মাহাত, কুজুররা ‘যোগ্য’ নয়, আদিবাসী ও দলিত দপ্তর তাই বাঁড়ুজ্যে, ভচ্চাজদের হাতে


  • June 27, 2018
  • (0 Comments)
  • 6442 Views

দেবাশিস আইচ

পশ্চিমবঙ্গে জাতপাত নেই। জাত নিয়ে দাঙ্গা নেই, জাতের রাজনীতি নেই। এ রাজ্যে এ বিষয়ে গর্ব করার মানুষেরও অভাব নেই। তাদের এই গর্বের মুকুটে আরও একটি পালক ইতিমধ্যেই যুক্ত হয়েছে। অথচ দেখুন নতুন পালক নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্চ নেই কোথাও, আলাপ-আলোচনাও দেখি না। যেন এমনটা-ই তো স্বাভাবিক ছিল। হেয়াঁলি মনে হচ্ছে। হেঁয়ালি তো বটেই। তা একটু ভেঙেই বলা যাক।

পঞ্চায়েত ভোটের বিপুল সাফল্যের পরও অখুশি মুখ্যমন্ত্রী মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ কিছু রদবদল ঘটালেন। কোনও কোনও মন্ত্রী সম্পূর্ণ ভাবেই ব্রাত্য হলেন। কারও কারও ক্ষেত্রে মন্ত্রিত্বের বদল ঘটল। কেউ পেলেন অতিরিক্ত দায়িত্ব। হুকুম দিয়ে যে তিন মন্ত্রীকে পত্রপাঠ পদত্যাগ করতে বলা হল, তাঁরা হলেন, অনগ্রসর কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী চূড়ামণি মাহাত, আদিবাসী কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী জেমস কুজুর এবং দপ্তরবিহীন মন্ত্রী, দীর্ঘকাল অসুস্থ অবনী জোয়ারদার। প্রথম দুজনের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ আদিবাসী প্রধান অঞ্চলে দল  খারাপ ফল করেছে। ৫ জুন তাঁরা পদত্যাগ করলেন। ৬ জুন মন্ত্রিসভার রদবদল হল। জানা গেল, আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তর দেখবেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই দপ্তরের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য স্বরাষ্ট্র, স্বাস্থ্য, তথ্য ও সংস্কৃতি, সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা সহ আটটি দপ্তর তাঁর হাতে ছিলই। আদিবাসী উন্নয়ন নবম ও নয়া দপ্তর। অনগ্রসর কল্যাণ দপ্তরের দায়িত্ব দেওয়া হল রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়কে। রাজীব ছিলেন সেচমন্ত্রী। জেলায় রাজনৈতিক আকচাআকচির জন্য নাকি তাঁকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ সেচ দপ্তর থেকে ‘কম গুরুত্বপূর্ণ’ দপ্তরে পাঠানো হয়েছে, এমনই মত সাংবাদিক মহলের। এই যে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব ও অগুরুত্বের বিচার, কিংবা শিরোনামে বলে ফেলা ‘চাপে রাজীব’ এখান থেকেও আমরা বুঝে নিতে পারি অনগ্রসরদের কল্যাণ বিষয়ে উচ্চবর্ণ মানসিকতাটিও। প্রকৃত অর্থে তৃণমূল মন্ত্রিসভার দিকে তাকাই একই ছবি দেখতে পাব। মুখ্যমন্ত্রীকে বাদ দিয়ে  ২০১৬’র মে মাসে রাজ্যের ষোড়শ মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী ছিলেন ২৮ জন। এর মধ্যে ব্যানার্জি, মুখার্জি, বসু, মিত্র অর্থাৎ উচ্চবর্ণের সংখ্যা ২২। সংখ্যালঘু মন্ত্রী তিন, আদিবাসী ১, ওবিসি ১জন। দুজনের পদবি থেকে জাতি পরিচয় বোঝা মুশকিল। এর মধ্যে আমরা আগেই বলেছি  আদিবাসী ওঁরাও সম্প্রদায়ের জেমস কুজুর এবং ওবিসি চূড়ামণি মাহাতকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। ১৩ প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে উচ্চবর্ণের প্রতিনিধি ৫ জন, সংখ্যালঘু ৪ জন, আদিবাসী ২ জন এবং অন্যান্য ২ জন। বিগত ১৫টি মন্ত্রিসভার দিকে ফিরে তাকালে অবশ্য আমরা কমবেশি উচ্চবর্ণের আধিপত্যের ছবিটাই দেখতে পাব। আর দেখতে পাব, মুখ্যমন্ত্রী থেকে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ সব দপ্তরই উচ্চবর্ণের দখলে। তবে এই মন্ত্রিসভার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল নগর কেন্দ্রিকতা, এই পূর্ণমন্ত্রীদের মধ্যে ১২ জন কলকাতার নাগরিক। পাঁচজন হাওড়া, শিলিগুড়ি, আসানসোল সহ কোনো না কোনো জেলা শহরের নাগরিক। যাই হোক, আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়ে ফিরি।

