‘উন্নয়ন’-এ চড়তে হলে ‘দূষণ গিলে খাও’!

0
454
Illustration: Sébastien Thibault. Source: Internet.

সস্তা শ্রম এবং বেলাগাম দূষণ। বিশ্বায়নী উদারনীতির ‘উন্নয়ন’-এর এটাই ছিল প্যাকেজ ডিল। ‘উন্নয়ন’-এর চমকানিতে ভারত, বাংলাদেশ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার মতো বিভিন্ন দেশে অরণ্যের-পর-অরণ্য হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, খনিজ সম্পদে ভরা পাহাড় বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, এক দিকে খরায় যখন ভূ-ভারত হেঁচকি তুলে মরেছে তখন নদীর জলে বহুজাতিক পানীয় কোম্পানি বোতল ধুয়েছে। আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘উন্নয়ন’ আমাদের চোখ রাঙিয়ে ঝকঝকে ভারত চিনিয়েছে। লিখছেন নন্দন মিত্র

২৮ মে ২০১৮-র সন্ধ্যায় তামিলনাড়ু সরকার বেদান্ত’র স্টারলাইট প্ল্যান্ট পাকাপাকি ভাবে বন্ধ করার শিলমোহর দিল। ভয়ংকর পরিবেশ দূষণকারী এই প্ল্যান্টটি সরকার বন্ধ করতে বাধ্যই হল। সরকারকে বাধ্য করার পিছনে রয়েছে, বিগত ২৩ বছরের ধারাবাহিক প্রতিবাদ-প্রতিরোধ সংগ্রাম আর ২২মে’র গুলিচালনায় সরকারি হিসেব মতো ১৩ জনের বলিদান। প্রতিবাদের ইতিহাস খুব দ্রুতই হারিয়ে যাবে কিনা জানা নেই, কিন্তু একথা প্রায় নিশ্চিত করেই বলে দেওয়া যায় পরিবেশ দূষণকারী বেদান্ত’র প্রজেক্টগুলি মোটেই পাততাড়ি গুটিয়ে পালাবে না বা পরিবেশের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকারক প্ল্যান্টগুলি সম্পর্কে সরকার বা বিরোধী কেউই কোনও ভূমিকা আগামী দিনে নেবে না। অন্য কোথাও, অন্য কোনও নামে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিষাক্ত-কারখানাগুলো ফিরে আসবে। হয়তো, এই থুথুকুডিতেই। ইতিহাসের গায়ে যদি ২২ মে ২০১৮ ‘ট্র্যাজেডি’র চিহ্ন এঁকে থাকে, তাহলে পুনরাবৃত্তির ‘প্রহসন’ গায়ে মেখে হয়তো আজকের আন্দোলনের জমিকে সেদিন মুচকি হেসে ক্ষান্ত থাকতে হবে। ভারতে উন্নয়নের নীলনকশার হিসেবের মধ্যে বাসযোগ্য-পরিবেশ বা আরো বাড়িয়ে বললে প্রকৃতি-পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, ধ্বংস-রোধ—এসবের কোনও জায়গা নেই। জায়গা নেই বলেই ভারতের বিস্তীর্ণভূমি আজ বহুজাতিক-অতিজাতিকদের মৃগয়াক্ষেত্র। এবং বহুজাতিক-অতিজাতিক প্রভুরা যাতে নির্ঝঞ্ঝাটে মুনাফা-শিকার করতে পারেন তার জন্যেও প্রস্তুত করা আছে যাবতীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যাক-আপ, সমস্যাদায়ী নীতির রদবদলের ব্যবস্থা। আপনি যদি শুধু থুথুকুডি’র স্টারলাইটের উদাহরণটাই ভালো করে দেখেন তাহলেই ‘উন্নয়ন’-এর পিছনে থাকা ব্যপক পরিবেশ ধ্বংসের গল্পটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ইন্সটিটিউট (NEERI/নিরি), স্টারলাইটের এই কারখানাটির পরিবেশের ওপর প্রভাব সংক্রান্ত একাধিক পরীক্ষা করেছে। মাদ্রাজ হাইকোর্টের নির্দেশে তারা প্রথম রিপোর্ট পেশ করে ১৯৯৮ সালে। সেই রিপোর্টে পরিবেশ সংক্রান্ত বিধিনিষেধ পালনে থুথুকুডি প্ল্যান্টের নেতিবাচক ভূমিকাকে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছিল। এর ঠিক কিছু মাস বাদেই ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারির রিপোর্টে আশ্চর্যজনকভাবে নিরি স্টারলাইটের প্ল্যান্টকে ক্লিনচিট দিয়ে দেয়। যদিও তারা ফ্যাক্টরি সংলগ্ন বায়ু এবং ভূগর্ভস্থ জলে দূষণের প্রমাণ পেয়েছিল। ২০১০ সালে মাদ্রাজ হাইকোর্ট ১৯৯৬-এর একটি মামলায় স্টারলাইট প্ল্যান্ট বন্ধের নির্দেশ দিলেও তিনদিনের মধ্যে স্টারলাইট সুপ্রিমকোর্টে স্টে-অর্ডার পেয়ে যায়। আবারও নিরির কাছে এনভায়রনমেন্ট ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্টে বা পরিবেশের ওপর প্রভাব মাপার দায়িত্ব দেয় সুপ্রিম কোর্ট। এবারেও ক্লিনচিট পায় স্টারলাইট। অনুসন্ধানে বাতাস থেকে ভৌম জল সর্বত্রই প্ল্যান্ট -নির্গত দূষণ সৃষ্টিকারী নানান উপকরণের সন্ধান পেলেও নিরি রিপোর্টটি এমন ভাবেই প্রস্তুত করেছিল যাতে কোর্টে স্টারলাইটের দোষ অনেকটাই হালকা হয়ে যায়। স্টারলাইট কীভাবে দূষণের মাত্রা কমাতে পারে, পরিবেশ সংবেদী উৎপাদনের পথে যেতে পারে সে বিষয়ক উপদেশ ছিল রিপোর্টে। প্রকৃত অবস্থার প্রতিনিধিত্ব না-করা কমজোরি রিপোর্টের ফলেই ২০১০-এর প্ল্যান্ট বন্ধের নির্দেশ খারিজ হয়ে যায়। ১০০ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের বিনিময়ে স্টারলাইটের তামা-প্ল্যান্টটি থুথুকুডিতে আগের মতোই সংলগ্ন এলাকার মানুষের ওপর বিষাক্ত দূষণের বোঝা চাপিয়ে চলতে শুরু করে।

