স্কুল পাঠের প্রাথমিক স্তর থেকেই শুরু হোক যৌন শিক্ষা


  • May 17, 2018
  • (0 Comments)
  • 1272 Views

স্কুল থেকে উঠে গেছে যৌন শিক্ষার ক্লাস। এদিকে শিশুদের যৌন হেনস্থার হার বাড়ছে আর তার পাশাপাশি উঠে আসছে শিশু বা কিশোর হেনস্থাকারী বা ধর্ষকদের খবরও। যৌন সচেতনতার বা সংবেদনশীলতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি আর ইন্টারনেটে যৌন উপচারের নির্বিচার আগ্রাসী লভ্যতা পরিস্থিতির জটিলতা অপরিসীম বাড়িয়ে তুলেছে, তুলছে। এই অবস্থায় করণীয় কি? 

সিদ্ধার্থ বসু

২০০৭ নাগাদ চাকরিতে ঢোকার সময় জীববিদ্যার মাস্টার হিসেবে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত যৌনশিক্ষা-র ক্লাস নেবার সুযোগ হয়েছিল কয়েকটা। পোশাকি নাম ছিল তার ‘জীবন শৈলী শিক্ষা’। একটাও ক্লাস নেওয়ার আগে থেকেই স্টাফ রুম-এর নানা অভিজ্ঞ শিক্ষকদের থেকে পরামর্শ পাই পরিবেশসচেতনতা সংক্রান্ত আলাপ-আলোচনার মধ্যেই এ ক্লাসগুলো সীমাবদ্ধ রাখতে। অন্যথায় সমস্যা অনিবার্য। তারপর, ক্লাস নিতে গিয়ে, আমার নিজের অভিজ্ঞতার ধরনটাও আলাদা হয়না খুব।

এমনিতে প্রাণীদেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ-তন্ত্র ও তাদের ক্রিয়াশীলতা বিষয়ক কিছু আলোচনা আমরা জীববিদ্যার মধ্যে করে থাকি। কিন্তু তা যেন হয়ে যায় অনেকটাই জ্ঞানতাত্ত্বিক। অর্থাৎ রেচন, পরিপাক, জনন ইত্যাদি বিষয়ের আলোচনা যেন আমাদের প্রাত্যহিক সমস্যা, প্রশ্ন, অস্বস্তি ও সেসবের সমাধান বা উত্তর খোঁজার সহজাত উন্মুখতা—এসবের বাইরে, বা এইসব-নিরপেক্ষ। তাই যৌনতা বা নিজের নিজের শরীর বিষয়ক হাজারটা ভুল ধারণা, আবছা অজ্ঞতা, ভয়, অসওয়াস্তি, ট্যাবু, অসুস্থতা বিষয়ে আলোচনা করতে গেলে শুরুতেই ‘সরল ও তরল’মতি ছাত্রদের তুলকালাম হাসি-মস্করার উদ্রেক ঘটে যায়। আর তারপর ক্লাস চালানোটাই দুরূহ হয়ে পড়ে।

তা দু-দিন না যেতেই অবস্থার উন্নতি ঘটল। অর্থাৎ, দেখতে পেলাম, আমাদের এবং অন্যদিকে অবশ্যই ছাত্রদেরও রুটিন থেকে দূরীভূত হয়েছে ‘লাইফ স্টাইল এডুকেশন’ (life style education) নামধারী এই অনাকাঙ্খিত দূষণটি। শিক্ষকেরা সবাই হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন, আমিও তথৈবচ। ইতিমধ্যে স্কুল পরিসরের বাইরে ও ভিতরে, শিক্ষক, ছাত্র ও শিক্ষাসংক্রান্ত রাজনৈতিক ও সমাজনৈতিক চিন্তকেরা, কেউ এককভাবে, আবার কেউ বা সাংগঠনিক প্রয়াসে, রীতিমত জনমত গড়ে তুলছিলেন এই ‘ভারতীয় সংস্কৃতি’ বিরোধী অনাচারটির বিরুদ্ধে। তারই ফলশ্রুতিতে বোধ হয় এই ইতিবাচক নেতিকরণ। 