কিন্তু, এত জন তফসিলি জাতি ও জনজাতির বিধায়কদের মধ্যে – তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো – যোগ্য মানুষ খুঁজে পাওয়া গেল না? এই রদবদল স্পষ্ট বলছে, না পাওয়া যায়নি।

 

২০১৮ সালের ৬ জুন থেকে আদিবাসী, অনগ্রসর শ্রেণি অর্থাৎ তফসিলি ও অন্যান্য পিছিয়ে পড়া জাতি দপ্তরের মন্ত্রী হলেন বন্দ্যোপাধ্যায় ও ভট্টাচার্যরা। সংখ্যালঘু দপ্তরের পূর্ণমন্ত্রীও যে বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রশ্ন উঠতেই পারে, এতে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হল? আমরা একটু প্রথমে কিছু সংখ্যার হদিস করেনি। ২০১৬ সালে ৬৭টি সংরক্ষিত তফসিলি আসনের ৫০টিতে জয় পায় তৃণমূল কংগ্রেস। এবং ১৩টি সংরক্ষিত আদিবাসী আসনের ১১টি তৃণমূলের দখলে। আর সংখ্যালঘু বিধায়কের সংখ্যা ৩২জন। দ্বিতীয় তৃণমূল কংগ্রেস সরকারে মন্ত্রিত্ব পাওয়া মাহাত, কুজুররা ব্যর্থ হতেই পারেন, ব্যর্থ মন্ত্রীদের সরিয়ে দেওয়া কোনও অন্যায় নয়। কিন্তু, এত জন তফসিলি জাতি ও জনজাতির বিধায়কদের মধ্যে – তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার মতো – যোগ্য মানুষ খুঁজে পাওয়া গেল না? এই রদবদল স্পষ্ট বলছে, না পাওয়া যায়নি। বাকিরাও কেউ যোগ্য নন। এ বিষয়ে তফসিলি জাতি ও আদিবাসী সংগঠনের মধ্যেও যে হিরন্ময় নীরবতা লক্ষ করা যাচ্ছে, তা প্রমাণ করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। আমরা এই পালকের কথাই বলছি। যে পালক মুকুটে সাজিয়ে বলা হবে, জাতপাত নয় যোগ্যতা, মানে মেরিটকেই শিরোধার্য করা হয়েছে।

তাহলে এই যে আমাদের বলা হচ্ছে, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সংবিধান সাম্য ও ন্যায়বিচারের পবিত্র আদর্শ গ্রহণ করেছে। দেশের সামাজিক ও আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়া শ্রেণির মানুষদের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিশেষ সাংবিধানিক ও আইনি ব্যবস্থা রয়েছে, সে সবই কি মিথ্যা ও ব্যর্থ হল? সংবিধানে অনুচ্ছেদ ১৬৪-র অনুবিধিতে বলা হয়েছে, বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও ওড়িশা রাজ্যে আদিবাসী কল্যাণের ভারপ্রাপ্ত একজন মন্ত্রী থাকবেন। সেই মন্ত্রী তফসিলি জাতি ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণেরও ভারপ্রাপ্ত হতে পারেন। সংবিধানের নির্দেশ অনুসারে এই জাতীয় কল্যাণ বিভাগ শুধু আর ওই তিনটি নয়, কার্যত অন্যান্য রাজ্যেও স্থাপিত হয়েছে। (ভারতের সংবিধান পরিচয়, দুর্গাদাস বসু, ২০০১)। এ কথা ঠিক সেই মন্ত্রীকে আদিবাসী বা তফসিলি জাতির মানুষ হতে হবে, এমন কোনও স্পষ্ট নির্দেশ সংবিধানে নেই। কিন্তু, পরম্পরা, গণতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি আমরা এড়িয়ে যেতে পারি না। যদি এড়িয়ে যাই, তবে বুঝতে হবে সংবিধানের আত্মার কণ্ঠ আমরা আর শুনতে পাচ্ছি না। বা শুনেও শুনছি না। দেশ জোড়া দলিত ও আদিবাসী আন্দোলনের বিপরীতে এ এক উল্টো পথের যাত্রা।

