প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের মূল অন্তরায় অসচেতনতা, জানালেন এনপিআরডি-র সাধারণ সম্পাদক


  • August 18, 2018
  • (0 Comments)
  • 710 Views

স্বাধীনতার ৭২তম বছর। প্রতি বছর এই বিশেষ দিনটিতে নির্দিষ্ট কিছু ধরনের ছবি ও রিপোর্ট মূলস্রোতের গণমাধ্যমে আসবেই, দেশপ্রেমের আবেগ উসকে দিতে। তবে এই একটি দিন হোক বা বাকি ৩৬৪ দিন কোনও টিআরপি বাড়ানো খবর বা ‘সাফল্যের গল্প’ ছাড়া যা সাধারণত সংবাদের আলোকবর্তিকার বাইরেই রয়ে যায় তা হল ‘প্রতিবন্ধকতা’। এই প্রসঙ্গে ন্যাশনাল প্ল্যাটফর্ম ফর রাইটস্‌ অফ ডিসএবেলড – প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের এই জাতীয় মঞ্চের সাধারণ সম্পাদক মুরলিধরন বিশ্বনাথ কথা বললেন সুদর্শনা চক্রবর্তী-র সঙ্গে।

প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলন, প্রতিবন্ধীদের জন্য পাশ হওয়া আইন, তাদের দাবি – কোনও কিছুই আমাদের আলোচনায় উঠে আসে না। রাইটস অফ পার্সনস উইথ ডিসএবিলিটিস অ্যাক্ট, ২০১৬ পাশ হয়েছে দেড় বছরেরও বেশি হয়ে গেল। তবে তা শুধু পাশ হয়েই রয়েছে, আমাদের স্বাধীন, প্রগতিশীল গণতন্ত্রে এখনও যেখানে কোনওক্রমে একটা র‍্যাম্প করে দেওয়াকেই প্রতিবন্ধীদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে কিছু করে দেওয়া বোঝায়, সেখানে এই আইনটি বিষয়ে সচেতনতা প্রায় নেই। বিশেষত কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলির উদাসীনতা চোখে পড়ার মতো। অথচ এ দেশেই প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ কয়েক দশকের পুরনো, যা আজও চলছে। দিব্যাঙ্গ, পঙ্গু, বিশেষ ক্ষমতাসম্পন্ন – কোনও শব্দেরই প্রয়োজন পড়ে না, যদি প্রতিবন্ধকতাকে স্বীকৃতি দিয়ে ‘প্রতিবন্ধী’ মানুষদের অধিকারকে গণতান্ত্রিক অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

প্র: রাইটস অফ পার্সনস উইথ ডিসএবিলিটিস অ্যাক্ট, ২০১৬ (আরপিডি) – প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য এই আইনটি আমাদের দেশে রয়েছে গত দেড় বছরের উপর। আপনি বাস্তবচিত্রটি কী দেখতে পাচ্ছেন?

