গণআন্দোলন, ষড়যন্ত্র ও কুনাট্যরঙ্গ


  • June 19, 2018
  • (0 Comments)
  • 762 Views

“কাঠের কড়াই একবারই ব্যবহার করা যায়।” নির্বাচনের ঢাকে কাঠি বাজলেই উচ্চগ্রামের ষড়যন্ত্র নতুন কিছু নয়। আমরা আগেও তা প্রত্যক্ষ করেছি। শুধু ‘ষড়যন্ত্রকারী’দের মুখগুলি বদলে যায়। গল্পটা অস্বাভাবিক রকমের এক। ক্ষমতাবান রাজনীতিকদের হত্যার চক্রান্তের যে অভিযোগ উঠেছে, সে বিষয়ে অনুসন্ধান চালাল গ্রাউন্ডজিরো।

২৭ মে ২০০২, গুজরাতের গান্ধীনগরের অক্ষরধাম মন্দিরে হামলা চালাল দুই সশস্ত্র জঙ্গি। এই ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল ৩০ জনের। আহত আশির বেশি। নিরাপত্তাবাহিনীর পালটা আক্রমণে ওই দুজনের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে গ্রেফতার করা হয় ছ’জনকে। একযুগেরও বেশি পরে, ২০১৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তারা মুক্তি পায়। এই রায়ে দেশের শীর্ষ আদালত গুজরাট পুলিশ ও রাজ্যের স্বরাষ্ট্র দপ্তরের ‘মতিচ্ছন্ন’ মনোভাবের তীব্র সমালোচনা করে। কিন্তু অক্ষরধাম-কাণ্ডের পর যেটা আসলে ঘটল তা হল সংঘর্ষের নামে একের পর এক হত্যাকাণ্ড। গুজরাত পুলিশের দাবি ছিল, মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে হত্যা করার জন্য ‘জঙ্গি’ তৎপরতা শুরু হয়েছে। ২০০৩ থেকে ২০০৬, এ-জাতীয় ২২টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সবক্ষেত্রেই গল্পটা এক। জঙ্গিরা মুখ্যমন্ত্রীকে খুন করতে গুজরাটে ঢুকে পড়েছে, আর তাঁর কেশাগ্র স্পর্শ করার আগেই পুলিশ তাদের নিকেশ করে দিয়েছে। এই সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে ইশরাত জাহান, সোহরাবুদ্দিন শেখ, সাদিক জামাল, তুলসিরাম প্রজাপতির হত্যার ঘটনাটি মিডিয়ার নেকনজরে পড়েছিল। অভিযোগ উঠেছিল এই সংঘর্ষের অধিকাংশই ভূয়ো। জেল হয়েছিল গুজরাত পুলিশের তৎকালীন ডিজি বানজারার মতো অফিসারদের। সেই সময়ে, বর্তমানে বিজেপি’র সর্বভারতীয় সভাপতির অমিত শাহ’র ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। তারও জেলে যাওয়ারই কথা ছিল। ঘটনাচক্রে ২০০৭-এ ছিল গুজরাত বিধানসভার নির্বাচন। ফলাফল : মোট আসন — ১৮২। বিজেপি — ১১৭। কংগ্রেস — ৫৯।

২০০২ সালে গুজরাতে সাম্প্রদায়িক গণহত্যার পর নরেন্দ্র মোদীর হিন্দুত্ববাদী ভাবমূর্তি প্রকট হয়ে উঠেছিল। ফলত,২০০৭ – এর নির্বাচনে উগ্র মুসলিম মৌলবাদীরা তাঁর উপর আঘাত হানবে এবং মোদী মুসলিম মৌলবাদ এবং ইসলামি সন্ত্রাসবাদের শিকার — এমন একটা ভঙ্গি দাঁড় করানো জরুরি ছিল। যেখান থেকেই ‘হিন্দু হৃদয় সম্রাট’  ইমেজটাকে সংহত রূপ দেয় মোদী। যেখান থেকে তার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফের ক্ষমতায় ফেরা। সে সময় এই চিত্রনাট্য অনেকেরই নজরে এসেছিল। এই নির্বাচনী প্রতিযোগিতা ছিল ব্যক্তি মোদীর কল্পচিত্রের উপর ভর করে।