খানিক ভেবে দেখলে উঠে আসে, যৌন উত্তেজনা আগাগোড়াই জৈবিক, প্রাকৃতিক। তার টান এড়ানোর উপায় নেই, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু অজ্ঞতার জমাট অন্ধকারে পাশাপাশি বেড়ে উঠছে অপরাধবোধ আর অপরাধপ্রবণতা, চরম বিকৃতি আর চূড়ান্ত সংস্কারাচ্ছন্নতা।

এখন কথা হচ্ছে, প্রথমত, নিজেদের শরীর চেনা শুরু হয় বয়ঃসন্ধির অনেক আগে থেকেই। পরিপূরক লিঙ্গের প্রতি আগ্রহ ও কৌতূহলও পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। রাস্তাঘাটে, জোটে-জটলায় ফেনিয়ে উঠতে থাকে আধ-বোঝা, সবে বুঝতে শুরু করা, বা একেবারে না বোঝা যৌন অনুষঙ্গের ঝাঁজ। টেলিভিশন, হলি-বলি-টলির আপাতনিরীহ অথচ গভীর যৌনগন্ধী উপস্থাপনা মগজের দখল নিতে থাকে। অতঃপর আসে, কম্পুটারে সোশ্যাল মিডিয়া এবং তৎসহ ডিজিটাল যৌনতার অন্তহীন দুনিয়ার দরজা হাট করে খুলে যাওয়া। আর তারপর স্মার্টফোন এবং ভিডিও চ্যাটে যৌন যোগাযোগ ও তার রেকর্ডিং শুরু হতেও খুব সময় লাগে না বেশি। আজ একটা পাঁচ বছরের শিশুও আমাদের অনেকের চেয়ে ভালো বোঝে স্মার্টফোন ও ল্যাপ্টপের কায়দাকৌশল—অনলাইনের অবাধ দুনিয়া। অথচ, ঠিক কোন ধরণের যৌন হিংসার শিকার সে হয়ে যেতে পারে যেকোনো দিন, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সচেতনতা নেই তার, থাকার পথও নেই। সত্যি করেই তো শিশুদের যৌন হেনস্থার হার বাড়ছে আর তার পাশাপাশি উঠে আসছে শিশু বা কিশোর হেনস্থাকারী বা ধর্ষকদের খবরও। কারণ তারা হাতের মুঠোয় পেয়ে যাওয়া ভার্চুয়াল যৌন পরিবেশের সঙ্গে তাদের বয়সোচিত যৌন বাস্তবতাকে আর সাধারণ বুঝসুঝ দিয়ে মেলাতে পারছে না। যৌন সচেতনতার বা সংবেদনশীলতার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি আর যৌন উপচারের নির্বিচার আগ্রাসী লভ্যতা পরিস্থিতির জটিলতা অপরিসীম বাড়িয়ে তুলেছে, তুলছে।

খানিক ভেবে দেখলে উঠে আসে, যৌন উত্তেজনা আগাগোড়াই জৈবিক, প্রাকৃতিক। তার টান এড়ানোর উপায় নেই, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু অজ্ঞতার জমাট অন্ধকারে পাশাপাশি বেড়ে উঠছে অপরাধবোধ আর অপরাধপ্রবণতা, চরম বিকৃতি আর চূড়ান্ত সংস্কারাচ্ছন্নতা। একদিকে বড়রা—পাকারা, পরিণতরা—যৌন বিষয়কে অলঙ্ঘ্য ট্যাবুতে মুড়ে অক্ষম দূরত্বে সরিয়ে রাখতে চাইছেন। আর ছোটোরা—নতুনরা, বিকচরা—ফুটে উঠতে থাকা শরীরবোধ আর যৌন উপাদানের তোলপাড় আবেদনের মাঝখানে নিতান্ত অসহায় বোধ করছে: প্রথমত তাদের গ্রাস করছে অপরাধবোধ, তারপর উপায়ন্তরহীনভাবে তারা হয়ে উঠছে অপরাধপ্রবণ। অথচ, একটু খোলা চোখে তাকালেই পরিষ্কার দেখা যাবে যে, যৌনতা বিষয়ক এই ক্ষতিকর রক্ষণশীলতা, পোষাক-আচরণ-অভিব্যক্তির প্রকাশ ও গোপনতার ওপর অপরিকল্পিত লাল চোখ আসলে সুবিধে করে দিচ্ছে মৌলবাদী ক্ষমতাকেন্দ্রের, লিঙ্গবৈষম্যমূলক হিংসা যার দুঃশাসনেরই এক হাতিয়ার। ধর্মের দোহাই পেড়েও চলছে অবদমনের মারণখেলা। তথাকথিত হিন্দু অনুশাসন অনুমোদন করছে না প্রকাশ্য বা গোপনীয় কোনো যৌন অভিব্যক্তিকেই। যৌনতা সমাজবিরোধী, অনৈতিক, অশুভ—এমন একটা কানাকানি বাতাসে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর তার মাঝখানেই চলছে লিঙ্গ অসাম্য ও যৌন হিংসার বিরতিহীন বাড়বাড়ন্ত।

যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এই নিজেকে চোখ ঠারা। যৌনতাকে আবডাল দিয়ে সমাজে তথাকথিত সভ্যতা প্রচলিত করার মারাত্মক প্রবণতা, যার ফল ভুগতে হয়েছে সেই সমাজকেই। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য়‌ করি, যে পরিণত বয়সের অনেক মানুষকেই আজ যৌন অস্থিরতা, বিভ্রান্তি বা অবসাদ নিয়ে মনোবিদের সাহায্য নিতে হয়। অন্য যৌনতার মানুষেরা আস্তে আস্তে তুলতে শুরু করেছেন তাঁদের চেপে রাখা স্বর। তাঁদের প্রতি এতদিনকার তথাকথিত-মূল-ধারার যৌনপরিচয়ের মানুষেরা তুলতে শুরু করেছেন সংশয়ের, অবজ্ঞার আঙুল। এসবকিছুর অনেকখানিই কিন্তু আমাদের আশৈশব যৌনতা বিষয়টিকে এক দূরতর দ্বীপ করে রাখারই ফলশ্রুতি। এমনকি ক্রমবর্ধমান যৌন হিংসার প্রশ্নেও যেন আবছাভাবে মনে হয়, ছোটবেলা থেকে নিজের ও পরিপূরক লিঙ্গের চাহিদা ও অধিকারের ন্যায্যতা যদি পৌঁছতে পারে মানুষের কাছে, পারস্পরিক লালসা-বিদ্বেষের অচরিতার্থতার খানিক উপশম হয়ত সম্ভব হতে পারে। 

একটু খোলা চোখে তাকালেই পরিষ্কার দেখা যাবে যে, যৌনতা বিষয়ক এই ক্ষতিকর রক্ষণশীলতা, পোষাক-আচরণ-অভিব্যক্তির প্রকাশ ও গোপনতার ওপর অপরিকল্পিত লাল চোখ আসলে সুবিধে করে দিচ্ছে মৌলবাদী ক্ষমতাকেন্দ্রের, লিঙ্গবৈষম্যমূলক হিংসা যার দুঃশাসনেরই এক হাতিয়ার।