উ: দেশের সরকার এক ধরনের বাধ্যতামূলক পরিস্থিতিতে এই আইনটি পাশ করেছে, না করে তাদের আর উপায় ছিল না। প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য আমাদের অধিকার আন্দোলন দীর্ঘ কয়েক দশকের। রাষ্ট্রপুঞ্জে ভারত যে চুক্তি সাক্ষর করেছে তা অনুসারে তাকে কনভেনশন অনুযায়ী দ্রুত আইন সংঘটিত করতে হবে। তাছাড়া আমাদের মতো আরও অসংখ্য সংগঠন যারা প্রতিবন্ধী মানুষদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে, তাদের চাপেও সরকার এই আইন পাশ করতে বাধ্য হয়েছে। এবারে এই আইন বাস্তবে প্রণয়ন ও প্রয়োগ করার জন্য সরকারের যে আন্তরিকতা থাকা দরকার, তার এখনও অভাব রয়েছে, যা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আর এক্ষেত্রে কিন্তু শুধু কেন্দ্রীয় সরকার নয়, রাজ্য সরকারগুলিরও দায়িত্ব রয়েছে। প্রতিবন্ধকতা বা ডিসএবিলিটি আসলে রাজ্য সরকারের বিষয় এবং এক্ষেত্রে নিয়ম হল সংসদে আইনটি পাশ হওয়ার ছ’মাসের মধ্যে রাজ্য সরকারকে এই আইন সংক্রান্ত রুল (নীতিনির্দেশ) পাশ করতে হবে। আইনেও এ কথা বলা আছে। আইন পাশ হয়ে যাওয়ার এতগুলি মাস পরে মাত্রই কয়েকটি রাজ্য এই আইনসংক্রান্ত নির্দেশগুলির খসড়া করে বিজ্ঞাপিত করেছে। অধিকাংশ খসড়া নির্দেশিকাও তৈরি করে উঠতে পারেনি। তাছাড়া এই আইনে বেশ কিছু সামাজিক পরিকল্পনা, প্রকল্পের কথাও বলা রয়েছে প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য। কেরালা-ই একমাত্র এধরনের কিছু প্রকল্প চালু করেছে, তাছাড়া আর কোনও রাজ্য এই বিষয়টিও অনুসরণ করেনি। এই আইনে কেয়ার-গিভারদের বিষয়ে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে। কেরালাতে এই আইন আসার আগেই কেয়ার-গিভারদের জন্য নির্দিষ্ট প্রকল্প ছিল। তারা ছাড়া আর প্রায় কোনও রাজ্যেই কেয়ার-গিভারদের নিয়ে কোনও কথা হচ্ছে না। অ্যাকসেসেবিলিটি বা অভিগম্যতা বা সহজ ব্যবহারযোগ্যতা – প্রতিবন্ধীদের এই বিষয়টি নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে কোনও কাজ হচ্ছে না। দিল্লিতে এই আইনটি পাশ হওয়ার পরেও দিল্লি সরকার যে টেন্ডার দিয়েছে বাস কেনার ক্ষেত্রে তা সাধারণ উচ্চতার বাস, নিচু উচ্চতার নয়, যা প্রতিবন্ধীদের ব্যবহারযোগ্য। ফলে দিল্লি হাইকোর্টে একটি কেস চলছে, যেখানে সরকারকে বলা হচ্ছে নিচু উচ্চতার বাস কেনার জন্য। সুতরাং এখনও আন্দোলন করে বা নানাভাবে চাপ তৈরি করে এই কাজগুলি করতে হচ্ছে, সরকার নিজেদের উদ্যোগে করছে না। প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে যে ২৫% বর্ধিত বন্টন যা এই আইনে পাশ হয়েছে, তা আদায় করার জন্য তামিলনাড়ুতে আন্দোলন করতে হয়েছে, তারপরেই সরকার তা দিয়েছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও প্রতিবন্ধী মানুষদের ৩%-৪% অর্ন্তভুক্তি বেড়েছে। কিন্তু প্রতিবন্ধকতার নতুন যে ক্ষেত্রগুলি অর্ন্তগত হয়েছে তারা কি এই সুবিধাগুলি পাচ্ছেন? তা বাস্তবে হচ্ছে না। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার হোক বা কেন্দ্রীয় সরকার তারা প্রতিবন্ধকতার নতুন ক্ষেত্রগুলিকে অর্ন্তভুক্ত করছে না, বিজ্ঞাপনেও দিচ্ছে না। যতক্ষণ না বিজ্ঞাপনে আসছে সংরক্ষণের বিষয়টিও স্পষ্ট হচ্ছে না। যতক্ষণ না পদগুলি চিহ্নিত হচ্ছে ততক্ষণ কোনগুলি প্রতিবন্ধীদের কোন্‌ ক্ষেত্রের জন্য সংরক্ষিত হবে বোঝা যাচ্ছে না, তা তো অন্য ক্ষেত্রদের দিয়ে দেওয়া যায় না। সরকারি নানা ক্ষেত্রেও এই বিষয়গুলি স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। কারণ আরপিডি অ্যাক্ট অনুযায়ী এই নিয়মগুলি অনুসরণ করা প্রয়োজন। সুতরাং, প্রয়োগ, আইনটি বোঝা ইত্যাদি বিবিধ ক্ষেত্রেই স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতা প্রয়োজন।

