“ভালোবাসার জয়”


  • September 6, 2018
  • (0 Comments)
  • 557 Views

সমলৈঙ্গিক ট্রান্সজেন্ডার দ্বিলৈঙ্গিক ও কুইয়ার সম্পর্কবিরোধী কালাকানুন ৩৭৭ কে “অসাংবিধানিক” রায় দিল সুপ্রীম কোর্ট। দীর্ঘ সময়ব্যাপী গণ আন্দোলনের সামনে পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর এই নতজানু হতে বাধ্য হওয়া বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের জন্য ঐতিহাসিক মুহূর্ত। কিন্তু আইনি লড়াইয়ে জিত হাসিল হলেও সমাজ বদলের, মানসিকতা বদলের কঠিন লড়াই এখনো বাকি। লিখছেন তৃষ্ণিকা ভৌমিক

 

“কাঁদছি। কী বলবো বুঝতে পারছি না। Not a criminal anymore। ভালোবাসাকে ভালোবাসার মত সহজ করে যদি দেখা হয় তাহলে এর থেকে ভাল আর কি হতে পারে। এত টিটকিরি, এত কথা শুনেছি… আশা করছি এরপর পুলিশে ধরিয়ে দেবার ভয় দেখাবে না কেউ বা টিটকিরি দেবার আগে একবার ভাববে”। – তিতির

 

“আজ তো সত্যিই একটা বিশেষ প্রাপ্তির দিন। এই নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক কিছু বলা যায়, অনেক পুরনো কথা, নিজের, বন্ধুদের, আজকের কিছু হাসিকান্না। এটুকুই বলবো, আমার দেশের আইনের চোখে আমি অপরাধী নই, এই ভাবনাটা একটা প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে। খুব বড়ো মাপের। কিন্তু সমানাধিকারের লক্ষ্যে এই রায় কিন্তু একটি ধাপ। একদিকে আজকের এই রায়, আর নালসা, এই দুইকে হাতিয়ার করে আরো অনেকটা লড়াই বাকি। ভবিষ্যৎ কতোটা এই ইতিহাসকে মনে রাখবে জানিনা, কিন্তু এক ইতিহাসকে আজ আমরা এতোটা উপভোগ করলাম, যা বলার নয়। আমার চেয়ে প্রবীণ যারা, তাদের টানাপোড়েন অনেক বেশী, তারা হয়তো আরো বেশী উচ্ছ্বসিত।“ কাঁচালঙ্কা ফেসবুক পেজের পক্ষ থেকে।

 

কলকাতা প্রাইড মার্চ ২০১৬। ছবিঃ নিলাদ্রি চ্যাটার্জি।

ফ্যাসিস্ত শক্তি যখন ক্ষমতায়। সর্বশক্তি দিয়ে সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করতে সচেষ্ট। শুধুমাত্র বিরুদ্ধমত পোষণ করবার জন্য গ্রেপ্তার হতে হয় কবি, অধ্যাপক, সমাজকর্মীদের। হেনস্থাকারী পুলিশ প্রশ্ন হাঁকায়, ব্যক্তিগত যাপনে… তা সে বিবাহিত নারীর পোশাকই হোক কিম্বা পাঠ্য বই; দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবার ঘটনা ক্রমবর্ধমান এবং প্রায় স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে… এরকম এক অস্থির গণতন্ত্রের চরম সঙ্কটতম লগ্নে সুপ্রিম কোর্টের এই রায় নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক। একটু ভুল হয়ে গেল। দীর্ঘ সময়ব্যাপী চলতে থাকা গণ আন্দোলনের সামনে পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র কাঠামোর এই নতজানু হতে বাধ্য হওয়া বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের জন্য অবশ্যই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