এ বধিরতা নয়। আর আমরাও মূক নই। স্পষ্টত এই নীরবতার মধ্য দিয়েই আমরা দলিত ও আদিবাসী মানুষের অধিকারকেই অস্বীকার করি। অস্বীকার করি সমাজে তাদের উপস্থিতিকেই। এ আসলে এ রাজ্যের পরম্পরাগত বর্ণহিন্দু চরিত্রলক্ষণ। ব্রাহ্মণবাদী সামাজিক-রাজনৈতিক আধিপত্যবাদ। এই আধিপত্যবাদী মানসিকতাই মণ্ডল কমিশনকে জানিয়েছিল, “পশ্চিমবঙ্গে কোনও পশ্চাদপদ (ওবিসি) জাতি নেই।” মণ্ডল কমিশনকে এ কথা জানিয়েছিল, ওবিসি বিষয়ক এক সদস্যের বিনয় চৌধুরী কমিটি। বাম কিংবা দক্ষিণ এ রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলি মনেই করে যে পশ্চিমবঙ্গে কোনও জাতি-ভিত্তিক পশ্চাদপদতা বা বৈষম্য নেই। বামফ্রন্ট না হয় স্পষ্ট বলে দিয়েছিল, কিন্তু কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি বা এসইউসি’র মতো দলগুলিও ওবিসি-দের জন্য সংরক্ষণের দাবি জানায়নি। অনেকেই মনে করেন তফসিলি জাতি ও জনজাতিদের যে সমস্ত সাংবিধানিক অধিকার  রয়েছে, যেমন, লোকসভা বা বিধানসভায় আসন সংরক্ষণ, শিক্ষা ও চাকরিতে সংরক্ষণ, সেগুলি রাজনৈতিক দলগুলি বাধ্য হয়ে মেনে চলে। পারলে বানচাল করে দেয়। (পশ্চিমবঙ্গে দলিত ও আদিবাসী, সন্তোষ রাণা ও কুমার রাণা, ২০০৯।)

বানচালের এই অভিযোগ তো আজও ওঠে। অভিযোগ, (এক) রাজ্যে ২ লক্ষ ৬৫ হাজার ৬৫০টি সংরক্ষিত কোটার আসন পূরণ হয়নি। এর মধ্যে এক বড় অংশে ‘যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যায়নি’ এই অজুহাতে ডি-রিজার্ভ করে সাধারণ প্রার্থীদের নিয়োগ করা হয়েছে। (দুই) স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সংরক্ষণ মানা হচ্ছে না। (তিন) ছাত্রদের স্টাইপেন্ডের টাকা সময় মতো পায় না তফসিলি ও আদিবাসী ছাত্র-ছাত্রীরা। এ নিয়ে প্রতিবাদ জানালে মুখ শুনতে হয়। শিক্ষামন্ত্রী তো বলেই ফেলেছেন, তফসিলি ছেলেমেয়েরা স্টাইপেন্ডের জন্যই স্কুলে আসে। অভিযোগ বিস্তর। কিন্তু, কোথাও কোনও সংগঠিত প্রতিবাদ আন্দোলন নেই। শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে জঙ্গলমহলে। স্থানীয় জনজাতি ও দলিত নয়, শিক্ষকতার চাকরি মিলেছে ভিন জেলার প্রার্থীদের। জঙ্গলমহলে হারের কারণ খুঁজতে গিয়ে সাংবাদিকরা এমনই অভিযোগ পেয়েছেন। এ দায় তো মাহাত ও কুজুরদের হতে পারে না। এই দায় তো সেই রাজনৈতিক দল ও সমাজকে নিতে হবে, স্বাধীনতার ৭০ বছর পরও যারা সংখ্যালঘু, অনুন্নত, আদিবাসী উন্নয়ন দপ্তরে স্ব স্ব জনগোষ্ঠী থেকে উঠে আসা কোনো ‘যোগ্য’ পূর্ণমন্ত্রী খুঁজে পায় না।

লেখক একজন স্বতন্ত্র সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

Share this
Leave a Comment