প্র: আরপিডি অ্যাক্ট, ২০১৬ পাশ হওয়ার পরেও সাধারণ মানুষ এখনও এই আইন সম্পর্কে যথেষ্ঠ কম জানেন। সচেতনতার প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে কোথায় ঘাটতি রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?

উ: আমি বলব, শুধু সাধারণ মানুষেরা নন, প্রতিবন্ধী মানুষেরাও এই আইনটি সম্পর্কে যথেষ্ঠ সচেতন নন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক প্রতিবন্ধী মানুষই এখনও এই আইনটি বিষয়ে যথেষ্ট জানেন না। তবে অনেকেই জানেন যে সংরক্ষণ ৩% থেকে ৪% বেড়েছে। কিন্তু কোথা থেকে এটা হচ্ছে তা তারা জানেন না। শিক্ষাক্ষেত্রেও কিছু নতুন সংযোজন সম্পর্কে তারা জানছেন। এরকম একটি, দু’টি বিষয় হয়তো তারা জেনেছেন, কিন্তু তা যে এই আইন থেকেই হচ্ছে সে বিষয়ে অনেকেরই কোনও ধারণা নেই। প্রতিবন্ধী মানুষেরাই যেখানে জানেন না, অন্যরা জানবেন এমনটা তো ভাবাই ভুল। এই আইনে কিন্তু সচেতনতা তৈরির কথাও বলা আছে। শুধু সাধারণ মানুষের সচেতনতা নয় আমলা, পুলিশ আধিকারিক, বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, পঞ্চায়েত সদস্য, পঞ্চায়েত থেকে সংসদ – নির্বাচিত সমস্ত রাজনৈতিক প্রতিনিধি সকলের সচেতনতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কোনও স্তরেই সাধারণ মানুষ, প্রয়োগকারী সংস্থা কাউকেই সচেতন করার যে আন্তরিক প্রয়াস থাকা প্রয়োজন তা দেখা যাচ্ছে না।

প্র: এই উদ্যোগ তো সরকারের থেকেই আসা উচিত ছিল। কিন্তু যেহেতু তা হচ্ছে না, তাহলে বিভিন্ন সংগঠন, এনপিআরডি-র মতো সংগঠন, প্রেশার গ্রুপ, আঞ্চলিক স্তরে প্রতিবন্ধী অধিকার আন্দোলন নিয়ে কাজ করা সংগঠন তাদের এক্ষেত্রে সচেতনতা বাড়াতে কী করণীয় এখন?

উ: বিভিন্ন ধরনের সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদির আয়োজন করে আমরা কিছুটা সচেতনতা প্রসারের কাজ করছি এবং সেখানে চেষ্টা করছি প্রতিবন্ধী ও অ-প্রতিবন্ধী মানুষ ও বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষেরা যাতে অংশগ্রহণ করেন। বহু সংগঠন রয়েছে যারা নিজেদের মতো করে কাজগুলি করছে। আমরা চাই যাতে আমাদের আইনটি প্রয়োগ, কোনও মন্তব্য সংযোজন ইত্যাদিতে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হোক। কিন্তু সরকার করলে যতটা বিস্তৃত ভাবে করতে পারে, আমাদের প্রচেষ্টাগুলি তো তুলনায় ছোট, অতটা পরিসর জুড়ে হচ্ছে না।

প্র: সাধারণত এমনিই দেখা যায় যে যখন কোনও প্রকল্প ঘোষণা করা হয়, তা তৃণমূল স্তরে পৌঁছতে এত হাতবদল হয় যে মানুষ অনেক সময়েই তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। ধরা যাক পঞ্চায়েত স্তরের কথাই। প্রতিবন্ধকতার ক্ষেত্রে তো এই সমস্যা আরও বেশি। সেক্ষেত্রে গ্রাম, আধা-শহর এলাকায় এই আইন বিষয়ে সচেতনা ছড়াবে কীভাবে?

