বেজে উঠুক ‘সাইরেন শঙ্খ’


  • May 1, 2018
  • (0 Comments)
  • 781 Views

শঙ্কর রায়

মে দিবসের আওয়াজ ওঠার তিন বছর আগেই কার্ল মার্ক্সের জীবনাবসান ঘটে, ১৮৮৩ সালে, যদিও প্রথম আন্তর্জাতিকের জেনেভা কংগ্রেসে (১৮৬৬) দিনে অনধিক আট ঘন্টা কাজের দাবির প্রস্তাব নেওয়া হয়। সেখানে মার্ক্স এবং তাঁর কমরেড ও প্রিয় সখা ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করেন। ‘পুঁজি’র প্রথম খন্ডে ‘শ্রম দিবস’ শিরোনামে অধ্যায়ে মার্কিন মুলুকে কৃষ্ণকায় ও শ্বেতকায়দের বর্ণবিদ্বেষী সংঘাত প্রসঙ্গে মার্ক্স ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়নে আট ঘন্টা কাজের দাবির কথায় বলেন যে বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী ‘মানবাধিকারের প্রথম ফসল আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে লড়াইয়ের সূচনা…’।

In the United States of America, any sort of independent labor movement was paralyzed so long as slavery disfigured a part of the republic. Labor with a white skin cannot emancipate itself where labor with a black skin is branded. But out of the death of slavery a new vigorous life sprang. The first fruit of the Civil War was an agitation for the 8-hour day – a movement which ran with express speed from the Atlantic to the Pacific, from New England to California.

শিকাগোর হে মার্কেটে ১৮৮৬ সালে ১ মে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট ও তার পরে চার নেতা অগাস্ট স্পাইজ, অ্যাডলফম জর্জ এঞ্জেল, লুই লিংগো ও অ্যালবার্ট পার্সন্স এর ফাঁসি (যা আদ্যন্ত আইনী প্রহসন ছাড়া আর কিছু ছিল না) নিয়ে রচিত ইতিহাস এখন আর অজানা নয়, বিশেষত ১৯৩২ সালে আলেকজান্ডার ট্রাক্টেনবার্গের মে দিবসের ইতিহাস পুস্তিকা প্রকাশের পরে। আমেরিকার সকল শিল্পাঞ্চলে ১মে, ১৮৮৬-তে আট ঘন্টা কাজের দাবিতে সফল হয়েছিলো ধর্মঘট, যার কেন্দ্রস্থল ছিল শিকাগো শহর। শামিল হয়েছিলেন তিন লক্ষ শ্রমিক। নেতৃত্বে ছিলেন বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়ন সমূহের সমন্বয়ে গঠিত ‘আট ঘন্টা শ্রম সমিতি’, যাঁদের আবার সামনের সারিতে ছিলেন নৈরাজ্যবাদীরা, কিন্তু প্যারি কমিউনের মত তাঁদের প্রায় কেউই প্রুধোঁ বা বাকুনিনের অনুগামী নন। মার্ক্স ও এঙ্গেলস নৈরাজ্যবাদের প্রতি নেতিবাচক অবস্থান নেন নি, স্বতঃস্ফূর্ততাকেও কখনো ছোট করে দেখেন নি।

অচিরেই মে দিসসের ডাক পুঁজিতন্ত্রের আরেক বড় ঘাঁটি ইংল্যান্ডে ঊর্মিল আঘাত হানে। এঙ্গেলস ১৮৯০ সালে ৪ মে, মে দিবসের তাৎপর্যকে অভিনন্দিত করে লেখেন, ব্রিটেনের শ্রমিক শ্রেনী আন্তর্জাতিক শ্রমিক বাহিনীতে শামিল হয়েছে। ব্রিটিশ প্রলেতারিয়েতের উৎস সর্বোচ্চ শিল্পবিকাশে এবং তাদের আছে রাজনৈতিক আন্দোলনের মহোত্তম স্বাধীনতা। একদিকে ১৮৩৬-৫০-এর চার্টিস্ট আন্দোলন ও অন্যদিকে ১৮৪৮-৫০-এ অতিকায় শিল্প-উল্লম্ফন – দুইয়ের ঘাতে তাদের ঘুম ভেঙেছে। ব্রিটেনে মে দিবস উদযাপনকে এঙ্গেলস ‘যুগান্তকারী’ আখ্যা দেন।