থুথুকুডিতে গত ২৩ বছর ধরে মানুষ নিরবিচ্ছিন্নভাবে স্টারলাইটের দূষণের বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে এসেছে। আজ দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের ফলশ্রুতিতে তাদেরই কিছু সাথির প্রাণের বিনিময়ে এই জয় তারা ছিনিয়ে আনতে পেরেছে। কিন্তু, এই জয় সাময়িক বই কিছু নয়। আজ এ কথা বলতেই হচ্ছে, তার কারণ একদিকে ভারতবর্ষের উন্নয়ন-প্রোপাগান্ডা আর অন্যদিকে প্রকৃতি-পরিবেশ সঙ্কটের সার্বিকতা। অর্থাৎ, থুথুকুডির কারখানার দূষণের প্রত্যক্ষ কবলে ওই অঞ্চলের মানুষই আজ বিপর্যস্ত হবেন বা হয়ে এসেছেন—বিষয়টা এতটা স্থানিক হয়ে আজকে আর নেই। থুথুকুডিকে বুঝতে হলে আজ সারা ভারতের দূষণ-মানচিত্রের অংশ হিসেবেই তাকে বুঝে নিতে হবে। এবং এই সমগ্র দূষণ মানচিত্রটির প্রত্যক্ষ কবলে আমরা প্রত্যেকেই পড়ছি। পরিবেশ সঙ্কটের প্রশ্নটি যে অর্থে সার্বিক, আজ কোনও একটি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে হয়ে চলা দূষণও সেই অর্থেই সার্বিক হয়ে উঠেছে। ফলত আজ ‘উন্নয়ন’ নামক এই ভয়াবহ পরিবেশধ্বংসী কর্পোরেট উদ্যোগটিকে প্রশ্ন না করে পালিয়ে যাবার উপায় নেই। প্রশ্নটা আজকের স্থান-কালে এই মুহূর্তের কোনও রিলিফ বা খুচরো সমাধানে মিটিয়ে ফেলা যাবে না। বাস্তুতন্ত্রের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাবটিকে বিচার করতে হবে। যেভাবে থুথুকুডির মানুষের স্টারলাইটের দেওয়া ক্যানসারের বীজ শরীরে বয়ে নিয়ে চলবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, যেভাবে ইউনিয়ন কার্বাইডের কর্পোরেট ক্রাইমের বোঝা প্রত্যেকদিন টেনে চলবে প্রত্যেক ভোপালবাসী যারা সংক্রামিত ভূগর্ভস্থ জলের সংস্পর্শে আসবেন, যেভাবে নিত্যদিন নিত্য নতুন কেমিক্যাল কমপোনেন্ট ভারতের খোলা-বাজারে কোনোরকম অ্যাসেসমেন্ট রিপোর্ট ছাড়াই পণ্য হয়ে ঢুকে পড়বে, আর আমি-আপনি বাধ্য হব সেগুলো ব্যবহার করে নিজেদেরকে বহুজাতিক কেমিক্যাল কোম্পানির গিনিপিগ করে তুলতে — আমাদের কাছে দূষণের এই বাস্তবটি কোনোমতেই আর বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারবে না। সার্বিক ভাবেই দূষণের বাস্তবটি বুঝতে হবে এবং এ বিষয়ে নিঃসন্দেহ থাকতে হবে যে, এই বাস্তবটির থেকে বর্তমান ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’র উন্নয়নী বাস্তবটি মোটেই আলাদা নয়। ‘উন্নয়ন’-এর রথে চড়তে হলে দূষণ গিলে খেতে শেখো।