উ: এ কথা ঠিক যে যখনই প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে কথা হয় তখন অধিকাংশটাই হয় বড় ও ছোট শহরকে কেন্দ্র করে। যখন আমরা এই আইনটিকে আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ করে বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার কথা ভাবছি, তখনও আমাদের মাথায় রাখতে হবে যে তা যেন গ্রাম, শহর, মফস্বল সব জায়গার মানুষ বুঝতে পারেন, তার প্রেক্ষিতটা বুঝতে পারেন। ফলে তা সহজভাবে প্রচার করতে হবে। জেলাস্তরে যে আধিকারিকেরা দায়িত্বপ্রাপ্ত এ বিষয়ে তাদের বিশেষ দায় রয়ে যায়।

প্র: মূলস্রোতের গণমাধ্যমেও সাধারণভাবে প্রতিবন্ধকতার বিষয় নিয়ে তেমনভাবে আলোকপাত করা হয় না। আরপিডি বা সেই সংক্রান্ত নানা কেসও তার ব্যতিক্রম নয়। এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?

উ: মূলস্রোতের গণমাধ্যমে কোনও সময়েই আইন সংক্রান্ত আলোচনা গভীরে গিয়ে হয় না। সেটা শুধু আরপিডি বিষয়ে নয়, যেকোনও আইন সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনাতেই তাদের অনীহা আছে। যখন কোনও আইন পাশ হওয়ার জন্য সংসদে যায় তখন তার কিছু গুরুত্বহীন দিক নিয়ে হয়তো কিছুটা আলোচনা করে, তারপর সব চুপচাপ, কেউ আর এগুলি নিয়ে কথাই বলে না। গণমাধ্যম, মিডিয়া তখনই আকৃষ্ট হয় যখন কোনও নির্দিষ্ট কেস উঠে আসে। তবে আমি একটা কথা বলব, আগের তুলনায় এখন মিডিয়াতে প্রতিবন্ধকতা বিষয়ে বা সেরকম কেস নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। কারণ এরকম কভারেজ তাদের কিছুটা মাইলেজ দেয়। যেসব কেস সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্ট-এ উঠছে মিডিয়া সেগুলোকে হাইলাইট করে এখন। সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তা নয়।

সূত্র – ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

প্র: কিন্তু সেগুলো সবই নির্দিষ্ট কেস বা ঘটনা। আরপিডি নিয়ে কোনও বিস্তৃত আলোচনা মিডিয়াতে হচ্ছে না, তারা একে ফোকাস-ও করছে না।

উ: কারণ তারা বিষয়টি নিয়ে আদৌ পুরোপুরি অবগতই নয়, সচেতনও নয়। যতক্ষণ না তারা নিজেরা সচেতন হচ্ছেন কীভাবে লিখবেন বা কভার করবেন! কিছু কিছু মিডিয়া এক সময় বিষয়টি নিয়ে কয়েকটি লেখা লিখেছে, কভার করেছে। তারপর এক সময়ে তা বন্ধ করে দিয়েছে। কারণ এটি তাদের কাছে টপিকাল ইন্টারেস্ট নয়।

প্র: আগামী দিনে ধরা যাক দু’বছরের জন্য এনপিআরডি-র পরিকল্পনা কী আরপিডি নিয়ে?