হে মার্কেটের হত্যাকান্ডের পরের ঘটনা ও তারপরে শ্রমিক এলাকাগুলিতে শ্রমিকদের উপর নির্যাতন, নিপীড়ন, মিথ্যা মামলায় শ্রমিক নেতাদের গ্রেপ্তার এবং মিথ্যা মামলায় বিচারের প্রহসন, ২১ জুন বিচার শুরু হবার ঠিক আগ মুহূর্তে সবাইকে অবাক করে দিয়ে আদালতের কাঠগড়ায় হাজির শ্রমিক নেতা পারসনের আত্মপক্ষ সমর্থন – এসব এখন জানা। তিনি দৃপ্ত কন্ঠে বলেছিলেন,

 হে মাননীয় বিচারকআমি এসেছি আমার নিরাপরাধ কমরেডদের সাথে বিচারের সম্মুখীন হতে। কারণ আমার বন্ধুদের শাস্তি হবে আর আমি পালিয়ে থাকবো এটা আমার পক্ষে অসম্ভব।

কিন্তু ফাঁসির আদেশ ও অন্যদের দীর্ঘ কারাবাসের রায় সব আগে থেকে ঠিক ছিল। ঐতিহাসিক ও ট্রাজিক রায় ঘোষণার বিরুদ্ধে আমেরিকার শ্রমিক সংগঠন, হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ, বিশিষ্ট নাগরিক ও বিভিন্ন রাষ্ট্র শ্রমিক নেতাদের মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেও আমেরিকার সুপ্রিম কোর্ট রায় পুনর্বিবেচনা করেনি, এবং ১১ নভেম্বর ১৮৮৭ সালে ফাঁসির রায় দেয়।

তার অনেক পরে বিদ্রোহী কিশোর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লেখেন,

‘লাল আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দিগন্ত থেকে দিগন্তে
কী হবে আর কুকুরের মতো বেঁচে থাকার?’

একেবারে মে দিবসের ভাষা। আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের ‘মে দিনের কবিতা’ তো চির প্রেরণার উৎস।

প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।
চিমনির মুখে শোনো সাইরেন-শঙ্খ,
গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে,
তিল তিল মরণেও জীবন অসংখ্য
জীবনকে চায় ভালবাসতে।
প্রণয়ের যৌতুক দাও প্রতিবন্ধে,
মারণের পণ নখদন্তে;
বন্ধন ঘুচে যাবে জাগবার ছন্দে,
উজ্জ্বল দিন দিক্‌-অন্তে।

তাঁর প্রেরণায় উজ্জীবিত বাংলাদেশের কবি পিয়াস মজিদ লেখেন ‘মে দিনের অনুষঙ্গে সুভাষ‘।

লেনিন
ধর্মতলা
মে দিনের গান
নাজিম হিকমত আর
সালেমনের মা
ফুল ও বসন্ত
সুভাষের বিরুদ্ধে সুভাষ।
আর তারপর
বেলভিউ নার্সিংহোম
এবং শেষশয্যা।
পদাতিকের পা থামে
কাদের
পা চালানোর কথা থেকে যায়।

আচম্বিতে মনে পড়ে শেখ মাফিজুল ইসলামের কবিতা ‘মহান মে দিবস’।

উদয়-অস্ত খাটতেই হবে
নেই কোন বিশ্রাম
অর্থ-লোলুপ পিপাসা ওদের
বেড়ে যায় অবিরাম।
এ-বঞ্চনারশেষ কবে হবে
শ্রমিক পায়না ভেবে
মনের মধ্যে জমে ওঠে ক্ষোভ
প্রতিশোধ তারা নেবে।

আমাদের উপমহাদেশে লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কর্মহীন। আজ কবি-কথাশিল্পী-চিত্রকর ভাস্করদের মৃত্যুঞ্জয়ী পারসনের ভাষায় ঝলসে ওঠার দিন। তাদের সৃজনীতে জ্বলে উঠুক হে মার্কেটের উত্তরাধিকার।

Share this
Leave a Comment