কলকাতা প্রাইড মার্চ ২০১৬। ছবিঃ নিলাদ্রি চ্যাটার্জি।

সালটা ১৮৬১। ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শক্তির অধীন। ভারতীয় দণ্ডবিধি থেকে সদ্য অবলুপ্ত ৩৭৭ ধারা লাগু হয়েছিল সেই বছরই। সেই সময় দাঁড়িয়ে হিসাব করলে ৩০০ বছর পুরনো এক ব্রিটিশ আইনের অনুকরণে। কারণ একটাই। ভীত সন্ত্রস্ত পিতৃতান্ত্রিক শোষণ কাঠামো এবং তাকে ভিত্তি করে তৈরি বাকি শোষণ যন্ত্রগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে ভালবাসাকে দাবিয়ে রাখতে হবে। প্রেম বলতে বৈধতা পাবে শুধু বিপরীত লিঙ্গ পরিচয়ের মধ্যেকার সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্ক স্থাপনের একমাত্র উদ্দ্যেশ্য সন্তান উৎপাদন। তাই ভালোবাসাকে নিষিদ্ধ হতে হয়। ব্রিটিশরা ভারত ছেড়ে গেলেও ৩৭৭ ধারার কালা কানুন থেকে যায়। কিন্তু যারা ভালবাসতে জানে তারা কবে কোথায় এসব বিধি নিষেধের তোয়াক্কা করেছে। উলটোদিকে লড়াইটা দেরীতে হলেও শুরু হয়। নাজ ফাউন্ডেশনের দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০০৯ সালে প্রথমবার দিল্লী হাইকোর্ট ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত দিল্লি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে রায় দান করে এবং সম্পূর্ণ বিষয়টি আদালতের নয়, সংসদের আলোচ্য বিষয় বলে ঘোষণা করে। নাজ ফাউন্ডেশন থেকে শুরু করে ভারতবর্ষের গণতন্ত্রপ্রেমী লিঙ্গ পরিচয়ভেদে শুধুমাত্র ভালবাসায় বিশ্বাস করে এমন সমস্ত মানুষ, বিভিন্ন লিঙ্গ বৈষম্যবিরোধী, সমাজকর্মী সংগঠন – হাল ছাড়তে রাজি ছিল না কেউই।.২০১৬ সালে এই রায়ের বিরুদ্ধে পিটিশন সই করেন বিখ্যাত নৃত্যশিল্পী নভতেজ সিং জোহার, সাংবাদিক সুনীল মেহরা, শেফ রিতু ডালমিয়া, শিল্পরসিক ও ইতিহাসবিদ আমন নাথ এবং আয়েশা কাপুর। লড়াই জারি থাকে। রাজপথে এবং আদালতে। আজকের আগেও বহুবার আদালত এই মামলার শুনানির তারিখ দিয়েছে এবং শেষমেশ হতাশ করেছে। কিন্তু তাই বলে হার স্বীকার করতে রাজি হয়নি সংগ্রামের সাথীরা। প্রত্যেকবার নতুন উদ্যমে লড়াই শুরু করেছেন। আর সেই অদম্য জেদের কাছেই আজ হার মেনেছে পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্র। ভালোবাসা জিতে গেছে। সমকামিতা আর শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়।

ছবিঃ বিজনেস ইনসাইডার।

তবে লড়াই কিন্তু এখানেই শেষ হয়ে যায়নি। এটা সাফল্যের প্রথম ধাপ। ভারতবর্ষের মত একটা দেশ যেখানে গার্হস্থ্য হিংসা থেকে ধর্ষণ… জঘন্য থেকে জঘন্যতম অপরাধ দমনের জন্য হাজার একটা আইন থাকা সত্ত্বেও আইন-আদালতকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে প্রতিনিয়ত অপরাধ সংগঠিত হয়ে চলেছে। লিঙ্গবৈষম্য ভিত্তিক হিংসার পরিসংখ্যান দেখলে এমনি শিউরে উঠতে হয়, বিষমকামিতা সমাজে গ্রহণযোগ্য হওয়া সত্তেও যে দেশে নির্বিচারে সম্মান রক্ষার্থে খুন হতে হয় প্রেমিক-প্রেমিকাদের…সেখানে ৩৭৭ এর মত একটা পৈশাচিক ধারার অবলুপ্তি সমকামি মানুষদের স্বস্তির জীবন দেবে, এটা কল্পনা করা বিলাসিতা মাত্র। আইনি লড়াইয়ে জিত হাসিল হলেও সমাজ বদলের তথা ভারতবাসীর মানসিকতা বদলের কঠিন লড়াইটা এখনো গোটাটাই বাকি রয়ে গেছে। প্রচলিত পিতৃতান্ত্রিক ধারণা যা আজও সমাজের এক বিশাল অংশের মানুষকে পছন্দের জীবনসঙ্গী, জীবনযাপন নির্বাচনের অধিকার থেকে অসাংবিধানিকভাবে বঞ্চিত করে চলেছে তা বদলাতে হলে সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত জরুরি। এতদিন পর্যন্ত যেসমস্ত মানুষদেরকে শুধুমাত্র ভালোবাসার জন্য লাঞ্ছিত, অত্যাচারিত হতে হয়েছে, প্রাণ দিতে বাধ্য হয়েছে যারা একটু মুক্ত হয়ে বেঁচে থাকবার অভাবে – তাদের যন্ত্রণাময় রক্তাক্ত ইতিহাসের দিব্যি রইল আগামীর প্রেমিক-প্রেমিকাদেরকে যেন নতুন দিন এনে দিতে পারি আমরা, আমাদের লড়াই। “যে শিশু ভূমিষ্ঠ হল আজ রাত্রে” সে যেন মানুষ হয়ে উঠতে পারে এমন এক পৃথিবীতে যেখানে ভালোবাসাই শেষ কথা বলে, ভালোবাসতে কোনো বাধা নেই, নেই কোন কঠিন নিয়মনীতির বেড়াজাল।

 

কলকাতার রানু ছায়া মঞ্চে বিজয়োল্লাস। ছবিঃ নীরব রায়।

 

পুনশ্চঃ যারা ভালোবাসার এই জয়ে মোটেই খুশি হতে পারলেন না, তাদের জন্য নীচের লাইনটা রইল-
“…ভালো ভালোবাসার তোমরা জানো কি! ভালোবাসতে না জানলে জীবনের ষোলো আনাই ফাঁকি…”

ছবিঃ নিউজএক্স।

লেখক লিঙ্গবৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী।

Share this
Leave a Comment