উ: আমাদের প্রথম পরিকল্পনা হল, যখন আইনটা আছে তখন নির্দেশগুলি যাতে তৈরি করা হয় তাতে জোর দেওয়া। আইন পাশ হওয়ার ছ’মাসের মধ্যে এটি হওয়ার থাকলেও অধিকাংশ রাজ্যে তা হয়নি। আমরা চাই যত দ্রুত সম্ভব এটি হোক। আর তা যেন শুধু লোক দেখানোর মতো না হয়। নির্দেশিকা তৈরি হলে তাতে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা ইত্যাদির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি জায়গা করে নিক। আমরা বেশ কিছু কর্মশালার আয়োজন করেছি, যাতে কীভাবে নির্দেশিকা তৈরি করা যায় ও কোন্‌ বিষয়গুলিকে এর অর্ন্তভুক্ত করা যায়। অনেক ক্ষেত্রের মানুষ অংশ নিয়েছেন। কিন্তু আমরা যখন কেন্দ্রের কাছে আমাদের পরামর্শগুলি পাঠিয়েছি একটি দু’টি বাদে তা গৃহীত হয়নি। আমরা যেসব রাজ্যে আমাদের শাখা রয়েছে সেখানে রাজ্য সরকারের কাছেও আমাদের বক্তব্য পাঠিয়েছে। রাজ্য সরকার পুরনো নির্দেশিকা বদল করতে পারে বা নতুন খসড়া নির্দেশিকাও তৈরি করতে পারে। আমরা কীভাবে সংশোধন করা যায় সে বিষয়েও জানিয়েছি। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। কাজেই প্রথম লড়াইটা হল খসড়া নির্দেশিকা তৈরির। কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা এই বিষয়গুলি কীভাবে প্রয়োগ করা যায় আগামী দু’বছর আমরা সেই বিষয়েই কাজ করব।

প্র: ন্যাশনাল স্যাম্পেল সার্ভে অফিস চলতি বছরে তাদের সমীক্ষার বিষয় হিসাবে প্রতিবন্ধকতাকে বেছে নিয়েছে। যদিও আরপিডিতে নতুন যে ক্ষেত্রগুলি অর্ন্তভুক্ত হয়েছে তার অধিকাংশই এতে জায়গা পায়নি। এ বিষয়ে আপনি কী বলবেন?

উ: এই বিষয়টি সম্পর্কে আমি পুরোটা জানি না। যতটুকু বুঝতে পেরেছি যে এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে তারা এই বিষয়টি সম্পর্কে সঠিক জানেন না। অ্যাসিড অ্যাটাক তাদের সমীক্ষায় জায়গা পেয়েছে। মানে কী এটাই যে তারা শুধু এটুকুই জানেন। বাকি যে নতুন ক্ষেত্রগুলি অর্ন্তভুক্ত হল, তারা জানেনই না। কেন্দ্রীয় সরকারের দফতরের থেকে এই মনোভাব আশা করা যায় না। সুতরাং সরকারকে প্রথমেই উদ্যোগ নিতে হবে তার নিজের দফতরগুলি যেন এ বিষয়ে সম্যক ধারণা পায়, সচেতন হয়।

প্র: বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার দাবি করে আরপিডি অ্যাক্ট, ২০১৬ তাদের জন্যই পাশ হয়েছে। একদিকে প্রতিবন্ধীদের দিব্যাঙ্গ বলা, অন্যদিকে তাদের ব্যবহার্য সামগ্রীর উপরে জিএসটি বসানো – একাধারে সবই হয়েছে। সামনে ২০১৯-এর নির্বাচন। প্রতিবন্ধী আন্দোলনের গতিবিধি দেখে আপনার কী মনে হয় আগামী নির্বাচনে কী প্রভাব পড়বে?