আবার ২০১৪। মার্চ মাস। সাধারণ নির্বাচনের ভোটদানের ঠিক আগে রাজস্থানে গ্রেফতার হল চার জন জঙ্গি। দাবি করা হল, এরা বিজেপি’র প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদীকে হত্যা করার ছক কষছিল। এর আগে, ২০১৩-র নভেম্বর থেকে ২০১৪-র জানুয়ারি পর্যন্ত টিভি নাইন, ওয়ান ইন্ডিয়া, এএনআই-এর মতো বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হতে থাকে — মূলত

‘নাম- পরিচয়হীন সূত্র’ উদ্ধৃত করে — মুজাহিদ্দিন জঙ্গিরা নরেন্দ্র মোদী ও শীর্ষ বিজেপি নেতাদের হত্যার পরিকল্পনা করেছে। ২০১৪-র ২০ মার্চ বিজেপি এ-বিষয়ে একটি সাংবাদিক সম্মেলন করে  এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেয়। স্মারকলিপিতে দাবি করা হয়,

Memorandum to Home Minister to provide security cover to BJP Leaders

“আমাদের নজরে পড়েছে, বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম আইবি রিপোর্ট উদ্ধৃত করে জানাচ্ছে যে, আমাদের নেতাদের আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি তারা অপহৃত হতে পারে। মিডিয়া এমনও ইঙ্গিত করছে যে, এই বর্বরোচিত কাণ্ড ঘটানোর পিছনের মূল উদ্দেশ্য হতে পারে ইয়াসিন ভাটকলের মতো জঙ্গিকে মুক্ত করে আনা।” গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, যে খবরগুলি তখন প্রকাশিত হয়েছিল, যার উপর ভিত্তি করে বিজেপি’র সাংবাদিক সম্মেলন আর স্মারকলিপি দেওয়া, সেগুলির খোঁজ এখন আর কোত্থাও পাওয়া যায় না। শুধুমাত্র বিজেপি’র মুখপত্র নীতিসেন্ট্রাল-এ সেগুলি দেখতে পাওয়া যায়। বিজেপি নেত্রী নির্মলা সীতারামনের সাংবাদিক সম্মেলন এবং স্মারকলিপি প্রদানের পর রবিশঙ্কর প্রসাদের সাক্ষাৎকার বেশ ফলাও করে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। কিন্তু, কোনও চ্যানেল বা সংবাদপত্র এতবড় অভিযোগের সত্যাসত্য খোঁজ নিয়ে দেখার চেষ্টা করেনি। যদিও নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ২০১৪-র নির্বাচনের বর্শামুখ ছিল ‘উন্নয়ন’ আর ‘গুজরাত মডেল’। তবুও, আস্তিনে হিন্দুত্বের তাসও ছিল। এই নির্বাচনও ছিল মোদীময়। দেশ বিরোধী শক্তি তার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তায় স্বস্তিতে নেই, অতএব তাঁর জীবনের আশঙ্কা রয়েছে — বিজেপি’র এ জাতীয় আখ্যানের সঙ্গে মোদীর চারপাশে শত্রুরা ওত পেতে রয়েছে, এই বয়ান খাপে খাপে মিলে যায়।

 

মোদী জমানার চার বছর পূর্ণ হল। চাকরি, উন্নয়নের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে। সর্বত্র ক্ষোভ-বিক্ষোভ বাড়ছে। পরবর্তী লোকসভা নির্বাচনের আর মাত্র এক বছর বাকি। বিজেপি আদৌ স্বস্তিতে নেই। বিশেষ করে উপ নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের গোরখপুর ও কৈরানা আসন দুটি হারানোর পর। সুতরাং, বিজেপি ‘মোদী ষড়যন্ত্রের শিকার’ এই চর্চিত এবং পরীক্ষিত কৌশলটির আশ্রয় নেবে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিষয়টি শুধুমাত্র এই নয় যে, সমস্ত বিরোধী দল তার বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে, দেখানো হচ্ছে তাঁর জীবনহানিও হতে পারে। একই সঙ্গে মোদীকে একজন ধর্মযোদ্ধা এবং মরণম্মুখ বিপদগ্রস্ত হিসেবে তুলে ধরার রণনীতি অতীতে বহুবার ব্যবহৃত হয়েছে। সে লভ্যাংশও ঘরে তুলেছে বিজেপি।