Vedanta in Niyamgiri. Source: BBC

বেদান্ত’র সঙ্গে পরিবেশের সংঘাত তো থুথুকোডিতেই প্রথম হল না, এর আগে আমরা নিয়মগিরিও দেখেছি। সেই একই কায়দায় বক্সাইট-মাইনিং-এর জন্য পাহাড় লুঠে নেবার উন্নয়ন প্রকল্পে বলি হতে যাচ্ছিল ডোংরিয়া কোন্ধ’রা। ডোংরিয়া কোন্ধ’দের প্রকৃতি-সংলগ্ন যাপনই প্রতিস্পর্ধা হয়ে রুখে দিয়েছে বেদান্তকে। সরকারকে প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য করেছে। শোনা যাচ্ছে থুথুকুডির এই প্ল্যান্ট নাকি অন্য দু-তিনটি রাজ্য থেকে খারিজ হয়ে এখানে এসেছে। অর্থাৎ ভেবে দেখুন পাঠক, যে প্ল্যান্ট এক রাজ্যের পরিবেশ-নীতির নিরিখে পাশ করতে পারল না তা অন্য রাজ্যে পাশ করে যাচ্ছে। দেশের শ্রম আইন, পরিবেশনীতি এগুলিকে বেদান্ত’র মতন বহুজাতিক কর্পোরেট প্রায় যে ছেলেখেলায় পরিণত করেছে তা সহজেই অনুমেয়। ১৯৯০ পরবর্তী সময়ে বিশ্বায়িত অর্থনীতির সাথে ভারতের ভেতরেও একের-পর-এক অর্থনৈতিক সংষ্কারের আঘাত নেমে এসেছে। আবার ৯২’তে রিও পরিবেশ সম্মেলনে সম্মিলিতভাবে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রগুলির সিদ্ধান্তের পর গোটা বিশ্বেই এক অভূতপূর্ব এক্সপোর্ট-নির্ভর দূষিত উৎপাদন-প্রক্রিয়ার জন্ম হয়েছে। বিষয়টা হল একদিকে গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে হবে অথচ অর্থনৈতিক বৃদ্ধির অনন্ত গতিকে থামানো যাবে না। এ দুই এক সাথে কীভাবে হতে পারে? আমরা প্রত্যক্ষ করেছি কীভাবে দূষণ-নিয়ন্ত্রণ নিজেই একটা বাণিজ্য হয়ে উঠছে কার্বন-অর্থনীতির হাত ধরে।

