম আলোর অজুহাতে মাঠ ছেড়ে চলে গিয়েছিল, কিন্তু ফিরে এসেছিল তোমাদের দুজনের শক্ত চোয়ালের দিকে তাকিয়ে। ৩১৪ রান করেও সেবার পাকিস্তান জিততে পারেনি।

আজাহার আলো কমে আসছে। বড় অন্ধকার। তুমি কি সত্যিই দেশকে বেচে দিয়েছিলে? আইনের মারপ্যাঁচ খুব একটা বুঝি না। শুধু জানি, ১২ বছর পর হলেও আদালত তোমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ থেকে তোমাকে মুক্তি দিয়েছিল। কিন্তু এই ঘনঘোর আঁধারেও দিনের আলোর মত পরিষ্কার – আমার স্বদেশ আজ নিলামে চড়েছে, লে লে বাবু দু আনা…

আজাহার বড় অন্ধকার, কিন্তু তাকিয়ে দেখো – আমাদের শক্ত চোয়াল, মাঠ ছেড়ে চলে যাইনি। তোমার দিব্যি, মাঠ ছেড়ে চলে যাবনা।

ইতি

(শমীক সাহা একজন সামাজিক কর্মী। ব্যানার-এর ছবিটি কৌস্তভ (কষা)-র আঁকা।)

Share this
Leave a Comment