প্রধানমন্ত্রীকে খুন করার মাওবাদী ষড়যন্ত্রের ‘অপরাধ প্রমাণকারী সাক্ষ্য’ হিসাবে যে দুটি চিঠিকে তুলে ধরা হচ্ছে তার সময় ও বিষয়বস্তু মনোযোগের দাবি রাখে। আরও একটি নির্বাচন ভারতীয় রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়ছে। এবং মনে হচ্ছে আবারও সেই শাসক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে ‘হত্যার ছক’ কষার (এবং খুঁড়ে তোলার) চক্রান্তে তা দেওয়া হচ্ছে। বিগত চার বছর দেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি বিজেপি’র কাছে জমি হারিয়েছে। ২০১৪ সালে উৎখাত হয়ে যাওয়ার পর কংগ্রেস এখনও বিজেপি’র তেল মসৃণ নির্বাচনী মেশিনারির সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মতো অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। আঞ্চলিক দলগুলোও দেখতে পাচ্ছে তাদের ভোটভিত্তি  বিজেপি’র দিকে সরে যাচ্ছে, এমনকি দলীয় নেতৃত্বের একাংশ বিজেপি’তে চলে যাচ্ছে। ফলত  নির্বাচনে জনগণের অনুকূলে কোনও বিকল্প তৈরি করতে রীতিমতো লড়তে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শাসক দলের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ইস্যুতে এককাট্টা জনতা। যেমন দলিত ও মুসলমানদের উপর ক্রমবর্ধমান হিংসার বিরোধিতা, কৃষিঋণ মকুবের নামে খুদকুঁড়ো ঠেকানোর বিরুদ্ধে কৃষকদের জোট বাঁধা, উচ্ছেদ বিরোধিতা  জাতীয় এমন আরও আন্দোলন। এই বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে যেখানে জাতপাত বিরোধী সামাজিক কর্মীরা, নাগরিক অধিকারের জন্য জনতার আইনজীবীরা, অধ্যাপক ও উচ্ছেদ বিরোধী সামাজিক কর্মীরা গণ আন্দোলনের পক্ষে কাজ করে চলেছেন, তাদের জেলে পোরা হচ্ছে।

চাঞ্চল্যকর চিঠি নিয়ে টিভি স্টুডিয়োর চড়া সুরে আলোচনার প্রসঙ্গে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। প্রথমত, ২ জানুয়ারির তারিখের একটি চিঠিতে কীভাবে ভবিষ্যৎকালের বয়ানে ৬ ডিসেম্বরের তথ্য অনুসন্ধানের পরিকল্পনার উল্লেখ থাকে (সৌজন্য : সকাল টাইমস)? দ্বিতীয়ত, যে চিঠিগুলো মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ফড়ণবীস অন্তত এক সপ্তাহ আগে পেয়েছিলেন, সেগুলো কেন ওই পাঁচ জনকে গ্রেফতারের পর পুলিশ আর মিডিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হল? তৃতীয়ত, নরেন্দ্র মোদীকে খুন করার আইএসআই-এর চক্রান্তের গোয়েন্দা রিপোর্ট প্রকাশ্যে আসতে এক বছরের বেশি সময় লাগল যে খবর এই গ্রেফতারের আগেই জানা ছিল। চতুর্থত, এমন কী হল গ্রেফতারের প্রায় সম সময়ে অনেকেই এমনকি মিলিন্দ একবোতের পরিবারও খুনের হুমকি পেতে শুরু করল? পঞ্চমত, একটা নিষিদ্ধ সংগঠন কীভাবে এত পরিষ্কার ভাবে সব কিছুর এমনকি অস্ত্রশস্ত্রের টাকা কোথা থেকে আসবে তাও পরিষ্কার লিখে ফেলল? ষষ্ঠত, কেন পাঁচজনের পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার আবেদনে ‘প্রধানমন্ত্রীকে খুনের চক্রান্ত’র অভিযোগ লেখা হল না? এমন প্রশ্ন রয়েছে আরও। আর এই সব প্রশ্নের উত্তর আদালতে দিতে হবে। আমরাও প্রকৃত তথ্য প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করব।