Source: Internet

আর এই পর্ব থেকেই ভারতে নয়া উদারনৈতিক যাত্রাপথের গল্পটা আমরা একদিক থেকে পড়ার চেষ্টা করে এসেছি এতকাল। পরিবেশ প্রেক্ষিত থেকে পড়লে তার চিত্রটা আরো মারাত্মক হয়ে ওঠে। ভারতের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলির শ্রম বাজারে আমরা ক্রমাগত ঢুকে আসতে দেখেছি বহুজাতিক-অতিজাতিক পুঁজিকে। সস্তা শ্রমের বাজার লুঠ করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। ক্রমশ আইনি রক্ষাকবচগুলি সরিয়ে নিয়ে কর্পোরেট-ফ্রেন্ডলি করে তোলার চেষ্টা হয়েছে ভারতের বাজারকে। স্পেশ্যাল-ইকনমিক-জোন নামক শ্রম-শক্তি শোষণের কর্পোরেট ব্যবস্থাগুলিও আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু হয়তো যেদিকটা আমরা প্রত্যক্ষ সেভাবে করিনি সেটা হচ্ছে দূষণের প্রসঙ্গটা। সস্তা শ্রম এবং বেলাগাম দূষণ। বিশ্বায়নী উদারনীতির এটাই ছিল প্যাকেজ ডিল। অর্থাৎ একভাবে রিও চুক্তি অনুযায়ী প্রথম বিশ্বের দেশগুলি নিজের দেশে গ্রিন হাউস গ্যাস উৎপাদন কমিয়ে আনতে পারল, অথচ বিশ্বায়িত অর্থনীতির অসীম বৃদ্ধির গতিতে রাশও টানা হল না। ভারত, বাংলাদেশ, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশ সরাসরি সস্তা শ্রম ও বেলাগাম দূষণের এই প্যাকেজ ডিলের সব থেকে বড় মার্কেট। আন্তর্জাতিকভাবে কুখ্যাত ডাও কেমিক্যাল থেকে ইন্দোনেশিয়ার সালেম, মনসান্টো দ্যুঁপোর মতো দানবীয় বীজ কোম্পানি, বেদান্ত’র মতো কুখ্যাত মাইনিং কোম্পানি, পরমানু বিদ্যুৎ, কয়লা বিদ্যুৎ কোম্পানি, একের-পর-এক বাঁধ নির্মাতা থেকে প্রথম বিশ্বে রিজেক্টেড/ব্ল্যাক লিস্টেড কোম্পানিরা কেউ সরাসরি কেউ নাম ভাঁড়িয়ে আসমুদ্র-হিমাচল দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এই দাপাদাপির পোশাকি নামই ‘উন্নয়ন’। যা আজকে নয়, চিরকালই রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল। এবং যারা তাকে মানতে চায়নি তাদের হয় উচ্ছেদ নতুবা ঘাড় ধরে ‘উন্নয়ন’-এর ৮-লেনের হাইওয়েতে টেনে নিয়ে আসা হয়েছিল। ‘উন্নয়ন’-এর চমকানিতে ভারতের অরণ্যের-পর-অরণ্য হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে, খনিজ সম্পদে ভরা পাহাড় বিদেশে পাচার হয়ে গেছে, এক দিকে খরায় যখন ভূ-ভারত হেঁচকি তুলে মরেছে তখন নদীর জলে বহুজাতিক পানীয় কোম্পানি বোতল ধুয়েছে। আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে ‘উন্নয়ন’ আমাদের চোখ রাঙিয়ে ঝকঝকে ভারত চিনিয়েছে। ভারতের মতো বাস্তুতান্ত্রিক ভাবে সমৃদ্ধ একটা দেশে এক একটা বাস্তুতান্ত্রিক-সংবেদনশীল অঞ্চল কীভাবে গড়ে উঠেছে তার বিজ্ঞান/ইতিহাসের দিকে ন্যূনতম নজরপাত না করে উন্নয়নের স্টিম-রোলার চালানো হয়েছে। জনগণের ঘাড়ে খুরোর কলের মত কর্মসংস্থান, আচ্ছে দিন, মেক ইন ইন্ডিয়া ইত্যাদির বুলি ঝুলিয়ে। ‘উন্নয়ন’-এর হাইওয়েতে দৌড়তে দৌড়তে আমাদের ফুসফুস ভরেছে বিষাক্ত ধোঁয়ায়। কখনো-বা ধোঁয়াশার অন্ধকারে ধাক্কাধাক্কি খেয়ে নিজেরাই নিজেদের ঘায়েল করেছি। আজ থুথুকুডি যে লড়াইটা চালিয়ে যেতে পেরেছে বা নিয়মগিরিতে যেটা করা সম্ভব হয়েছে সেখানেই বহুজায়গায় এখনো ন্যূনতম প্রতিরোধটুকুও গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। আজ ভারতের শ্রমবাজারে যে পণ্যটা তৈরি হচ্ছে তার উপভোক্তা বসে রয়েছে প্রথম বিশ্বের কোনও দূষণ নিয়ন্ত্রিত শহরে অথচ আমরা না পাচ্ছি শ্রমের ন্যায্য মূল্য, উলটে দূষণ গিলে খেতে হচ্ছে বংশ-পরম্পরায়। যেভাবে অনেক তাত্ত্বিকেরা ভারত, বাংলাদেশ প্রভৃতিকে নয়া-অর্থনৈতিক কলোনি বলে অভিহিত করছেন, সেভাবে দূষণের-নয়া-আন্তর্জাতিক-কলোনি বললে খুব অত্যুক্তি হবে বলে মনে হয় না। এর পাশাপাশি যদি আপনি অরণ্য সহ প্রকৃতির বিবিধ ভাণ্ডার দখলের প্রকল্পটি ক্রমশ বুঝে ওঠার চেষ্টা করেন পাঠক, তাহলে নিশ্চিত বুঝতে পারবেন ‘উন্নয়ন’ কীভাবে রাস্তা ছেড়ে আপনার ঘাড়ের ওপর উঠে দাঁড়িয়েছে!