উ: বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার আসলে কোনও কাজ করছে না। মিথ্যে প্রতিশ্রুতি ও নানা অলঙ্কারময় কথাবার্তা তারা যতটা বলছে, বাস্তবে তার কোনও প্রয়োগই দেখা যাচ্ছে না। আমি মনে করাতে চাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ২০১৪-এর নির্বাচনী প্রচারের সময়ে বারাণসী ও চেন্নাইয়ের দু’টি প্রচারসভায় কানা, খোঁড়া, বোবা ইত্যাদি নানা অপমানজনক ভাষা প্রয়োগ করেছিলেন। চেন্নাইতে যিনি তার কথা অনুবাদ করছিলেন তিনি নিজে প্রতিবন্ধী ছিলেন, তিনি ভয়ানক অস্বস্তিতে পড়েছিলেন। সেই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর হঠাৎ মন কি বাত-এ প্রতিবন্ধীদের দিব্যাঙ্গ বলতে শুরু করলেন, তার মানে যাই হোক না কেন। এটা তাদের যে ধর্মীয় ভাবনা তার থেকেই এসেছে। এই সরকার ভালো কাজ করেছে চাপের মুখে আইনটি পাশ করে। কিন্তু এই আইনের খসড়া  তাদের সময়ে তৈরি নয়, এটাও মনে রাখতে হবে। অনেকগুলি প্রয়োজনীয় বিষয়কে কিন্তু তারা বাদ দিয়েছেন বা গুলিয়ে দিয়েছেন। সবচেয়ে যেটা চোখে পড়ছে তা হল, তাদের মধ্যে প্রতিবন্ধী মানুষদের প্রতি এক ধরনের দয়ার মানসিকতা বা চ্যারিটি অ্যাপ্রোচ রয়েছে যা কখনওই গ্রহণযোগ্য নয়। তারা যে অ্যাকসেসেবল ইন্ডিয়া ক্যাম্পেইন করছে সেটিও খুবই বড় শহর ও ছোট শহরকেন্দ্রিক, সেখানে গ্রামীণ ভারতের কোনও উল্লেখ নেই। যে বিষয়গুলি দেখা হবে বলে দাবি করছে, বাস্তবে আদৌ কি সেগুলি কার্যকর হচ্ছে? আইনটি পাশ হয়েছে ২০১৬-তে, এখন ২০১৮, কতগুলি অফিস অ্যাকসেসেবল হয়েছে? শুধু এসকালেটর বা র‍্যাম্প বানিয়ে দেওয়াই অ্যাকসেসেবল করে তোলা নয়। সব শ্রেণির প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্যও নয়। আমি বলছি না সবটাই অসফল, অন্তত কিছুটা সচেতনতার মধ্যে ঢুকেছে। তাছাড়া মনে রাখতে হবে এই আইনে উল্লেখিত বিষয়গুলি তখনই সফলভাবে প্রয়োগ হবে যখন বাজেটে তা সঠিকভাবে উল্লেখিত হচ্ছে। এখনও পর্যন্ত সেরকম কিছু দেখা যায়নি। মেন্টাল হেলথ্‌ কেয়ার অ্যাক্ট-এও দেখা যাবে আমাদের দেশে সাইক্রিয়াটিস্ট-এর সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত কম।সে বিষয়ে সরকার কী ভাবছে? বেশি সংখ্যায় প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে কি প্রশিক্ষণের জন্য? জেলাস্তরে মেন্টাল হেলথ কেয়ার সেন্টারগুলির অবস্থাও খুব খারাপ। এইসবের জন্য বাজেটে কি উল্লেখ থাকছে? জিএসটি তো ছিলই। দৃষ্টিহীনদের জন্য বিনামূল্যে লেখনী সহায়কের কথা বলা হয়েছে, সেটা কি আদৌ সম্ভব হচ্ছে? কী করে হবে যদি বাজেটে তা না থাকে! নিশ্চয়ই আগামী নির্বাচনে আমাদের তরফ থেকে এই বিষয়গুলি আমরা তুলে ধরব। তবে ঠিক সেই সময়ে কীভাবে এই সব ক’টি বিষয়কে এক সূত্রে গেঁথে উপস্থাপিত করা যায় সেটাও আমরা দেখব।

Share this
Leave a Comment