কিন্তু আপাতত ঘটনাটা হল, এই গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব  সন্দেহজনক কারণে জেলবন্দি। পাশাপাশি, লোকসভার কঠিন সীমাবদ্ধ গণ্ডির বাইরে গণআন্দোলনকে লক্ষ্যবস্তু করে তোলা হবে। স্পষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে, ২০১৯ নির্বাচনের বহু আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ কোনোরকম রাজনৈতিক বিরোধিতাকে শুকিয়ে ফেলা। এটাও মনে রাখতে হবে, আইনজীবী, দলিত আন্দোলনের নেতাদের গ্রেফতারের দিন প্রধান প্রধান সংবাদ মাধ্যমের রাজনৈতিক ভাষ্যকারদের বাগাড়ম্বর পূর্ণ বক্তব্যের মূল সুর ছিল, ‘দলিত কর্মীরা’ গ্রেফতার হয়েছে, ‘জাতপাতের রাজনীতি’র মাধ্যমে এরা ‘দেশকে টুকরো টুকরো করতে চায়’। বিশেষ ভাবে ভীমা কোরেগাঁও আন্দোলনের পর। এক দিন বাদেই সুর বদলে বলা শুরু হল, নকশাল-ঐস্লামিক চক্রান্ত, গুপ্তহত্যার ছক ইত্যাদি। আলোচ্য চিঠিতে ‘কমরেড আর-এর’ শহর এলাকায় দ্বিমাত্রিক (টু লাইন) সংগ্রাম’-এর অর্থ না বোঝা গেলেও, সরকারের সাঁড়াশি নীতির অঙ্কটি পরিষ্কার। একদিকে, কার্যত জাতপাত বিরোধী, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী, উচ্ছেদ বিরোধী আন্দোলনগুলিকে আক্রমণ করা, অন্যদিকে, দেশের সার্বভৌমত্বের উপর নকশাল-ঐস্লামিক সমন্বয়ী প্রভাবের সমান্তরাল ভাষ্য বুনে চলা।

সরকার এবং সংবাদমাধ্যমের এক বড় অংশকে যে কোনও ধরনের তৃণমূল স্তরের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্রের আতস কাচের তলায় ফেলে দেখার একটা ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এও এক অদ্ভুত রাজনীতি। এ ভাবে দেখার অর্থ,  সামাজিক আন্দোলনকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে, এই জনপ্রিয় দাবিকে সম্পূর্ণভাবে তুচ্ছ করে দেওয়া। ষড়যন্ত্রের লেন্স দিয়ে দেখার অর্থ, ধৃত পাঁচজনের মূল কাজ থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া। এই পাঁচজন ঠিক কী ধরণের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং সেই আন্দোলন থেকে ঠিক কী জাতীয় দাবি উঠে আসছে সে বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়নি। দেশ সাক্ষী যখন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, তখন সেটাকে রাজনৈতিক ভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এ এক জোরালো রণনীতি। এই রণনীতির মধে রাষ্ট্র ও মিডিয়ার আঁতাত ফাঁস হয়ে গিয়েছে। উদ্দেশ্য, এমন একটা রাজনৈতিক আধিপত্য তৈরি করা যেখানে কোনোরকম মতভেদের মূল্য নেই। সুধীর ধাওয়ালে যে একটি পত্রিকা, ‘বিদ্রোহী’র সম্পাদক, প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো সে পরিচয় বেমালুম বাদ দিয়ে দিয়েছে। ঠিক কোন বিষয়ের কী ধরনের লেখা সেখানে প্রকাশিত হয় তা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই। একই ভাবে আইনজীবী সুরেন্দ্র গ্যাডলিং প্রান্তিক মানুষদের কীভাবে আইনি সাহায্য করে থাকেন বা অধ্যাপক সোমা সেনের লেখালেখি নিয়েও কোথাও কোনও উল্লেখ নেই।

সরকার এবং সংবাদমাধ্যমের এক বড় অংশকে যে কোনও ধরনের তৃণমূল স্তরের আন্দোলনকে ষড়যন্ত্রের আতস কাচের তলায় ফেলে দেখার একটা ক্রমবর্ধমান প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। এও এক অদ্ভুত রাজনীতি। এ ভাবে দেখার অর্থ,  সামাজিক আন্দোলনকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে, এই জনপ্রিয় দাবিকে সম্পূর্ণভাবে তুচ্ছ করে দেওয়া। ষড়যন্ত্রের লেন্স দিয়ে দেখার অর্থ, ধৃত পাঁচজনের মূল কাজ থেকে আমাদের দৃষ্টি সরিয়ে দেওয়া। এই পাঁচজন ঠিক কী ধরণের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত এবং সেই আন্দোলন থেকে ঠিক কী জাতীয় দাবি উঠে আসছে সে বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়নি। দেশ সাক্ষী যখন গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, তখন সেটাকে রাজনৈতিক ভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার এ এক জোরালো রণনীতি। এই রণনীতির মধে রাষ্ট্র ও মিডিয়ার আঁতাত ফাঁস হয়ে গিয়েছে। উদ্দেশ্য, এমন একটা রাজনৈতিক আধিপত্য তৈরি করা যেখানে কোনোরকম মতভেদের মূল্য নেই। সুধীর ধাওয়ালে যে একটি পত্রিকা, ‘বিদ্রোহী’র সম্পাদক, প্রধান সংবাদমাধ্যমগুলো সে পরিচয় বেমালুম বাদ দিয়ে দিয়েছে। ঠিক কোন বিষয়ের কী ধরনের লেখা সেখানে প্রকাশিত হয় তা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য নেই। একই ভাবে আইনজীবী সুরেন্দ্র গ্যাডলিং প্রান্তিক মানুষদের কীভাবে আইনি সাহায্য করে থাকেন বা অধ্যাপক সোমা সেনের লেখালেখি নিয়েও কোথাও কোনও উল্লেখ নেই।