Vedanta aluminium mines. Source: Internet

‘উন্নয়ন’-এর গাণিতিক হিসেবনিকেশ এখন পরিবেশ-প্রকৃতির লাভ-ক্ষতির অঙ্কেও ঢুকে পড়েছে। মাটি-জল-খনিজ-তেল-গ্যাস-বায়ু-উদ্ভিদ ও প্রাণীকূল এসবই এখন ন্যাচারল ক্যাপিটাল বা প্রাকৃতিক পুঁজি। এই প্রাকৃতিক পুঁজির মূল্য নির্ধারণ করে তাকে পণ্য-বাজারের আওতায় আনা হচ্ছে। প্রকৃতির মধ্যে লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য অর্থনীতিকে মূল্য নির্ধারণ করে মূর্ত করে তোলার মধ্যে দিয়ে যে ঘটনাটি ঘটছে তাকে বলা যেতে পারে ক্যাপিটালাইজেশন অভ নেচার বা প্রকৃতির পুঁজিকরণ। আর এই গল্পটি তৈরি হচ্ছে প্রকৃতি-পরিবেশ সংরক্ষণের গল্পের নামেই। ভারতবর্ষের ক্রান্তীয় অরণ্যে এভাবেই অদৃশ্য অর্থনীতির চিহ্নিতকরণ এবং মূল্য নির্ধারণ হয়েছে একাধিক বাস্তুতান্ত্রিক উপকরণের। কর্পোরেট কোম্পানি থেকে পুঁজি-কর্পোরেশন, সরকারি আনুকূল্যে এরা সকলেই ‘প্রাকৃতিক পুঁজি’-সমৃদ্ধ অঞ্চলগুলিতে — যার মধ্যে অরণ্য থেকে হিমালয় পর্বতমালা অঞ্চলের মতো বাস্তুতান্ত্রিক ভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকাগুলি রয়েছে — বন/পশু সংরক্ষণের নামে ব্যবসা করতে ঢুকে পড়ছে। মূল্য নির্ধারণের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে বাস্তুতান্ত্রিক হিসেব মেটানোর এক অদ্ভুত অর্থনীতি। অর্থাৎ একটি জায়গায় কোনও একটি মাইনিং কোম্পানি তার কাজের জন্য বাস্তুতন্ত্রের ব্যাপক ক্ষতি করল, অন্য কোনও জায়গায় সে সমমূল্যের পরিবেশ-কর্ম করে ক্ষতি চুকিয়ে দিয়ে হিসেব বরাবর করে দিল। এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘অফসেটিং’। একটু খেয়াল করে দেখলে দেখতে পাবেন যখনই কোনও জায়গায় প্রকৃতি ধ্বংসের বিরুদ্ধে প্রশ্ন ওঠে, তখনি এই ক্ষতি মিটিয়ে দেওয়ার গল্পটি বেশ জোরালো ভাবে এসে হাজির হয়।

