মুক্তচিন্তার নয়া পরিসর তৈরি হচ্ছে শহরে


  • July 6, 2018
  • (0 Comments)
  • 573 Views

কলকাতায় একটি অনেক বছরের পুরনো নিমগাছকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে প্রতিবাদের এক নতুন আখ্যান। লিখলেন সুদর্শনা চক্রবর্তী

একটা প্রতিবাদ আসলে অনেক প্রতিবাদের জমি তৈরি করে দেয়। একটা প্রতিরোধ একটু করে প্রতিরোধের প্রাচীর তৈরি করতে থাকে, যেখানে একটা সময়ে এসে ক্ষমতার চোখ রাঙানি থমকে যেতে, চোখ নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়। হিংসা, সন্ত্রাস, ক্ষমতার আস্ফালনের সামনে সব সময়ে শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের প্রয়োজন পড়ে না। নিছক যুক্তিপূর্ণ কথা বলা, শিল্পের ভাষায় যুক্তি, বুদ্ধি, মানবতার কথা বলা একজন মানুষের থেকে পৌঁছে যায় বহু মানুষের কাছে। জনমত গড়ে তোলে। একেকটা সময় আসে যখন প্রতিরোধের ভাষা, প্রতিবাদের ভাষা এভাবেই নির্ধারিত হয়ে যায়।

কলকাতায় এভাবেই একটি অনেক বছরের পুরনো নিমগাছকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে এক নতুন আখ্যান। সাক্ষী থাকছে এই শহর আর আশেপাশের, দূরের মফস্বল, গ্রাম থেকে আসা মানুষেরা, পথচলতি মানুষেরা আর ঐ নিমগাছখানি। আকাডেমী অফ ফাইন আর্টস – নাটক, শিল্পচর্চার অন্যতম মূল কেন্দ্র। সেখানেই মাত্র কিছুদিন আগে হঠাৎই পাথর পুজো ও মানুষের ধর্মবিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কিছু সুযোগসন্ধানীর আসা ও কিছু শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সমমনস্ক মানুষের একসাথে হয়ে তা রুখে দেওয়া।

বিষয়টা হয়তো এখানেই থেমে থাকত পারত। কিন্তু তা হলে যে আবার ধর্ম, অন্ধবিশ্বাস, ক্ষমতার দাপাদাপির ফিরে আসা দেখতে হতে পারে। সেইজন্যই যে নিমগাছের নীচে পাথর পুজোর শুরু সেখানেই জুলাইয়ের পয়লা শুক্রবার থেকে শুরু হল এক অন্য রকম প্রতিবাদ, কথাবার্তা, আলোচনা। সকলের একসঙ্গে আসা আবারও ঘটে যাওয়া এক নৃশংস ধর্ষণের ঘটনার বিরূদ্ধে। মন্দাসৌরের শিশুকন্যাটি যে যন্ত্রণা ও অপমান পেয়েছে তার বিরূদ্ধেই একসঙ্গে দাঁড়ানো। আসিফার মৃত্যু আমাদের নাড়িয়ে দিয়েছিল। সেই সময়ে ধর্ষকদের সমর্থনে ধর্মের ধ্বজাধারীদের আস্ফালন দেখেছি, দেখেছি কীভাবে দেশের প্রতিটি প্রান্তরে গর্জে উঠেছে মানুষের কন্ঠস্বর। আশ্চর্যজনকভাবে মান্দাসৌরের শিশুকন্যার সঙ্গে জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পরেও তা নিয়ে ধর্মের পরিচয়কে সামনে রেখে রাজনীতির ঘৃণ্য খেলা শুরু হয়েছিল ধর্ষকের ধর্মীয় পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে।