Courtesy: AltNews

ষড়যন্ত্র ও গুপ্তহত্যার পরিকল্পনার যে অভিযোগ সে প্রসঙ্গে ফিরে আসি। সাম্প্রতিক কালে যে পরিমাণ মানুষকে  প্রকাশ্যে খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। সব ধরণের মানুষ এই তালিকায় রয়েছেন। রভীশ কুমারের মতো সাংবাদিক, বিশেষ করে মহিলা সাংবাদিকরা, বরখা দত্ত, অঞ্জনা ওম কাশ্যপ, নেহা দীক্ষিত, রানা আয়ুব আরও অনেকে। খুন করা হয়েছে গৌরী লঙ্কেশকে। ছাত্রী গুরমেহর কাউর, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপিকা, রাজনীতিক ও সামাজিক আন্দোলনের নেতা জিগ্নেশ মেভানি, উমর খালিদ, পিন্নারাই বিজয়ন, দীপিকা পাড়ুকোনের মতো অভিনেত্রী, প্রশান্ত ভূষণের মতো আইনজীবীরাও এই তালিকায় রয়েছেন। এ ছাড়াও রয়েছেন সেই সব অসংখ্য সাধারণ মানুষ যাঁরা গবাদি পশু এবং সামান্য ডেয়ারি ব্যবসায়ী। গুজরাত, পশ্চিমবঙ্গ, কাশ্মীরের মুসলমানরা এবং রামমন্দির নির্মাণ বিরোধী প্রায় সকলেই। এদের সকলকেই, হয় তাদের কাজের জন্য, নয় তাদের মতবাদের জন্য হিন্দু জাতীয়তাবাদী আধিপত্যের মস্ত বাধা হিসেবে দেখা হয়। এই প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে খুন, ধর্ষণ, শারীরিক নিগ্রহের হুমকি যারা দিচ্ছে, তাদের ব্যক্তি ও রাজনৈতিক পরিচতি স্পষ্ট, তবু সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা নেয়নি।

এই ক্ষেত্রগুলোতে সরকার যদি কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবত, তবে তদন্তের জন্য কোনও জালি চিঠির প্র‍য়োজন হত না। উল্টে, প্রকাশ্যে যারা খুনের ষড়যন্ত করে চলেছে তাদের হয় বাহবা দিয়ে পিঠ চাপড়ে দেওয়া হয়েছে। নয় তাদের দলে উচ্চাসনে বসানো হয়েছে অথবা প্রধানমন্ত্রী বা অন্য উচ্চপদস্থরা এদের সামাজিক মাধ্যমের একাউন্টগুলিকে সমর্থন করে চলেছেন। ২৪ x ৭ টিভি  স্টুডিয়োর ঝকঝকে অন্দরে বসে যখন আলোচ্য চিঠিগুলোর আইনসিদ্ধতা, বিদ্বেষপরায়ণতা সহ নানা দিক নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে, তখন দুর্বোধ্য কারণে (হয়তো নয়) তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে দেওয়া খুন-ধর্ষণের
হুমকির ঘটনাগুলোকে সম্পূর্ণ নির্লজ্জ বেহায়ার মতো অবজ্ঞা করা হচ্ছে।

The Gau Rakshak Clan.
Courtesy: AltNews

বঙ্গানুবাদ করেছেন দেবাশিস আইচ। মূল লেখাটি এখানে পাবেন

Share this
Leave a Comment