Source: Pinterest

যেনো বাস্তুতন্ত্রের যে ক্ষতিসাধন হচ্ছে তার প্রকৃত মূল্য ওই সময়কালে দাঁড়িয়ে বাস্তুতন্ত্রটি যে অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি করছে সেটুকুতেই সীমাবদ্ধ। আর তার বদলে অন্য কোথাও দুটো গাছ লাগালেই ধ্বংসপ্রাপ্ত বাস্তুতান্ত্রিক ক্ষতি মিটিয়ে দেওয়া যায়। এক-একটা বাস্তুতন্ত্র গড়ে ওঠে দীর্ঘ-দীর্ঘদিন ধরে। এক নিমেষে তাকে ধ্বংস করে ফেলা হয় বহুজাতিক-অতিজাতিক কর্পোরেশনের মুনাফার স্বার্থে। ভুলে যাওয়া হয় বাস্তুতন্ত্রের ভিতরের জটিল গঠন-বিজ্ঞানটি। শুধু অর্থ মূল্যে তা সেই মুহূর্তে যা দাঁড়াচ্ছে সেটুকুই ওই বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্ব হয়ে দাঁড়ায় মুক্ত-বাজার অর্থনীতির সামনে। সেই বাস্তুতন্ত্রে গড়ে ওঠা জীবনবোধ-সমাজবোধ ইত্যাদি তো আরো দূরের ব্যাপার। ফলত, হিমালয়-পর্বতমালায় নদীর উচ্চ-প্রবাহ জুড়ে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ করে পাহাড়ি-অঞ্চলকে ক্রমশ ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া জারি থাকবে। নদীর উচ্চগতিতে একের পর এক বাঁধে নদী যখন মধ্য ও নিম্ন গতিতে ক্রমশ নিজস্ব ভূগোল হারিয়ে ধ্বংস হয়ে যেতে থাকবে এবং সুজলাং-সুফলাং ধরণী ক্রমশ শুকিয়ে যেতে থাকবে তখন কর্পোরেট-ফ্রেন্ডলি অফসেটিংবাদী পুঁজির-সেবাদাস প্রকৃতি-বিজ্ঞানীরা নদী-সংযুক্তির দাওয়াই বাতলাবেন। সেই মুহূর্তে এই তথ্য সম্পূর্ণ ভুলে যাওয়া হবে যে, নদীর এই বিশেষ গতির জন্যই দেশের মৌসুমী বায়ুর অনুপ্রবেশ ও গতি এতকাল একভাবে হয়ে এসেছে। নদী সংযুক্তি প্রকল্প বর্ষা মানচিত্রটাকেই সম্পূর্ণ ওলটপালট করে দেবে। যে মুহূর্ত থেকে প্রাকৃতিক সম্পদের মূল্য নির্ধারণ শুরু হয়েছে সেই মুহূর্ত থেকে অরণ্য ধ্বংস আরো নতুন গতি পেয়েছে। কারণ, পুঁজিবাদী হিসেবের চোখে কোনও একটি অরণ্য থাকায় মোট যা মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে তার চেয়ে যদি অরণ্য না থাকা বেশি মূল্যদায়ী হয়—তবে সেটাই হবে। এক জায়গায় অরণ্য ধ্বংস করে অন্য জায়গায় গাছের চারা পুঁতে হিসেব মিটিয়ে দেওয়া হবে। ঠিক এরকম হিসেব মিটিয়ে দেওয়ার কথাই আমরা শুনেছিলাম যখন ভাবাদীঘি বুজিয়ে রেললাইন পাতার বিরুদ্ধে মানুষ আন্দোলন করছিলেন—বিনিময়ে দুটি দীঘি খুঁড়ে অর্থনীতির হিসেবে আখেরে লাভের অঙ্ক বোঝানোর চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু, যেভাবে ডোংরিয়া কোন্ধরাও এই পরিবেশ-অর্থনীতির হিসেবে নিজেদের প্রকৃতি-সংলগ্ন জীবন বোধের অঙ্ক মেলাতে পারেনি সেভাবেই ভাবাদীঘির মানুষেরাও দুটো দীঘিতে আখেরে ক্ষতিই বুঝেছিলেন। অফসেটিং-এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ভাবাদীঘির বাস্তুতন্ত্রকে রক্ষা করতে চেয়েছিলেন। একই রকম অফসেটিং-এর গল্প আমরা শুনতে পাবো আজ যখন বাস্তুতান্ত্রিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল পূর্ব কলকাতা জলাজমির দিকে জমি হাঙরদের চোখ পড়েছে। এখনো ওটির ন্যাচারাল ক্যাপিটাল-এ বদলে যাওয়া বাকি আছে। সময় বলবে মানুষ বাস্তুতন্ত্রের পুঁজিকরণ ওখানে আটকাতে পারে কি না!