ঠিক এই জায়গা থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কিছু মানুষের একসঙ্গে এগিয়ে আসা ও ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরূদ্ধে আবারও দাঁড়ানোর কথা চিন্তা করা পোস্টার, ব্যানার, ছবি, কবিতা, নাটক দিয়ে। এই প্রতিরোধ বৃহত্তর হয়ে ওঠে যখন এরসঙ্গে জুড়ে যায় চাপিয়ে দিতে চাওয়া ধর্মের রাজনীতি, ক্ষমতার বাড়াবাড়ি। শিল্পচর্চার, চিন্তা-ভাবনার একটি মুক্ত পরিসরকে গ্রাস করে নিতে চাওয়ার চেষ্টা। সেইজন্যই মান্দাসৌরের শিশুকন্যার জন্য ন্যায়ের দাবীতে ধর্ষণের বিরূদ্ধে যখন পোস্টার লেখা হয় তখন সেখানে লেখা হয় – ধর্ষণ কোনও যৌনাচার নয় দুর্বলের উপর সবলের পাপাচার। লেখা হয় – মানুষ বড় কাঁদছে তুমি মানুষের হাত ধরো। তার সাথেই যে মিলে যেতে পারে – মান্দাসৌরের ছোট্ট মেয়ে আমার দিকে রয়েছে চেয়ে। যখন কলকাতার কাছাকাছি অথচ ভিন্ন জেলার মানুষও আসেন তাদের অঞ্চলে হওয়া বর্বরতম ধর্ষণের বিচারের দাবী চেয়ে, যেখানে প্রশাসন, ক্ষমতা অপরাধীদের আড়াল করছে, তখন সব অপরাধীদের জন্যই একই শাস্তির দাবী জোরদার হয়, লেখা হয় – গ্রাম শহর দিচ্ছে ডাক ধর্ষকরা নিপাত যাক। রাস্তা জোড়া ছবিতে উঠে আসে – মানুষ প্রকৃতি।

যখন ধর্ষণের বিরোধীতা করার মধ্যে দিয়েই উঠে আসে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, ধর্মীয় সন্ত্রাস, ক্ষমতার সন্ত্রাস, লিঙ্গ বৈষম্য, পরিবার-সমাজে ছোট থেকে ক্রমশ বড় হতে থাকা বৈষম্য ও হেনস্থার কথা, যখন ধীরে ধীরে জমায়েত হওয়া মানুষেরা নিজেদের ভাবনা, গান, কবিতা, পথনাটক ভাগ করে নিতে থাকেন স্বতঃস্ফূর্তভাবে তখন বোঝা যায় রাজনৈতিকভাবে কোনঠাসা করে দেওয়ার চেষ্টা অতীত থেকে বর্তমান সব সময়েই চালু থাকলেও রাজনৈতিক অথচ কোনও নির্দিষ্ট রংবিহীন পরিসরেই মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রতিবাদী হয়ে ওঠার ক্ষমতা ধরে।

নিমগাছের নীচে এই জমায়েত, আবর্জনার ভ্যাট নিজেরা ঠেলে সরিয়ে তার সামনেই কথা বলা, পারফরম্যান্স-এর জায়গা তৈরি করে নেওয়া – কোনওটাই প্রতীকি নয়। এ এক নতুন পরিসর, মত বিনিময়ের স্বাধীন পরিসর খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা। আসলে এমন একটা জায়গা তৈরি করা যেখানে শিল্পীরা তাদের শিল্প উপস্থাপন করতে পারেন, নতুন-পুরনো মানুষেরা মত বিনিময় করতে পারেন আর যে কোনও ধরনের রাজনৈতিক, ধর্মীয়, প্রাতিষ্ঠানিক, বাণিজ্যিক আগ্রাসনকে একযোগে দূরে সরিয়ে রাখা যায়, যেখানে কোনও রকম হায়ারার্কি না রেখে কথা বলার সহজ স্বাভাবিকতা বজায় থাকে।

এই শহরে এমন এক নতুন কথা বলার জায়গা তৈরি হল। নিয়মিত দেখা-সাক্ষাতে তা শিল্প ও বুদ্ধিবৃত্তি চর্চার এক সমসাময়িক গল্প তৈরি করবে আশা করা যায়।

ছবি – শ্রাবন্তী ভট্টাচার্য, মানসী সরকার

লেখক স্বাধীন সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা। 
Share this
Leave a Comment