অতএব, নিজের বাল্য-কৈশোর এর অভিজ্ঞতা দিয়েও বটে, আর এখনকার অনুরূপ বয়সী ছেলেমেয়েদের দেখেও বটে, আগাগোড়াই অত্যন্ত ন্যায্য মনে হয়েছে এই অসাংস্কৃতিক বিষয়টির পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তিকরণ। এবং এই উচ্চ প্রাথমিক স্তরে বিষয়টি আলোচনার ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা আমাকে ঠেলে দিয়েছে এমন অনুমানপ্রবণতার দিকে, যে এই পাঠ্যক্রম আরো কমবয়েস থেকেই ছেলেমেয়েদের কাছে পৌঁছে দেওয়া অবশ্যকর্তব্য। কারণ, যৌন সচেতনতা ও অধিকারের অসাম্যের যে বীজ শৈশব থেকে ছেলেমেয়েদের মধ্যে রোপণ করা হয় অসচেতনভাবে, বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার বিষ ফলবান হয়ে উঠতে থাকে। ফলে—আগের আলোচনামতোই—নিজের ও অন্য মানুষের শরীর-মন পরিবর্তন-প্রবণতা-যৌনতা সংক্রান্ত ব্যাপক অজ্ঞতা আমাদের গ্রাস করতে পারে (যা ইতিমধ্যেই অনেকটা করেছে), যার ফলস্বরূপ ক্ষতিকারক, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং এমনকি ক্রমবর্ধমান অপরাধপ্রবণ এক অসুস্থ সমাজের বিস্তারের জন্য আমরা প্রত্যেকে দায়ী থাকব। তবে ঠিক কেমন হবে সে পাঠ্যক্রমের বিষয়সূচি, ঠিকঠাক কোন বয়স থেকেই বা আলোচনা হবে সেসব এবং কেমন করেই বা—এসব প্রশ্নে আরো সুগভীর চিন্তাভাবনা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন আছে। মনস্তত্ব, সমাজবিদ্যা, শিক্ষাতত্ব, রাজনীতি প্রভৃতি বিবিধ ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিটি স্বাধীন চিন্তাশীল সাধারণ মানুষজনের এগিয়ে আসা কর্তব্য। ‘বেসিক নীড’ না হওয়ার ও ‘ভারতীয় সংস্কৃতির বিরুদ্ধে যাওয়ার অপযুক্তি দিয়ে এ বিষয়কে দূরে ঠেলে রাখার ফলাফল বোধ হয় দিনে দিনেই আরো ‘ভারী পড়ে যেতে’ চলেছে।

প্রসঙ্গত, কিছুকাল হল, কেন্দ্রীয় সরকারের সুনির্দিষ্ট নীতিনির্ধারণের কাজটিও সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়েছে এ বিষয়ে। ‘অব কি বার, অপসংস্কৃতি পরিহার’ সম্পূর্ণ করা গেছে। আইনত নাকচ হয়ে গেছে যৌন শিক্ষা বা জীবন শৈলী শিক্ষার কর্মসূচি। তবে সেই সঙ্গে আবার স্মরণ করে নেওয়া দরকার যে, যদ্দিন লাগু ছিল এই ‘কর্মযোগ’, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের কোনো কার্যকরী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা হয় নি। যেটুকু হয়েছিল তাও নেহাতই অপ্রতুল এবং অপরিকল্পিত। এই ভয়ানক ‘অপসংস্কৃতির’ বীজ ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দেবার জন্য মনস্তাত্বিকদের সাহায্য আবশ্যক বলে মনে হয় প্রতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই, কোথাওই যার কোনো চিহ্নমাত্র ছিল না। নাম কা ওয়াস্তে একটা ‘পলিসি’ ঝুলিয়েই রাখা হয়েছিল শুধু, নিজেদের র‍্যাডিকাল প্রমাণ করার ভুয়ো তাড়নায়, যার প্রতিফল মর্মে মর্মে টের পেতে হচ্ছে এখনকার ‘আচ্ছে দিন’-গুলোতে। লিঙ্গবৈষম্য ও যৌন হিংসা আগুনের মতো বাড়ছে। আমরা বরং একটু নড়েচড়ে বসি। উচ্চ প্রাথমিক নয়, একেবারে ছোটো শিশুদের প্রাথমিক বা প্রিপারেটরি ক্লাস থেকেই শুরু হোক যৌন শিক্ষার পাঠ। অন্যথায় ভুল ও বিপজ্জনক যৌন চেতনার গভীর দাগ পড়ে যাচ্ছে তাদের মনে। জন্ম নিচ্ছে এক অসুস্থ প্রজন্ম। আর আমরা শুধু মুখ ঘুরিয়ে রয়েছি মাত্র। প্রলয় বন্ধ নেই।

সিদ্ধার্থ বসু জীববিদ্যার শিক্ষক এবং কবি।
Share this
Comments are closed