 

হাবড়ায় যশোর রোড সম্প্রসারণের প্রকল্পে কাটা পড়বে ১০০ বছরের-ও পুরনো এইসব গাছগুলি।

আজকের ‘উন্নয়ন’-এর রাজনীতি আর অর্থনীতিকে যদি পড়তে হয় তাহলে প্রকৃতি-পরিবেশের চোখটি অনস্বীকার্য। কারণ, এই মুহূর্তে ‘উন্নয়ন’-এর বড় হাঁ-টির সামনে সমস্ত প্রকৃতি-পরিবেশ দাঁড়িয়ে আছে। যারপুঁজিকরণ করে ‘উন্নয়ন’-প্যাকেজের হাত ধরে বাজারে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারলেই ‘এন্ডলেস-গ্রোথ’-এর যাত্রাপথ আরো মসৃণ হয়ে উঠবে। ভারতের মতো দেশে প্রকৃতি-পরিবেশ, অরণ্য, শহর-গ্রামের বাসযোগ্য পরিবেশ এই পুরোটাই বহুজাতিক-অতিজাতিক পুঁজির ভয়ংকরআগ্রাসনের মুখে। একদিকে যেমন অনিয়ন্ত্রিত দূষণের ছাড়পত্র পাওয়া কোম্পানিদের স্বর্গরাজ্য অন্যদিকে অরণ্য-ক্ষেত খামার-নদী-বীজবাজারে বহুজাতিকের অনুপ্রবেশ। সাম্প্রতিক ভাঙড়ের আন্দোলনই উৎকৃষ্ট উদাহরণ যেখানে কোম্পানি নিজেই নিজের বানানো হাই-ভোল্টেজ তার নিয়ে যাওয়া ও গ্রিড বানানো সংক্রান্ত বিধিনিষেধ অমান্য করছে। অন্যদিকে প্রতিবাদী জনগণের ওপর নেমে আসছে রাষ্ট্রীয়-দলীয় সন্ত্রাস। আশার কথা আন্দোলনগুলি হাল ছেড়ে দিচ্ছে না। যেভাবে থুথুকুডিও ছেড়ে দেয়নি। স্থানিক-কালিক কোনও খুচরো সমাধানের পথে না-গিয়ে এই আন্দোলনগুলি প্রকৃতি-পরিবেশ ধ্বংসের প্রশ্নটিকে সার্বিকভাবে তুলে আনছে, পুঁজি-আগ্রাসনের নয়া আখ্যান তথা ‘উন্নয়ন’-এর রাজনীতি-অর্থনীতির নগ্ন চিত্রটি উন্মোচিত করছে। বাড়িতে কিচেন-গার্ডেন বানিয়ে বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে[বা সরকারি (পুঁজির!)] গাছের চারা লাগিয়ে জঙ্গল বানিয়ে যে ‘উন্নয়ন’-এর গ্রাস থেকে প্রকৃতি-পরিবেশের সঙ্কটকে রোখা যাবে না, থুথুকুডি-ভাঙর-নিয়মগিরি-রামপাল-ভাবাদীঘির মতো প্রতিরোধগুলি তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে। প্রশ্ন হল, ‘উন্নয়ন’-এর ভয়-ভীতি আর মায়া কাটিয়ে আমরা সবাই মিলে কবে সেটা দেখতে পাবো!

Courtesy: Video Republic

সূত্রঃ

১) http://www.downtoearth.org.in/news/neeri-made-way-for-sterlite-to-pollute-tuticorin-60647

২) This Changes Everything: Capitalism vs. the Climate; Naomi Klein.

৩) Capitalisation of Nature: Political Economy of Forest/Biodiversity Offsets; Soumitra Ghosh.

লেখক সামাজিক কর্মী ও স্কুল শিক্ষক।

Share this

NO COMMENTS

LEAVE A REPLY